Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-০৩-২০১৬

খোলা আকাশের নিচে লাখো মানুষের মানবেতর জীবন যাপন

খোলা আকাশের নিচে লাখো মানুষের মানবেতর জীবন যাপন

ঢাকা, ০৩ অগাস্ট- উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। নাগরপুরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। কুড়িগ্রামে বানভাসি মানুষের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার মানুষ। ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। লাখ লাখ বন্যাদুর্গত পরিবার খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে ওইসব এলাকায়। পর্যাপ্ত ত্রাণ পাচ্ছে না বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, নদ-নদীর পানি হ্রাস পেতে থাকায় কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি এখনও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ঘরে ফিরতে পারছে না চরাঞ্চলসহ নিম্নাঞ্চলে বন্যা দুর্গতরা।

বন্যাদুর্গত দেড় লাখ পরিবারের জন্য জেলায় ৫৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় খোলা আকাশের নীচে মানবেতর জীবনযাপন করছে বেশির ভাগ পরিবার। জেলায় আরো আশ্রয় কেন্দ্র বাড়ানোর দাবি বন্যা দুর্গতদের। ১৬ দিনের বন্যায় মানুষের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়েছে। বন্যায় পানিতে ডুবে মারা গেছে ১৩ জন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১ লাখ ৫০ হাজার ৫৮৬ পরিবারের প্রায় সাড়ে ৬ লাখ মানুষ। এরমধ্যে নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ২২ হাজার ৬৭৫ জন। ৭ হাজার ১২ হেঃ জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৬৩ জন। বন্যায় ৫৪ কিলোমিটার বাঁধ ও ৩৯টি ব্রিজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঁচা সড়ক ৪৭৪ কিলোমিটার ও পাকা সড়ক ৫২ কিলোমিটার ভেঙে গেছে। প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪৮টি। ৫৩টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৮৪ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। গবাদিপশু মারা গেছে ৭৭টি। পানি কমার সাথে সাথে ছড়িয়ে পড়েছে রোগবালাই। গত ২৪ ঘন্টায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৭৯ জন।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজার রহমান জানান, মঙ্গলবার ধরলা নদীর পানি ৫ সে.মি ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ২২ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কুড়িগ্রাম ত্রাণ বিভাগের কর্মকর্তা আব্দুল মোত্তালিব মোল্লা জানান, সরকারি হিসাবে জেলার ৯ উপজেলার ৭৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫৭টি ইউনিয়নের ৭২৮ গ্রাম প্লাবিত হয়। এখন পানি নেমে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে এক হাজার ৩৭৫ মে.টন এবং জিআর ক্যাশ দেয়া হয়েছে ৩৮ লাখ। মজুদ আছে ১০০ মে.টন চাল ও ৫ লাখ টাকা। এছাড়া ২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কন্ট্রোল রুমের কর্মকর্তা আখের আলী জানান, মঙ্গলবার রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের নয়ার চরের যারহাদ আলীর কন্যা রওশনারা (২০) পানিতে ডুবে মারা গেছে। চলতি বন্যায় এপর্যন্ত পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১৩ জনে। অপর মৃতরা হলেন রৌমারীর ঝগড়ার চরের আলম হোসেনের পুত্র জাহিদ (১), গয়টাপাড়ার মজুন মিয়ার কন্যা আশা মনি (২), কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের চর বড়াইবাড়ীর তাজুল ইসলামের পুত্র মোস্তাকিন (২), নাগেশ্বরীর বেরুবাড়ী এলাকার আব্দুল মান্নানের কন্যা মারুফা (১৬), কালিগঞ্জ ইউনিয়নের ভবানন্দের কুটি এলাকার মৃত রজনী চন্দ্র নন্দীর পুত্র নারায়ণ চন্দ্র নন্দী (৫৫), হাসনাবাদ ইউনিয়নের সিংহের হাটের ছোলায়মানের কন্যা খাদিজা (১৮), ভুরুঙ্গামারীর বলদিয়ার নবী হোসেনের পুত্র শহীদ হোসেন (১৫ মাস), উলিপুরের অনন্তপুর এলাকার কান্তারা চন্দ্র দাসের পুত্র সারু চন্দ্র দাস (১৮), চিলমারীর অস্টমীরচরের আব্দুস ছামাদের কন্যা শিল্পী (১৬ মাস), রমনা সরকার পাড়ার মৃত পনির উদ্দিনের পুত্র উসমান আলী (৪৫), সবুজপাড়া এলাকার শাহিনের পুত্র নাজিম (১৫) এবং রাজিবপুরে অজ্ঞাতনামা নুর মোহম্মদ (৭০)। এরা সকলেই পানিতে ডুবে মারা যায়। এ সময়ে জেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ৭১০ জন।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে গাইবান্ধা জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে গোটা ফুলছড়ি উপজেলা পরিষদ চত্বর এবং কাতলামারির ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র এখনও বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। তিন সপ্তাহের দীর্ঘায়িত বন্যায় ৪টি উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের বন্যা কবলিত মানুষ শুকনো খাবার, জ্বালানি, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, গবাদি পশু সংরণ, গবাদি পশুর খাদ্যসহ নানা সমস্যায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এদিকে ফুলছড়ি উপজেলার সকল সড়ক বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থাকায় এবং বাঁধ ও সড়ক ভেঙে যাওয়ার কারণে ওই উপজেলা সদর, সকল ইউনিয়ন ও জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। নৌকাই সেখানে চলাচলের একমাত্র বাহন।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, বন্যা কবলিত সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা ও সদর উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নের ২৩৪টি গ্রাম বন্যা কবলিত অবস্থায় রয়েছে। ওই ৪ উপজেলার ৯৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১১ হাজার ৪১৭ জন আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বাঁধ এবং উঁচু এলাকায় আরও বিপুলসংখ্যক মানুষ উঠেছে। এ পর্যন্ত বন্যার্তদের জন্য ৪১ লাখ টাকা ও ১ হাজার ৫০ মে. টন চাল ও ২ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কাজ চলছে। এছাড়া বন্যা দুর্গত এলাকায় ৩ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমির রোপা আমনসহ বিভিন্ন ফসল নিমজ্জিত অবস্থায় থাকায় সেগুলো এখন বিনষ্ট হওয়ার পথে। এছাড়া ১শ’ ৮৯ কি.মি. কাঁচা রাস্তা, ২৯ কি.মি. পাকা রাস্তা, ৪শ’ মিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে গেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর থেকে জানানো হয়েছে, আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে বিশুদ্ধ পানির জন্য ২১টি নলকূপ ও ৬৪টি ল্যাট্রিন স্থাপন করা হয়েছে। বন্যা কবলিত এলাকায় চর্ম রোগ দেখা দিয়েছে। ৬৫টি মেডিকেল টিম বন্যার্তদের স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করছে।

ঝালকাঠি : ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, ঝালকাঠির সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে অমাবশ্যার জোয়ারে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭/৮ ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরের কলাবাগান ও পূর্ব চাঁদকাঠি জেলেপাড়া এলাকাসহ জেলার ৪ উপজেলার নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। চরম দুর্ভোগে পড়েছে নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। সরেজমিনে দেখা গেছে, নদীর পানি বৃদ্ধিতে আবাসিক এলাকায় হাঁটু সমান পানি হয়েছে। তলিয়ে গেছে বাসার ফোর, রান্না ঘর, পায়খানা। স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। সাপ আতঙ্কে রাত যাপন করতে হচ্ছে খাটের উপরে বসে।

কলাবাগান এলাকার মরিয়ম বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, অমাবশ্যা অথবা পূর্ণিমা হলেই প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে পানি বাড়তে থাকে। মানের (মানুষের) বাসায় কাজ করি। পানি বেড়ে যাওয়ায় কাজেও যেতে পারছি না। রান্নাঘর তলিয়ে গেছে। রাত হলে সাপের ভয়ে বসে থাকি। শুকনা মরিচ পুড়ে ঘরের চারপাশে দিয়ে খাটের উপর বসে রাত কাটাই। প্রতিবছরই এরকম দুর্ভোগে পড়তে হয়। আমাগো বিপদ দেখাইয়া বড় মেয়ারা (জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা) সাহায্য এনে নিজেরাই নেয়। আমাগো কিছু দেয় না। আকলিমা মোয়াজ্জেম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলীমা আক্তার ও শেখ অপু জানায়, পানি বাড়লে কোনটা রাস্তা আর কোনটা খাল আমরা বুঝি না। স্কুলে যাবার সময় গড়তে পড়ে গিয়ে (হোঁচট খেয়ে) বই-খাতা ও স্কুল ড্রেস ভিজে যায়। কাস করতে পারি না। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মাহমুদা আক্তার বলেন প্রতিবছরই এ মৌসুমে পানি ওঠে স্কুলে যাতায়াতের রাস্তা ও খেলার মাঠ তলিয়ে যায়। ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয়। ব্যাহত হয় পাঠদান কার্যক্রমও।

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে