Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.6/5 (9 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-১২-২০১৬

আমি মনে হয় আউটসাইডার : আল মাহমুদ

আমি মনে হয় আউটসাইডার : আল মাহমুদ

কবি আল মাহমুদের ৮১তম জন্মদিন আজ। তিনি ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যর অন্যতম কবি। তিনি গল্প-উপন্যাস-ছড়া লিখেও সাফল্যের শীর্ষ ছুঁয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো; গ্রল্পগ্রন্থ: পানকৌড়ির রক্ত, গন্ধ বণিক, সৌরভের কাছে পরাজিত; উপন্যাস : উপমহাদেশ, কাবিলের বোন এবং ছড়াগ্রন্থ: পাখির কাছে ফুলের কাছে। তিনি বাংলা একাডেমী, একুশে পদক-সহ পেয়েছেন দেশ-বিদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কবি ও নির্মাতা শ্যামল চন্দ্র নাথ।

শ্যামল : বাংলা কবিতায় আপনি এক বিস্ময়। এই বিস্ময় নির্মাণে আপনি অনেক সংগ্রাম করেছেন। আপনার সংগ্রামের দিনগুলো সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।

আল মাহমুদ : জীবনের সাথে অনেক লড়াই করেছি। আমরা কবিতাকে আধুনিক কারার জন্য অনেক সংগ্রাম করেছি। কিন্তু ভাষার আধুনিকতা কাব্যে প্রকাশ পায় না, পায় গদ্যে। কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কয়েকজন কবির কবিতাই আধুনিকতার প্রবর্তন করলেন সে জন্য একটা ঘটনা ঘটলো সাহিত্য। সেটা ঘটে গেল যে, কবিতাই হল আমাদের আধুনিক সাহিত্য। আধুনিক সাহিত্য বলতে সাধারণত গদ্য শিল্পকেই বোঝানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশে যেহেতু শীর্ষ কয়েকজন কবি ওই সময়ে লিখেছেন, যেমন- শামসুর রাহমান, আমি ও শহীদ কাদরী। 

শ্যামল : আপনি কিছুক্ষণ আগে শহীদ কাদরী ও শামসুর রাহমানের কথা বললেন। আপনারা এক সময় ঢাকা শহর দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। বিউটি বোডিংয়ে আপনি এদের সাথে আড্ডা দিতেন। ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করবেন কি?

আল মাহমুদ : ওখানে তো তখন সবাই যেত। শুধু যে কবিতার লোকেরা যেত তা না। সিনেমা যারা বানাতো তাঁরাও যেত। ওই সময়ে জহির রায়হানও ওখানে আড্ডা দিত। কম যেত, তবে তাঁরা যেত। এখন তো সেই সময় আর ফিরে আসবে না।

শ্যামল : আপনারা তো অনেক ঘুরে বেড়িয়েছেন, আড্ডা দিয়েছেন। ঘুরে বেড়ানো কিংবা আড্ডা দেওয়া একজন লেখক কিংবা কবির জন্য কতটা সহায়ক বলে আপনি মনে করেন?

আল মাহমুদ : সাধারণত কবিতা যারা লেখে তাঁরা নিভৃতচারী হয়। নীরবতা খোঁজে; কিন্তু সর্বক্ষণ তো মানুষ নীরব থাকতে পারে না। মানুষের আড্ডারও দরকার হয়। এর ফলে মানুষ সতেজ থাকে। মানুষের যে প্রতিভা যে প্রবণতা তার সবটাই উৎসাহ পায় তখন।

শ্যামল : কবিতার প্রতি ভাবনা, আখাঙ্ক্ষা আপনার শৈশব থেকেই কাজ করেছে। আমি জানতে চাই আপনি যদি কবি না হতেন তাহলে আপনি কি হতেন? 

আল মাহমুদ : আমি যদি কবি না হতাম তাহলে- এটা আমার আন্দাজ আর কি- আমি নিশ্চয়ই সংগীতজ্ঞ হতাম। আমি যেখানে মানে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেছি- আর ওই জায়গায় ছিল উপমহাদেশের অন্যতম সংগীতের তীর্থভূমি। যত ধরনের সংগীতযন্ত্র ছিল যেমন- সরদ, সেতার, বেহেলা এর সব কিছুই ওখানে তৈরি হত। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম একটা ঘরে সংগীতের যন্ত্র তৈরি হচ্ছে।

শ্যামল : আপনি আপনার লেখায় সবসময় জীবন, মানুষ এবং স্বদেশের কথা বলেছেন। আপনার সৃষ্ট সাহিত্যকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ কিংবা মূল্যায়ন করবেন?

আল মাহমুদ : তা তো অবশ্যই। যারা শিল্প-সাহিত্য করেন বাংলা ভাষায় তাদের প্রায় সবাইকে আমার রচনা আকৃষ্ট করেছে। তারা ব্যাপকভাবে আমাকে পড়েছিলেন। এটা আমার মনে হয় এবং সেই সময় আমার কিছু লেখা আমার অজান্তেই অনুবাদ করেছিলেন। এটা আমাকে বিস্মিত করেছিল। খুব বেশি না, তবে অনেক লেখাই তখন অনুবাদ হতে শুরু করে। এটা আমার জন্য অনেক বড় গৌরবের বিষয় ছিল। কারণ, আমার কিছু লেখা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে এটা আমার জন্য খুবই আনন্দের ছিল।

শ্যামল : আপনি এখনো তো প্রেমের কবিতা লিখছেন। এই বয়সেও আপনি প্রেম অনুভব করে যাচ্ছেন। প্রথম কখন প্রেমে পড়েন?

আল মাহমুদ : শ্যামল, তুমি যেটা জানতে চাও সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। সব মানুষের মধ্যে যেটা জাগে আমার মধ্যেও সেটা জেগেছে, এসেছে। এবং আমি কাউকে ভালোবেসেছি সেটা ঘটে গিয়েছিল ও সেটা আমার মধ্যেও ছিল।

শ্যামল : আমি আপনার স্ত্রী সম্পর্কে জানতে চাই যিনি আপনার অগোছালো জীবনকে দারুণভাবে বেঁধে রেখেছিলেন। তাঁর কথা কিছু কি বলবেন?

আল মাহমুদ : সত্যি কথা বলতে কি, আমার স্ত্রী ছিল আমার জীবনে আল্লাহর একটা করুণা বিশেষ। সে অবশ্য বেশি দিন বাঁচেনি। সামান্য কিছুদিন বেঁচেছিল। আমি তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতাম। আমার সর্ব ব্যাপারে তার একটা কর্তৃত্ব করার অধিকার বর্তে গিয়েছিল। সেটা আমি দেইনি, সেই এটা আদায় করে নিয়েছিল। এটা কম কথা নয়। আমার মতো একজন কবি-সাহিত্যিকের জন্য এটা কত বড় কথা তা বলে বোঝাতে পারবো না। এরপর সে যখন মরে গেল আমি নিঃসঙ্গ হয়ে গেলাম। এখনো আমি নিঃসঙ্গ জীবনে আছি।

শ্যামল : আপনি উপন্যাসও লিখেছেন। আপনার কি নিজের আত্মজীবনী লেখার কোনো পরিকল্পনা আছে?

আল মাহমুদ : যদিও বিচ্ছিন্নভাবে আমি আত্মজীবনী লিখেছি। ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ কিংবা ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’ এগুলো আমি লিখেছি। কিন্তু একটা অখণ্ড আত্মজীবনী লেখার পরিকল্পনা আমার আছে। সেটা এখনো আমি শুরু করতে পারিনি।

শ্যামল : আপনি উপন্যাসে আঙ্গিক ও ভাষার কথা বললেন। আমি জানতে চাই বর্ণনা এবং বক্তব্যের যে সম্মিলন করা হয় এটা কতটা জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

আল মাহমুদ : উপন্যাস সৃষ্টি করতে হলে- আমি যেটা বলতে চাই- সেটা হয়তো অনেকেই মানবেন না। আমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করি লেখায় মানুষের সৃজন ক্ষমতাকে। এই জন্য একটা আঙ্গিক দরকার হয়। আমার উপন্যাসে আমি যে আঙ্গিক ব্যবহার করেছি সেটা আধুনিকতম আঙ্গিক বলে আমি মনে করি। যেই আধুনিক কৌশল আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল সেই সময়ে আমি তাই ব্যবহার করেছি।

আমি যদি চোখে ভালো দেখতে পেতাম! যদি নিজ হাতে লিখতে পারতাম! সেটা তো এখন সম্ভব নয়। মানুষের ইন্দ্রিয় স্বল্পকালীন। কিছুদিন কাজ করে এরপর আর করে না। আমি সারা পৃথিবী ঘুরেছি আমার চোখদুটো বাঁচাবার জন্য। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমি সেটা পারিনি

শ্যামল : আপনি একবার বলেছিলেন- ‘কবি হতে গেলে সারা জীবন উৎসর্গ করতে হয়’।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ, একটা জীবন দিতে হয়। এটা কোনো পার্ট-টাইম জব নয়। একটা পুরো জীবন দিয়ে দিতে হয়। ফিরতে পারে না সে।

শ্যামল : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটা কথা বলেছিলেন, ওই যে প্রথম একটা লেখা মাথার ভিতর ঢুকে গেছে, এখন যতই চেষ্টা করি ওই পথ থেকে বের হয়ে আসবো তা আর হয়ে ওঠে না।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ, সে তো আমার বন্ধু। আমার ধারণা, যদি মাথার ভিতর একটা উদ্দীপনা বা প্রেরণা উত্থাপিত হয়ে যায়- যতক্ষণ না পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে তা মাথা থেকে না নামানো যায় ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্তি নাই। It will brun you. এটা তোমাকে পোড়াবে; তোমাকে জ্বালাবে, তোমাকে ক্ষতবিক্ষত করবে। যখন তুমি কলম নিয়ে বসবে সেটা গল্প হোক, কবিতা হোক কিংবা উপন্যাস হোক যখন তুমি লিখে ফেলবে তখন তুমি একটি সিগারেট জ্বালিয়ে নিঃশব্দে নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে।

শ্যামল : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আপনার বন্ধু ছিলেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পর্কে আপনার কিছু বলার আছে?

আল মাহমুদ : সুনীল বাবু আমাকে অনেক পছন্দ করতেন। আমাদের মধ্যে একটা সু-সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তার মৃত্যুতে আমি অত্যন্ত দুঃখবোধ করেছি। তার স্ত্রীর কথা আমার মনে পড়ে। তিনি খুবই ভালো মহিলা। এরা আমাকে যেখানেই দেখেছে ঢাকা বা কোলকাতায়- এরা বলেছে, এরা আমাকে সব সময় মিস করে।

শ্যামল : আপনি বললেন যে, একটি লেখা শেষ করতে না পারলে তা আপনার ভিতর একটা জ্বালার সৃষ্টি করে বা আপনাকে ক্ষতবিক্ষত করে। আপনার উত্তরসুরী যারা লিখছেন তাদের সম্পর্কে আপনার কিছু বলার আছে?

আল মাহমুদ : তাদের ভিতর অনেক প্রতিভাবান লেখক রয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু তাদের মধ্যে এমন কারো কথা কি বলা যায় যে, যাদের একটি লেখা তোমার অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছে?

শ্যামল : আপনার গল্পের বই ‘গন্ধবণিক’ সম্পর্কে জানতে চাই। যে বইটি আপনি অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানকে উৎসর্গ করেছেন। ওই গল্পের শুরু এই ভাবে- ‘ট্রেন থেকে নেমেই মনে হল এটা কি আমাদের ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া? চিরপরিচিত স্টেশনটাকেও আমার কেনো জানি বড়ই অন্ধকারাচ্ছন্ন, অচেনা মনে হচ্ছে। অথচ কতই না চেনা এই রেলস্টেশন।’ জীবনকে কখনো অচেনা কিংবা অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হয়েছে আপনার কাছে?

আল মাহমুদ : আমার জীবনকে কখনো অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হয়নি। তবে আমার মনে হয়েছে- আমি মনে হয় আউটসাইডার। কোথাও থেকে এসে পড়েছি।

শ্যামল : আউটসাইডার নামে আলবেয়র কামুর একটা বিখ্যাত উপন্যাসও রয়েছে এই সম্পর্কে আপনি কি কিছু বলবেন?

আল মাহমুদ : আসলে তত্ত্বটা তো তাঁরই। বাহির থেকে আসা একজন পরিব্রাজক। এটা বলার ফুসরত তো এখন আর আমার নাই। তবে এই উপন্যাস বুঝতে হলে তোমাকে অবশ্যই অস্তিত্ত্ববাদ সম্পর্কে পড়াশুনা করতে হবে। এটা তো দর্শন। আমি তো কবি মানুষ। আমি তো দার্শনিক না।

শ্যামল : আপনি তো এখন ‘ডিটেকশন’ দিয়ে লেখেন। এতে কোনো অতৃপ্তি রয়েছে কি? বা আপনার মনে হয় না যে, যদি আমি নিজ হাত দিয়ে লিখতে পারতাম!

আল মাহমুদ : আমার খুব মনে হয়। আমি যদি চোখে ভালো দেখতে পেতাম! যদি নিজ হাতে লিখতে পারতাম! সেটা তো এখন সম্ভব নয়। মানুষের ইন্দ্রিয় স্বল্পকালীন। কিছুদিন কাজ করে এরপর আর করে না। আমি সারা পৃথিবী ঘুরেছি আমার চোখদুটো বাঁচাবার জন্য। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমি সেটা পারিনি। তবে আমাকে বলা হয়েছে আপনি পুরো অন্ধ হয়ে যাবেন না। তবে দেখতে পাবেন। এই যে, তোমাকে আমি ঝাপসা মতন দেখছি আর কি।আত্মবিশ্বাস তো তৈরি হয়েছিল দেখা ও লেখার মাধ্যমে এবং ভ্রমণের মাধ্যমে। আমি তো সারা দুনিয়া ভ্রমণ করেছি। ফুটপাত ধরে কত হেঁটেছি। কখনো রোদ কখনো বৃষ্টি; আমি তো দাঁড়াইনি। আমি যা দেখেছি তাই লিখেছি।

শ্যামল : আপনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো উপন্যাস লেখার কোনো চিন্তা-ভাবনা আপনার আছে কি?

আল মাহমুদ : দেখো, আমার অনেক বইয়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গটি নিয়ে আমি লিখে ফেলেছি। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলাদা কোনো বই লেখার চিন্তা আমি এখনো করিনি। যদি পাঠকদের দাবি হয় তাহলে আমি এটা চিন্তা করে দেখবো।

শ্যামল : আপনি যখন মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ছিলেন তখন আপনি একবার নকশালদের তোপের মুখে পড়েছিলেন। এই বিষয়ে কিছু বলবেন কি?

আল মাহমুদ : নকশাল আর মিলিটারিরা আমার বিরুদ্ধে একটা প্রপাগাণ্ডা চালালো। বাংলাদেশের দেশান্তরী কবিরা ভিআইপিদের মতো পোশাক পরে কফি হাউজে আড্ডা দেয়। কফি হাউজ হলো এলবার্ট হল। ওখানে কাজী নজরুল ইসলামকে সংর্বধনা দেওয়া হয়েছিল। ওই সভায় সুভাষচন্দ্র বসু উপস্থিত ছিলেন। আমি কলকাতায় যেটা করেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় সেটা হল মোটিভেশনের কাজ। কারণ, নকশালরা জঘন্নভাবে আজেবাজে বলে বেড়াচ্ছিল। আমার শার্ট নিয়ে কথা বলা শরু করে দিল। সত্যি কথা এই যে, আমি ঢাকা থেকে গিয়েছিলাম একটি মাত্র শার্ট পরে। আমি যখন এটা বললাম তখন এটা পত্রিকায় চলে এল। আমি যখন ওই শার্টটি ধুয়ে দিই তখন আমাকে সারাক্ষণ ওই শার্ট না শুকানো পর্যন্ত ঘরে বসে থাকতে হয়। এই হল আমার অবস্থা। তখন কিন্তু নকশাল-ফকশাল সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তখন কিছু লোক এসে বললেন, ওরা না বুঝে এটা করেছে আপনি ক্ষমা করবেন। আমরা বুঝতে পারিনি। তখন আর কি বলার থাকে!

শ্যামল : তরুণ যারা লিখছেন তাদের সম্পর্কে আপনার কিছু বলার আছে?

আল মাহমুদ : আগে তো আজিজ মার্কেটে যেতাম তরুণরা কে কি লিখছে পড়তাম। এখন তো আর যেতে পারি না। এখন তরুণদের সাথে আমার আর তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। তরুণদের লেখা- আমার ধারণা- তারা ভালো লিখছে। তবে আমি একটা জিনিশ বলবো যে, ব্যাপক পড়াশোনা করা দরকার। আমাদের দেশের কবিদের বিশ্ব সাহিত্য সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশোনা নাই। এটা ঠিক না। জানতে হবে কোথায় কে কি লিখছে। এটা জানতে হয় আমি যখন বাংলাদেশে একটা লেখা লিখছি তখন আমেরিকা বা ইউরোপে কে কি লিখছে।

শ্যামল : আপনি কাজী নজরুল ইসলামের কথা বলেছেন। স্বাধীনতার সময় কাজী নজরুলের গান কিংবা কবিতা গণমানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে। ওই সময়ে পৃথিবীতে আরো একজন কবি ছিলেন, কবি পাবলো নেরুদা, যিনি গণমানুষের কবি হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। এদের সম্পর্কে বলুন। এবং গণমানুষের কবিতে রূপান্তরিত হওয়ার উপায় কি?

আল মাহমুদ : এরা তো বিশ্বমানের লেখক। এত কোনো সন্দেহ নাই। কেউ তোমাকে উপদেশ দিয়ে কিছু করতে পারবে না। বই একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। তবে একটা জিনিশ করা উচিত যেটা আমাদের কবিরা করে না। সেটা হল- সফর। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াতে হয়। এতে একজন লেখকের জীবনে একটা তৃপ্তি আসে। লেখা যায়।

শ্যামল : ওয়াল্ট হুইটম্যান বলেছিলেন, ‘তিনিই মহান কবি, যিনি প্রতিটা শব্দে রক্ত ঝরাতে পারেন।’ আপনি এটাকে কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

আল মাহমুদ : আমার ঠিক জানা নেই। তবে তাঁর একটা বই আমি পড়েছিলাম। দ্যা গ্রিন গ্রাস মনে হয় বইটার নাম। এখন ঠিক মনে পড়ছে না।

শ্যামল : ১৮৩৫ সালে ইউরোপের মানবতাবাদী কবি গ্যাটে মারা যান। তো এই মানবতাবাদীর কবিতাকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

আল মাহমুদ : অনেক আগে আমি গ্যাটে পড়েছি। এরা তো বিশ্বখ্যাত কবি। ক্লাসিক্যাল কবি। তুমি এদের লেখা পড়লে বা জানলে ভালো, না জানলে তোমার ক্ষতি। এই যে গ্যাটে, তাঁকে আমার পড়তে হয়েছে, জানতে হয়েছে এটা তো অনেক বড় কথা। কারণ তিনি আমার মতো একজন একবিংশ শতাব্দীর একজন লেখককে তাঁর দিকে ধাবিত করেছেন। এটা কি কম কথা!

শ্যামল : আপনি আমাদের মানবতাবাদী কবি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বলেছিলেন যে, উনি অনেক বিষয় নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছিলেন। কবিতা গল্প কিংবা গানে তিনি তো শ্রেষ্ঠ। আপনি রবীন্দ্রনাথকে কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

আল মাহমুদ : তিনি নিঃসন্দেহে আমার প্রিয় লেখক। অনেক বিষয় আছে যেখানে তিনি প্রবেশ করতে পারেন নাই। সেটা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। ‘গিয়েছিলাম ওই প্রাঙ্গনের ধারে ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না আমার। এসো কবি অজ্ঞাত জনে, অজ্ঞাত মনে।’ তিনি ডাক দিয়েছিলেন যেখানে তিনি প্রবেশ করতে পারেন নাই। এতে তাঁর সিন্সিয়ারিটি বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথ অনেক বড় ব্যাপার। বিশ্বে কবিদের মধ্যে টেগর একটি নাম, গ্রেট পয়েট, দ্যা পয়েট যাকে বলে। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের ভীষণ ভক্ত ছিলাম। এখন তো আর পড়া হয় না। আর তাঁর গান তো অসাধারণ। যেমন- কেন যামিনী না যেতে জাগালে না, বেলা হল মরি লাজে। পাখি ডাকি বলে গেল বিভাবরি বধূ লইয়া গেল গাগরি আমিও শীথিল... কী অসাধারণ। এমন কি আর সৃষ্টি হয়!

আর/১২:১৪/১১ জুলাই

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে