Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-০৯-২০১৬

এক দল দেশে, আরেক দল আইএসে

এক দল দেশে, আরেক দল আইএসে

ঢাকা, ০৯ আগষ্ট- দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়া তরুণদের একটি অংশ সিরিয়ার আইএস নিয়ন্ত্রিত এলাকায়, অপর অংশটি দেশের ভেতরে থাকা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দেশের ভেতরে থাকা কথিত ‘নিখোঁজ’ তরুণেরা অন্যদের উদ্বুদ্ধ করা এবং বাইরের গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন কি না, সে বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

গুলশানে হলি আর্টিজান ও শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে জঙ্গি হামলার পর পুলিশ সারা দেশ থেকে নিখোঁজ তরুণদের খোঁজ নিতে শুরু করে। গত এক মাসে প্রাথমিক অনুসন্ধানে পুলিশ ৮০৩ জন নিখোঁজের খবর পায়। সেখান থেকে যাচাই-বাছাইয়ের পর ৫০ থেকে ৬০ জন তরুণের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে নিশ্চিত হয় পুলিশ। তাঁদের প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

পুলিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের তালিকা চেয়েছে। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ও রাজশাহীর ৩০ নিখোঁজ শিক্ষার্থীর ব্যাপারে তথ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশকে দিয়েছে। পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় অনিয়মিত শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। সব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হালনাগাদ তথ্যও পাওয়া যায়নি।’

পুলিশের আরেকটি সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন নিখোঁজদের নিয়ে কাজ করছে। পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার (তদন্ত ও পরিচালনা) আহসান হাবিব বলেন, মোট ২৪০ জন ব্যক্তিকে নিয়ে তাঁরা কাজ শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে এখন তাঁরা ৩০ জনের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে কাজ করছেন। পরিবার, বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে।

আইএস আছে কি নেই, তা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই গত মাসে পরপর দুটি জঙ্গি হামলা এবং কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযান হয়। হলি আর্টিজানে হামলার পরই হামলাকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে আইএস-অধ্যুষিত এলাকা থেকে তাহমিদ রহমান শাফি, আরাফাত হোসেন তুষার ও মো. তাওসিফ হোসেনের একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশিত হয়। তাঁদের স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, তাঁরা তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় চলে গেছেন।

পুলিশ বলছে, বাংলাদেশ থেকে সপরিবারে সিরিয়া চলে গেছে এমন বেশ কটি পরিবারের খোঁজও তারা পেয়েছে। তাদের অনেকেই দাপ্তরিক কাজ করছে। নারীদের কেউ কেউ বিয়ে করেছে, নার্স কিংবা রাঁধুনির কাজ করছে বলে তারা জানতে পেরেছে।

প্রায় দুই বছর আগে ১১৫ ক্রিসেন্ট রোডের আবেদা মঞ্জিল থেকে একই পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ হন। তাঁরা হলেন পান্না শরীফ, তাঁর দুই ছেলে রেজওয়ান শরীফ, মাঈনুদ্দিন শরীফ এবং মাঈনুদ্দিন শরীফের স্ত্রী তানিয়া শরীফ। গতকাল সোমবার ওই বাসায় গিয়ে কাউকেই পাওয়া যায়নি। পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের শেষের দিকে রেজওয়ান শরীফ এবং তাঁর মা পান্না শরীফ কুয়াকাটায় যাচ্ছেন বলে বাসা থেকে বের হন। এরপর আর ফেরেননি। উধাও হয়ে যাওয়ার আগে তাঁরা বাড়ির সব আসবাব বিক্রি করে দেন। আত্মীয়স্বজন জানতে চাইলে বলেন, নতুন আসবাব কেনা হবে বলে পুরোনোগুলো বেচে দিচ্ছেন।

২০১৩ সালের ২৪ আগস্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ জঙ্গি-সংশ্লিষ্টতায় রেজওয়ান শরীফসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানায়, জামায়াতুল মুসলিমিন নামের একটি বিদেশি উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর আমির জর্ডনীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক শেখ আবু ইসা আলী আর-রফাই আল হাশেমী আল কোরাইশি ২০০২ সালে বাংলাদেশে এলে এই রেজওয়ান শরীফ ও মাঈনুদ্দিন শরীফ তাঁর অনুসারী হন। পরে তাঁরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেন। ২০০৮ সালে এই দুই ভাই ইয়েমেনে গিয়ে আল-কায়েদা নেতা আনোয়ার আল আওলাকির ঘনিষ্ঠ সহযোগী সামির খানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পরিবারটির ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, রেজওয়ান গ্রেপ্তার হওয়ার পর মাঈনুদ্দিন ও তাঁর স্ত্রী আর বাড়ি আসেননি। ২০১৪ সালে রেজওয়ান জেল থেকে ছাড়া পান। মাস তিনেক পরই তিনি উধাও হয়ে যান।

রেজওয়ান শরীফ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। তবে মাঈনুদ্দিন শরীফ কী করতেন, সে সম্পর্কে জানা যায়নি। গতকাল সোমবার পর্যন্ত এ পরিবার সম্পর্কে কলাবাগান থানায় কোনো জিডি হয়নি বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইয়াসির আরাফাত খান।

গত বছরের জুন মাসে নিখোঁজ হয়েছিলেন নিয়াজ মোর্শেদ। ক্যান্টনমেন্ট থানায় এ বিষয়ে জিডি করেন তাঁর ভগ্নিপতি জাবেদ আহম্মেদ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি ই-মেইল ও ইন্টারনেটে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়।

নিয়াজের বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য গতকাল তাঁর বারিধারা ডিওএইচএসের বাসায় গেলে বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক ইন্টারকমে তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। অপর প্রান্ত থেকে এক নারী বলেন, নিয়াজের বিষয়ে বিস্তারিত তাঁরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছেন। তাঁরা এ বিষয়ে আর কিছু বলতে রাজি নন।

এ ছাড়া জাপানপ্রবাসী ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাইফুল্লাহ ওজাকি সম্প্রতি দুজন সন্ত্রাসীকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। জাপান পোস্ট-এর খবর, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইফুল্লাহ ওজাকি তাঁর জাপানি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে আইএস-অধ্যুষিত এলাকায় চলে গেছেন। সেখানে থেকে তিনি বাংলাদেশি সন্ত্রাসীদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন কি না, সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, সাইফুল্লাহ ওজাকি আদৌ কাউকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন কি না, করলে তাঁরা কারা, সে বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত নন। তাঁরা খোঁজখবর করছেন।

তবে পুলিশের তালিকায় নিখোঁজ অনেকেই দেশের ভেতর জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে জড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এক কর্মকর্তা তাঁদের জিম্মায় থাকা জঙ্গিদের বরাত দিয়ে বলেন, সংগঠনের নির্দেশে তারা ‘হিজরত’ করে বা নিজ এলাকা থেকে চলে যায়। এ সময়ে তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। অন্য জায়গায় গিয়ে রিকশা চালায় বা মুদিদোকান দেয় কিংবা চাষবাস করে। তারপর মানুষ মারার কাজে নামে।

চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকস অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ছাত্র সাব্বিরুল হক ওরফে কণিক ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ। ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের গুলিতে নয় জঙ্গি নিহত হওয়ার পর সাব্বিরুলের বাবা আজিজুল হক বাকলিয়া থানায় জিডি করেন। ধারণা করা হচ্ছিল, মৃত জঙ্গিদের একজন সাব্বিরুল। পরে তাঁরা নিশ্চিত হন, নিহত জঙ্গিদের মধ্যে সাব্বিরুল নেই। তবে সাব্বিরুল সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাব্বিরুল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সামরিক শাখার সদস্য। ব্লগার ও ভিন্নমতাবলম্বীদের একাধিক খুনের ঘটনায় পুলিশ সাব্বিরুলকে খুঁজছে অনেক দিন ধরে। চট্টগ্রামে সাব্বিরুলের স্বজনেরা বলেন, সাব্বিরুল উগ্রবাদে জড়িয়েছিলেন এবং পরিবারের সবার সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি করতেন।

জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে গত ১৯ জুলাই সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মো. আবদুল আজিজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দুই সেমিস্টারে মেধাস্থানে প্রথম হওয়া ছাত্রটি তৃতীয় বর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। আম্বরখানার যে বাড়িতে আজিজ পেইং গেস্ট হিসেবে থাকতেন, আজিজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেই বাসা তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। গোয়েন্দা পুলিশের যে ইউনিট আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কার্যক্রম তদন্ত করছে, সেই দলের একজন কর্মকর্তা বলেন, দাওয়াতি শাখার এই সদস্য সামরিক প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি ঝিনাইদহে সেবায়েত হত্যার ঘটনায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা আজিজের কাছ থেকে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রশাসনের কাছে দাবি করেছেন।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, নিখোঁজদের সম্পর্কে পুলিশ যে তথ্য দিচ্ছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। এর বাইরেও জঙ্গিবাদে জড়িয়ে কেউ নিখোঁজ থাকতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের কেউ নিখোঁজ হলেও থানায় জিডি করা হয় না। অনুসন্ধানকে ত্রুটিমুক্ত করতে জনগণের সহযোগিতা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

৭০ জন নিখোঁজের হালনাগাদ তালিকা দিল র্যাব: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শেখ ইফতিসাম আহম্মেদ সামি (২২)সহ পাঁচজন নিখোঁজের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যরা হলেন পাঁচ বছর আগে নিখোঁজ চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের মাদ্রাসাছাত্র শহীদুল আলম (৩৫), নীলফামারীর আদিতমারীর জীবন (২৭) এবং সিলেটের কানাইঘাটের শক্তিপাড়া গ্রামের হোসেন আহম্মেদ (৩২) এবং পাবনার ঈশ্বরদী থানার ভারইমারী গ্রামের ইমদাদুল হক (৩০)।

নতুন তালিকায় কল্যাণপুরে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত শেহজাদ রউফ ওরফে অর্ক, তিতুমীর কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র জুবায়ের হোসেন ও মো. ইকবাল হোসেনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

এফ/০৮:৫৭/০৯আগষ্ট

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে