Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-০৩-২০১৬

গুলশানে হোটেলে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

গুলশানে হোটেলে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

ঢাকা, ০৩ জুলাই- রাজধানীর গুলশান এলাকায় হলি আর্টিজেন বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্টজনেরা।

এ ঘটনায় দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান বলেছেন,এমন ঘটনা বাংলাদেশ কখনও দেখেনি, আশাও করেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য এমন ঘটনা আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হলো। এই ঘটনা প্রত্যাশিত নয়। আবার একেবারেই অপ্রত্যাশিত তাও বলব না। কেননা, অনেকদিন ধরেই এখানে বেশকিছু জঙ্গিবাদী বিচ্ছিন্ন ঘটনা একের পর এক ঘটাচ্ছিল। এরপর এই ঘটনাকে আর বিচ্ছিন্ন বলা যায় না। আইএসের যে দাবি তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে চেয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গে জঙ্গিবাদ ঘনিষ্ট হয়ে উঠতে পারে না। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। হয়তো একদি জঙ্গিবাদ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না। কিন্তু দমন করার চেষ্টাতো করতে হবে। সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু সেই চেষ্টা কেবল একক চেষ্টা হলে হবে না। সকলকে সমন্বিতভাবে সেই চেষ্টায় যুক্ত হতে হবে। আমাদের চেয়ে গোয়েন্দা তৎপরতায় অধিক শক্তিশালী দেশগুলোও জঙ্গি দমনে হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে আমরা যদি সকলে মিলে জঙ্গিবাদ দমনে একনিষ্ঠ না হই, আন্তরিকভাবে না চাই তাহলে কিভাবে সফলতা আসবে। জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের আন্তরিকতা অস্বীকারের উপায় নেই। পাশাপাশি আরও অধিক কার্যকর ও দির্ঘস্থায়ী পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে।

সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বসে আলাপ করা জরুরি: বিশিষ্ট আইনবিদ ড. কামাল হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, এটা কেউ কখনও আশা করেনি। এখন কেউই নিরাপদ নয়। সকলেরই নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে। এটি এখন আর কোনো ব্যক্তি বা দলের চিন্তা নয়। সামগ্রিক চিন্তা। দেশের চিন্তা। দেশ নিয়ে, দেশের মানুষ নিয়ে, আমাদের প্রত্যেককেই ভাবতে হবে। নিরাপত্তা এখন জাতীয় ইস্যু। জাতীয় ইস্যুতে সবার এক হওয়া উচিত। নানান মতাদর্শ নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থ নিয়ে কোনো বিরোধের সুযোগ নেই। এই সংকট, এখন জাতীয় সংকট। আমাদের জাতীয়ভাবে সবাইকে একসুরে এর প্রতিবাদ করতে হবে। একে অন্যকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এতে কেউ লাভবান হবে না। দেশ, দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সবার আগে দেশের স্বার্থ। জঙ্গিবাদ নিরসনে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বসে আলাপ করা জরুরি, কিভাবে জঙ্গিবাদকে দমন করা যায়। তবে, সরকারের আন্তরিকতার পাশাপাশি সকলের সমন্বিত চেষ্টা জঙ্গিবাদ দমনে জরুরি বলে মনে করছি। সেই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন জঙ্গিবাদ নির্মূলে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

বাংলাদেশ কখনোই জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র ছিল না। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কেউ যদি জঙ্গিবাদকে উস্কে দেয় ও ব্যবহার করে সেটা কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, চিরকাল অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্বপ্নে লালিত, সেখানে জঙ্গিবাদকে চাইলেও কেউ স্থায়িত্ব দিতে পারবে না। জনগণ সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।

এই ঘটনা ভয়াবহ ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত করছে: বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও লেখক হায়দার আকবর খান রনো বলেছেন, একটা দুঃসময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি আমরা। কিছুদিন ধরে যেভাবে মানুষ হত্যায় সন্ত্রাসীরা তৎপরতা দেখাচ্ছে তা আমাদের প্রচ- চিন্তিত করছে। চিন্তা করতে আমাদের বাধ্য করছে। জঙ্গিদের হাত থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। সরকার ও পুলিশের পক্ষ থেকে কত আশ্বাস পেলাম, কোথায় সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন? পরশু রাতে গুলশানে রেস্টুরেন্টে যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হলো, নিরীহ মানুষকে জিম্মি করে হত্যা করা হলো তা দেশে এই প্রথম। এই ঘটনা ভয়াবহ ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত করছে। তাদের ক্রমাগত হামলায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে উঠেছে।

মানুষকে জিম্মি করে সন্ত্রাসী হামলায় আমাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই হামলা কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগই নেই। এই হামলা নিয়ে কোনোভাবেই যেন রাজনীতি করা না হয়। কারণ আমরা দেখেছি এর আগের ঘটনাগুলোর পর সরকার বিএনপির ওপর দোষ চাপানোর, দোষারোপ করে বক্তব্য রাখতে। এসবকে বাদ দিতে হবে যদি একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র আমরা বিনির্মাণ করতে চাই।

রাজনীতি নয়, ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। সরকারকেও এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোতে হবে। সচেতন, সতর্ক হতে হবে। সময়োচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। জনগণকেও এ বিষয়ে সচেতনা বৃদ্ধি জরুরি। কারণ জনগণ সচেতন হলে কোনো অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। দেশের এই পরিস্থিতিতে একটি জাতীয় ঐক্য জরুরি। জাতীয় ঐক্য অবশ্যই হতে হবে। ঐক্য ছাড়া এই সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ করা যাবে না।

গণমাধ্যমের আরও সচেতনতা আশা করছি: বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আলী যাকের বলেছেন, সবার আগে দেশ ও দেশের মানুষ। সবার আগে দেশপ্রেম। মানবিকতা। গণমাধ্যমের আচরণ কখনও কখনও এর বিপরীতে গিয়ে দাঁড়ায় বলে মনে হয়। সর্বাগ্রে সাংবাদিকদের বলতে চাই, দর্শক বাড়াতে, পাঠক বাড়াতে আমরা কি দেশের কথা একবারও ভাববো না? শুধু বাণিজ্য স্বার্থ চিন্তা করব? গুলশান হামলা যে কতবড় বিপর্যয় তা আমাদের অনেক গণমাধ্যম হয়তো বুঝতেও পারেনি। বোঝার যোগ্যতাও অনেকের নেই। তা না হলে, কী করে এই ধরনের ঘটনা ও অপারেশন সরাসরি সম্প্রচার করতে চায় তারা?

আমি ধন্যবাদ দিতে চাই বাংলাদেশের যৌথবাহিনীকে যারা মিনিমাম ক্যাজুয়ালটিতে ম্যাক্সিমাম সুরক্ষা দিয়েছে। সবকিছুই কি গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে? আগে তো দেশের নিরাপত্তা। এধরনের জঙ্গি হামলা দেশে প্রথম এবং স্পর্শকাতর। এমন স্পর্শকাতর ও গুরুতর বিষয়ে কিভাবে টেলিভিশনে দেখাতে হবে, পত্রিকায় প্রচার করতে হবে, অনলাইনে আপ করতে হবে এই বিষয়ে আমাদের কোনো শিক্ষা আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ অনেক কম সময়ে এতবড় একটি নাশকতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। একটি অপারেশন শেষ হবার আগে নানা ধরনের মুখোরোচক সংবাদ পরিবেশন রীতিমতো অন্যায় বলেই মনে করি। গণমাধ্যমের আরও সচেতনতা আশা করছি।

রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়াস চালাতে হবে: রাজনীতিবীদ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে. জে. (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বলেন, গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় একটি রেস্টুরেন্ট যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা সংঘটিত হয়েছে তা আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, আশঙ্কা ছিল দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা পক্ষ থেকে। সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পূর্ণাঙ্গভাবে না হলেও আংশিকভাবে প্রস্তুত ছিল। তবে তারা পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতিতে যেতে পারত। সেটা আর হয়নি। যারা নির্মম এ ঘটনায় নিহত হয়েছে, আহতদের প্রতি সমবেদনা।

তারপরও ঘটনার সফল সমাপ্তি টানতে পেরেছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী, এটা তাদের সফলতা। তাদের অভিনন্দন।

দেশে জঙ্গি তৎপরতা কোনোভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না। এই জঙ্গি তৎপরতায় ধর্মীয় আবহ দেওয়ার চেষ্টা থাকে, সেটা করতে দেওয়া যাবে না। জঙ্গি তৎপরতা ধর্মীয় ছদ্মবেশে ঘটতে দেওয়া যাবে না। পরিস্থিতি দাবি মেটাতে, রাজনৈতিক ঐক্যেও বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা বৃহৎ ঐক্য জরুরি। রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়াস চালাতে হবে।

মিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রুল পালন করতে হবে এখানে। জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে জনগণকে সচেতনার কাজটি তাদেরকে করতে হবে বেশি করে। রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিকভাবেও জঙ্গিদের মোকাবিলা করতে হবে। কারণ একটি কোনো দলীয় ইস্যু নয়, জাতীয়। এ ঘটনার পর সকলের চোখ খুলে যাওয়া উচিত। তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে জঙ্গি হামলার কারণে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক হেড লাইন হলো একটি অপ্রীতিকর ঘটনার কারণে। এটা আমাদের কাক্সিক্ষত ছিল না।

এই সন্ত্রাসী হামলা নতুন শঙ্কা যোগ করল: নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে. জে. (অব.) আব্দুর রশিদ বলেন, যে সন্ত্রাসী হামলা ঘটে গেল দেশে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এই হামলাটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সংঘটিত করা হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তার ফাকফোকর দেখে, নিশ্চিত হয়েই জঙ্গিরা এই নৃশংস হামলা চালিয়েছে। এই হামলা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে নতুন মাত্রা, নতুন শঙ্কা যোগ করল। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস মোকাবিলা করতে হলে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

নতুন এই সন্ত্রাসী হামলার সূত্র ধরে, উছিলা করে আন্তর্জাতিক কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর কোনো খড়গ নেমে আসবে বলে আমি মনে করি না। কারণ এই সংকট বা সমস্যাটি এখন শুধু আর বাংলাদেশেরই একার নয়, এই সমস্যা এখন সবার। গোটা বিশ্বের। দুনিয়ার অন্যান্য দেশ আমাদের কোনো সহযোগিতা করবে না এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই।

বাংলাদেশের এই জঙ্গি হামলা নতুন চিন্তার বিষয় হলো। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা পাবে বলেই আমি করি। এখানে এমন কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি, যাতে তাদের চাপের মুখে বাংলাদেশকে পড়তে হবে।

সন্ত্রাস মোকাবিলায় রাজনৈতিক তৎপরতা জরুরি: সমাজ বিশ্লেষক ড. এম. শাহ্ নওয়াজ আলি বলেছেন, যে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটল গুলশানে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নির্মম। এটা কী করে এই বাংলাদেশে? হত্যা, জঙ্গি তৎপরতা আগেও ছিল দেশে, তাই বলে সাধারণ নিরীহ মানুষ এভাবে জিম্মির ঘটনা তো এর আগে কখনো ঘটেনি। এই প্রথম ঘটল। আমাদের চিন্তার অনেক কিছু দিয়ে গেল এই ঘটনা।

এই বাংলাদেশ তো সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের জন্য নয়। তাহলে কিভাবে সন্ত্রাসীরা আমাদের জন্য কাল হয়ে এল। আমাদের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করছে। কারা করছে, কেন করছে তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোনোভাবেই এই ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার দিকে নজর দিতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। তার এই প্রচেষ্টার সঙ্গে সকলকে সমর্থন যুগিয়ে যেতে হবে, পাশে থাকতে হবে। সামর্থ্যরে সীমাবদ্ধতা থাকলে দ্রুত সম্ভব সেই সীমাবদ্ধতা দূও করতে হবে। সরকারকে আরও সচেতন, সতর্ক হতে হবে। রাজনৈতিকভাবেও জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস মোকাবিলায় তৎপরতা দেখাতে হবে। জনগণের সচেতনতাও খুব জরুরি। জনসচেতনায় সন্ত্রাস দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলেই আমি মনে করি।

মূলউৎপাটন না হলে সংকটের সমাধান হবে না: নিরাপত্তা বিশ্লেষক, ইসফাক ইলাহি চৌধুরী বলেছেন,জঙ্গি হামলায় কাঁপল গুলশান। এটাও কী বলা যায় না, এই ঘটনা কাপিয়ে দিল আসলে গোটা বাংলাদেশকেই? সন্ত্রাসী হামলা, জঙ্গি তৎপরতা এর আগে এদেশে ঘটলেও মানুষ জিম্মি কওে সন্ত্রাসী তৎপরতার ঘটনা এই প্রথম। এ ঘটনা নতুন মোড় নিল। এখন আমাদেও অনেক সতর্ক হতে হবে, সাবধান থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

ঘটনার সঙ্গে সন্ত্রাসীদের বেশিরভাগই নিহত হয়েছে। এটা খুশির সংবাদ। আমরা এতে খুশি। শান্তিপ্রিয় যেকোনো মানুষই এতে খুশি না হয়ে পারে না। তবে আমাদের নিহত আহত সন্ত্রাসীদের পরিচয় জানতে হবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার স্বার্থে। কাদেও কারণে তারা সন্ত্রাসী হিসেবে তৈরি হলো তাদেও বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হবে। এই সন্ত্রাসী হামলার পেছনে যারা রয়েছে, তাদের মূলউৎপাটন না হলে এই সংকটের সমাধান হবে না।

ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে চায়: বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাহবুবুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশে এধরনের জঙ্গিবাদ নতুন সন্ত্রাসের উপদ্রব। মানুষকে জিম্মি করে এইভাবে হত্যা করা কত বড় অন্যায়, অবিচার, জুলুম তা ইসলাম কখনোই অনুমোদন করে না। এধরনের সন্ত্রাসের সঙ্গে ইসলামের কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। এখন পবিত্র রমজান মাস। ইফতারের সময়ে, পবিত্র শবে কদরের মাত্র একদিন আগে এমন সন্ত্রাসী ঘটনা, ধর্মের নামে মানুষ হত্যা গুনাহের কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়। এদের না আছে ধর্ম না মানবিকতা। এদের কোনো ধর্মই নেই, এরা মানুষ নামের অমানুষ। যারা এই সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটিয়েছে তারা বাংলাদেশবিরোধী। বাংলাদেশের সরকারবিরোধী। এই দেশকে দুনিয়ার কাছে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। লক্ষ্য রাখতে হবে কখন বাংলাদেশে এধরনের ঘটনা ঘটছে, যখন বাংলাদেশ সারা দুনিয়াতে উন্নয়নের মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাপী সফল রাজনীতিবিদের অন্যতম একজন আইকন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে, আপনারা বাণিজ্যিক স্বার্থের চেয়ে, দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিন। দেশের স্বার্থে এমন কিছু প্রচার করা উচিত নয় যা জঙ্গিদের সুবিধা করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কখনোই জঙ্গিবাদকে, ধর্মীয় মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি, অনুমোদন করেনি। আগামীতেও করবে না।

সুদৃঢ় রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশের ইতিাসে সংঘটিত সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী ঘটনা এটি। আমাদের সময় এসেছে তা রিয়েলাইজড করা যে, এটা আইএস করেছে। আমরা সবাই যদি এটা রিয়েলাইজ করি, বাংলাদেশে আইএসের একটা স্ট্রং ঘাঁটি গড়ে উঠেছে, অবিলম্বে সরকারকে সমস্ত প্রধান প্রধান বিরোধী দলসমূহকে নিয়ে একটা জাতীয় ঐক্যমত গড়ে তুলতে হবে, জাতীয় স্ট্র্যাটেজি নির্ধারণ করতে, কিভাবে আমরা এই সংকট মোকাবিলা করব। এই সংকটে পুলিশ, গোয়েন্দা, র‌্যাব, সেনাবাহিনী, বিজিবি দিয়ে তাৎক্ষনিকভাবে মোকাবিলা করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু সূদুর প্রসারী মোকাবিলা করতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতায় আসতে হবে।

যে বাংলাদেশকে নিয়ে আমরা গর্ব করি, সেই বাংলাদেশ পুরোপুরি বদলে যাবে যদি অচিরেই এই সমস্যার সমাধান করতে না পারি। আজকে আফগান বা পাকিস্তানের যে অবস্থা, যদি সরকার ও বিরোধীদলগুলোরমধ্যে চলমান তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকে এবং আইএসের মতো শক্তির প্রেক্ষাপট অব্যাহত থাকে অচিরেই বাংলাদেশ পাকিস্তান, আফগাস্তিানের মতো পরিস্থিতির হওয়ার আশঙ্কা আমার।

এখন আমাদের ভাবতে হবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে দেশীয়ভাবে মোকাবিলা করা গেলেই সবচেয়ে ভালো। বিদেশিদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে, তবে সক্রিয়ভাবে দেশীয় বাহিনীকেই থাকতে হবে। আমাদের সুদৃঢ় রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি। তা না হলে বাংলাদেশের ওপর বিদেশিদের নিয়ন্ত্রণ, খবরদারিত্ব আরও বৃদ্ধি পাবে। দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে:সমাজবিজ্ঞানী সাদেকা হালিম বলেছেন, জঙ্গি হামলায় গুলশান রক্তাক্ত। বিপর্যস্ত। ঘটনার আকর্ষিকতায় মানসিকভাবে আমি বিপর্যস্ত। আমাদের সন্তান, পরিবার-পরিজন রয়েছে। আমরা একেকজন একেক এলাকায় থাকি। পেশাগত প্রয়োজনেও থাকি। গুলশান এলাকায়ও অনেকেই পেশাগত কারণে বসবাস করেন। আবার কেউ কেউ প্রয়োজনে যান। আমি নিজেও একাধিকবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার ‘সেই’ রেস্টুরেন্টিতে গিয়েছি। একা নয়, সন্তান ও পরিবারের অনেকেই আমার সঙ্গে ছিল। সেই রেস্টুরেন্টে এমন একটি ঘটনায় দেশের মানুষের মতো আমি চিন্তিত।

যদিও সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ এখন আর কোনো একটি একক রাষ্ট্রের সমস্যা নয়, বৈশ্বিক সমস্যা। হিজবুত তাহরির, জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ দেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলো আন্তুর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস বা তালেবানের মতো সংগঠনগুলোর অনুসারী। তারা প্রায় একই মতাদর্শে বিশ্বাসী। আমি জানি না কেন আমাদের কর্তৃপক্ষ তা স্বীকার করে না।

এমন একটি ভয়ংকর ঘটনা ঘটল, আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কী করল? অভিযানের সময় পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, গোয়েন্দা সংস্থাÑ সব থাকলেও কিভাবে এমন একটি ঘটনা সংঘটিত হতে পারল? কোনো তথ্য কি আগে থেকে ছিল না? আর যদি থেকেই থাকে তবে, আগে থেকে জানা সত্ত্বেও কেন এমন একটি ঘটনা ঘটতে পারল? আমার মনে হয় এখানে দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে।

আরও বেশি সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে: নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে. জে. (অব.) মোহাম্মদ আলী সিকদার বলেছেন, গুলশানের এক রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার মাধ্যমে দেশে নতুন করে উদ্বেগের আবির্ভাব ঘটল। এ ধরনের হামলা এর আগেও বিভিন্ন দেশে হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশে প্রথম। সুতরাং, জঙ্গিরা নতুন কৌশলে ও নতুনভাবে হামলা শুরু করেছে।

এই পর্যন্ত ২৮ জন নিহতের খবর এসেছে। জঙ্গিরা জেনেশুনেই এই হামলা করতে এসেছে। তারা জানে যে, হামলা করে জীবিত অবস্থায় এখান থেকে ফিরে যেতে পারবে না। এটা এক ধরনের আত্মঘাতী হামলা হলেও, হামলার ধরন ছিল অন্যরকম। জঙ্গিরা একধরনের পণ করেই এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। যদি তারা ইচ্ছা করত ২-৫ মিনিটে এলোপাতাড়ি গুলি করে কিছু মানুষ হত্যা করে পালিয়ে যাবে, তাহলে তারা পুলিশ আসার আগেই সেখান থেকে পালিয়ে যেত। কিন্তু তারা সেটা না করে পরিকল্পিতভাবে হামলা করেছে এবং নিজেরাও নিহত হয়েছে।

হামলা শুরুর প্রথম থেকেই পুলিশ দ্রুতই ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পেরেছে। তাদের সাহসী মনোভাব নিয়ে তারা জঙ্গিদের হাত থেকে নিরীহ মানুষদের বাঁচাতে গিয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এতে একদিকে যেমন তাদের সাহসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। তবে তাদের কৌশলের সঙ্গে সঙ্গে সতর্কতারও অভাব রয়েছে।

জঙ্গিদের এই ধরনের হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাকে আরও বেশি তিক্ষè ও বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে। দেশের মানুষকে আরও বেশি সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

তারা আত্মঘাতী কিছু বাহিনী গড়ে তুলেছে: রাজনীতিবিদ রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশকে ঘিরে একধরনের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এই ঘটনা সেই ষড়যন্ত্রেরই একধরনের ফল বলে আমার মনে হয়। বাংলাদেশে যখনই এই ধরনের হামলা হয়ে থাকে, তখনই দেশের বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয় এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে, এটি একটি রাজনৈতিক ঘটনা।

দেশে অনেক দিন ধরেই জঙ্গি বাহিনী বিভিন্ন হামলা করে আসছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় তারা আত্মঘাতী কিছু বাহিনী গড়ে তুলেছে। তার সর্বশেষ পরিণতিই হচ্ছে এই গুলশান হামলা। সুতরাং সহজে বলা যায় আগামীতেও যে এইধরনের হামলা আরও সংঘটিত হবে।

এই ধরনের হামলা থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচাতে হলে জনগণকে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। দেশের জনগণকে একদিকে যেমন জাতীয় জাগরণ গড়ে তুলতে হবে, তেমনি অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির জাতীয় জাগরণ গড়ে তুলতে হবে। সাধারণ জনগণ ও মুক্তিযুদ্ধের বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক শক্তির জাতীয় ঐক্যই এই ধরনের অপশক্তি, জঙ্গিশক্তির এহেন হামলা প্রতিহত করতে সক্ষম। অন্যদিকে দেশের বিরুদ্ধে জঙ্গিশক্তি ও বিশ্বের অনেক দেশের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দেশকে, দেশের মানুষকে বসবাসের একটি সুন্দর দেশ গড়ে তুলতে হবে।

সম্মিলিত চেষ্টায় সংকটের নিরসন অবশ্যই সম্ভব: বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আবু ইউসুফ এম আব্দুল্লাহ বলেছেন, দিনরাত অবিরত এদেশের মানুষ জেগে আছে, এগিয়ে যাচ্ছে, অগ্রগতি হচ্ছে তখনই এরকম একটি নৃশংসতম ঘটনা ঘটল গুলশানে। বাংলাদেশকে নিয়ে নানারকম অপতৎপরতা, ষড়যন্ত্র হচ্ছে চারদিকে, আমাদের উন্নয়ন অগ্রগতি অনেকের পছন্দ হচ্ছে না, ভালো লাগছে না। অন্যরা অস্বস্থিতে, আমরা স্থিতিশীলতায় বসবাস করছি এটা অনেক দেশ চায় না।

আমরা এগিয়ে যাওয়া জাতি, পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সব সংকট সম্ভাবনাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যাব। পরিস্থিতি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করতে হবে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস দমনে সরকার একা পারবে না, সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আন্তরিকতা দিয়ে ভালোবাসার এই বাংলাদেশকে আগলে রাখতে হবে। তার জন্য সকেলর দায়িত্বশীল আচরণ অবশ্যই কর্তব্য। কিভাবে সংকট থেকে উত্তরণ করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা জরুরি।

আমরা যারা সাধারণ মানুষ, তাদেরও এই দুঃসময়ে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ রয়েছে। সেটা আমরা আমাদের জায়গায় থেকেই করার চেষ্টা করতে পারি। এজন্য আমাদের সচেতন হতে হবে। কারণ যারা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত তারা এই সমাজেরই সদস্য। কোনো না কোনো পরিবারের সদস্য। তারা যাতে কোনোভাবেই জঙ্গি, সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত হতে না পারে এই বিষয়ে সজাগ সতর্ক থাকতে হবে। সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় সংকটের নিরসন অবশ্যই সম্ভব।

আর/১৪:১৪/০৩ জুলাই

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে