Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৭-০১-২০১৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : গৌরব, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ৯৫ বছর

মুনির হোসাইন


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : গৌরব, ঐতিহ্য ও সংগ্রামের ৯৫ বছর

ঢাকা, ০১ জুলাই- একশ বছর ছুঁই ছুঁই। এরপরও নিজস্ব আলোয় আলোকিত। নির্ভর করতে হয়নি কারো উপর। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বময় উদ্ভাসিত। নিজের গৌরব ও ঐতিহ্যে এখন গৌরবান্বিত। বাতিলের কাছে মাথা নত না করা প্রতিষ্ঠান হিসেবে খ্যাতি রয়েছে বিশ্ব দরবারে। দীর্ঘ পথচলায় অর্জনও রয়েছে অনেক। দেশ মাতৃকারে দায়ী করে রেখেছে জন্মলগ্ন থেকে। পৃথিবীর মানচিত্রে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সবুজ শ্যামল ভূখণ্ডটির জন্মদাতা হিসেবেও একক নেতৃত্ব তার। বিশাল এ বসুন্ধরায় এমন প্রতিষ্ঠান আর খুঁজে পাওয়া যায় না, যেটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম দেয়া থেকে শুরু করে তাকে একটি পতাকা উপহার দিতে পেরেছে।

বলা হচ্ছে প্রাচ্যের বাতিঘর হিসেবে খ্যাত দেশের ষোলো কোটি মানুষের স্বপ্নের জায়গা হিসেবে চিহ্নিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। আজ ১ জুলাই। দেশ শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে হাঁটি হাঁটি পা পা করে অতিক্রম করেছে ৯৫টি সাফল্যের বছর। দেশের ক্রান্তিলগ্নে সোচ্চার থাকা এ বিদ্যাপীঠটির এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিপাদ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ‘সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও মানবিক চেতনা বিকাশে উচ্চশিক্ষা।’ সম্প্রতি দেশে চলমান হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধেই এ স্লোগান।

গৌরবোজ্জ্বল এ পথ চলায় নিজেকে করেছে তিন যুগের সাক্ষী। ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। যৌবন ব্যয় হয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-র গণ অভ্যুত্থান, ৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ১/১১ সরকারের পতনের আন্দোলনে। দেশের সব আন্দোলন সংগ্রামের মূল নেতৃত্ব দেয়া হয় এখান থেকে। যখনই জাতির ক্রান্তিলগ্ন শুরু হয় তখনই সোচ্চার থেকেছে এ বিদ্যাপীঠ। তাইতো সম্প্রতি চলমান হত্যাকাণ্ডের কথা মাথায় রেখে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ।


কীর্তিমান লেখক আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দেশটির যা কিছু আশা-ভরসার, তার সবটাই তো ধারণ করে এই (ঢাকা) বিশ্ববিদ্যালয়।’

ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন তৎকালীন পূর্ব বাংলার জমিদার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ও শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তাদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের নির্দেশে ১৯১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যারিস্টার রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে নাথান কমিটি গঠন করা হয়। সুদীর্ঘ প্রতিক্ষার পর ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে ৬০০ একর জমি নিয়ে মনোরম পরিবেশে বিশাল তরুছায়া সুনিবিড় পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে। যদিও এখন কমতে কমতে এর আয়তন দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৬০ একরে। ব্রিটিশরা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে এর পঠন-পাঠন ও শিক্ষাদান কার্যক্রম পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন বলেই এটিকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো।

এরপর থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিদ্যাচর্চার খ্যাতিতে এই উপমহাদেশের একটি শ্রেষ্ঠ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষাদান, বিদ্যাচর্চা, শিক্ষকদের গবেষণা ও পাণ্ডিত্যের খ্যাতি শুধু এ উপমহাদেশে নয়, অর্জনের প্রভাব পড়ে পূর্ব বাংলা পেরিয়ে ইউরোপ, আমেরিকাসহ নানা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও।


অন্যদিকে এর আবাসিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল উপমহাদেশের প্রাচীনতম এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন, পাঠ নেবেন ও জ্ঞানার্জনের নানা প্রয়োজনে লাইব্রেরিসহ শিক্ষকের সাহচর্য লাভ করবেন।

প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে তিনটি অনুষদ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা করলেও বর্তমানে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টি। ১২টি বিভাগ থেকে এখন ৮১টি বিভাগ চালু রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ১১টি ইনস্টিটিউট, ৪৯টি গবেষণা ব্যুরো ও কেন্দ্র। সূচনাকালে এর আবাসিক হল ছিল তিনটি। বর্তমানে ৫টি ছাত্রী হলসহ সর্বমোট হল সংখ্যা ১৯টি। এছাড়াও রয়েছে একটি ছাত্রীনিবাস ও পাঁচটি হোস্টেল।

প্রতিষ্ঠাকালে শিক্ষক ছিলেন মাত্র ৬০ জন। বর্তমানে শিক্ষক সংখ্যা এক হাজার ৯৫৫ জন। ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা করেছিল আজ তার শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩১ হাজার ৯৫৫ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা রয়েছেন এক হাজার ৯২ জন, ৩য় শ্রেণির কর্মচারী এক হাজার ১৩৭ জন ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রয়েছের দুই হাজার ২০৫ জন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এ পর্যন্ত ঢাবি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এক হাজার ৩৮৭ জন আর এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন এক হাজার ৩৩৮ জন।

সুদীর্ঘ ৯৫ পেরিয়ে ৯৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ দেশকে দিয়েছে অনেক কিছু। দিয়েছে দেশ-বিদেশে অনেক খ্যাতি ও গৌরব। অর্জন করেছে অনেক দুর্লভ সম্মান। তৈরি করেছে দেশ-বিদেশে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান পণ্ডিত ও গবেষক। আজ দেশটির রাজনীতি, প্রশাসন থেকে শুরু করে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা।

এদিকে ৯৫ বছর পেরিয়ে ৯৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে পুরো ক্যাম্পাস। শুক্রবার সকাল সোয়া ১০টায় প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন মলে জাতীয় পতাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলসমূহের পতাকা উত্তোলন, পায়রা উড়ানো এবং উদ্বোধনী সংগীতের মধ্যদিয়ে দিবসটির কর্মসূচি শুরু হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক দিনব্যাপি কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এর আগে সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন হল থেকে শোভাযাত্রাসহ প্রশাসনিক ভবন সংলগ্ন মলে জমায়েত হবেন। সেখান থেকে শোভাযাত্রা সহকারে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) গমন করা হবে।

সকাল ১১টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা। আলোচনা সভায় “সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও মানবিক চেতনা বিকাশে উচ্চশিক্ষা” শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট সদস্য রামেন্দু মজুমদার। উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এই আলোচনা সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ ও প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, প্রাক্তন প্রো-উপাচার্য, প্রফেসর এমিরিটাসবৃন্দ, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতির প্রতিনিধিবৃন্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সৈয়দ রেজাউর রহমান আলোচনা অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন।

অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার আয়োজিত দুর্লভ পাণ্ডুলিপি প্রদর্শন এবং সকাল ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কার্জন হলে বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের উদ্ভাবিত চিকিৎসা প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি/গবেষণার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে। চারুকলা অনুষদের আয়োজনে চিত্রকলা প্রদর্শনী চলছে।


এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অনুষদ, বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হল দিনব্যাপি নিজস্ব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে হল, বিভাগ ও অন্যান্য অফিস দুপুর ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

এদিকে ৯৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মঙ্গলবার রাতে নিজ বাস ভবনে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, এ দেশের যা কিছু অর্জন তার সবই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ৯৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেশের সকল আন্দোলন সংগ্রামে শহীদ সব সূর্য সন্তানকে শ্রদ্ধা জানাই। তিনি বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় আগে যেভাবে এ দেশের সব অর্জনে নেতৃত্ব দিয়েছে সে ভাবে আগামীতেও নেতৃত্ব দেবে। জাতির ক্রান্তিলগ্নে সোচ্চার থাকবে।

এফ/০৭:১৫/০১ জুলাই

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে