Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.3/5 (3 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-২৬-২০১৬

তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থান: পেশাদারিত্বের পরীক্ষায় ব্যর্থ পশ্চিমা মিডিয়া

রাশেদ শাওন


তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থান: পেশাদারিত্বের পরীক্ষায় ব্যর্থ পশ্চিমা মিডিয়া

আঙ্কারা, ২৬ জুলাই- তুরস্কের ইতিহাসে চলতি বছরের ১৫ এবং ১৬ জুলাইয়ের দিন দুটি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে। ১৫ জুলাই সন্ধ্যার পর থেকেই দেশটিতে সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায় সেনাদের একাংশ। শুধু এরদোয়ান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করাই নয়, এই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ছিল পুরো জাতিকে স্বৈরতন্ত্রের পথে নিয়ে যাওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি সেনা অভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানের কাছে পরাজিত হয়েছে সেনাদের বিদ্রোহী দলটি। জনগণ, রাজনৈতিক নেতা, সাংসদ, মূলধারার গণমাধ্যম, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং শীর্ষ সেনা কর্মকর্তারা একযোগে রুখে দিয়েছে অভ্যুত্থান।

প্রশ্নবিদ্ধ পশ্চিমা গণমাধ্যমের পেশাদারিত্ব
পশ্চিমা গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এবং তাদের বিশ্লেষকরা অভ্যুত্থান চেষ্টার ঘটনায় তুরস্কের জনগণ এবং তুর্কি সমাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি অভ্যুত্থান রুখে দেয়ার কৃতিত্বও তুর্কিদের দিতে ব্যর্থ হয়েছে। জোর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় চেপে বসা কোনো শাসকগোষ্ঠিকেই যে তুরস্কের জনগণ মেনে নেবে না- এই বিষয়টিকে খাটো করে দেখা হয়েছে। মার্কিন এবং ইউরোপীয় গণমাধ্যমগুলোর বেশিরভাগই অভ্যুত্থান চেষ্টার প্রথম ২৪ ঘণ্টায় তাদের নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তাদের সংবাদগুলো ছিল অস্পষ্টতা এবং বিচ্ছিন্নতায় ভরপুর।

অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে তুরস্কের জনগণের রাজপথে নেমে আসা এবং প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের অবকাশস্থল ত্যাগ ও ইস্তাম্বুলের মাটিতে নিরাপদের অবতরণের এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল যে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ইস্তাম্বুলে এসে তুর্কি প্রেসিডেন্ট যখন জনগণকে রাজপথে নেমে আসার আহ্বান জানাচ্ছিলেন তখনও দেখা যাচ্ছিল, সিএনএন’র মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এরদোয়ানকে ‘তুরস্কের অবরুদ্ধ প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক শীর্ষ স্থানীয় গণমাধ্যম এমএসএনবিসি টুইটারে জানায়, ‘উচ্চ পর্যায়ের মার্কিন সামরিক সূত্র এনবিসিকে জানিয়েছে, এরদোয়ান ইস্তাম্বুলে অবতরণ করতে অস্বীকার করেছেন। জানা গেছে, তিনি জার্মানির কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন।’ পরে অবশ্য টুইটার বার্তাটি মুছে ফেলে এমএসএনবিসি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ততক্ষণে এই সংবাদটি অসংখ্য গণমাধ্যমে বেকিং নিউজ হিসেবে প্রচারিত হতে শুরু করে। এরপর ইস্তাম্বুলে এরদোয়ান যখন ক্যামেরার সামনে জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন তখন সংবাদটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায়।


যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার গণমাধ্যম হিসেবে এমএসএনবিসি’র এ ধরনের প্রতিবেদনকে নিঃসন্দেহে কমপক্ষে ‘দায়িত্বহীন’ বলা যায়। একটি দেশের প্রধান নেতাকে পলাতক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এতে। এমন একটি বিপজ্জনক সময়ে এ ধরনের সংবাদ জনগণকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিরুৎসাহিত করেছে সন্দেহ নেই। ভুল প্রচারণার শিকার হয়ে ঘরে ফিরে গেলে আবারো সামরিক সরকারই হয়তো তুরস্কের মসনদে আসীন হতো।

পরেরদিন সকালে একই চিত্র দেখা গেছে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের লেখায়। তারা সবাই নিজেদের একই অবস্থান প্রচার করতে শুরু করল। তারা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত সরকারকে সমর্থন দেয়ার পরিবর্তে তুরস্কের স্থিতিশীলতা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। জনগণকে হতাশ করতে সবচে ভালো উপস্থাপনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গণমাধ্যম ফক্স নিউজের। ১৬ জুলাই তারা তাদের মতামত পাতায় একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল, ‘শেষ হয়ে গেল তুরস্কের শেষ স্বপ্ন’। শুধু তাই নয়, তুরস্কের রাজপথে কী ঘটেছিল তার সঠিক চিত্র বর্ণনা করার পরিবর্তে ঘটনাকে এরদোয়ান সমর্থক এবং বিরোধীদের মধ্যে সংঘর্ষ হিসেবে বর্ণনা করে এই মার্কিন গণমাধ্যটি।

১৭ জুলাই ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এরদোয়ানকে ‘ইলেকটেড ডিকটেটরশিপ’ (নির্বাচিত স্বৈরাচার) আখ্যা দিয়ে তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, ‘একটি সামরিক স্বৈরাচার নিঃসন্দেহে সবচে বাজে সরকার ব্যবস্থার উদাহরণ। তবে একটি নির্বাচিত স্বৈরাচারও এর চেয়ে কোনো অংশ কম বিপজ্জনক নয়।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে তুরস্কে সামরিক সরকারকে এক ধরনের বৈধতাই দেয়া হলো। নির্বাচিত সরকার আর সামরিক সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখা হলো না।

তবে সবচে আশ্চর্য করেছে এরদোয়ানের সমালোচনা করে বিবিসি অনলাইনের একটি বিশ্লেষণ। এর শিরোনাম ছিল; ‘রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান: টার্কি’স রাথলেস প্রেসিডেন্ট’। অর্থাৎ, ‘রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান: তুরস্কের নিষ্ঠুর প্রেসিডেন্ট’। পশ্চিমা গণমাধ্যমের এরকম আরো অসংখ্য সংবাদ সারা পৃথিবীর মানুষকে ভুল তথ্য দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রের ওপর অবৈধ ও অগণতান্ত্রিক শক্তির আক্রমণ ঠেকিয়ে দিয়েছে তুর্কিরা।

জনগণের প্রতি অবজ্ঞা
 
পশ্চিমা গণমাধ্যমের এসব সংবাদ এবং বিশ্লষণের যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি ছিল তা হচ্ছে, অভ্যুত্থান ঠেকাতে তুর্কিদের সামাজিক আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে অবজ্ঞা প্রদর্শন করা। এছাড়া একইসঙ্গে ঘটনার সঠিক চিত্র তুলে ধরার ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব এড়াতে না পারাও ছিল সংবাদগুলোর হতাশাজনক বৈশিষ্ট্য। তুরস্ক এবং তুর্কি সরকারের বিষয়ে একটি নেতিবাচক ভবিষ্যত খুব সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরে এসব গণমাধ্যম।

তুরস্কের জনগণের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের আরো একটি ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করেছে আরেক শীর্ষ মার্কিন গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। ঘটনার পরের দিন এক প্রতিবেদনে এই সংবাদমাধ্যটি এরদোয়ান সমর্থকদের ‘ভেড়া’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তুরস্কের জনগণ একে পশ্চিমাদের পক্ষপাতিত্ব এবং তাদের প্রাচ্যবাদী মানসিকতার পরিচয় বলেই মনে করছে। নিউইয়র্ক টাইমসের মতো গণমাধ্যমও এ ধরনের পক্ষপাতিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি।

এছাড়া আরেকটি মতামতে তুরস্কের রাজপথে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা জনগণকে ‘এরদোয়ানের পক্ষের সহিংস জনতা’ বলে আখ্যায়িত করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। পশ্চিমা বিভিন্ন গণমাধ্যমের এসব প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ এবং মতামতের কঠোর সমালোচনা করেছে তুরস্কের জনগণ। তবে এসবের মধ্যে কিছু নিরপেক্ষ এবং সদিচ্ছাপূর্ণ সংবাদও ছিল। এসব সংবাদ এবং সংবাদমাধ্যম জনগণের কাছ থেকে প্রশংসাও পেয়েছে। বাকিরা তাদের প্রেজুডিস, দ্বিমুখী নীতি এবং কুটিল মনোভাব নিয়েই সংবাদ প্রচার করেছে।

পশ্চিমা নেতাদের প্রতিক্রিয়া
অভ্যুত্থানের ঘটনায় পশ্চিমা নেতাদের প্রতিক্রিয়াও সন্তোষজনক ছিল না। তাদের বিবৃতিগুলোই এসেছে অনেক দেরিতে। তাছাড়া এগুলো ছিল অনেক অস্পষ্ট এবং দুর্বল বিবৃতি। স্পষ্ট এবং শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি তারা। অভ্যুত্থান চেষ্টার সঠিক নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। গণমাধ্যমগুলোর মতো নেতারাও জনতার সংহতির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছেন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত সরকার এবং সংসদের প্রতি সমর্থন তারা জানিয়েছেন। তবে সেটা প্রত্যাশিত মাত্রার চেয়ে অনেক দুর্বল ছিল।


অভ্যুত্থান চেষ্টা পরবর্তী সময়ে তুর্কি সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও পশ্চিমা নেতাদের প্রতিক্রিয়া সবচে সন্দেহপূর্ণ। তারা বারবার তুর্কি সরকারের অসহিষ্ণুতার কথা বলে যাচ্ছে। মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলেছেন তারা। অথচ তুরস্ক এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়। আর তাই ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক সরকারেকে উৎখাতের যেকোনো চেষ্টা যাতে সফল না হয় সেজন্য প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার আনার পরিকল্পনা নিয়েছে এরদোয়ান সরকার।

সামরিক বাহিনী এবং বিচারবিভাগে সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। তাছাড়া অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে একটি নতুন সংবিধান তুরস্কের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। তবে আইনের শাসন, স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের বিষয় নিশ্চয়ই এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। সংকট মোকাবেলায় তুরস্ক সরকারের দায়িত্ব অনেক। আর তাই সংহতির চেতনার ওপর ভিত্তি করেই তাদের যেকোনো পদক্ষেপ নিতে হবে।

এফ/২৩:২০/২৬জুলাই

ইউরোপ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে