Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-৩০-২০১৬

বোল্টকে অমরত্বের স্বীকৃতি দেয়াই যায়

আরিফুর রহমান বাবু


বোল্টকে অমরত্বের স্বীকৃতি দেয়াই যায়

তার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা হয়ে গিয়েছিল আগেই। অলিম্পিকের ১২০ বছরে কেউ যা কখনো পারেনি, সে বিরল ও আকাশ ছোঁয়া কৃতিত্বটা চার বছর আগে লন্ডনেই নিজের করে ফেলেছিলেন উসাইন সেন্ট লিও বোল্ট। 

একজন দৌড়বীদ ১০০, ২০০ মিটার দৌড়ে স্বর্ণ বিজয়ের পাশাপাশি ৪*১০০ মিটার রিলের রেসেও পর পর দুই আসরে নিজের দেশকে সোনালী সাফল্য এনে দিতে পারেন- ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকে উসাইন বোল্টই তা প্রথম করে দেখান। 

২০০৮ সালে চীনের বেইজিংয়ে উল্কার মত আবির্ভাব জ্যামাইকান স্প্রিন্টারের। ইভেন্ট শুরুর আগেই বলে বসেন, ‘আমিই হবো এবারের দ্রুততম মানব। পাশাপাশি ২০০ মিটারেও সবার আগে ফিনিশিং মার্কে পৌঁছাবো। আর দুটি ইভেন্টে নতুন অলিম্পিক রেকর্ডও গড়বো।’ তার কথা শুনে তো সবাই অবাক। বলে কী ছোকরাটা। সত্যি সত্যিই তাই করে দেখালেন তিনি। সবার ধারনাকে ভুল প্রমাণ করে ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে নতুন অলিম্পিক রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জিতলেন জ্যামাইকার ২২ বছর বয়সী তেজোদ্দীপ্ত যুবা বোল্ট। এরপর তার গলায় ওঠে আরও একটি স্বর্ণ পদক। বোল্ট হন ৪দ্ধ১০০ মিটার রিলে রেসে জয়ী জ্যামাইকার চার দৌড়বিদের একজন।  

তিন বছর পর ২০১১ বিশ্ব এ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ফলস স্টার্টের কারণে ডিসকোয়ালিফাইড হয়ে যাবার পর মনে হচ্ছিল বোল্ট উপাখ্যান বুঝি শেষ; কিন্তু এক বছর না পেরুতেই আবার ঘুরে দাড়ান বোল্ট। ২০১২ সালে লন্ডনে আবারো বোল্ট ম্যাজিক; দ্বিতীয়বারের মত অলিম্পিকে ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড় ও ৪দ্ধ১০০ মিটার রিলে রেসে স্বর্ণ জয়।  

কাজেই ইতিহাস স্রষ্টা বোল্টের কাছে এবারের রিও অলিম্পিক গেমসে ছিল অমরত্বের হাতছানি। এবার কি করবেন উসাইন বোল্ট? এ আলোচনাই ছিল সর্বত্র। অলিম্পিকের ১২০ বছরে যা কখনো হয়নি, সেই বিরল কৃতিত্বের অধিকারী হবেন? প্রথম এ্যাথলেট হিসেবে পরপর তিন অলিম্পিক গেমসের দ্রুততম মানব এবং ২০০ মিটার স্প্রিন্টে স্বর্ণ ও ৪*১০০ রিলে রেসে বিজয়ের দূর্লভ কৃতিত্বটা কি তারই হবে? বেইজিং ২০০৮, লন্ডন ২০১২‘র পর এবার রিওতেও বোল্টই হবেন ট্র্যাকের রাজা? বিশ্বের শত কোটি খেলাপ্রেমী উন্মুখ হয়ে ছিলেন তা দেখতে।

bolt টানা তিনবার ওই অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারি হবার অর্থ ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে জীবন্ত কিংবদন্তী হয়ে থাকা। এ উপলব্ধি তার নিজেরও ছিল। তাই তো এক যুগ আগে আবির্ভাবে ঘোষণা দিয়ে ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ বিজয়ের পর এবারও বোল্টের কন্ঠে ছিল সাফল্যের পূর্বাভাষ। 

টানা তিন অলিম্পিকে দ্রুততম মানব হবার পর পরই তার মুখ থেকে একটি কথা উচ্চারিত হয়েছে, ‘আমি পেলে ও মোহাম্মদ আলীর মত গ্রেটেস্ট হতে চাই।’ সত্যি সত্যিই গ্রেট বনে গেছেন এ জ্যামাইকান। গত ২০ আগস্ট রিও‘র ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে সে অমরত্বের দেখা মিললো। তিন সহযোগি আসাফা পাওয়েল, ইয়োহান ব্লেক ও নিকেল এ্যাসমেকে নিয়ে জাপানী দৌড়বিদদের পিছনে ফেলে ৩৭.২৭৫ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে টানা তৃতীয়বার ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ের পর ৪*১০০ মিটার রিলে রেসেও স্বর্ণ বিজয়ী হলেন বোল্ট। এরই সঙ্গে হয়ে গেলেন ‘জীবন্ত কিংবদন্তী।’ পেয়ে গেলেন অমরত্ব। গ্রেটেস্ট বলতে সম্ভবত আর কোন দ্বীধা নেই বোল্টকে।

সঙ্গে আরও একটি বড় সড় সার্টিফিকেট জুটে গেলো। অলিম্পিক  ইতিহাসে সর্বকালের সেরা দৌড়বীদের তকমা। বোল্ট নিজেই বলেছেন, ‘আমি এখন মোহাম্মদ আলী ও পেলের মতই গ্রেটেস্ট।’ অতিবড় সমালোচকেরও মুখ বন্ধ। বোল্টকে অলিম্পিক ইতিহাসের সেরা দৌড়বিদ বলতে আপত্তি নেই কারো। কি করে থাকবে? 

পরপর তিন অলিম্পিকে দ্রুততম মানব হবার পাশাপাশি ২০০ মিটার দৌড়েও সবাইকে পেছনে ফেলা এবং ৪দ্ধ১০০ মিটার রিলের স্বর্ণ জয়ের অসামান্য কীর্তি ও বিরল রেকর্ডটিও যে বোল্টের দখলে!  ইতিহাস স্বাক্ষী দিচ্ছে, অলিম্পিকের ১২০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব বরেন্য স্প্রিন্টার কার্ল লুইসই পরপর দু’বার (১৯৮৪ লস এ্যাঞ্জেলেস ও ১৯৮৮ সিউল) দ্রুততম মানব হয়ে ইতিহাস রচনা করেছিলেন। বোল্ট ২০১২ সালে লন্ডনেই কার্ল লুইসকে ছুঁয়ে ফেলেন। এবার ছিল তাকে ছাড়িয়ে যাবার পালা। 

নিজের সেরা সময় ৯.৫৮ সেকেন্ডকে পিছনে ফেলতে না পারলেও  ৯.৮১ সেকেন্ডে বাকিদের পিছনে ফেলেই ফিনিশিং টেপ স্পর্শ করেন। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিন গ্যাটলিন এবং কানডার আন্দ্রে গ্রাসেকে টপকে সবার আগে ফিনিশিং মার্কে পৌছলেও শুরু দেখে মনে হয়নি বোল্ট স্বর্ন জিতবেন। অতিবড় ভক্তও চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। চিন্তিায় পড়ারই কথা। বোল্টের স্টার্টিংটাই তেমন সুবিধার হয়নি। প্রথমেই এগিয়ে যান গ্যাটলিন। অর্ধেকেরও বেশি দুরত্ব পর্যন্ত গ্যাটলিনের পিছনেই ছিলেন বোল্ট। ৬০ মিটার থেকে হঠাৎ তেজ বেড়ে যায়। চাবুক খাওয়া ঘোড়ার মত ছুটতে থাকেন। তার প্রচন্ড গতি আর লম্বা লম্বা স্টেপিংয়ের কাছে ধীরে ধীরে নুয়ে পড়েন গ্যাটলিন। ৭০ মিটার থেকেই নিয়ন্ত্রণ চলে যায় বোল্টের কাছে। শেষ অবধি সেটাই বহাল থাকলো। ৯.৮১ সেকেন্ডে ১০০ মিটার শেষ করা বোল্টের ০.০৮ সেকেন্ড পরে ফিনিশিং মার্কে পা রাখেন গ্যাটলিন। 

প্রচার মাধ্যম এমন গতিময় দৌড়বীদের নতুন নাম দিয়েছে ‘বিদ্যুৎ গতির বোল্ট।’ বোল্ট নিজেও স্বীকার করেন, ‘শুরুটা তেমন ভাল হয়নি। তারপরও আমি এক সময় ঠিক নিজেকে ফিরে পাই এবং সবার আগেই পৌছে যাই।’ 

শুনে অবাক হবেন, ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের সব সময়ের সেরা দৌড়বীদ ও সময়ের অন্যতম সেরা এ্যাথলেট উসাইন বোল্ট কিন্তু প্রথম জীবনে স্প্রিন্টার হতে চাননি। কৈশোর ও তারুণ্যে অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাকের চেয়ে ক্রিকেট মাঠ আর ২২ গজের পিচই তাকে বেশি টানতো। জ্যামাইকান খেলাপ্রেমী উসাইন বোল্টের প্রথম পছন্দ ছিল ক্রিকেট। ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলেন। 

কৈশোরের স্বপ্ন ছিল ফাস্টবোলার হবার। পাকিস্তানের ফাস্টবোলার ওয়াকার ইউনুসের বোলিংয়ে দারুণ ভক্ত ছিলেন বোল্ট। ধরা যাক, অ্যাথলেট বা স্প্রিন্টার না হয়ে ফাস্টবোলারই হতেন তিনি। তাহলে আজ কোথায় থাকতেন বোল্ট? খুব ভালো মাপের ফাস্টবোলার হলে বড়জোর মাইকেল হোল্ডিং, অ্যান্ডি রবার্টস, জোয়েল গার্নার, ম্যালকম মার্শাল, কার্টলি এ্যামব্রোস কিংবা কোর্টনি ওয়ালশের কাতারে জায়গা হতো তার! 

তাহলে কি ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বকালের সেরা ফাস্ট বোলারদের তালিকায় নাম থাকতো? ক্রিকেট বিশ্ব কি চিনতো একজন ভাল ফাস্ট বোলার হিসেবে? এখনকার যে বিশ্বজোড়া পরিচিতি, খ্যাতি, প্রাপ্তি-অর্জন তার কিছুই কিন্তু হতো না। আজকের জীবন্ত কিংবদন্তী  উসাইন বোল্টকে চিনতো শুধু ক্রিকেট খেলুড়ে দেশগুলোর মানুষরা; কিন্তু এখন তাকে সারা বিশ্ব এক নামে চেনে, জানে। তার অসামান্য প্রতিভার প্রশংসা, স্তুতি ও বন্দনা সবার মুখে মুখে। 

ক্রিকেটার না হলেও ক্রিকেট এখনো তার দ্বিতীয় পছন্দ। শচীন টেন্ডুলকারের বড় ভক্ত তিনি। দুই মারকুটে ওপেনার ক্রিস গেইল ও ম্যাথ্যু হেইডেনের আক্রমনাত্মক উইলোবাজিও তার অনেক পছন্দের। এক প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচে বোল্টের দারুণ গতি ও সুইংয়ে পরাস্ত ক্রিস গেইলের উইকেট উপড়ে গিয়েছিল। ক্যারিবীয় স্বর্ণ যুগের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার কার্টলি এ্যামব্রোসও ফাষ্টবোলার বোল্টের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। 

ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবল-বাস্কেটবলও তাকে টানে। ক্লাব ফুটবলে ইংলিশ দল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অন্ধ ভক্ত বোল্টের প্রিয় ফুটবলার ছিলেন ডাচ স্ট্রাইকার নিস্টলরয়। এদিকে ২০১৩ সালে এনবিএ অলস্টার উইকেন্ড সেলিব্রেটি বাস্কেটবলেও অংশ নেন। তবে স্বীকার করেন, ‘আমার স্কিলে ঘাটতি আছে।’ 

বাস্কেটবলে তার স্কিলে ঘাটতি থাকতেই পাওে; কিন্তু দৌড়বীদ উসাইন বোল্টের যে কোন কিছুরই কমতি নেই! একটানা ১২বছর শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার দৃঢ় সংকল্প, কঠোর সাধনা আর জায়গামত পারফর্ম করার দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিই তাকে এনে দিয়েছে অমরত্ব। ১২০ বছরে যা কেউ করতে পারেননি, সেই না পারাকে জয় করেই ‘ট্রিপল-ট্রিপল’ অধিকারী ২৮ বছরের জ্যামাইকান। অলিম্পিকে নতুন ইতিহাস রচয়িতা বোল্ট ট্রিপল-ট্রিপল অর্জনের পর পরই জানিয়ে দিলেন, ‘বিদায় অলিম্পিক। বিদায়।’ 

চার বছর পর জাপানে রাজধানী টোকিওতে ট্র্যাকে এন্ড ফিল্ডে আর দেখা মিলবে না তার। আগামী বছর বিশ্ব এ্যাথলেটিক চ্যাম্পিয়নশিপ থেকেই বিদায়ের ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন। তিনি ট্র্যাকে থাকুক বা নাই থাকুক, মনের আয়নায় তার ছবি আঁকা হয়ে গেছে বিশ্বের সব ক্রীড়াপ্রেমীর। যা থাকবে চিরকাল। 

এফ/১৬:২০/৩০আগষ্ট

অন্যান্য

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে