Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.6/5 (7 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-০৩-২০১৬

গুলশান ট্র্যাজেডি : আসুন, আমরা মায়েরা জেগে উঠি

সালমা লুনা


গুলশান ট্র্যাজেডি : আসুন, আমরা মায়েরা জেগে উঠি

আমাকে একবার গল্পচ্ছলে এক বন্ধু বললেন, তোমার বাচ্চা কথা শোনে না? না শুনুক! রাগ দেখায়? দেখাক! প্রেম করে? করতে দাও!

শুধু খেয়াল রেখো, সে যেন মাদক না নেয়, এমনকি সিগারেটটিও যেন না ছোঁয়। সিগারেট মাদকের গুরু। আর মাদক হলো সেই ব্যাধি, যেটাতে আক্রান্ত হলে সন্তান আর সন্তান থাকে না, পশু হয়ে যায়।

আজ আমি সেই বন্ধুর কথাটির সাথে আরও যোগ করে নির্দ্বিধায় বলতে চাই, শুধু মাদক না, খেয়াল রাখুন আপনার সন্তান যেন জঙ্গি না হয়ে যায়। কারণ জঙ্গি হলে সে মানুষ থাকে না, নরমাংসভোজী পিশাচ হয়ে যায়, রক্তলোভী জানোয়ার হয়ে যায়।

ছড়িয়ে পড়েছে গুলশান হত্যাকাণ্ডের খুনিদের ছবি। পাঁচটি ছেলে। প্রাণহীন, রক্তাক্ত। পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন মায়ের সন্তান।

দু’তিনজনের মোটামুটি একটা পরিচয় পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, তারা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত ছেলে। তাদের ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে দেখা গেল, বাবা-মা ভাই-বোন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হাসিখুশি সব ছবি। নানা রঙের কথা, খেলাধুলার ছবি। কাউকেই দেখে নরখাদক পিশাচের মতো লাগছে না। ইতরামি-নোংরামি নেই। আজেবাজে কথা বা ছবি নেই। আমাদের মতোই, আমাদের সন্তানদের মতোই।

সবাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে বেরিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিল। এদের মধ্যে দুজনের ব্যাপারে জানা গেছে যে, তারা মাস দুয়েক আগে থেকেই নিখোঁজ ছিল। পুলিশ অনুসন্ধান করছিল, খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।

খুবই ভয়াবহ তথ্য! তারা আমাদের মতো সাধারণ। এটিও ভয়াবহ।

আমাদের সন্তানরাও যেকোনো সময়ে জঙ্গি হয়ে যেতে পারে? নিখোঁজ হয়ে ট্রেনিং নিতে চলে যেতে পারে? তারপর ফিরে আসতে পারে এইভাবে, রক্তের হোলি খেলা নিয়ে ... 

তখন আমরা?

আমরা হয়ে পড়ব ঘৃণার পাত্র। দেশের শত্রু। জঙ্গির বাবা-মা হিসেবে আমাদের নতুন পরিচয় হবে। সন্তানের জন্য শোক তো দূর, নিজের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে হাহাকার করতে করতে বাকি জীবনটা কাটবে। নিজেকেই নিজে ধিক্কার দিতে থাকব কেন সন্তানহীন হলাম না! কেন জন্মের পরেই মরে গেল না এই কু-সন্তান!

এই-ই কি নিয়তি হতে যাচ্ছে এদেশের মা-বাবাদের?
আমরা একটু সচেতন হলেই এটি এড়ানো সম্ভব। সন্তান কার সাথে মিশছে, প্রতিমুহূর্তে লক্ষ রাখতে হবে। সন্তান চিন্তিত? চুপচাপ? আচরণে হঠাৎই পরিবর্তন? ধর্মের যেকোনো বিষয়ে অধিক মনোযোগী? কোরআন বা হাদিসের বাণী নিয়ে অনাবশ্যক মাতামাতি? বিশ্বে মুসলিমদের উপর হামলা, জুলুম, জঙ্গি হামলা বা জঙ্গি সংগঠনের নামধাম নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে? নেট ঘেঁটে খুঁজে বের করছে এ সংক্রান্ত নানা ঘটনা? ফেসবুক কর্মকাণ্ড ধর্মালোচনা আর হাদিস কোরআন বিষয়েই সীমাবদ্ধ? হঠাৎই নতুন কোনো বন্ধু তৈরি হয়েছে? ঘনঘন নতুন কোনো বন্ধু সম্পর্কে আলোচনা করছে?

এই প্রশ্নগুলো করে সন্তানের আচার-আচরণ খেয়াল রাখতে হবে। মাদক যেমন বন্ধুর হাত ধরে আসে, জঙ্গিবাদের হাতছানিও বন্ধু বা কাছের লোকের কাছ থেকে আসে। 

সন্তানকে সময় দিতে হবে। সন্দেহের হয়তো অবকাশ নেই, তবুও বোঝাতে হবে যে ধর্ম মানুষ খুন করার জন্য নয়।

এ দেশে কেন শুধু! সারা পৃথিবীতেই কেউ মসজিদে যাবে, কেউ মন্দিরে তো চার্চে বা প্যাগোডায়। কেউ নিরাকার আল্লাহকে ডাকবে তো কেউ মাটির মূর্তি গড়ে তাকে বিশ্বাসের সাথে ডেকে যাবে আবার কেউ বিশ্বাস করবে আল্লাহর পুত্র যিশু তাদের মঙ্গল করবে।

জীবনদায়ী ‘পানিকে’ কেউ ‘জল’ বললে পিপাসা মিটতে কোনওই অসুবিধা হয় না ।

আবার হয়তো কেউ কেউ এসব বিশ্বাসই করবে না। তারা বলবে, মৃত্যুর পর আর কিছু নেই, তাই এইসব মসজিদ-মন্দির আর উপাসনা অর্থহীন। সে অবিশ্বাসী হয়ে থাকতে চাইছে পৃথিবীতে থাকার সময়টা। থাক না, তার বিশ্বাস ভেঙে দেয়ার তুমি কে? সন্তানকে বোঝাতে হবে, জীবন চলার পথে তোমার বিরুদ্ধমত আসবে, তাকে মেনে নিতে শেখো।

ওই পাঁচটি রক্তাক্ত লাশের জন্মদাত্রী মায়েরা যে প্রসব ব্যথায় ছটফট করে তাদের জন্ম দিয়েছে, তার সাথে পরিচয় শুধু আমাদের মতো মায়েদের আছে। তাই একজন মা-ই বুঝবে ওই লাশগুলোর মায়ের কেমন লাগছে! কোনো মা অন্তত এইভাবে কুপিয়ে মানুষ খুন করতে তার সন্তান জন্ম দেয় না এবং এ-ও চায় না তার সন্তান জঙ্গি হয়ে এভাবে মরে পড়ে থাকুক।

কোনো ইংলিশ বা বাংলা মিডিয়াম স্কুল, কোনো পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এসব শেখাতে পারবে না আমাদের সন্তানদের। এটা কেবল একজন মা-ই পারে। দেশের যা পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তাতে ঘরে ঘরে প্রতিটি মাকেই সচেতন হতে হবে। আগে তো ঘর!

রাজনীতিক, রাষ্ট্র, পুলিশ, সমাজ এদের দোষ দিয়ে কী হবে? তারা নিজেদের ক্ষমতা কুরসি-উর্দি সামলাতে থাকুন।

আমরা ঘর থেকেই আমাদের কাজ শুরু করি, প্রত্যেকে। দেশ বদলে যাচ্ছে দ্রুত। আমরাও যদি না বদলাই তবে মস্ত খেসারত দিতে হতে পারে। মনে রাখবেন, নগর পুড়লে দেবালয় অক্ষত থাকে না।

দেশে জঙ্গি আছে, অবশ্যই আছে এবং এদের জাল আমাদের ঘিরেই আছে। টার্গেট আমরা এবং আমাদের ভবিষ্যতৎ প্রজন্ম। সেইসাথে এই প্রিয় দেশটা। মাতৃভূমি এবং সন্তানের জন্য আমাদেরকেই তো জেগে উঠতে হবে।

আর/১৭:১৪/০৩ জুলাই

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে