Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-২৩-২০১৬

বাবা-মায়ের স্নেহের জন্য তৃষ্ণার্ত সন্তানদের আকুতি

মহিউদ্দিন মাহী


বাবা-মায়ের স্নেহের জন্য তৃষ্ণার্ত সন্তানদের আকুতি

ঢাকা, ২৩ আগষ্ট- আধুনিক যুগের মানুষ ভীষণ ব্যস্ত। সন্তানদের সময় দেয়ার ফুরসত কই? সন্তান কী করে, কী চায় সে খবর নেয়ার মত যেন সময় নেই কর্মজীবীদের। বাবা-মায়ের সঙ্গে কি সন্তানদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে?

কিছু তরুণ ভাবলেন ঢের হয়েছে। এবার সবাইকেই নাড়া দিতে হবে। হাতে লেখা কিছু প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা নামলেন রাজপথে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। যারা লেখাগুলো দেখলো, তারা কিছুক্ষণ ভাবলো। তারাও কি বাবা-মায়ের অভাবটা একটু উপলব্ধি করলো?

এক তরুণী তার প্ল্যাকার্ডে লিখেছেন, ‘বাবা-মা, এবারের ঈদে কেনাকাটার টাকা চাই না, সময় চাই।’

আরেক তরুণ লিখেছেন, ‘বাবা, তোমার হাত ধরে হাঁটা শিখেছি। এখন কাছে পাই না কেন’।

একটি প্ল্যাকার্ড ধরে দাঁড়ানো দুই তরুণ লিখেছেন, ‘বাবা-মা এখন শুক্রবারের দিনেও একসাথে টেবিলে বসে খাওয়া হয় না কেন’।

এরপর এসব ছবি দেয়া হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেখানেও রীতিমত ভাইরাল হয়ে গেলো সেগুলো। মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষ লাইক শেয়ার দিলো ছবিগুলো। সবার মনেই বুঝি একই রকম শূন্যতা।

এই উদ্যোগী তরুণদের নাম কিন্তু জানা গেলো না। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। মনের কথাগুলো বলতে পারলে সেই কথাগুলোই জনপ্রিয় হয়, সেটাই বোঝা গেলো কিছু মানুষের প্রতিক্রিয়ায়।

একটি ছবির নিরে দেব দাস নামে একজন লিখেছেন, ‘যুগ পাল্টেছে! আমরা পুর্বে সব সময় অস্থির থাকতাম আব্বা আম্মা কবে কোথায় যাবে, বাসা ফাঁকা হবে আর আমরা দুষ্ট কিশোরের দল ইচ্ছেমত হৈ হৌল্লোর আর মজা করতে পারব। আর এখন আব্বা- আম্মাকে আন্দোলন করে ঘরে ফেরাতে হয়! এক জীবনে কত কি যে আরোও দেখতে হবে আমাদের।’

মোহাম্মদ যোবায় একজন বাবা। ভীষণ পরিশ্রম করতে হয় তার সংসার চালাতে। তরুণদের এই উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি লিখেছেন, ‘আমার দৃষ্টিকোণ থেকে এটা একটা শুভ উদ্যোগ।’ তবে নিজের জীবনের বাস্তবতাটাও তুলে ধরেছেন তিনি। লিখেন, ‘এটাও সত্য যে বাবাদের কিসের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা অনেক সময় অন্যরা বোঝে না।, বাবাদের কামলা বানায়, ঘাড়ে কাজের ওপর কাজ, এমনকি শুক্রবারেও কাজের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়।’


আবুল হাসান মনি লিখেছেন, ‘আমাদের আমলে কামনা ছিল এই রকম যে, সন্ধ্যায় আম্মা যদি একটু পাশের বাসায় বেড়াতে যেতেন কিংবা আব্বা অফিস থেকে একটু দেরিতে আসতেন যাতে পড়াশোনাতে একটু ঢিলেমি দেয়া যেত! আহারে.. দিন গুলি কই যে গেল!’

সন্তানদেরকে আরও বেশি সময় দিতে টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার চালাচ্ছে সরকার। জুলাইয়ে গুলশানের হলি আর্টিজান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিক বক্তব্য সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মত মিশতে, তাদের সময় দিতে বাবা মাকে অনুরোধ করেছেন। 

এটা স্পষ্ট যে, বিশেষ করে নগরে বাবা-মাকে সন্তানরা তেমন একটা বেশি সময় পায় না। আদনান শহীদ নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সময় টা যাচ্ছে কোথায়? অথবা, কে কোথায় দিচ্ছে?’

আসলেই সময়টা কোথায় যাচ্ছে? জানতে এ প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তাহসিন আক্তারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পূঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা নেই সম্পর্ককে যান্ত্রিকতায় রূপ ‍দিচ্ছে। বাবা-মা সন্তানের ভবিষ্যতে কথা চিন্তা করে বাড়তি উপার্জনের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে বেড়াচ্ছে। রাতে যখন বাবা বাসায় ফিরছেন তখন এসে দেখে আদারের সন্তানটি ঘুমায়। আবার যখন সকালে ঘুম থেকে সন্তানটি উঠল তখন বাবা-মায়ের অফিসে যাওয়ার তারা।’

এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ‘নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী করার চেষ্টায় ব্যস্ত বাবা-মা। এরই মধ্য সন্তানের মাঝে সামাজিকীকরণের প্রভাব পরে। বাবা-মার সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয়। এটি উন্নয়নশীল সমাজের নেতিবাচক দিক। কাল মার্কসের বস্তুবাদী দ্বান্দ্বিকতার রিফ্লেকশন আমাদের সমাজে প্রতিফলিত হচ্ছে।’

তিন তরুণের উদ্যোগ নিয়ে তাহসিন আক্তার বলেন, ‘একটা বয়েসে শিশুর মধ্যে ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে। সে বাবা-মার কাছ থেকে অনেক কিছু পেতে চায়। বাবা-মার সান্নিধ্য চায়। কিন্তু মানুষ এখন অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ছুটাছুটি করছে। রাতে ১২টায়ও আমরা দেখি রাস্তায় যানজট। সে আরও বেশি কাজ করতে চায়। আয় করতে চায়। সে ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য একটা কিছু করতে চায়। একারণে সে বাসায় ফেরে রাতে। আমাদের প্রত্যাশা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এটা থামানোর সময় এসেছে।’


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেম মো. জামালউদ্দিন বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নতির চেষ্টায় বাবা মায়েরা সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। একদিনে বাবা-মা তার সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তায় নিরন্তর অর্থের পেছনে ছুটছে, অন্যদিকে সন্তান বাবা মায়ের স্নেহ, মায়া-মমতা না পেয়ে হতাশায় ভুগছে।’

এ থেকে মুক্তির কি কোনো উপায় নেই?- জানতে চাইলে এই সমাজবিজ্ঞানী কিছুটা পরোক্ষভাবে জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘সব কিছুর উন্নতি হলেও আমাদের সমাজে আধুনিক শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র গড়ে উঠছে না। তাই তারা ভালোভাবে বিকাশের সুযোগ পাচ্ছে না। তারা না পাচ্ছে বাবা-মায়ের ভালোবাসা, না পাচ্ছে পরিচর্যা।’

মাদার তেরেসা বলেছিলেন, ‘যদি তুমি পৃথিবীকে পাল্টাতে চাও, তাহলে বাড়ি ফিরে যাও, পরিবারকে ভালোবাসো।’ মহীয়সী এই নারী কি বহু বছর আগেই আধুনিক জীবনের জটিলতা টের পেয়েছিলেন?

আর/১৭:১৪/২৩ আগষ্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে