Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৮-০৩-২০১৬

তবু কেন রামপাল?

আসিফ নজরুল


তবু কেন রামপাল?

গত ২৮ জুলাই তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির একটি মিছিল ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে। এই মিছিলে কোনো জঙ্গি, জামায়াত এমনকি বিএনপির কেউ ছিল না। ছিল না কোনো সন্ত্রাসী, অপরাধী বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার মতো মানুষ। এই মিছিল সরকারের পতনের জন্য ছিল না, এমনকি সরকারের বিরোধিতার জন্যও ছিল না। মিছিলের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিরোধিতা করা, এই বিরোধিতার যুক্তিগুলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।

অথচ এই মিছিলই কয়েক দফা হামলা করে শেরাটনের কাছে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। তাদের যুক্তি, মিছিলটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় হচ্ছিল, ফলে যান চলাচলে মানুষের সমস্যা হচ্ছিল। প্রহসনের বিষয় হচ্ছে, মিছিলটি ছিল তার চেয়ে বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে—দেশের সবচেয়ে বড় একটি সম্পদ সুন্দরবনকে রক্ষা করার দাবিতে। আরও প্রহসনের বিষয় হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলকে এবং এদের সমর্থকদের একই রাস্তায় আগে বহুবার মিছিল করতে দেওয়া হয়েছে বিনা বাধায়, এমনকি কখনো কখনো পুলিশের নিরাপদ প্রহরায়!

২৮ জুলাই পুলিশি বাধার তাই একটাই মানে হতে পারে। আর তা হচ্ছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির কোনো রকম বিরোধিতা পছন্দ নয় সরকারের, এই বিরোধিতার যুক্তিগুলোও আর শুনতে রাজি নয় সরকার। কিন্তু তাই বলে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হওয়ার দায়িত্ব থেকে থেমে থাকলে চলবে না। সরকারের বহু শুভাকাঙ্ক্ষীএই প্রকল্পকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রধানতম চেতনা দেশের সম্পদ ও দেশের স্বার্থকে রক্ষা করা। রামপাল প্রকল্প এর সবকিছু বিপন্ন করতে পারে। কারণ, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হতে যাচ্ছে সুন্দরবনের ঠিক পাশে।

সুন্দরবন শুধু আমাদের নয়, গোটা বিশ্বের জন্য একটি অনন্য প্রাণীবৈচিত্র্যপূর্ণ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এই বনের শুধু অনন্যনৈসর্গিক, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ রয়েছে তা নয়, বাংলাদেশকে বিভিন্ন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচাতে এটি একটি চিরন্তন ও অতুলনীয় ভূমিকা পালন করে থাকে। রামপালের বিরুদ্ধে আপত্তির প্রধানতম কারণ হচ্ছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুন্দরবন এবং এর অসাধারণ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে ফেলবে। সুন্দরবন না থাকলে যে বাংলাদেশ থাকবে তা হবে বিকৃত, খণ্ডিত ও কুৎসিত একটি লোকালয়।

২. রামপাল নিয়ে মারাত্মক আশঙ্কার বহু কারণ রয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাংলাদেশ নির্মাণ করতে যাচ্ছে ভারতের ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার করপোরেশন অব ইন্ডিয়ার (এনটিসি) সঙ্গে। সব বাদ দিয়ে শুধু ভারতের নিজের পরিবেশ আইনের দিকে লক্ষ করলেই এই তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রটির অযৌক্তিকতা আমরা বুঝতে পারব। তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের মারাত্মক পরিবেশগত প্রভাবের কথা বিবেচনা করে ভারতের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ২০১০ সালের ইআইএ গাইডলাইনে অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা ইত্যাদির ২৫ কিলোমিটার সীমার মধ্যে এ ধরনের কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিষিদ্ধ করা আছে। সুন্দরবন বাংলাদেশের আইনে একটি অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা। তাহলে এর ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে রামপালের মতো একটি অতিবৃহৎ কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কী করে নিরাপদ হতে পারে? ভারতে যা নিরাপদ নয়, তা বাংলাদেশে কোন বিবেচনায় নিরাপদ হবে? সেও খোদ সুন্দরবনের পাশে?

ভারতের বিজ্ঞান ও পরিবেশ সেন্টারের ‘হিট অন পাওয়ার’ নামক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে বৈশ্বিক মানদণ্ডে ভারতের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর পরিবেশদূষণ রোধের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমানের। প্রতিবেদন অনুসারে ভারতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আবার নিম্নতর মানের একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এনটিপিসি এবং ভারতেই সবচেয়ে পরিবেশদূষণকারী বদরপুর প্রকল্পটি ছিল এদেরই। তাহলে কী করে আমরা ভাবতে পারব এদের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সব যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে একটি নিরাপদ প্রকল্প হবে?

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বিপক্ষে যেসব বৈজ্ঞানিক যুক্তিতর্ক, তা বহুবার বিভিন্ন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। প্রথম আলোতে কয়েক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিদ্যুৎ প্রকৌশলী আরশাদ মজুমদার কিছু সহজবোধ্য প্রশ্ন-উত্তরের মাধ্যমে এই প্রকল্পের মারাত্মক ঝুঁকির কথা বুঝিয়ে বলেছেন। কোনো যুক্তির, কোনো উদ্বেগের সরাসরি উত্তর না দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার শুধু কিছু খেলো কথা বলে দায় সারার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি তার দু-একটি বিষয় এখানে তুলে ধরছি।

এক. সরকারের পক্ষ থেকে বহুবার বলা হয়েছে বড়পুকুরিয়ার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো পরিবেশদূষণ হচ্ছে না, তাহলে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরিবেশদূষণ হবে কেন? এর উত্তর হচ্ছে, বড়পুকুরিয়ার কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে না—এর কোনো প্রমাণ নেই; বরং পরিবেশবাদীদের পক্ষ থেকে কৃষিজমি, পানির স্তর ও মাছের ওপর এই কেন্দ্রটির মারাত্মক প্রভাবের কথাই বারবার তুলে ধরা হয়েছে। তা ছাড়া, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ১৩২০ মেগাওয়াট, যা বড়পুকুরিয়ার কার্যকর (১২৫ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতার ১০ গুণেরও বেশি এবং এটি নির্মিত হচ্ছে স্পর্শকাতর একটি বনাঞ্চলের পাশে। কাজেই প্রশ্ন আসে রামপালের ঝুঁকি অনুধাবনের সদিচ্ছা থাকলে এর সঙ্গে বড়পুকুরিয়ার কোনো তুলনা করা যায় কি?

দুই. সরকার এবং রামপালের প্রস্তাবিত নির্মাতাদের লোকজন বলেছেন, অক্সফোর্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সেগুলোতে কোনো ক্ষতি হয় না। রামপালে তাহলে কেন ক্ষতি হবে? এর উত্তর হচ্ছে—এই প্রশ্নের তথ্যই ভুল। অক্সফোর্ডশায়ার ডিডকোট-ওয়ান কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিবেশদূষণের কারণেই ২০১৩ সালের মার্চ মাসে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রটোকলের পর ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় আরও অনেক কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি খোদ ভারতের জ্বালানি মন্ত্রণালয় কর্ণাটক, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র ও ওডিশার রাজ্য সরকারগুলো এবং স্থানীয় জনগণের আপত্তির কারণে চারটি বড় ধরনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প এ বছর জুন মাসে বাতিল করে দিয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর কোনোটিই সুন্দরবনের মতো অনন্য একটি প্রাকৃতিক সম্পদের পাশে ছিল না। পরিবেশদূষণের কারণে এগুলো বন্ধ হলে সুন্দরবনের পাশে রামপালের মতো একটি অতিঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প কীভাবে গ্রহণ করার কথা ভাবতে পারি আমরা?

তিন. রামপালের পক্ষে সরকারের অন্যতম যুক্তি হচ্ছে: রামপালে ‘সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি’ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ফলে সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, সাব ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির তুলনায় সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করলে দূষণের পরিমাণ মাত্র ৮ থেকে ১০ শতাংশ হ্রাস পায়, যা কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভয়াবহ দূষণ সামান্যই কমাতে পারে। আর সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি যদি রক্ষাকবচ হয়ে থাকে তাহলে খোদ ভারতেই বিভিন্ন রাজ্যে এই টেকনোলজি ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল এমন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাদ দেওয়া হলো কেন?

রামপালের বিপক্ষে আরও বহু যুক্তি রয়েছে। আমাদের বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী কিছুদিন আগে বলেছেন, প্রতিবাদী নাগরিকবৃন্দ এ বিষয়ে কোনো সঠিক তথ্য ও যুক্তি ছাড়াই তাঁদের বিরোধিতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর উত্তরে ৫৩টি সামাজিক আন্দোলনের সমন্বয়ে গঠিত সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে সুলতানা কামাল একটি বিবৃতি গণমাধ্যমে প্রেরণ করেছেন। ১ আগস্টের এই বিবৃতিতে তিনি বলেছেন: ‘আমি পরিষ্কারভাবে জানাতে চাই যে, মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের এই বক্তব্যটি একেবারেই সত্য নয় এবং তা আন্দোলনকারী নাগরিক সমাজের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত অপপ্রচারের শামিল।’

সুলতানা কামাল জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ১৯ জুন ২০১৬ তারিখে বিদ্যুৎ ভবনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবর্গ রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপক্ষে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ও যুক্তিগুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন, যার কোনোটিই সরকারপক্ষ খণ্ডন করতে পারেনি। তঁার বক্তব্য অনুসারে, সভার শেষ পর্যায়ে মন্ত্রী মহোদয় নিজেকে ‘কোনো পক্ষের নয়, দুই পক্ষের মাঝখানের’ বলে অভিহিত করেন এবং আরও আলোচনার আশ্বাস দেন।

পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আর কোনো আলোচনা ছাড়াই এর কয়েক দিনের মধ্যেই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিটি স্বাক্ষর করা হয়!

৪. বাংলাদেশের বহু সমস্যা রয়েছে। বাংলাদেশের মতো গণতন্ত্র, সুশাসন, জঙ্গিবাদ, সম্পদের সুষম বণ্টন নিয়ে বহু সমস্যা রয়েছে অনেক দেশেই। সদিচ্ছা থাকলে এসব সমস্যার প্রতিটির সমাধান সম্ভব একসময়। সুশাসন, মানবাধিকার, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়, ফিরেও পাওয়া যায়। কিন্তু সুন্দরবনের মতো অনন্যসম্পদ প্রতিষ্ঠা করা যায় না, এটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত হলে তা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যায় না।

সরকারের কাছে আমাদের তাই অনুরোধ, সুন্দরবনের পাশে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করুন। সেই সঙ্গে ওরিয়ন গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ সুন্দরবনবিনাশী সব প্রকল্প বাতিল করুন। নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সব পরিকল্পনা বাদ দিয়ে কম ব্যয়সাপেক্ষ ঝুঁকিমুক্ত বৃহৎ গ্যাস, বর্জ্য ও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করুন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যদি নির্মাণ করতেই হয়, অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তা করুন।

মনে রাখতে হবে যে সুন্দরবন কোনো সরকারের না, এটি রাষ্ট্রের। সুন্দরবন শুধু এই প্রজন্ম বা এই অঞ্চলের মানুষের না, এটি সবার এবং সব সময়ের একটি অমূল্য সম্পদ বা হেরিটেজ।

লেখক: আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

এফ/০৯:৫০/০৩আগষ্ট

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে