Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (13 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-২২-২০১৬

বাঙালির সময়জ্ঞান

তৌফিক আহমেদ


বাঙালির সময়জ্ঞান

বাঙালির সময়জ্ঞান কী আদৌ ছিল? খুব সাধারণ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হর-হামেশাই মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাঙালির জাতীয় জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মোটাদাগে বলতে গেলে ওই একটি বিষয়ই বোধ হয় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। আর সেটি হলো বাঙালির সময়জ্ঞান। ইতিহাস ঘেঁটে হয়তো বলা যাবে না, স্মৃতির পাতা থেকে দু-চারটি ঘটনার বিবরণ থেকে বোঝা যাবে যে বাঙালির সময়জ্ঞান কতটা নিম্নগামী!

আশি কিংবা নব্বই দশকে আমরা ১৬ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে উপজেলা শহরে এসে রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতাম কখন ট্রেন আসবে। এটা প্রায় রেওয়াজে পরিণত হয়ে গিয়েছিল যে, মোহনগঞ্জের ট্রেন মানেই বিলম্বিত আগমন। যথাসময়ে ট্রেন স্টেশনে এসেছে এমন কোনো নজির আমি দেখিনি। কেউ দেখেছেন কিনা জানাবেন। বরং বিলম্ব হতে হতে এমন একপর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, সাধারণ যাত্রীরা প্ল্যাটফর্মে এসে স্টেশন মাস্টার বা সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞেস করত, ও স্যার, ৮টার টেন (ট্রেন) কয়ডায় আইব? স্যারের গম্ভীর জবাব, চেষ্টা করতাছি খবর লওয়ার, কিন্তু কোনোমতেই লাইন কিলিয়ার (ক্লিয়ার) পাইতাছি না। সাধারণ যাত্রীদের অপেক্ষার যেন আর শেষ হতেই চায় না। সময় অতিক্রান্ত হয়েছে দুই যুগ, কী অর্থনৈতিক, কী সামাজিক, কী অবকাঠামোগত—সবখানেই এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ঢাকা-মোহনগঞ্জ রুটে লোকাল ট্রেনের পাশাপাশি চালু হয়েছে আন্তনগর ট্রেন। গতি বেড়েছে বহু গুনে। তাল মিলিয়ে যাত্রী সংখ্যাও বেড়েছে। সবকিছুর বাড়ার সঙ্গে সময়জ্ঞান কি বেড়েছে? আমি ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মিলিয়ে দুই মাস ঢাকায় ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং রিসার্চ স্টুডেন্ট হিসেবে গিয়েছিলাম। সেই সুবাদে আমি বারকয়েক ঢাকা থেকে মোহনগঞ্জ গিয়েছিলাম হাওর এক্সপ্রেসে। একটি বারের জন্যও আমি যথা সময়ে ট্রেন ছাড়তে ও পৌঁছতে দেখিনি (হতে পারে আমার দুর্ভাগ্য)। তাতে করে আমার মনে হয়েছিল, অর্থনৈতিক আর অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আরও অনেক কিছুর সঙ্গে সময়ানুবর্তিতা শেখা উচিত যা আজও আমাদের হয়নি।

একটু বড় হয়ে শহরে গেলাম। লেখাপড়া শেষ করে চাকরিতে যোগদান করলাম। এই লম্বা সময়ের মধ্যে বাঙালির সময়জ্ঞান স্বল্পতার অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম। এর মধ্যে একটি অভিজ্ঞতার কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। ২০০৫ সালের ঘটনা। আমি তখন কিশোরগঞ্জে চাকরি করি। ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ। একই শহরের একই সড়কে দুই-তিন বাড়ি তফাতে থাকেন আমার বস। ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে একদিন বার্তা এল যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে আসবেন একটি সেমিনারে যোগ দিতে। আমি যেন আমার বসসহ পুলেরঘাট বাজারে সকাল ৮টার মধ্যে উপস্থিত থাকি। 

ঢাকা থেকে বাজিতপুর যাওয়ার সময় পথিমধ্যে আমাদের গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাবেন। বসেরও বস, প্রধান কার্যালয়ের বস বলে কথা! ৮টা বাজতে মিনিট-বিশেক বাকি। আমি পুলেরঘাট বাজারের নির্দিষ্ট পয়েন্টে উপস্থিত। ঢাকা থেকে প্রধান কার্যালয়ের বসেরাও নির্ধারিত সময়ের ৫ মিনিট আগেই চলে এসেছেন। কিন্তু আমার কিশোরগঞ্জের বসের কোনো হদিস মিলছে না। ৮টা থেকে ৮টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে, বারবার ফোনে যোগাযোগ করেও অবশেষে ব্যর্থ হয়ে তাঁকে ছাড়াই আমরা বাজিতপুর চলে যাই। কিশোরগঞ্জের বস সেদিন বাজিতপুর পৌঁছেছিলেন বটে, কিঞ্চিৎ বিলম্বে। সেমিনার ততক্ষণে অর্ধেক এজেন্ডা শেষ করে ফেলেছে। পরে যত দূর মনে পড়ে, ২০০৬ সালের শুরুতে চাকরিটা হারিয়েছিলেন শুধুমাত্র যথাসময়ে পুলেরহাট উপস্থিত না থাকার কারণে। অনেক বিখ্যাত মানুষের ব্যর্থতার ইতিহাস থেকে সফলতার শীর্ষে উঠে আসার কথা আমরা শুনে থাকি। তাঁর ক্ষেত্রেও আমি ঠিক তেমনটিই দেখতে পাই। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এখন তিনি নিশ্চয়ই ৮টার ক্লাসে ১০টায় হাজির হন না, কিংবা ২টার মিটিংয়ে ৩টায়।

বড় ধাক্কাটি খেলাম জাপানে এসে। ২০০৯ সালে যখন আমি জাপানে এলাম তখন দেখলাম বাঙালি-জাপানি সম্মিলিত অনুষ্ঠান খুব বেশি অনুষ্ঠিত না হলেও বছরে দু-একবার হতো। যে সকল অনুষ্ঠানে জাপানিদের দাওয়াত করা হতো সেসব অনুষ্ঠানের ব্যাপকতা একটু বেশিই থাকত। তবে যে বিষয়টি জাপানিদের বিব্রত অবস্থায় ফেলত সেটি হলো অনুষ্ঠান শুরুর নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠানস্থলে এসে কাউকে না পাওয়া। দেখা গেল, অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার নির্ধারিত সময় হলো সন্ধ্যা ৭টা। জাপানি অতিথিরা সকলেই ঠিক ৭টা বাজার ২-৪ মিনিট আগেই পৌঁছে গেছেন। কিন্তু অনুষ্ঠান আয়োজনকারীদের কোনো পাত্তা নেই। ১০, ২০ বা ৩০ মিনিট বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা করার পর দু-একজন আসতে শুরু করলেন। অনুষ্ঠান শুরু হতে হতে ততক্ষণে বেজে গেছে রাত ৯টা। জাপানিদের জন্য বিশেষ করে মফস্বল এলাকায় যাঁরা বসবাস করেন তাঁদের জন্য এটা মধ্যরাত। এভাবে চলতে চলতে এখন কোনো জাপানি অতিথিকে দাওয়াত করলে আগেই জিজ্ঞেস করেন, উপস্থিত হওয়ার নির্ধারিত সময়টা কি জাপানি সময় নাকি বাংলাদেশি সময়! জাপানি সময় হলো নির্ধারিত সময়ের আগেই হাজির হওয়া, আর বাংলাদেশি সময় হলো নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা পর হাজির হওয়া। বোঝেন এইবার, আমাদের সময়জ্ঞান কোথায় গিয়ে ঠেকেছে!


লেখক

সাম্প্রতিককালে অপেক্ষাকৃত তরুণদের মাঝে সময় ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ করুন দৃশ্য চোখে পড়ছে। প্রথমত, যে উদ্দীপনা নিয়ে বিদেশে পড়তে আসার কথা সে উদ্দীপনা কেন জানি তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয় না। এমনও দেখা গেছে যে, প্রথম দিনের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে তাদের বিলম্বিত উপস্থিতি সবার নজর কাড়ে। এইরকম আরও হাজারো ক্ষেত্রে আমাদের বিলম্বিত উপস্থিতির বিশেষ নাম আছে। সব শেষে দেখা গেল, বছরে দুই বার ঈদের নামাজেও তারা বিলম্বিত। এমনকি কেউ কেউ হাজির হচ্ছেন নামাজ শেষে দোয়ার সময়। একটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বসবাস করতে গেলে সময়ানুবর্তিতা যে কতটুকু জরুরি তা কতিপয় তরুণদের কাছে বোধগম্য নয়। যার যার শিক্ষা তার তার, এতে কারও কিছু বলার নেই। কিন্তু যখন বিদেশে তারা দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন সে ক্ষেত্রে কৃতিত্বের ভাগীদার যেমন গোটা দেশ হয় তেমনি বদনামটাও সকলের মধ্যে সমভাবে চলে যায়। আর এখানেই আমাদের মতো গুটি কয়েক মানুষের আপত্তি।

শেষ করব একটি মজার উদাহরণ দিয়ে। জনৈক ব্যক্তি বাঙালির সময়জ্ঞান নিয়ে একটি প্রচলিত চুটকির প্রসঙ্গ টেনেছেন। চুটকিটি হলো এ রকম: ইংরেজ আমলে এক যুবক ব্রিটিশ অফিসার বাংলাদেশে এল চাকরি নিয়ে। যুবক হওয়ার দরুন তাঁর আগ্রহের কমতি না থাকাটাই স্বাভাবিক। আগ্রহ থেকেই গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে কাজের ফাঁকে ফাঁকে বা ছুটির দিনে ঘুরে বেড়ান। একদিন কোনো এক দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন শেষে তিনি ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে এসেছেন। কিন্তু ট্রেন চলে গেল নির্ধারিত সময়ের কয়েক মিনিট আগেই। রেগেমেগে ওই ব্রিটিশ অফিসার মোবাইল কোর্ট বসালেন এর বিচার করার জন্য। স্টেশন মাস্টারকে ডাকা হলো। তাকে বলা হলো ট্রেন সময়ের কয়েক মিনিট আগেই ছেড়ে গেল কেন তার জন্য সন্তোষজনক কৈফিয়ত দিতে হবে, না পারলে চাকরি যাবে সঙ্গে শাস্তিও। ভয়ে ভয়ে স্টেশন মাস্টার বললেন, ট্রেনটা কয়েক মিনিট আগে ছেড়ে গিয়েছে ঠিকই স্যার, কিন্তু এই ট্রেনটা তো আজকের নয়, এটা ছিল গতকালের ট্রেন।

(Toufiq Ahmed, PhD Fellow, Japan Advanced Institute of Science and Technology‍, Ishikawa, Japan. mailto: toufiq 30.ku.jp@gmail.com)

এফ/০৮:০২/২২জুলাই

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে