Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.3/5 (3 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-০৯-২০১৬

২১ নারীকে যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় পাচার!

রোজিনা ইসলাম


২১ নারীকে যুদ্ধকবলিত সিরিয়ায় পাচার!

ঢাকা, ০৯ আগষ্ট- তিন সন্তানকে ভালো রাখতে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে লেবানন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার এক নারী। লেবানন যেতে জমি বন্ধক রেখে ৪০ হাজার টাকা তুলে দেন বোয়ালমারীরই এক ব্যক্তির কাছে। তিনিই সব ঠিক করেন। কিন্তু ঢাকার ফকিরাপুলের একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁকে সিরিয়ায় পাচার করে বিক্রি করা হয়েছে।

ওই নারীর বড় ছেলের অভিযোগ, বোয়ালমারীর মোতালেব শেখ নামের এক ব্যক্তি ফকিরাপুলের আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনালের সিরাজ সিকদারের মাধ্যমে তাঁর মাকে লেবাননের বদলে সিরিয়া নিয়ে তিন লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। অবশ্য আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার বলেছেন, সিরাজ সিকদার তাঁদের প্রতিষ্ঠানের কেউ নন, তিনি একজন দালাল।

সরকারি সূত্র বলেছে, বোয়ালমারীর ওই নারীর মতো ২১ জন বাংলাদেশি নারীকে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চাকরির লোভ দেখিয়ে সিরিয়ায় পাচার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত তথ্য রয়েছে। তাঁদের ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়ে ৩ আগস্ট চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠির সঙ্গে থাকা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ায় এই নারীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চলছে। সিরিয়া থেকে তাঁদের অনেকে টেলিফোনে স্বজনদের এসব জানিয়েছেন। পরিবার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছে।

অনুসন্ধানেও ফরিদপুর, ঢাকা, নরসিংদী, সিরাজগঞ্জ, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, হবিগঞ্জ, সাতক্ষীরা, খুলনা ও পটুয়াখালীর মোট ২১ জন নারীকে সিরিয়ায় পাচারের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে অনেকের পরিবারই স্বজনের সিরিয়ায় পাচার হওয়ার বিষয়টি জানে না। তারা জানে, লেবানন, ইয়েমেনসহ অন্যান্য দেশে আছেন। 

সিরিয়ায় পাচার হওয়া বোয়ালমারীর ওই নারীর মেয়ে বলেন, তাঁর মাসহ পাঁচ নারীকে সিরিয়ায় বিক্রি করেছে ওই চক্র। তাঁদের একজন মারা গেছেন। চুয়াডাঙ্গার এক নারী অনেক টাকা দিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন। তিনিই তাঁর মায়ের বিক্রি হওয়া সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। গত দুই বছরে মাকে কয়েক বার বিক্রি করা হয়েছে। গত ৩০ জুলাই মায়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে। দেশে আসার জন্য খুব কান্নাকাটি করেন। তাঁকে মুক্ত করে দেশে আনার প্রক্রিয়া তাঁদের জানা নেই।

পাচার হওয়া ওই নারীর মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি মেয়েকে ফেরত চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই, আমার মাইয়ারে সিরিয়া থেইকা ফেরত আইনা দেন।’

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার এক নারীকে তিন বছর আগে পাচারকারী চক্র বিদেশে নেওয়ার নাম করে সিরিয়ায় বিক্রি করে। এক মাস আগে তিনি বন্দিদশা থেকে পালিয়ে পুলিশের কাছে আশ্রয় নেন। তাঁর চাচা বলেন, তাঁর ভাতিজি লেবানন যেতে মাদারীপুরের শিবচরের দালাল আফজালকে ৭৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। আফজাল কাকরাইলের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লেবাননে পাঠান। লেবাননে তাঁর ভাতিজিকে গ্রহণ করেন বাংলাদেশি এক নারী। পরে ওই নারী তাঁর ভাতিজিসহ ১২ জনকে সিরিয়ায় নিয়ে একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করেন। সিরিয়ার হালাল শহরে তাঁদের বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কাজ করতে না চাইলে নির্যাতন করা হয়। পাচার হয়ে পালিয়ে আসা বরিশালের এক নারীর কাছ থেকে তাঁরা এসব জেনেছেন।

অবশ্য গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে কেউ থানায় অভিযোগ করেননি। খোঁজ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি দেখব।’

গজারিয়ার আরেক নারীকেও তিন বছর আগে সিরিয়ায় পাচার করা হয়। বন্দিদশা থেকে এক মাস আগে পালিয়ে পুলিশের কাছে আশ্রয় নেন তিনি। দেশে আসার অর্থ না থাকায় তাঁকে সিরিয়ায় থাকতে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিন বছর আগে পাচার হওয়া এক নারীর বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায়। অবশ্য পরিবার জানে না, তিনি সিরিয়ায়। তাঁর বাবা বলেন, ‘মেয়ে চার-পাঁচ মাস পরপর ফোন করে, এক মিনিটের বেশি কথা বলে না। আগে টাকা পাঠাত, এখন টাকাও পাঠায় না।’ পটুয়াখালীর দশমিনার আরেক নারী দুই বছর ধরে সিরিয়ায় আছেন। তবে তিনি কোথায় আছেন তা তাঁর স্বামী বা ননদ নিশ্চিতভাবে জানেন না। তবে স্বামী বলেন, ছেলে জানে। মুঠোফোনে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বলেন, তাঁর মা সিরিয়ায় আছেন। তবে কোন শহরে তা জানেন না।

পাচার হওয়া আরেক নারীর বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে। তাঁর বড় বোন বললেন, পাচার হয়েছে কি না, জানেন না। তবে চাচি বলেন, তিনি ইয়েমেনে থাকেন। কিন্তু পরিবারের লোকজন যে মুঠোফোন নম্বরে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন, সেই নম্বরের কোডটি সিরিয়ার।

এদিকে র্যাব বলছে, তাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী অন্তত ৪৩ জন নারীকে সিরিয়ায় পাচার করা হয়েছে। এ রকম তিনজন গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁদের নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।

সিরিয়ায় পাচার হওয়া নারীদের দেশে ফিরিয়ে আনা হবে কি না, এ প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘সিরিয়ায় পাচার অত্যন্ত ভয়াবহ। সেখানে বাংলাদেশের দূতাবাস না থাকায় এবং ওই নারীদের অবস্থান না জানায় তাঁদের ফিরিয়ে আনা কঠিন বিষয়। কারণ, কয়েকজনের পরিবারও বলেছে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তবু আমরা জর্ডানে থাকা দূতাবাসের মাধ্যমে এ বিষয়ে চেষ্টা চালাব।’ 

র্যাব-৩-এর অধিনায়ক খন্দকার গোলাম সারোয়ার বলেন, তাঁরা তথ্য পেয়েছেন, সিরিয়ায় পাচার হওয়া নারীদের ওপর নানা অত্যাচার চলছে। পাচারের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনাল, আল হাসিব ইন্টারন্যাশনাল, সিকদার ট্রাভেলস, বাংলাদেশ এক্সপার্ট করপোরেশন, হাসান ইন্টারন্যাশনাল ও নামিরা ওভারসিজের নামে র্যাব অভিযোগ পেয়েছে। 

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে আল রাবেতা ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার আবুল বাসার বলেন, তাঁরা কাউকে সিরিয়ায় পাঠান না। সিরিয়ার সঙ্গে তাঁদের সমঝোতা স্মারকও নেই। তিনি বলেন, কোনো এজেন্সি সিরিয়ায় লোক পাঠায়নি, বরং লেবাননে পাঠিয়েছে। মানব পাচারের অভিযোগে মামলা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের হয়রানি করছে। 

এফ/০৮:৩৩/০৯আগষ্ট

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে