Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.8/5 (17 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-১৯-২০১৬

মধ্যপন্থার বাঙালি সমাজই শ্রেষ্ঠ সমাজ

সৈয়দ আবুল মকসুদ


মধ্যপন্থার বাঙালি সমাজই শ্রেষ্ঠ সমাজ

বাংলাদেশ চিরকাল মধ্যপন্থায় বিশ্বাস করে। মধ্যযুগে শ্রীচৈতন্যের সময় থেকেই হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ই মধ্যপথ অবলম্বন করে আসছে। এশিয়ায় প্রবর্তিত সব প্রধান ধর্মই মধ্যপথের কথা বলে। মধ্যপথ পরমতসহিষ্ণু। উগ্র প্রতিক্রিয়াশীলতা বা ধর্মান্ধতা এবং উগ্র প্রগতিশীলতা বাঙালি সমাজ সব সময় প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ডিরোজিওর অনুসারী ইয়ং বেঙ্গলের হঠাৎ অতি-আধুনিক ও প্রগতিকামী যুবকেরা এক হাতে গো-মাংসের কাবাব এবং অন্য হাতে হুইস্কির বোতল নিয়ে বাংলা নয় ইংরেজি গান গাইতে গাইতে কলকাতার কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট (বিধান সরণি) বা হ্যারিসন রোড (মহাত্মা গান্ধী রোড) দিয়ে শ্যামবাজারের দিকে যেতেন। অর্থনীতি শোচনীয় ছিল এবং সমাজে নৈতিক অধঃপতন ঘটায় পতিতায় ভরে গিয়েছিল কলকাতার গলি। সেগুলোতে ঢুকে তাঁরা ফুর্তি করতেন। বাইজিদের নাচ দেখতেন রাতভর কেউ কেউ। কলকাতার মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ তাঁদের বাহবা দেননি। অনেকের মা-বাবা ওই ধরনের প্রগতিবাদী সন্তানদের ত্যাজ্য করেছেন।

ডিরোজিওর অনুসারীদের অবদান অসামান্য। অন্যদিকে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ তাদের ওপর আঘাত করেছে এবং নির্যাতন করতে দ্বিধা করেনি। প্রতিক্রিয়াশীলদের জবাবে ডিরোজিওপন্থীরা তাঁদের মুখপত্র এনকয়ারার-এ লিখেছেন: ‘আমরা হিন্দুধর্মের পবিত্র দেবালয় পরিত্যাগ করেছি বলে আমাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন করা হচ্ছে। কুসংস্কার আমরা বর্জন করেছি বলে অতিধার্মিকেরা আমাদের ওপর খড়্গহস্ত হয়েছে। আমরা যা করছি তা ন্যায়সংগত বলেই আমাদের বিবেকবুদ্ধিসংগত।...সর্বপ্রকারের অত্যাচার আমরা সহ্য করতে প্রস্তুত। আমরা জানি, একটা জাতিকে সংস্কারমুক্ত করতে হলে বাইরে খানিকটা কোলাহল ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হবেই।’ [বিদ্রোহী ডিরোজিও, বিনয় ঘোষ]।

যেকোনো সমাজের মতো বাঙালি সমাজেও রক্ষণশীল, প্রগতিশীল ও প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বহুকাল থেকেই ছিল। সব রকম সংকীর্ণতামুক্ত খুবই উদার মানুষ যেমন আমাদের সমাজে সব সময় ছিলেন, তেমনি ধর্মীয় ব্যাপারে অতি অসহিষ্ণু ও সংকীর্ণ মানুষও ছিলেন অগণিত। ধর্মের নামে তুচ্ছ ব্যাপারে হাতাহাতি-মারামারি মাঝেমধ্যে হয়েছে প্রত্যন্ত পল্লিতে। সেটা হয়েছে স্বধর্মাবলম্বীর মধ্যেই, ভিন্নধর্মাবলম্বীর সঙ্গে নয়। ভিন্নধর্মাবলম্বীর সঙ্গে হয়েছে শুধু মসজিদের সামনে নামাজের সময় বাদ্য বাজানো এবং রাস্তাঘাটে গরু জবাই করা নিয়ে। সেসবও অতি অল্প সময়ের জন্য। মারামারি বেধেছে লাঠিসোঁটা বা ছুরি বঁটি নিয়ে; দুদিন পরেই মিটে গেছে।

সেই মধ্যযুগে ইউরোপে যখন খ্রিষ্টান ও ইহুদিরা রক্তারক্তি করেছে, তখন বাঙালি সাধক-কবি ঘোষণা করেছেন: ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ এর চেয়ে বড় কথা আর কী হতে পারে? ইউরোপীয় মানবতাবাদী দর্শন আমরা পাঠ করছি দেড় শ বছর থেকে, কিন্তু মানবতাবাদের চর্চা করছি শত শত বছর যাবৎ। সব ধর্মের অনুসারী বাঙালির নিজস্ব জিনিস প্রেমধর্ম। বাঙালি তার নীতিবোধ ও ন্যায়পরতা পশ্চিমের মিল, বেনথাম, মার্কস, হেগেল পাঠ করে শেখেনি। বাঙালি প্রেমধর্ম কোনো বিশেষ শিক্ষকের কাছে শেখেনি, তারা তা এই মাটির থেকেই শিখেছে। এ দেশের মাটি নরম, মানুষের মনও নরম। প্রেমধর্ম জিনিসটাই নরম জিনিস, শক্ত কিছু নয়—উগ্র তো নয়ই। যদিও এই বাংলার মাটিতেই কিছু দুর্বৃত্ত ও নীতিবোধহীন দুশ্চরিত্র মানুষ চিরকাল ছিল। কোনো কোনো সময় তারা সংখ্যায় কিছু বেশি ছিল বটে, কিন্তু তারা কোনো দিনই প্রাধান্য পায়নি। প্রশাসনের সহায়তায় সাধারণ মানুষই তাদের শায়েস্তা করেছে।

এই মাটিতে হাজার বছর থেকে হিন্দু সাধুসন্তরা আধ্যাত্মিক সাধনা করেছেন, কাউকে হিংসা করেননি, তা সে যে ধর্মেরই হোক। শত শত বছর ধরে মুসলমান পীর-ফকির-সুফিদের আস্তানায় নামাজের সময় মানুষ জামাতের কাতারে দাঁড়িয়ে গেছেন। অন্য সময় ভক্তিমূলক বা মারফতি গান গেয়েছেন যাঁর যেমন খুশি। কেউ বাধা দেয়নি।

ধর্মীয় সহিষ্ণুতা কাকে বলে তা এ দেশের মানুষের চেয়ে কে বেশি জানে? হাজি শাহবাজের মাজার ও মসজিদ থেকে রমনা কালীবাড়ির দূরত্ব ছিল মাত্র ২০০ গজ। আঠারো শতক থেকে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পর্যন্ত আড়াই শ বছর তাদের অস্তিত্ব ছিল। এ রকম শুধু ঢাকায় নয়—সারা দেশে।

লালন ফকির শাস্ত্রীয় অনুশাসনের বাইরে গিয়ে অপ্রথাগতভাবে স্রষ্টা ও মানুষের মহত্ত্ব প্রচার করেছেন। তাঁকে সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধা করেছে এবং তাঁর গান গীত হয়েছে মানুষের কণ্ঠে। সে মানুষ হিন্দু-মুসলমান সবাই। আজ লালনভক্ত বাউলদের কুপিয়ে জখম করা হচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়। কেন এই অসহিষ্ণুতা? তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে বাউল সাধকদেরও। এখনো অসামান্য জ্ঞানী সাধক-বাউল আমাদের দেশে আছেন। ফকির নহির শাহের সঙ্গে আমি কয়েক দিন কথা বলে দেখেছি খুব বড় ভাব-সাধক তাঁরা। জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁদের চিন্তার গুরুত্ব সামান্য নয়।

অবশ্য উগ্রপন্থী প্রগতিবাদিতার কারণে অনেক সময় মধ্যপন্থী বাঙালি সমাজের ক্ষতিই হয়েছে। বিশের দশকে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের ‘শিখা গোষ্ঠী’র নেতারা চমৎকার সংস্কারমূলক কাজ করছিলেন। রক্ষণশীল মুসলমান সমাজে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল। এর মধ্যে কাজী আবদুল অদুদের এক ছাত্র এবং পরে মেয়েজামাই, তার নাম শামসুল হুদা, ইসলাম ধর্ম ও রাসুল (সা.)-কে নিয়ে এমন সব কথা বলা শুরু করলেন, যার কারণে গোষ্ঠীর প্রধান নেতাদের রাস্তাঘাটে অপদস্থ হতে হলো। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতা আবুল হুসেনের মাথায় বংশাল রোডের কিছু লোক একদিন মলভাণ্ড ঢেলে দেয়। বাধ্য হয়ে তিনি কলকাতা চলে যান। মধ্যপন্থী সমাজে অতি অল্প কিছু উগ্র মানুষের কারণে অশান্তির সৃষ্টি হয়।

মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যে গোঁড়ামিমুক্ত ও উদার মধ্যপন্থী, তার প্রমাণ তারা প্রায় ৩৫ বছর যাবৎ নারী নেতৃত্বকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ইসলামি মৌলবাদীরা অনবরত বলেছেন নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। মানুষ তা শোনেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, তাঁদের সময়ই কিছু কিছু উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠী মধ্যপ্রাচ্যের প্ররোচনায় মাথাচাড়া দেয়। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের প্রকাশ্য পৃষ্ঠপোষকতা পায় ইসলামি মৌলবাদীরা। বাংলা ভাইদের অনাচার প্রকাশ্য রূপ নেয়। উচ্চশিক্ষা নিয়ে মেয়েরা যখন জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ধর্মীয় গোঁড়ামির বিস্তৃতি ঘটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েদের অনেকের পোশাক-পরিচ্ছদে আসে দৃষ্টিগ্রাহ্য পরিবর্তন।

ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এক জিনিস, উগ্র মৌলবাদ আরেক জিনিস, সন্ত্রাসবাদ আরেক জিনিস, আর আত্মঘাতী তৎপরতা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। দায়িত্বজ্ঞানহীন খুতবার কারণে যদি জঙ্গির জন্ম হতো, তা হলে দুই-তিন শ বছর আগে থেকেই তা হতো—দুই হাজার খ্রিষ্টীয় অব্দের দ্বিতীয় দশকে সেই আলামত দেখা দিত না।

যদি মনে করা হয় বর্তমান জঙ্গিত্বের জন্য দায়ী মসজিদের ইমামেরা, তা হলে তাঁদের দিয়েই এটা সামলানো সম্ভব। আর যদি এই সন্ত্রাস ও জঙ্গিত্বের জন্য রাষ্ট্র ও সমাজ দায়ী হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজকেই দায়ভার নিতে হবে। যা কিছু ঘটবে তার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকেই জবাব দিতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে সরকার আছে, সরকারি দল আছে, বিরোধী দলও আছে, দলীয়-অদলীয় পেশাজীবী আছেন, সব ধর্মের নেতা ও ইমাম-পুরোহিত আছেন, দলনিরপেক্ষ নাগরিকেরাও আছেন।

আত্মঘাতী জঙ্গিদের অস্ত্র অনেক রকম। তাদের রাইফেল, বোমা, গ্রেনেডের প্রয়োজন সম্ভবত ফুরিয়ে গেছে। সর্বশেষ অস্ত্র একটি মালবাহী ট্রাক। এর পরের অস্ত্রটি কী হবে তা পশ্চিমের গোয়েন্দাও কল্পনা করতে পারে না। যে যে কারণে একজন মানুষ আত্মঘাতী হয়, তা দূর না করলে সারা দুনিয়ার মানুষ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তুললেও আত্মঘাতী আক্রমণ থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করা যাবে না। স্থানীয়ভাবে যে সমস্যার কারণ ভুল রাজনীতি, তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়।

ভয়াবহ জঙ্গি হামলা বাংলাদেশে যদি না-ও ঘটে, ছোট ছোট সন্ত্রাস-ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছেই। বিপুল কাজের চাপে সরকারের নীতিনির্ধারকেরা একটি বিষয় অনুধাবন করার অবকাশ পাচ্ছেন না যে, সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তৎপরতা শুধু জীবনের জন্য হুমকি নয়, তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামাজিক ও জাতীয় জীবনের সর্বত্র। শুধু সরকারি কর্মকাণ্ড নয়, বেসরকারি ও সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা শুধু সরকারের চেষ্টায় নয়, তার জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং ব্যক্তিগত উদ্যোক্তারা। নানামুখী কর্মকাণ্ড আজ দেশের আনাচকানাচে চলছে। প্রত্যন্ত এলাকার তরুণেরা আজ অনেক কিছু করতে চাইছেন। খুব সামান্য পুঁজিতে ভালো কাজ করা সম্ভব। কিন্তু বহু শিক্ষিত যুবক আমাকে বলেছেন, তাঁদের মাথায় পরিকল্পনা আছে, তবে সামাজিক অশান্তি ও অস্থিরতার কারণে তাঁরা কোনো কাজে হাত দেওয়ার সাহস পাচ্ছেন না। এই সব সম্ভাব্য উদ্যোক্তার মধ্যে সরকারি দলের ছেলেমেয়ে এবং বিরোধী দলের যুবক-যুবতীরাও আছেন। অপার সম্ভাবনা তাঁদের মধ্যে। সুযোগ পেলে এবং সামাজিক অশান্তি ও সন্ত্রাস না থাকলে তাঁরা অনেক দূর যেতে পারবেন। এই শিক্ষিত বেকারের দেশে যার খুব বেশি প্রয়োজন।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় কাউকে প্রশংসামূলক ও লাভজনক কোনো কিছু করতে দেখলে হিংসায় অন্তর দাউ দাউ করে জ্বলে তার আশপাশের বহু মানুষের। আসে নানাভাবে প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত বাধা। বাধাও অতিক্রম করা সম্ভব, কিন্তু সন্ত্রাস মোকাবিলা করে অস্তিত্ব রক্ষা করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। কেউ ধারদেনা করে একটা কিছু গড়ে তুলেছেন, একদিন স্লোগান দিতে দিতে এসে একদল দেশপ্রেমিক স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের সিপাহশালার ছাত্র–যুবক তা গুঁড়িয়ে দিলেন বা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলেন। তাঁরা জানেন তাঁদের কোনো দিন বিচার ও শাস্তি হবে না। ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের প্রাচীন মুসলিম ছাত্রাবাস পুড়ে ছাই হয়ে গেল সবার চোখের সামনে, শিক্ষামন্ত্রীর চোখ দিয়ে দর দর করে পানি পড়ল তা দেখে, কারও কিছুই হলো না। সন্ত্রাসী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রশাসনের সহানুভূতিশীল মনোভাবে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা চাঙা হবে—সেটাই স্বাভাবিক।

মধ্যপন্থী ও প্রেমধর্মী বাঙালি সমাজে যদি হিংসার প্রসার ঘটানো হয় সংকীর্ণ স্বার্থে, তা হলে মানুষ পুড়বে এবং হিংসার উদ্‌গাতারাও পুড়বেন হিংসার আগুনেই। আগুন যেমন স্থান-শ্রেণি-পাত্র বাছবিচার করে না, হিংসার আগুনও কাউকে ছাড় দেয় না।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

এফ/০৮:৪০/১৯ জুলাই

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে