Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.2/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-২০-২০১৬

আপনার বাড়ির দাগ নম্বর জানেন তো?

মো. মাশফাকুর রহমান


আপনার বাড়ির দাগ নম্বর জানেন তো?

প্রথমেই বলে নিই, ভূমি বুঝতে গেলে তফসিল (schedule) বুঝতে হয়। তফসিল হলো একটি জমির পরিচয় বা ঠিকানা। যেখানে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন এবং মৌজার নামসহ (জেএল নং) দাগ নম্বর (প্লট নম্বর) থাকে। আপনি যদি এই ঠিকানা না বোঝেন, তবে ভূমির নিরাপত্তা বুঝবেন না। আপনার ভূমি আদৌ আপনার আছে কি না, আপনি জানবেন না।

ভূমির নিরাপত্তা ইস্যুটি নিয়ে ভাবনাটা বরাবরই আমাদের অধিকাংশ জনসাধারণের মধ্যে কম।

এর অনেক কারণ রয়েছে। অধিকাংশ মানুষের কাছে ভূমিসংক্রান্ত বিষয়গুলো খুব জটিল ও দুর্বোধ্য মনে হয়। তাই আমাদের সমাজব্যবস্থায় এমনটা প্রচলন যে, পরিবারের প্রধানরা এই বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামাবেন। ফলে পরিবারের অন্যদের মধ্যে ভূমিসংক্রান্ত বিষয়ে মাথাব্যথা কম থাকে। বিশেষ করে একান্নবর্তী পরিবারের ছোটরা বা কেউ যদি এটা নিয়ে কথা উত্থাপন করেন, তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছে তিনি স্বার্থপর বলে বিবেচিত হন।

এখনো গ্রামের অনেক মানুষ বলে, ‘আমি আমার পিতার সম্পত্তি চিনি না, কখনোই যাইনি।’ যেন জমি না চেনা বা জমির বিষয়ে মাথাব্যথা না থাকা গর্বের বিষয় বা উদারতাকে তুলে ধরে। আসলে পিতার মৃত্যুর আগে সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক হতে পারে না বলে তাদের মধ্যে তার প্রাপ্যতার বিষয়ে চিন্তাভাবনা কম থাকে। কিন্তু এই উদাসীনতাই পরবর্তী সময়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ঝগড়া-বিবাদের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভূমি স্থাবর সম্পত্তি হওয়ায় এর নিরাপত্তা শুধু দখলের ভিত্তিতেই হয় বলে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। ফলে দখল থাকলেই সেই সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার নিরাপত্তা ইস্যুটি সবার কাছে এতটা গুরুত্ব পায় না। তাছাড়া, ভূমির বিষয়গুলোতে আদিকাল থেকেই খুব জটিল, দুর্বোধ্য, এবং সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ব্যবহার করা হয়ে আসছে। যেমন, তফসিল, তসদিক, খানাপুরী, আনা, নামজারি, তহশিল, মৌজা, পর্চা, খতিয়ান, জেএল প্রভৃতি বিধায় এ বিষয়গুলো মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। আমি জানি না আনা প্রবর্তনের কি প্রয়োজন ছিল। ভূমির পরিমাণ নির্ধারণের ইউনিট একই রকম হয়নি বা করা হয়নি অনেক আগে থেকেই।

কারণ, ভূমির হিসাবটাকে সাধারণের কাছে বোধগম্য করার বদলে গোপন করা হয়েছিল শাসনের স্বার্থেই। তখন কি ব্রিটিশরা আনা, কড়া প্রভৃতি দ্বারা ভূমির পরিমাপ করত? এমনকি সেই আনার হিসাবটাও লেখা হয়েছে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ দিয়ে। ফলে, ভূমি সংক্রান্ত বিষয়গুলো খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।

তাছাড়া পাঠ্যবইয়ে ভূমির বিষয়ে মৌলিক ধারণাসংক্রান্ত কোনো কিছুই পড়ানো হয়নি। অধিকন্তু এমনও হতে পারে ব্রিটিশ শাসন থেকেই সমাজের নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী ছাড়া প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এটিকে দুর্বোধ্য করে রাখা হয়েছে একটি বিশেষ অভিপ্রায় নিয়ে। এ নিয়ে অন্যদিন না হয় আলোচনা করা যাবে।

যা বলছিলাম, এমন অনেক কারণেই সাধারণ মানুষ ভূমির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে শেখেনি। তাই, অধিকাংশের অসচেতনতার কারণে আজ  যত জটিলতা, লাখ লাখ মামলা; এত অন্যায়-অবিচার, দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রভৃতি।

আমরা নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ই-মেইলের পাসওয়ার্ড, ফেসবুক, ক্রেডিট কার্ড, অনলাইন ব্যাংকিং বা ডেবিট কার্ড প্রভৃতির নিরাপত্তা বিষয়ে কিন্তু বেশ সচেতন! নিয়মিত ব্যবহার করি; নিয়মিত আপডেট রাখি এবং স্টেটমেন্ট তুলছি নিয়মিত। কিন্তু কখনো কি আমরা ভেবেছি যে, আমাদের মালিকানাধীন স্থাবর সম্পত্তির স্টেটমেন্ট আমরা জানি কি না? আমার পরিবারের সম্পত্তি আমি চিনি কি না, অথবা অন্য কেউ এটি চুরি করে নিয়ে নিলো কি না? আমার পিতার সম্পত্তিতে আমার অংশ কতটুকু, আমার বোনের প্রাপ্য আমি মিটিয়ে দিচ্ছি কি না, উত্তরাধিকারদের প্রাপ্যতার নিরাপত্তার খাতিরে বিধি মোতাবেক ভাগ-বাটোয়ারা করছি কি না, নিয়মিত খাজনা (ভূমি উন্নয়ন কর) পরিশোধ করছি কি না, ভূমির মালিকানা পরিবর্তনের সাথে সাথে রেকর্ড সংশোধন (নামজারি/খারিজ) করছি কি না- এমন আরও  অনেক বিষয়েই আমাদের মধ্যে সচেতনতা নেই।

অস্বীকার করব না, সংশ্লিষ্ট দপ্তর, যেমন- সেটেলমেন্ট অফিস, সাব রেজিস্ট্রার অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস, ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রভৃতি, যারা কিনা ভূমি ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত, তাদের অনেক দায় এ ক্ষেত্রে রয়েছে। কিন্তু আশার কথা হলো, ভূমি ব্যবস্থাপনায় ভেতরে ভেতরে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। এর উন্নয়নকল্পে ডিজিটালই রেকর্ড সংরক্ষণ এবং অনলাইন নামজারি আবেদন, অনেক জায়গাতে বাস্তবায়ন ইতোমধ্যেই হচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আরও অনেক বিষয়েই দেশব্যাপী ভালো ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

সেটেলমেন্ট, রেজিস্ট্রেশন এবং রেকর্ড সংশোধনের সমন্বয় করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলা ভূমি অফিস থেকে শুরু করে সুনামগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ অনেক ভূমি অফিসেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি।

তবে নাগরিক হিসেবে আমাদের অসচেতনতার দায় এবং সচেতনতার দায়িত্বকে আমরা এড়াতে পারি না। আমরা যখন নিজেরা জানি না, তখনই অন্যদের ওপর নির্ভর করি। আর সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই সুযোগ নিয়েছে আবহমান কাল থেকে। তাহলে নাগরিক হিসেবে আমাদের করণীয় কী?

আমাদের ভূমির নিরাপত্তা নিয়ে ভাবনা এবং এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা। অন্তত নিজের স্বার্থে নিজের মালিকানাধীন বা পিতার সম্পত্তির নিরাপত্তা বিষয়ে ভাবতে হবে। ভূমির স্বত্ব বা মালিকানা কিন্তু কাগজের ভিত্তিতে হয়। সুতরাং আপনি যে ভূমিতে অবস্থান করছেন সেটি অন্য কেউ চুরি করল কি না সেটা নিয়ে চিন্তা থাকা দরকার। ব্যাংকের হিসাবে যত টাকা আপনার আছে, তার মূল্যের চেয়ে ঢের বেশি দাম আপনার সম্পত্তির, যেখানে আপনি জন্মেছেন বা ব্যবসা করছেন অথবা কৃষিকাজ করছেন বা অন্য কিছু।

আপনি জেনে নিন আপনার খতিয়ান (মূল রেকর্ড-এসএ কিংবা আরএস রেকর্ড)। এটি অনেকটা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টের মতো। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলা রেকর্ড রুমে পাওয়া যাবে। তাছাড়া, আপনার অধীনে থাকা দলিল, রেকর্ড, খাজনার রশিদ, খতিয়ান কপিসহ জমির মালিকানার প্রমাণ হিসেবে সব সহায়ক কাগজপত্র ঠিকমতো আছে কি না দেখে নিন এবং যত্ন নিয়ে সংরক্ষণে রাখুন। আপনি যেই ভূমিতে জন্ম নিয়ে এতবড় হয়েছেন সেই বাড়িটির দাগ নম্বর আপনি জানেন তো!

আর/১২:১৪/২০ আগষ্ট

জানা-অজানা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে