Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-২৮-২০১৬

৫ এপ্রিল বাড়ি ছাড়ে তামিমের সহযোগী জঙ্গি রাব্বী

তৌহিদ জামান


৫ এপ্রিল বাড়ি ছাড়ে তামিমের সহযোগী জঙ্গি রাব্বী
কাজী ফজলে রাব্বী

যশোর, ২৮ আগষ্ট- ‘অপারেশন হিট স্ট্রং ২৭’ এ নিহত কাজী ফজলে রাব্বী গত ৫ এপ্রিল বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে যায়। ‘জিহাদে যাচ্ছি’ বলে নিখোঁজ হয় সে। ৭ এপ্রিল জিডি করা হলেও তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। রাব্বীর বাবা, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য জানা যায়।

গোয়েন্দা সূত্রে আরও জানা যায়, রাব্বী এক সময় ছাত্রশিবিরের সমর্থক ছিল। পরে যশোরে থাকতেই সে এই সংগঠন ছেড়ে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ে। তবে এলাকায় মাথা নিচু করে চলাফেরা করা এই ছেলেটি যে নারায়ণগঞ্জে নিহত মাস্টারমাইন্ড তামিমের সহযোগী- সেটি অনেকেই জানতেন না। শনিবার নারায়ণগঞ্জের জঙ্গিবিরোধী অভিযানে তার মৃত্যুর পর বিষয়টি সম্পর্কে যশোরে জানাজানি হয়।

রবিবার সকাল থেকে বিভিন্নভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় রাব্বীর বাবা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কাজী হাবিবুল্লাহর সঙ্গে। যশোরের কিসমত নওয়াপাড়া, বিশ্বাসপাড়ায়  ‘মদীনা মনজিল’ নামে দোতলা এই বাসভবনের ওপরতলায় থাকেন তিনি। নিচতলা ভাড়া দেওয়া। অনেক অনুরোধ করার পর তিনি নিচতলায় নামেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে থেকে দু’একটি কথা বলে আবার দ্রুত চলে যান।


রাব্বীদের বাড়ি

কাজী হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘শনিবার আমার ছেলে মারা গেছে- এটা আমি জানি। তার বিষয়ে রিপোর্ট করেন, আমার কোনও সমস্যা নেই। তবে আমার ছেলেকে যারা জঙ্গি বানিয়েছে, বিষ খাইয়েছে- সরকার তাদের কেন ধরছে না।’ লাশ নিয়ে আসার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমার ছেলের মরদেহ আনবো।’

গত মাসে যশোর পুলিশ যে পাঁচজনকে জঙ্গি হিসেবে সাব্যস্ত করে পোস্টার ছাপে, ফজলে রাব্বির নাম ও ছবি সেই তালিকায় দ্বিতীয় নাম্বারে ছিল। তিনি যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের পদার্থবিদ্যা (অনার্স) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। গত ৫ এপ্রিল তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। এরপর তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। তার বাবা যশোর উপশহর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ কাজী হাবিবুল্লাহ।

কাজী হাবিবুল্লাহ ছেলে নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারে গত ৭ এপ্রিল যশোর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নম্বর ৩৬০/০৭.০৪.২০১৬। ছেলেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছিলেন।

একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, ফজলে রাব্বী মোবাইল ফোনের মোট ছয়টি সিম ব্যবহার করতেন। মাঝে মধ্যে মোবাইল ফোনসেটও বদলে ফেলতেন।

গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা যায়, তারা রাব্বীর সম্বন্ধে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তারা জানতে পেরেছেন, রাব্বী এক সময় ছাত্রশিবিরের সমর্থক ছিলেন। পরে তিনি এই সংগঠন ছেড়ে জঙ্গি তৎপরতায় জড়িত হয়ে পড়েন। তবে ঠিক কোন জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে তার যোগ ছিল, তা নিশ্চিত হতে পারেননি যশোরের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।


জঙ্গিদের তালিকায় রাব্বীর নাম

কাজী হাবিবুল্লাহর একমাত্র ছেলে রাব্বী। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এদিকে, কোতয়ালি থানা সূত্র জানায়, ছেলে নিখোঁজের ব্যাপারে কাজী হাবিবুল্লাহ থানায় যে জিডি করেছিলেন, সেটি তদন্তের ভার দেওয়া হয় থানার এসআই আলী আকবরকে। তিনি মাসখানেক আগে যশোর কোতোয়ালি থানা থেকে বদলি হয়ে যান।এরপর তদন্তের দায়িত্ব বর্তায় উপশহর ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই বিপ্লব হোসেনের ওপর। কিন্তু তিনদিন আগে তিনিও বদলি হয়েছেন। ফলে তদন্তে কী পাওয়া গেছে, তা এখন কেউ বলতে পারছেন না।

এ বিষয়ে জানতে কোতোয়ালি থানার ওসি ইলিয়াস হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি মিটিংয়ে আছেন বলে ফোন রেখে দেন।

এসব বিষয়ে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, এই ছেলেটা যাওয়ার পরে তার বাবা জিডিই করেন। প্রথমদিকে তিনি বলেছিলেন, বাড়ি থেকে না বলে চলে যায়। কিন্তু ডিএসবি থেকে আমরা রিপোর্ট পেয়েছি, সে জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে চলে যাওয়ার বিষয়ে বাড়িতে বলে যায়। তার বাবা-মা পরবর্তীতে তাকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনার বহু চেষ্টা করেও তাকে আনতে পারেননি।

ফজলে রাব্বীর ব্যাপারে রবিবার সকালে তার এলাকায় খোঁজ নিতে যান এ প্রতিবেদক। প্রতিবেশীরা জানান, রাব্বী এলাকার ছেলেদের সঙ্গে খুব একটা মিশতেন না। শুধু স্থানীয় মসজিদের ইমাম মো. ইয়াহহিয়ার সঙ্গে তার সখ্য ছিল।


এই মসজিদে নামাজ পড়তো রাব্বী

স্থানীয়রা জানান, রাব্বী এলাকায় কারও সঙ্গেই মিশতেন না। বাড়ির পাশে মসজিদে নামাজ পড়তে আসতেন। সেখানে ইমামতি করতেন মো. ইয়াহহিয়া। তিনিই রাব্বীসহ চার-পাঁচজনকে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার প্রয়াস চালান। বিষয়টি জানার পর স্থানীয় লোকজন ইয়াহহিয়াকে ওই মসজিদ থেকে বের করে দেন।

রাব্বীর বিষয়ে প্রতিবেশী মশিয়ার রহমান জানান, সে বাড়িতে ল্যাপটপ ব্যবহার করতো। কিন্তু ঘরে তার বাবা-মা ঢুকলেই তা বন্ধ করে দিতো। তার বাসায় জেহাদের নানা বই পাওয়া যায়, যেগুলো কার বাবা নষ্ট করে ফেলেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা শফিউল আলম জানান, কাজী হাবিবুল্লাহ ১০-১২ বছর আগে এখানে (কিসমত নওয়াপাড়া, বিশ্বাসপাড়া) জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেন। তিনি নামাজ-কালাম করতেন। মসজিদের ইমাম রাব্বীসহ আরও কয়েকজনকে জঙ্গি বানানোর জন্য তৎপরতা শুরু করে। কিন্তু অন্যরা এড়াতে পারলেও রাব্বী প্রভাবিত হয়ে যায়। গত এপ্রিলে সে বাড়ি ছেড়ে যায়।

আরেক প্রতিবেশী নাসরিন আক্তার বলেন, ‘রাব্বীরা কেউই এলাকার লোকজনের সঙ্গে মিশতেন না। বাড়ির পাশে মসজিদে নামাজ পড়তেন। এখানে (মসজিদে) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকার মুসল্লিরা আসতেন, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের লোকজনও আসতেন। রাব্বী বাড়ি থেকে যেদিন চলে যান, হুজুরদের সঙ্গেই গিয়েছিলেন।’

একই তথ্য জানান ওই মসজিদে নামাজ আদায় করা মুসল্লি মো. রবিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ছেলেটি নামাজ-কালাম করতো। চিল্লার দাওয়াত দিতো। কিন্তু সে যে জঙ্গি সদস্য বা এমন খারাপ কাজ করতে পারে, তা জানতাম না।

একই এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যশোর সদর উপজেলার কমিটির ডেপুটি কমান্ডার আফজাল হোসেন দোদুল বলেন, ‘রাব্বী এপ্রিলের প্রথম দিকে বাড়ি থেকে চলে যায়। যাওয়ার সময় সে তার বোনকে বলে যায়- জেহাদের জন্যে যাচ্ছি। হাশরের ময়দানে দেখা হবে। তার চলে যাওয়ার পর কাজী হাবিবুল্লাহকে থানায় সাধারণ ডায়রি করতে সহায়তা করি।’

তিনি বলেন, ‘গত রাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জে নিহত একজনের (রাব্বী) ছবি দেওয়া হয় আমার কাছে। আমি ছবিটি তার বাবাকে দেখাই। উনি ছবিটি তার ছেলে রাব্বীর বলে শনাক্ত করেন। তিনি ছবিটি দেখে মর্মাহত হয়েছেন এবং ভেঙে পড়েছেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন- যারা তার ছেলেকে জঙ্গি বানিয়েছে, সরকার যেন তাদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সম্ভবত রাব্বীর দাফন তাদের গ্রামের বাড়ি মাগুরার মহম্মদপুরে হবে। লাশ আনার বিষয়ে সাধারণ মানুষ বাধা দেবে বলে মনে হয় না।’

ইমাম মো. ইয়াহহিয়ার বিষয়ে যশোরের পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, ‘রাব্বীর পেছনে যারা মদদদাতা, ইন্ধনদাতা, আশ্রয়দাতা, কিংবা অর্থ সহায়তা করেছেন- তাদের সবার বিষয়ে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। এদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’  


কলেজে রাব্বীর তথ্য

রাব্বীর বিষয়ে যশোর এমএম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মিজানুর রহমান জানান, রাব্বী খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল। এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং এইচএসসিতে ৪ দশমিক ৬ পয়েন্ট পেয়ে বিজ্ঞান বিভাগে পাশ করে। সে এমএম কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে পড়তো। প্রথমবর্ষের রেজাল্টও ভাল।

নিখোঁজ ছাত্রদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে। প্রত্যেক বিভাগের শিক্ষার্থীদের তাদের তথ্য সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।’

পোস্টার
জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত যে পাঁচজনের পোস্টার পুলিশ ছাপে তারা হলেন- যশোর শহরের শংকরপুর গোলপাতা মসজিদ এলাকার আব্দুস সোবহানের ছেলে কামরুজ্জামান তুহিন ওরফে মুন্না (২৪), যশোর সদরের কিসমত নওয়াপাড়া এলাকার কাজী হাবিবুল্লাহর ছেলে কাজী ফজলে রাব্বী (২১), শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি এলাকার আওরঙ্গজেবের ছেলে মেহেদি হাসান জিম (১৯), মণিরামপুর উপজেলার দুর্গাপুর এলাকার হাসান আলী গাজীর ছেলে জিএম নাজিমউদ্দিন ওরফে নকশা নাজিম (৪২) এবং যশোর শহরের ধর্মতলা এলাকার আব্দুস সালামের ছেলে রায়হান আহমেদ(২১)।

এরমধ্যে প্রথমজন মুন্না ২৫ জুলাই নববধূসহ যশোরে ফেরেন এবং সেদিনই পুলিশে সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পুলিশ তাকে পরদিন আদালতে সোপর্দ করে এবং পরে জামিনে মুক্ত হয়ে বাবার চায়ের দোকানে কাজ করছেন। শেষের জন রায়হান আহমেদ হিজবুত তাহরীর কেন্দ্রীয় নেতা  এবং সম্প্রতি তিনি আত্মসমর্পণ করেছেন।

এফ/১৬:৫৫/২৮আগষ্ট

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে