Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-০৯-২০১৬

পদক পাক না পাক, দীপার এই লড়াইটাই তো রূপকথা

সোমা নন্দী


পদক পাক না পাক, দীপার এই লড়াইটাই তো রূপকথা

রিও ডি জেনিরো, ০৯ আগষ্ট- পাঁচ বছর বয়সে তাঁর কাছেই হাতেখড়ি দীপা কর্মকারের। তখন থেকেই ছাত্রীর মধ্যে লক্ষ্য করেছিলেন হার না মানা মানসিকতা। লিখলেন ছোটবেলার  সারারাত জেগে টিভির সামনে বসেছিলাম। মধ্যরাতে বিশ্বেশ্বরের বার্তা এল হোয়াটসঅ্যাপে, ‘খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে। প্রোদুনোভা ভল্টে নিখুঁতভাবে ল্যান্ড করতে পারেনি। জানি না, ফাইনাল পর্বে উঠতে পারবে কি না।’ তার একটু আগেই দীপার ভল্ট ইভেন্ট শেষ হয়েছে। তারপরেও ওরা অলিম্পিক ভিলেজে ফেরেনি। 

যেখানে আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিক্স হচ্ছে সেই অলিম্পিক এরিনার জিমে দু’জনেই উদ্বেগ নিয়ে বসেছিল। বিশ্বেশ্বর আমার স্বামী। তার বার্তা পেয়ে আমার মনেও উৎকণ্ঠা। টিভিতে আমিও দেখেছি প্রদুনোভা ল্যান্ডিংয়ের সময় ওর পিছনের অংশটা আগে নেমে গিয়েছিল। তবু, ১৪.৮৫০ গড় স্কোর তো খারাপ নয়। তখন দীপা ছ’নম্বরে রয়েছে। ভাবছিলাম, এখান থেকেও পারবে না ফাইনাল রাউন্ডে যেতে? 

আমার স্বামীর দ্বিতীয় বার্তা আসার সময় ভোর হয়ে গিয়েছে। লিখেছে, ‘আমার চোখে জল এসে গিয়েছে। ভাবতে পারছি না, দীপা ভল্টের ফাইনাল রাউন্ডে উঠেছে!’ তখনও ওরা দু’জনে অলিম্পিক ভিলেজে ফেরেনি! সেই জিমেই বসেছিল রেজাল্ট জানার অপেক্ষায়। বিশ্বেশ্বর’কে জবাব দেওয়ার সময় আমি হোয়াটসঅ্যাপে আর লিখতে পারলাম না যে, আমারও চোখে আনন্দাশ্রু!

মনে পড়ছিল প্রায় ১৯ বছর আগের কথা। দীপার বয়স তখন পাঁচ। ওর বাবা, দুলাল কর্মকার বিবেকানন্দ ব্যায়ামাগারে আমার জিমন্যাস্টিক্স কোচিং ক্যাম্পে নিয়ে এসেছেন দীপাকে। আমার ক্যাম্পে তখন ছাত্রীর সংখ্যা ১৯। কিন্তু ক্যাম্পের পরিকাঠামো খুব খারাপ ছিল। দুটো কাঠের তৈরি ব্যালান্সিং বিম ছিল। যার ওপর থেকে পেরেক বেরিয়ে আসত। আনইভেন বার ছিল না। ফ্লোর এক্সারসাইজের জন্য ছিল গোটা তিনেক ছেঁড়া মাদুর! আর একটা পুরনো কাঠের ভল্ট-টেবিল ছিল। টেবিলটার ওপর কোনও রাবারের আস্তরণ ছিল না! 

বিপজ্জনক এবং অনুন্নত ওই পরিকাঠামোর মধ্যেও দীপাকে দেখতাম আপনমনে অনুশীলন করে চলেছে! এবং অন্যরা চলে যাওয়ার পরেও দীপা একা প্র্যাক্টিস করে যেত। কতবার যে ওর চোট লেগেছে তার হিসাব নেই। ভল্ট প্র্যাক্টিসে টেবিলের ওপর থেকে শরীরটাকে শূন্যে তোলার সময় ওর হাত বহুবার কেটে গিয়েছে। একা প্র্যাক্টিস করার জন্য ওকে বকতামও। জবাবে দীপা বলত, ‘‘আমাকে বাড়ি পাঠাবেন না। গেলেই পড়াশুনো করতে হবে! আমি জিমন্যাস্ট হতে চাই।’’ তখনই বুঝেছিলাম, শুরু হয়ে গিয়েছে দীপার লড়াই!

আগরতলার অভয়নগরে ওদের বাড়ি। মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবার। ওর বাবা, দুলাল কর্মকারও একজন ভারোত্তোলক কোচ। দীপারা দুই বোন। ওর দিদি ছিল পড়াশুনোয় ভাল। আর দীপার প্রেম ছিল খেলাধুলোর প্রতি। খেলোয়াড় হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ছোট বয়স থেকেই ওর মধ্যে ছিল জেদ। প্র্যাক্টিসের সময় কোনও ইভেন্টে নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত হাল ছাড়বে না। এই সাধনার ফল? মাত্র আট বছর বয়সে উত্তর-পূর্বাঞ্চল গেমসের জিম্যান্যাস্টিক্সে ব্যালান্সিং বিমে সোনা জিতেছিল ছোট্ট দীপা! আগরতলাতেই হয়েছিল টুর্নামেন্ট। এখনও মনে আছে, দীপার ইভেন্ট শেষ হয়েছিল বেশ রাতে। ওকে বলেছিলাম বাড়ি ফিরে যেতে। পরের দিন সকালে রেজাল্ট জানা যাবে। দীপা নাছোড়বান্দা। নড়বে না জায়গা থেকে! ঠিক গতকালের মতো, সেবারও অনেক রাত পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থেকে রেজাল্ট জেনে বাড়ি ফিরেছিল দীপা।


আমার কোচিংয়ে দীপা ছিল তিন বছর। উত্তর-পূর্বাঞ্চল গেমসে সোনাজয়ের পরেই দীপাকে পাঠিয়েছিলাম স্বামীর কোচিং সেন্টারে। কারণ, ওখানে পরিকাঠামো অনেক উন্নত এবং বিশ্বেশ্বরের মতো কোচের কাছে থাকলে দীপার প্রতিভার যথার্থ বিকাশ হবে। হয়েছেও তাই। ওখানে গিয়েই দীপার আগ্রহ তৈরি হয়েছে ভল্টের প্রতি। প্রথমে স্কাহারা ভল্ট করত। কিন্তু প্রোদুনোভা ভল্ট? এটা তো মৃত্যু লাফ! শরীরটাকে শূন্যে তুলে দুটো সমারসল্ট দিয়ে সোজাভাবে ল্যান্ড করা। মাটিতে নামার সময় পায়ের অবস্থান ঠিক না থাকলে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে! আমার স্বামী কিন্তু এই ভল্টে দীপাকে অনুপ্রাণিতই করেছে। লড়াই করার অদম্য এক মানসিকতাই ওর সাফল্যের একমাত্র রহস্য। এখন আগরতলার রাস্তায় দীপাকে দেখলে সাধারণ মানুষও ওর অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু তাতেও দীপার মানসিকতা বদলায়নি। রিওতে যাওয়ার দু’দিন আগে ফোনে ওকে বললাম, তুই ঠিক পারবি। শুধু মনঃসংযোগটা নষ্ট করিস না। দীপা জবাব দিল, ‘‘ওখানেও আমি শূন্য থেকে শুরু করব। কীভাবে বলছ, আমি পারব? বরং আশীর্বাদ করো যেন আমি পারি!’’

সোমবার ভোরে দীপার সুসংবাদ জানার পরেও আমরা মিষ্টিমুখ করিনি। অপেক্ষা করে আছি ১৪ অগস্টের জন্য। যেদিন দীপা নামবে ভল্টের ফাইনাল রাউন্ডে। পদক পাবে কি না জানি না। তবে, পদক না পেলেও আমার আফশোস হবে না। কারণ, ওর লড়াই ব্যর্থ হয়নি। অলিম্পিক্সের মতো ইভেন্টে ফাইনাল রাউন্ডে ওঠা কম কৃতিত্বের নয়। বিশ্ব জিমন্যাসটিক্সকে ইতিমধ্যে দীপা জানিয়ে দিয়েছে যে, আমরাও পারি!

মন বলছে মেয়েটা পারবে! আমার কাছে দীপা মানেই যে এক প্রতিজ্ঞার নাম। হার না মানা এক মুখ! 

আর/১৭:১৪/০৯ আগষ্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে