Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.5/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-১৩-২০১৬

গহিন গাঁয়ের নাম ‘মাউলিননং’

রোখশানা রফিক


গহিন গাঁয়ের নাম ‘মাউলিননং’

মন আমার উদাসী হাওয়ায় দুরন্ত দুর্বার ছুটে চলা অরণ্য – মেঠো প্রান্তরঘেঁষা নদীজল ভাঙা অশ্বগতিতে ঘুরে বেড়ায় অচেনা-অজানায়। কোনো এক ছুটির ফাঁক পেলেই ফন্দি এঁটে বসে, বেরিয়ে পড়তে ঘরের কোন ফেলে। এক এক করে তাই দেখাও হয়েছে প্রাণজুড়ানো ছবির মতো সুন্দর কিছু দেশ-জনারণ্য নির্জন লোকালয়।

তেমনি এক গহিন গ্রাম, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ের গহিন কন্দরের খাসিয়াপল্লী মাউলিননং। এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে যার খ্যাতি সর্বত্র। ২০০৩-০৪ সালের কথা, ভারতে যাওয়ার আগে আমার আকাশপথে বিমানযোগে কয়েকটি দেশ বেরিয়ে আসা হলেও, কখনো স্থলপথে কোথাও যাইনি। এমনকি অনেক সময় প্রতিবছরের নির্ধারিত কক্সবাজারে  পারিবারিক ছুটি কাটাতে যাওয়া বিমানযোগেই সেরে নিতাম, সময় বাঁচানো এবং পথের দুর্ভোগ এড়ানোর জন্য। কাজেই আমাদের নর্থ-ইস্ট ইন্ডিয়া ট্যুর স্থলপথে হচ্ছে জেনে বেশ একটা নতুন অ্যাডভেঞ্চারের আমেজ এলো মনে।


কুয়াশা কুয়াশা আবছায়া এক শীতের সকালে ঢাকা থেকে ভলভো বাসে চেপে পৌঁছে গেলাম সিলেট। একটা কথা বলে রাখি, বাংলাদেশের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বন্ধ এসি বাসগুলোর ট্যুর কন্ডাক্টর মহোদয়রা প্রতি ঘণ্টাখানেক পরপর বাসের গহ্বরে এয়ার ফ্রেশনার নামের যে বিকট সৌরভ স্প্রে করেন, সেই গন্ধ আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে খুবই উৎকট এবং বিবমিষা উদ্রেককারী ঠেকে সব সময়ই। এর চেয়ে ধুলোবালির ঝাপটা খেয়ে হজম করে হলেও, খোলা হাওয়ার জানালায় নরমাল বাসে ভ্রমণ আমি শতভাগ বেশি পছন্দ করি।

ভ্রমণপথে বোনাস হিসেবে একদিন, এক রাত সিলেট শহর দেখা হয়ে গেল আমার। কিন্তু লন্ডনি পাউন্ডের শহর হিসাবে সিলেটকে আমার কল্পনায় একটু বেশি ছিমছাম অট্টালিকাসমৃদ্ধ হিসেবে আঁকা ছিল। বাস্তবের কিছুটা এবড়োখেবড়ো রাস্তাঘাট আর বাংলাদেশের অন্যান্য মফস্বলী জেলা শহরের মতোই ঘিঞ্জি দোকানপাট, আমার সে কল্পনার ছবি রূঢ়তার ইরেজারে মুছে একটু ফিকে হয়ে গেল যেন।

একরাত সিলেটের হোটেলে থেকে পরদিন সকাল সকাল মাইক্রোবাসে রওনা হয়ে গেলাম আমরা তামাবিল-ডাউকি সীমান্তের চেকপোস্টের পথে। আমরা মানে আমি, আমার একমাত্র মেয়ে অদ্বিতীয়া আর তার বাবা হাসিব। সেবার অবশ্য হাসিবের এক জুনিয়র বন্ধু জহিরুল ইসলাম কচিও ছিলেন সঙ্গে। নয়নাভিরাম পথযাত্রার শেষে সীমান্তের একতলা কাস্টমস অফিসে পৌঁছালাম। বর্ডারঘেঁষা রাস্তার একপাশে একতলা দালান, আরেক পাশে টিনের তৈরি ছোট একঘরে পাসপোর্ট -ভিসা চেকিং অফিসারের কার্যালয়। আমাদের আগেই পাসপোর্ট- ভিসা চেকিংয়ের জন্য আর ছিল সেখানে এক নববিবাহিত সিলেট যুবক-যুবতী দম্পতি। দুজনেই শার্ট - প্যান্ট পরিহিত চমৎকার স্মার্ট-সুদর্শন-সুবেশী এবং উভয়েরই দারুণ ব্রিটিশ ইংলিশ এক্সেন্ট। অথচ বাংলা যখন বলা শুরু করলেন, একেবারে ‘খাস সিলেটি মাত’ মানে খাটি সিলেটি ভাষা। বেশ অভিনব লেগেছিল সেই চমৎকার বাংলা নাটকের  ‘লন্ডনী কইন্যা’ টাইপ আবহ।


আরো বিস্ময় লাগছিল মনে, সীমান্তের মাইলফলকে বাংলাদেশ ০ কিলোমিটার, ভারত ০ কিলোমিটার লেখা। দুটো দেশ যেন নিকটাত্মীয় হয়েও অতি পর সেখানে। স্বপনের দিকশূন্যপুরে যদি চলে যাওয়া যেত এ রকম এক শূন্যতার সীমান্তরেখা ছুঁয়ে, আহা! যদিও ইচ্ছে করলেই এই সীমান্ত ফাঁড়ির ০-০ সীমানা হেঁটে এপার-ওপার করলে খুব বেশি নিরাপত্তাজনিত বিপত্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে হচ্ছিল না আপাতদৃষ্টিতে, তবু প্রহরীর বন্দুকের ভয় তো থাকেই। হাজার হোক দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটি। তাই প্রতিবারই দেশের মাটি ছেড়ে ভীনদেশে যাওয়ার সময় যে চিনচিনে ব্যথা বুকের গহিনে বাজে, সেই ব্যথা সেবারও একটু অল্প হর্সপাওয়ারে বেজেছিল মনে মনে। আমরা চল্লাম ভারত পরিভ্রমণে, আর সীমান্তে একলা এক বট-পাকুড় বৃক্ষ ঠায় দাঁড়িয়ে রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পথ চেয়ে রইল, এমন আরো কতশত সীমানা পেরোনো গল্পকথার অপেক্ষায়।

ভারতে ঢুকেই আমার প্রথম যে কথা মনে হলো, ‘ইহা কেবলমাত্র কয়লা  ঘাটিয়া জীবন-জীবিকা নির্বাহের ময়লারঙা আবাস।’ আসলে ঘটনা হলো, মেঘালয়ের কয়লাখনি থেকে বিশাল বপুর কয়লাভর্তি ট্রাকগুলো সেখানে হয় সীমান্ত পারাপার বা ভারতের  অন্যত্র যাচ্ছিল বা যাওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। রাস্তাঘাট কয়লার গুঁড়ো পড়ে কালো, বাতাসের ঝাপটায় ওড়া কয়লাবরণ ধুলো, একেবারে কালোয় কালোয় একাকার কৃষ্ণের দেশ-জনপদ।

সীমানা পেরুনোর কয়েক কদম পরেই ভারতীয় সীমান্ত চেকপোস্ট। আহামরি নয়, তবে আমাদেরটার চেয়ে বেশি সাজানো-গোছানো। সব ফর্মালিটি  ঠিকঠাকভাবে শেষ হলো। তবে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী কর্মকর্তা হাসিবের সঙ্গে থাকা বেশ কিছু ইন্ডিয়ান রুপি সে কোথায় পেল তা জানতে চাইছিলেন। সেগুলো পাসপোর্টে এন্ডোর্স করা ছিল কি না, মনে করতে পারছি না। মতিঝিল থেকে ডলার ভাঙিয়ে অথবা বাংলাদেশি টাকার বিনিময়ে এগুলো সঙ্গে নিয়েছিল হাসিব। বাংলাদেশে  বৈধ প্রক্রিয়াতেই। কিন্তু কর্মকর্তা সতর্ক করে দিলেন, ভবিষ্যতে যেন এ রকম ভুল না করে। বাইরের দেশ থেকে এত বেশি ভারতীয় রুপি বহনের নাকি নিয়ম নেই। এ ছাড়া আর সব ঠিক ছিল।

এসব ঝামেলা চুকিয়ে আমরা বাইরে জিপ নিয়ে অপেক্ষারত আমাদের ইংরেজ গাইড জেমসের সঙ্গে রওনা হলাম মাওলিননং-এর পথে। পথের মাঝে রাস্তা থেকে অনেক নিচু এক চওড়া পাহাড়ি নদীর ব্রিজে থেমে ছবি তোলা হলো কিছুক্ষণের জন্য। অপরূপা সে স্রোতস্বিনীর প্রগাঢ় সবুজাভ জলরাশি, ভাসমান ডিঙিনৌকার সারি যেন তার কণ্ঠে সাতনরী হারের সজ্জাবিলাস। একেবারে মুগ্ধকর প্রশান্তি ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেল চোখের পাতায় মনের বিজন ঘরে।

আমাদের ট্যুর গাইড জেমস দক্ষ হাতে জিপ চালাতে চালাতে টুকটাক নিজের গল্প বলছিল। বছর চল্লিশের উদ্যমী ইংরেজ মানুষ সে। ইংল্যান্ড থেকে ভারত পরিভ্রমণ করতে এসে এক ধনাঢ্য খাসিয়া সুন্দরীর প্রেমে পড়ে বিয়ে -থা করে মেঘালয়েই থেকে গেছে একেবারে। শিলং শহরে বাস। দুটো ফুটফুটে কন্যাসন্তান তার। আমার মেয়ের কাছাকাছি বয়সী। মাওলিননং গ্রামের সুপরিকল্পিত অনেক স্থাপনার ডিজাইনার এবং সুব্যবস্থার নির্দেশক সে নিজে।… এ রকম নানা গল্পে গল্পে সারা পথ পাড়ি দেওয়া হলো।


বহুদূর পাহাড়ি এলাকার রাস্তা জিপে পাড়ি দেওয়ার পর পৌঁছালাম খাসিয়াদের গ্রাম মাউওলিননং-এ।  গ্রামটির প্রবেশপথে নানা রঙের পাহাড়ি অর্কিড আর বুনো গাছপালায় সাজানো স্বাগত একটুকরো লম্বা মতো বাগান আর ওয়েলকাম সাইনবোর্ড। তার সামনে শান বাঁধানো অনেকখানি প্রশস্ত জায়গা গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য। সবকিছু তকতকে পরিষ্কার। পাহাড়ি এলাকার সঙ্গে ঝকঝকে শব্দটা মনে হয় যায় না ঠিক। ওটা শহুরে বুটপালিশ মেট্রোপলিটনেই মানায় ভালো। সুন্দর স্বাস্থ্যবান চেহারার খাসিয়া বাচ্চারা ভিড় করে এলো আমাদের দেখার জন্য। ছবি তোলা হলো তাদের সঙ্গে হাসিমুখে, তাতে ওদের উৎফুল্লতা আরো বেড়ে চোখেমুখে সজীব দ্যুতি খেলে গেল।

খাসিয়া গ্রামপ্রধান এবং ওনার দুয়েকজন সহকর্মী স্বাগত জানিয়ে পাহাড়ি অর্কিড গুচ্ছ দিয়ে বরণ করে নিলেন আমাদের তাঁদের গ্রামে। যতক্ষণ সেই গ্রামে ছিলাম, নিজেকে ভাড়া দেওয়া বাণিজ্যিক  ভ্রমণকারী নয়, বরং ওদের বড় চেনা অতিথি মনে হয়েছে গ্রামবাসী সবার গভীর আন্তরিকতার কারণে।

প্রথমেই বাক্সপেটরা নিয়ে যাওয়া হলো ছোট্ট গ্রামটির পেছন দিকে অবস্থিত বাঁশ-কাঠে বানানো দু-তিন কক্ষের অতিথিশালায়। গ্রামের মাঝ বরাবর ছিমছাম টিন-কাঠ-খড়-বাঁশে বানানো সুসজ্জিত বাগান করা বাড়িগুলোর সামনে দিয়ে চলে গেছে পথ। সবুজ ঘাসের বুকে সিমেন্ট স্ল্যাব ফেলা রাস্তা ধরে কিছুদূর গেলেই Sky view point. সম্পূর্ণ বাঁশের কাঠামোয় তৈরি ৮৫ ফুট উঁচু টাওয়ার কাম রেস্টরুম। ৮৫ ফুটের মাঝ বরাবর বাঁশের প্ল্যাটফর্মে বসার বেঞ্চ। সবকিছু বাঁশের তৈরি। প্ল্যাটফর্মটি উঁচু মোটা গাছের মগডাল কেটে ভিত বানিয়ে বাঁশ দিয়ে মজবুতভাবে বানানো, নড়বড়ে নয়। ওপরে ওঠার বাঁশের সিঁড়িও শক্তপোক্ত। মাঝের প্ল্যাটফর্ম থেকে আবার বাঁশের সিঁড়ি উঠে গেছে স্কাই ভিউ পয়েন্টের সর্বোচ্চে বানানো বসার রেস্টরুম আর বারান্দায়। সেখান থেকে খালি চোখে দেখা যায় একপাশে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি-জলাশয়, আর অন্য পাশে খাসিয়া পাহাড়ের বিভঙ্গিত সারি। পায়ের নিচে মাউলিননং গ্রাম আর তার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাথুরে পাহাড়িয়া ঝোপঝাড়ে ঘেরা কলকল ঝোরা।

সেখান থেকে নেমে অতিথিশালায় এসে একটু দেরিতেই দুপুরের খাবার খাওয়া হলো শোবার ঘরসংলগ্ন ডাইনিং রুমে বসে। বনমোরগের ঝোল, পাহাড়ি সবজি, ডাল আর গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত। এ রকম পাহাড়িয়া পরিবেশে বসে এমন খাবারের সোয়াদ চিরজীবনের জন্য মনে গেঁথে যায় আপনাতেই। পাহাড়ের বুকে সন্ধ্যা নামে ঝপ করে। তাই দিনের আলো মিলিয়ে গেল হঠাৎ করেই পাহাড়ের ওপাশের নিঝুম অরণ্যের ঢালে। বুনো গন্ধ মাখা বনরাজির ক্যানভাসের মাথায় ফুটে উঠল জোছনা ধোয়া চাঁদের আলোর সম্মোহন।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও যেমন ধান ভানে, তেমনি হাসিব আর কচি তাদের স্থাপিত এনজিওবিষয়ক আলোচনায় মগ্ন। মেয়ে আমার ছায়াসঙ্গী হলেও বরাবরই শান্ত, সেও নিশ্চুপ। কিন্তু এমন স্বপ্নের মতো মায়াবী রাতে প্রকৃতির রূপমাধুরী আকণ্ঠ পান করে আমি কী করি। রবীন্দ্র-নজরুল-আধুনিক-পল্লীগীতির সুরেলা রিমিক্সে আপন খেয়ালে গান গেয়ে নিজের সঙ্গ নিজেই উপভোগ করতে লাগলাম। গলাখানি আমার একেবারে বেসুরো নহে, ছাত্রজীবনে প্রচুর আবৃত্তি-উপস্থাপনা-বিতর্কের পুরস্কার পেয়েছিলাম এককালে। যাই হোক, কখনো গাইছি, কখনো আনমনে চেয়ে দেখছি চন্দ্রালোকিত চরাচর। এ রকম মাহেন্দ্রক্ষণে হাওয়ার পাখনায় ভর করে ভেসে এলো পাহাড়ি মাদলের দ্রিমিদ্রিমি কাঁপন তোলা ছন্দ।

‘মোর গাঁয়ের সীমানায় পাহাড়ের ওপারে,

 নিষিদ্ধ রাত্রির প্রতিধ্বনি শুনি।

কান পেতে শুনি আমি, শুনিতে না পারি,

চোখ মেলে দেখি আমি, দেখিতে না পারি।’

ভূপেন হাজারিকার এই চিরনতুন গান কোনো যন্ত্রে নয়, মনের ডিজিটাল পিসিতে আপনিই অনুরণন তুলল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কেমন সে বাঁধভাঙা ছায়াঘন রাত্রির নৃত্যপরা উল্লাস? জানা হয়নি আজও, হয়তো অজানাই থেকে যাবে এ জীবনে। তবু পাহাড়ি রাত্রির নিঝুম তন্ময়তা আনকোরা কবিতার না লেখা পঙক্তির ছন্দমালায় মগ্নপ্রায় বিহ্বল করে দিল শহুরে খাঁচার নিগড়ে আটকে পড়া আমার যাযাবর নোমাডিক মনোজগতের আঙিনা।

মেঘের আড়ালে চাঁদ ঢেকে গিয়ে রাতের আঁধার আরো ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে এলে নেমে এলাম তন্দ্রালু অতিথিনিবাসে। গাঁয়ের পেছন দিকে একতলা দু-তিনটি শোবার ঘর, ডাইনিং আর সামনে টানা বারান্দা, সবই বাঁশ-কাঠে তৈরি, তা বলাই বাহুল্য। বারান্দার শেষ মাথায় গোসলখানা। সামনের উঠান পেরিয়ে ফাঁকা জায়গায় ওয়াশরুম। অচেনা এই পরিবেশে ক্লান্তির আবেশে চোখে ঘুম নেমে এলো এখানকার রাত্রির মতোই দ্রুতপায়ে।

পাহাড়িরা ঘুম থেকে জাগে সূর্যোদয়ের লগ্নে। তুলনায় আমরা উঠতে একটু বেলাই করে ফেললাম। কয়েকজন খাসিয়া পুরুষ আমরা জাগার আগেই কাঠের আগুন জ্বেলে আমাদের স্নানের গরম জল তৈরি রেখেছে। বাঁশে বোনা স্নানঘরে তোলা জলে স্নানশেষে প্রাতঃরাশ। আমি বরাবরের অভ্যাসবশত স্নানশেষে হালকা প্রসাধনী আর আমার প্রিয় সুগন্ধি ‘Estee Lauder beautiful’ মেখে রেডি হলে কচি বলল, ‘যাবেন তো জঙ্গলে ঘুরতে, তাও এত সাজগোজ, ভাবী?’

আমি স্মিত হেসে বললাম, ‘কোথায় যাচ্ছি, কে দেখল ব্যাপার না, ভাই। আসল কথা হলো, এটা আমার জীবনের আরেকটা সুন্দর সকাল।’...এই সাজগোজের পেছনে সময় নষ্ট করেই তাবৎ বাঙালি নারীকূলের কোনো উন্নতি হলো না ইহজগতে, বলে কচি আক্ষেপ প্রকাশ করল, সঙ্গে আমাকে ফ্রেশ লাগছে বলে প্রশংসাও।


আগের দিন অত খেয়াল করিনি, সেদিন সকালে দেখি, পাহাড়িয়া অতিথিনিবাসের আঙিনায় ওরা মরা কাঠের গুঁড়ির ওপর বিভিন্ন প্রজাতির বুনো মাশরুম আর অর্কিড দিয়ে আঙিনায় সুসজ্জিত করে রেখেছে। সেখান থেকে একটু হাঁটাপথ পেরিয়ে আমরা নেমে গেলাম গাঁয়ের পাশের পাথুরে শরীরের পাহাড়ি ঝোরার বুকে। শীতকাল বলে তাতে পানি প্রায় নেই বললেই চলে। এক গাঁও বুড়ো সেখানে একলা বসে বাঁশের ঝাড় নুইয়ে কঞ্চি কাটছে, আর পাতার বিড়ি ফুঁকছে বিপুল উদাসীনতায় ও গভীর মনোযোগে। আমি টুকটাক গল্প সেরে ফেললাম তার সঙ্গে তার কাজের ফাঁকে।

ঝোরা থেকে ফেরার পথে গাঁয়ের স্কুলগামী বালক-বালিকাদের সঙ্গে দেখা। এ গ্রামে সাক্ষরতার হার শতভাগ। স্কুলের পাশেই চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর এক গির্জা। আমার এর আগে কখনো কোনো গির্জায় প্রবেশের সুযোগ হয়নি। শুধু মুভিতে দেখা। নিজে মুসলিম হওয়ায়, আর শৈশবের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশে হিন্দু বন্ধুদের সৌজন্যে মন্দির আর জাপান ভ্রমণের সুবাদে বেশ কিছু বিখ্যাত প্যাগোডা দেখা থাকলেও গির্জায় অনুপ্রবেশ জীবনে এই প্রথম। ঢংঢং গির্জার ঘণ্টাধ্বনিতে শুরু হলো পাশের স্কুলের প্রথম ক্লাস।

এরপর আজ অবধি আমি অনেক গির্জাই দেখেছি স্বচক্ষে, কিন্তু সেই গহিন পাহাড়ি ছবির মতো সাজানো গাঁয়ের খোলা প্রান্তরে নিরিবিলি সেই গির্জার ছায়াছায়া মাঠ আর গম্ভীর ঘণ্ঠাধ্বনির রেশ মনে রয়ে গেল কোনো এক হারানো সুখস্মৃতির লুকোচুরি খেলা আবছায়া ছবির মতো।

মাতা মেরির কোলে অপাপবিদ্ধ শিশু যিশুর চেহারা, ক্রুশবিদ্ধ যিশুর বেদনার্ত অথচ প্রশান্ত মুখচ্ছবি, লাস্ট সাপারের ছবি, যাজকের ডায়াস, কনফেশন বা  পাপ স্বীকারোক্তির কাঠের পার্টিশন ঘেরা গোপনীয়তা, সারি সারি খালি পড়ে থাকা বসার বেঞ্চ, বিশাল ঘণ্টা, কাচের ওপর আঁকা রংবেরঙ এচিং, বাইরের দেয়ালের গম্ভীর সাদাকালো কন্ট্রাস্ট-সব মিলিয়ে বড় পবিত্র নির্মল এক অনুভবের সকাল।

এরপর যাওয়া হলো মাউলিননং গ্রামসংলগ্ন জংলা বনের কখনো খরস্রোত, কখনো কুলকুল বয়ে চলা নদীর ওপর দুই পাশের রাবার বৃক্ষের শেকড় জোড়া দিয়ে দিয়ে তৈরি মজবুত ব্রিজ, এখানকার বিশেষ প্রাকৃতিক আকর্ষণ… Living Root Bridge বা জীবন্ত শেকড় ব্রিজ দেখতে। এ বনের ছায়াঘন ভেজা মাটির আর্দ্র আবহাওয়া রাবার চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। আর, বহুকাল আগে এখানকার খাসিয়া পূর্ব-পুরুষদের সিমেন্টের ব্যবহার সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায়, তারা নিজেদের ব্যবহারিক বুদ্ধি খাটিয়ে নদীর দুই পাড়ে রাবারগাছ লাগিয়ে, তাদের বাড়ন্ত শেকড় মজবুত বুননে গেঁথে গেঁথে এই জীবন্ত ব্রিজ উদ্ভাবন করেছে পদব্রজে নদী পারাপারের সুবিধা লাভের জন্য। তবে সে নদী যে খুব প্রশস্ত, তা নয়। পাহাড়ি নদীগুলো অনেক সময়ই সরু কিন্তু খরস্রোতা হয়ে থাকে। লিভিং রুট ব্রিজের খাঁজে খাঁজে আর আশপাশের বৃক্ষলতায় আদ্যিকালের শ্যাওলা আর নরম মসের গায়ে  সৌরালোকের আলো-আঁধারি, গাছের পাতার আড়ালে লুকোনো অচিন পাখিদের সুমধুর কূজন, বন থেকে চটের বস্তাভর্তি তেজপাতা কুড়িয়ে এনে পাহাড়ি মেয়েদের ঘরে ফেরা-সে আমার রোজকার রুটিন বাঁধা জীবনের অভিজ্ঞতায় যোগ করল বুনো ঘ্রাণে মাতাল এক রৌদ্রকর দিনের ইতিকথা।

সেখান থেকে জেমস জিপে করে আমাদের নিয়ে গেল ‘ডেভিলস ফলস’ বা শয়তানের জলপ্রপাত নামের অনেকগুলো পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া কয়েকটি জলপ্রপাতের সমষ্টি দেখতে। সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাতটি দেখলে মনে হয় যেন আকাশের মেঘ ফুঁড়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। আর শয়তান ই হোক বা দেবতা, তাদের বাসস্থান তো মেঘের কাছাকাছি বলেই ছবি আঁকা থাকে আমাদের কল্পনায়। তবু যেন মন মানতে চাইছিল না, কেন তিন দিক পাহাড় বেষ্টিত এ রকম নির্জন নিস্তব্ধ প্রকৃতির কোলজুড়ে থাকা বিপুল জলরাশির স্বর্গীয় পতন দৃশ্যের নাম অলুক্ষণে শয়তানের নামানুসারে হলো? ....জবাবও মিলে গেল এ প্রশ্নের। স্থানীয়ভাবে কথিত আছে, এক বিধবা মায়ের কষ্টলালিত একমাত্র ছেলেসন্তান কোনো এক গভীর মনোবেদনায় পাহাড় থেকে এই জলরাশির পতনের সঙ্গে লাফ দিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছিল, তাই এমন নামকরণ। 

গাঁয়ে ফিরতে ফিরতে বিকেল। অল্প বিশ্রাম শেষে গাইডের সঙ্গে গ্রামবাসীদের ঘর-গেরস্থালি দেখতে বেরোলাম। ছিমছাম ফুলের বাগান আর থোকায় থোকায় কাঁচা-পাকা কমলালেবু ঝুলে থাকা পরিচ্ছন্ন বসতবাটির কয়েকটি ঘুরে দেখে, আমি বসে গেলাম এক গৃহকর্তার রন্ধনকার্য দেখতে। খাসিয়া সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। এখানে মায়ের বড় মেয়ে তার সম্পত্তি ও পদবির

উত্তরাধিকারী হয়। তাই সমাজে পুরুষদের অবস্থান একটু নাজুক।

আর/১৫:৪৪/১৩ জুলাই

পর্যটন

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে