Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৭-০৪-২০১৬

চার জঙ্গির পরিচয় মিলেছে

চার জঙ্গির পরিচয় মিলেছে

ঢাকা, ০৪ জুলাই- গুলশানের রেস্তোরাঁয় জিম্মি উদ্ধার অভিযানে নিহত সন্দেহভাজন হামলাকারীদের চারজনের পরিচয় জানা গেছে। এঁদের মধ্যে দুজন দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের পরিবার থানায় জিডিও করেছিল। একজনের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই পাঁচজনের ছবি প্রকাশ করে আইএস দাবি করেছে, এঁরাই হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন।

জিম্মি উদ্ধারে গত শনিবার ভোরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযানে নিহত হন ছয়জন। এঁদের সবাইকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল সেনাসদরের ব্রিফিংয়ে। অভিযানের সময় একজনকে আটক করার কথা বলা হলেও গতকাল রোববার পর্যন্ত তাঁর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

তবে ঢাকা মহানগর পুলিশ গতকাল জানিয়েছে, এই ছয়জনের একজন ওই রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের কর্মী ছিলেন। তাঁর নাম সাইফুল ইসলাম। তাঁর পরিবার বলছে, তিনি ঘটনার শিকার। সন্ত্রাসী হামলার পর সাইফুল তাঁর ভগ্নিপতিকে ফোন করে বলেছিলেন যে তাঁরা বন্দুকের মুখে জিম্মি অবস্থায় আছেন।

যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে তাঁরা হলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, স্কলাসটিকা থেকে ও লেভেল পাস করা মীর সামেহ মোবাশ্বের, মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিবরাস ইসলাম ও বগুড়ার একটি মাদ্রাসার ছাত্র খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। নিবরাস ইসলাম আগে ঢাকার টার্কিশ হোপ স্কুল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন।

পুলিশ বলছে, বগুড়ার খায়রুলই গুলশানে হামলার নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি এর আগে উত্তরবঙ্গে অন্তত তিনটি হত্যায় জড়িত ছিলেন।

এর আগে গত শনিবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নিহত পাঁচজনের লাশের ছবি গণমাধ্যমে পাঠিয়ে বলেছিল তাঁদের নাম আকাশ, বিকাশ, ডন, বাঁধন ও রিপন। কিন্তু বাস্তবে এঁদের কারও নাম মেলেনি। আর হামলাকারী জঙ্গি হিসেবে যে পাঁচটি লাশের ছবি পাঠানো হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ওই রেস্তোরাঁর কর্মী সাইফুলের ছবিও ছিল।অভিযানে নিহত রোহান ইবনে ইমতিয়াজের বাবা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা।

আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস নিহত পাঁচজনকে তাদের সদস্য বলে দাবি করলেও বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি গতকাল রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, এরা সবাই বাংলাদেশি, দেশে বেড়ে ওঠা। দেশের লোকজনের পরামর্শেই তারা কাজ করছে। বিদেশিদের সঙ্গে এদের যোগাযোগ আছে বলে মনে হয় না।

আওয়ামী লীগের একজন নেতার ছেলেও হামলায় জড়িত থাকা প্রসঙ্গে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এদের সবারই বাংলাদেশে একটা অবস্থান রয়েছে। সবারই বাংলাদেশে বাবা-মা আছে, তাঁরা (বাবা-মা) জঙ্গি না, এটা নিশ্চিত। এদেরকে বাবা-মা হয়তো খোঁজাখুঁজি করেছিলেন। তারা যে জঙ্গি সংগঠনে জড়িত হয়েছে, তাদের বাবা-মা জানতেন না, এখন জানলেন।’

সন্দেহভাজন যে হামলাকারীর পরিচয় গতকাল পর্যন্ত জানা যায়নি তাঁর সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টুইটারে বিভিন্ন তথ্য দেখা গেছে। ওই সব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এখন তাঁরা মনে করছেন, আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা ‘আমাক নিউজের’ বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স যে পাঁচজনের ছবি দিয়েছে, তাঁরাই মূলত হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। তাঁরা সবাই অভিযানে নিহত হন। এই পাঁচজনের মধ্যে বগুড়ার খায়রুলকে ছয়-সাত মাস ধরে পুলিশ খুঁজছিল। বাকিদের সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না তাদের।

রোহান: অভিযানে নিহত রোহান ইবনে ইমতিয়াজের বাবা এস এম ইমতিয়াজ খান ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের উপমহাসচিব ও সাইক্লিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। রোহানের মা শিক্ষিকা। দুই ভাইবোনের মধ্যে রোহান বড়। তিনি ঢাকার স্কলাসটিকা থেকে এ লেভেল শেষ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন।

গতকাল দুপুরে রোহানদের ঢাকার লালমাটিয়ার বাসায় গিয়ে তাঁর বাবা-মাকে পাওয়া যায়নি। রোহানের খালা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে রোহান নিখোঁজ ছিল। তার সন্ধান চেয়ে পুলিশ, র‍্যাব এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও গিয়েছি আমরা। কেউ তার সন্ধান দিতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু জানতে চাই, সরকার কেন আমাদের নিখোঁজ ছেলেকে বের করতে পারল না।’

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দীন মীর বলেন, রোহান নিখোঁজ হয়েছেন উল্লেখ করে গত ৪ জানুয়ারি থানায় জিডি করা হয়েছিল। জিডিতে বলা হয়, ৩০ ডিসেম্বর বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে রোহান আর বাসায় ফেরেনি। পরে তদন্তে দেখা যায়, রোহান জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন। এরপর তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলে, যাতে দেশের বাইরে না যেতে পারেন, সে জন্য বিমানবন্দরেও জানানো হয়েছিল।

প্রতিবেশীরা জানান, গত বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে রেডিও প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন রোহানের বাবা ইমতিয়াজ। নির্বাচন উপলক্ষে তখন স্থানীয় সাংসদ জাহাঙ্গীর কবির নানক ভোটারদের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি ইমতিয়াজকে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন। ইমতিয়াজ খানের নির্বাচনী প্রচারপত্রের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক, মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এখন তিনি বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের উপমহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মোবাশ্বের: গত ২৯ ফেব্রুয়ারি কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে মীর সামেহ মোবাশ্বের বনানীর ডিওএইচএসের বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। গতকাল ওই বাসায় তাঁর বাবা মীর এ হায়াৎ কবিরের সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি বলেন, সামেহ স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে ও লেভেল পাস করেছে। এ লেভেল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যেদিন সামেহ নিখোঁজ হয়, সেদিন তার গুলশানের আজাদ মসজিদের পাশের একটি কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কথা ছিল।

বাবা মীর এ হায়াৎ কবির একটি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে চাকরি করেন। মা একটি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক।

হায়াৎ কবির বলেন, ‘মোবাশ্বের বোধ-বুদ্ধিতে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। আমার মন বলছিল ও কারও খপ্পরে পড়েছে। আমরা সচেতন অভিভাবক ছিলাম। তারপরও আমার সুরক্ষিত বাড়ি থেকে বাচ্চাকে কেড়ে নিল। ওরা কত শক্তিশালী যে কেউ ধরতে পারছে না? আজ আমারটা নিয়েছে, কাল আর কারও কপাল আমার মতো হবে। এটা তো একটা জাতীয় দুর্যোগ।’ তিনি বলেন, ‘মোবাশ্বের নিখোঁজ হওয়ার পরে সেখানকার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, গুলশানের আগোরার পাশে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে সে একটি রিকশায় করে বনানী ১১ নম্বরের দিকে যাচ্ছে। এরপর মুঠোফোনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে সে পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।’

হায়াৎ কবির বলেন, পত্রপত্রিকায় যে ছবি ছাপা হয়েছে, তার সঙ্গে ছেলের চেহারা মেলে। নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথমেই তিনি গুলশান থানায় জিডি করেন। এরপর ডিবি, র‍্যাব ও অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সংস্থাগুলো তাঁকে জানিয়েছে, যেদিন মোবাশ্বের নিখোঁজ হয়েছেন তার দু-এক দিনের মধ্যে গুলশান-বনানী এলাকা থেকে আরও চার-পাঁচটি ছেলে নিখোঁজ হয়। মোবাশ্বেরের কম্পিউটারে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর কিছু যোগাযোগের তথ্য-প্রমাণ পায় তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সংস্থাই তাঁকে খুঁজে বের করতে পারেনি। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, তাঁদের ধারণা ছিল, মোবাশ্বের দেশের বাইরে কোথাও চলে গেছেন। যদিও তাঁর পাসপোর্ট বাসাতেই ছিল।

নিবরাস: মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসের ছাত্র ছিলেন নিবরাস ইসলাম। ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নিবরাস বড়। বাসা ঢাকার উত্তরায়। তাঁর নিকটাত্মীয়রা সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে চাকরি করেন। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, নিবরাস যে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন, তা-ই জানত না পরিবার।

খায়রুল: পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ছয়-সাত মাস ধরে উত্তরবঙ্গের অন্তত তিনটি হত্যাকাণ্ডে খায়রুল ইসলামের নাম এসেছে। তাঁকে তখন থেকেই খোঁজা হচ্ছিল। খায়রুল যে গুলশানে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে পুলিশ মোটামুটি নিশ্চিত।

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার চুতিনগর ইউনিয়নের ব্রিকুষ্টিয়া গ্রামের দিনমজুর আবু হোসেনের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে খায়রুল বড়। ব্রিকুষ্টিয়া দারুল হাদিস সালাদিয়া কওমি মাদ্রাসায় কিছুদিন পড়েছিলেন খায়রুল। এরপর ডিহিগ্রাম ডিইউ সেন্ট্রাল ফাজিল মাদ্রাসা থেকে তিনি দাখিল পাস করেন বলে প্রতিবেশীরা জানান।

খায়রুলের মা পেয়ারা বেগম বলেন, এক বছর ধরে খায়রুল নিখোঁজ ছিল। স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে হারানো বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার জন্য আট-নয় মাস আগে গিয়েছিলেন বাবা-মা। কিন্তু থানায় জিডি করতে হবে শুনে তাঁরা আর বিজ্ঞপ্তি দেননি।

চুতিনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহজাহান আলী বলেন, গণমাধ্যমে ছবি দেখেই বাবা-মা ও প্রতিবেশীরা খায়রুলকে চিনতে পারেন। গ্রামে জানাজানি হয়। গতকাল বিকেলে পুলিশ একটি ছবি নিয়ে বাড়িতে আসে। তাঁর বাবা-মা প্রথমে ছবিটি চিনতে পারছেন না বলে পুলিশকে জানান। পরে পুলিশ কর্মকর্তারা খায়রুলের ছবি দেখতে চাইলে বিষয়টি বেরিয়ে আসে। পুলিশ খায়রুলের মা-বাবাকে আটক করেছে।

ঢাকা মহানগর ডিবির একজন কর্মকর্তা গতকাল বলেন, ঢাকার অভিজাত এলাকায় বসে কেউ একজন এই হামলার সমন্বয় ও পরিকল্পনা করেছেন বলে তাঁরা মনে করছেন। যার কারণে বগুড়ার নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন মাদ্রাসাছাত্রের সঙ্গে ঢাকার অভিজাত পরিবারের চারটি ছেলের যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।

গত শুক্রবার রাত পৌনে নয়টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হত্যাযজ্ঞ চালায় জঙ্গিরা। ১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসান ঘটে শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে সেনা নেতৃত্বাধীন সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে। অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়, যাঁদের জঙ্গিরা আগেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেছিল। এই ২০ জনের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি নাগরিক ও ৩ জন বাংলাদেশি। উদ্ধার অভিযানে নিহত হয় আরও ছয়জন। এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রথম দফা উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। আহত হন অন্তত ৪০ জন।

এফ/০৭:২০/০৪জুলাই

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে