Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.9/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-২৯-২০১৬

হাতি ঘোড়া গেল তল...

শাহেদীন মালিক


হাতি ঘোড়া গেল তল...

রোজা-রমজানের এই মাসে মহান সংসদ সংগত কারণেই বিকেল-সন্ধ্যার পরিবর্তে সকাল-দুপুরে আলোচনায় বসেছে। ইফতারের আগেই নিত্যকার আলোচনা শেষ হয়েছে। রাতে টেলিভিশনের খবরে অথবা পরের দিন পত্রপত্রিকায় মহান সংসদের আলোচনার কিছু অংশ ‘সংবাদ’ হয়ে দর্শক-পাঠকের গোচরীভূত হয়েছে।

মাসটা ‘বাজেটের’। বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদে যা এসেছে, তা-ই সংবাদমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন হয়েছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে ‘বাজেট আলোচনা’ চোখে পড়েনি। অর্থাৎ অমুক মন্ত্রণালয়ের তমুক খাতে কেন এত টাকা বরাদ্দ করা হলো অথবা তার উল্টো, অর্থাৎ এত কম টাকা কেন ইত্যাদি গোছের প্রশ্ন বা বিতর্ক খুবই কম হয়েছে। হলেও চোখে পড়েনি বা সংবাদমাধ্যমগুলো গুরুত্বসহকারে প্রচার করেনি।

অগত্যা অধমকে বাজেট আলোচনায় নিমজ্জিত হতে হলো। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমদানি-রপ্তানিকারক, করদাতা, আদায়কারী প্রতিষ্ঠানসহ বাজেট-প্রক্রিয়ায় বহু বছর ধরে জড়িত সবার কাছে ‘গোস্তাখি মাফ’ চেয়েই অধমের বয়ান!

পাঠক! পাই-পয়সা হিসাবের দরকার নেই। এই লেখার সংখ্যাগুলো বড় দাগের। যেমন ৯৮৭ কোটি ৫৪ লাখ ৮২ হাজারের বদলে বলেছি বড় দাগে ১ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বড় দাগের ৩ লাখ ৪০ হাজার কোটি (চৌত্রিশের পর শূন্য ১১টা!) টাকার বাজেটে সরকারি কর্মচারীদের বেতন–ভাতার পর সবচেয়ে বড় খাতের পরিমাণ হলো ৩৯ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই খাতে বরাদ্দ হলো বাজেটের প্রতি ১০ টাকায় ১ টাকারও বেশি। অন্য কথায়, শতকরা ১০ ভাগের বেশি বরাদ্দ এই খাতে। কিন্তু কী আশ্চর্য। কোনো মন্ত্রী নেই, অন্তত সরাসরি আছেন বলে তো আমরা শুনিনি। থাকলে নাম নিশ্চয় হতো ‘সুদমন্ত্রী’। হ্যাঁ, খাতটা হলো সুদ। আগামী অর্থবছরে সুদ বাবদ সরকারকে ব্যয় করতে হবে ৩৮ হাজার কোটি টাকা।

ভাবুন। অতীতে ও বর্তমানে সরকার কী পরিমাণ অর্থ ধার নেয়, যার শুধু সুদের পরিমাণই আসছে বছরে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। কোন সরকার কোন বছর কত হাজার কোটি টাকা ধার নিয়েছে, কী কাজে সে টাকা ব্যয় করেছে, এসব অবান্তর প্রশ্ন সাংসদেরা করেন না। অধমও সে ঝুট-ঝামেলায় জড়াতে চায় না। তবে নিবেদন ছোট—প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা তো, তাই একজন মন্ত্রী থাকলে ভালো হতো। সম্ভবত খোদ অর্থমন্ত্রীই এই হাজার হাজার কোটি টাকা দেখভাল করেন। তা-ও বলছি, একজন মন্ত্রী থাকলে লাখ লাখ কোটি টাকা ধার নেওয়া আর হাজার হাজার কোটি টাকা শুধু সুদ পরিশোধের ব্যাপারটা আরও দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করা যেত।

‘সুদমন্ত্রী’র ব্যাপারটা আরও যৌক্তিক হবে, যদি আমরা হোমরাচোমরা সব মন্ত্রীর বাজেট বরাদ্দের দিকে নজর ফেরাই।

নিঃসন্দেহে তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, রাশেদ খান মেনন বড় বড় মন্ত্রী। বা ছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। কী না হইচই হলো তাঁর নিউইয়র্কের একটা বক্তব্যকে ঘিরে। ছিলেন বড় মন্ত্রী। মন্ত্রণালয় ছিল বস্ত্র ও পাট। মন্ত্রী থাকলে আসছে অর্থবছরে তাঁর মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থাকত ৪২৫ কোটি টাকা।

রাশেদ খান মেননের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৫৪৯ কোটি টাকা। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের মন্ত্রণালয়ের জন্য জুটেছে ৫৫২ কোটি টাকা। আর ইনু সাহেবের তথ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য ৮৩৬ কোটি টাকা। ‘বাকের ভাই’খ্যাত আসাদুজ্জামান নূরের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় পাবে ৪২১ কোটি টাকা। আর আরেক বড় মন্ত্রী আমির হোসেন আমু। তাঁর হিসাবে না-ইবা গেলাম। এসব বড় মন্ত্রী যোগ করলে যা, তার ‘ডাবল’ হলেন মুজিবুল হক। পাঠক, বুঝলেন না কোন মন্ত্রী? রেলমন্ত্রী। ছিলেন চিরকুমার সংগঠনের বড় নেতা। পেলেন মন্ত্রিত্ব। ছাড়লেন ‘চিরকুমারত্ব’। বাজেট আসছে বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। মন্ত্রণালয় বটে।

ওবায়দুল কাদের দেখা যাচ্ছে কথায় ও কাজে বড় মন্ত্রী। তাঁর মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। মারহাবা! ‘সুদ মন্ত্রণালয়’ থেকেও বড় একটা মন্ত্রণালয় আছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং শিক্ষা মিলিয়ে—অবশ্য দুটো মেলালে বাজেট প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। টাকা খরচ করলেই শিক্ষা হয় না। হলে সব ব্যাটা বড়লোকের ছেলেমেয়েরা ভীষণভাবে উচ্চশিক্ষিত হয়ে যেত। ইদানীং এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া ছেলেমেয়েদের প্রায় অর্ধেকই হয়তো আমাদের (বাংলাদেশের) রাষ্ট্রপতির নাম জানে না। নেপালের রাজধানীর নাম জানা তো অনেক দূরের ব্যাপার।

আসল কথায় আসি। আগামী বছর সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়ন বাজেট গোল্লা, অর্থাৎ শূন্য অর্থাৎ এক টাকাও বরাদ্দ নেই। অনুন্নয়ন বাজেট ১৫৫ কোটি টাকা। বিচারপতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ঝাড়মোছ অর্থাৎ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়মিত অন্যান্য কাজ—এসব মিলিয়ে ১৫৫ কোটি টাকা।

সুপ্রিম কোর্টের বিচার মানের এতই তুঙ্গে উঠে গেছে যে এর উন্নয়নের জন্য কোনো অর্থের প্রয়োজন অন্তত আগামী বছর আর দরকার হবে না। তবে একটা বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেল, আগামী অর্থবছরে নতুন কোনো বিচারপতি বোধ হয় শপথ নেবেন না। নতুন বিচারপতি নিয়োজিত হলে তাঁর জন্য গাড়ি তো লাগবে। গাড়ি কিনতে হলে বাজেট বরাদ্দ লাগবে। নতুন গাড়ির জন্য বরাদ্দ থাকার কথা উন্নয়ন বাজেটে। সেটা যেহেতু শূন্য, অতএব নতুন গাড়ি নেই। অথবা নতুন বিচারপতিও নেই। অবশ্য অবসরে যাওয়া বিচারপতির পুরোনো গাড়ি দিয়ে যদি নতুন বিচারপতিকে আনা-নেওয়া করা যায়, তাহলে ভিন্ন কথা।

আইনের আরেকটা প্রতিষ্ঠান আছে, যার বরাদ্দ ১৮ কোটি টাকা। উন্নয়ন বরাদ্দ—পাঠকের ধারণা সঠিক—শূন্য। বছরে ১৮ কোটিকে ১২ দিয়ে ভাগ করলে মাসে দাঁড়ায় দেড় কোটি টাকা। অ্যাটর্নি জেনারেল, অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেলদের নিয়ে সাকল্যে বর্তমানে ১৪৭ জন। সঙ্গে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে মাসিক বরাদ্দ দেড় কোটি টাকা।

মাঝেমধ্যে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে যে শত শত এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকার কর আটকে গেছে হাইকোর্টের মামলার বেড়াজালে। এসব কর মামলার ঝামেলা মিটিয়ে সরকার কর আদায় করতে পারছে না। করের মামলা ছাড়াও বছরে যত দিন হাইকোর্ট খোলা থাকে, তার প্রতিটি দিনে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয় অন্তত শ-তিনেক। সরকারের হয়ে প্রতিদিনের এই শ-তিনেক মামলাও ঠেকাতে হয় মাসিক দেড় কোটি টাকার অফিসকে। ১৪৭ জনের মধ্যে গাড়ি বরাদ্দ আছে সাকল্যে চারটি। অবশ্য পাঁচ-ছয়টাও হতে পারে। সম্বল ওই পর্যন্তই। ‘সম্বল মোর কম্বলখানি’—এটা বলারও জো নেই। আর সরকার বলে, দেশে নাকি আইনের শাসন আছে। নদীতে মাছ নেই, গোলায় ধান নেই—বলে মাছে-ভাতে বাঙালি।

কলিকালে আরও কত কিছু শুনব।

আসি আদালতে। উন্নয়ন বরাদ্দ ৪৭৪ কোটি টাকা, যার সিংহভাগ খরচ হবে বিভিন্ন জেলায় আদালত ভবন নির্মাণে। এটা ভালো উদ্যোগ।

পুঙ্খানুপুঙ্খ মনে নেই, মাস তিনেক আগে খবর এসেছিল পত্রপত্রিকার মাধ্যমে যে মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসড়কের কিছু সংশোধনী প্রয়োজন। উড়ালসড়কটির এক অংশ আধা কিলোমিটার বাড়িয়ে এফডিসি পর্যন্ত আনা হবে। নির্মাণকাজ শেষ হবে আগামী জুনে। এই বর্ধিত আধা কিলোমিটার উড়ালসড়ক ও সংস্কারের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ যোগ করা হয়েছিল কমবেশি ৪৫০ কোটি টাকা। পদ্মা সেতুর জন্য ঢাকা-মাওয়া চার লেনের মহাসড়কের প্রতি কিলোমিটারে বর্তমান হিসাবমতে খরচ হবে ১১৩ কোটি টাকা। ১৬০ মিটার, অর্থাৎ ৩০০ হাত রাস্তার নির্মাণ খরচ দিয়ে চলে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, আর সুপ্রিম কোর্টের জন্য বরাদ্দ দেড় কিলোমিটার মহাসড়কের নির্মাণ বরাদ্দের চেয়েও কম। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের চিফ ইঞ্জিনিয়ারের বাজেট হাজার হাজার কোটি টাকা, তার তুলনায় মাননীয় প্রধান বিচারপতির জন্য বরাদ্দ ছিটেফোঁটা বাড়ালেই মামলার জট ছুটে যাবে নিমেষেই আর আদালতগুলোর প্রক্ষালনকক্ষে আমরা আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা যেতে পারতাম নাক না চেপেই।

হায়রে কপাল!

বহু বছর ধরেই আদালত ও বিচার বিভাগের ভাগ্যে বাজেটের শতকরা ১ ভাগের অর্ধেকও জোটেনি। দেশের মোট বাজেট ১০০ টাকা হলে বিচার বিভাগ পায় ৩০ থেকে ৪০ পয়সা। এটা বাড়িয়ে ১০০ টাকায় ৫০ পয়সা বিচার বিভাগকে দিলে হয়তো ভালো হতো। নিশ্চিতভাবে ভালো হতো যদি বর্ধিত বরাদ্দের পুরোটাই আগামী পাঁচ বছর ধরে বিচার বিভাগের সঙ্গে জড়িত—বিচারপতি, বিচারক, আইনজীবী, কর্মকর্তা, কর্মচারী—সবার মান উন্নয়নে। অর্থাৎ মানবসম্পদ উন্নয়নে।

গাড়ির ব্যাপারে আগে যা বলেছি, সেটা সম্পূর্ণ সঠিক হয়তো নয়, কারণ অনুন্নয়ন বাজেট থেকেও গাড়ি কেনা যায়, কিন্তু জানামতে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সুপ্রিম কোর্টের উন্নয়নের জন্য কোনো প্রকল্প নেই, কোনো বরাদ্দও নেই।

পাঠক! আয়কর, ভ্যাট, আমদানি-রপ্তানি কর, জমিজমার কর, হোল্ডিং ট্যাক্স, সারচার্জসহ হরেক কিসিমের ট্যাক্স সারা বছরই দিয়ে যান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আমার-আপনার কাছ থেকে সারা বছরে আদায় করে নেবে দুই লাখ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু বিচার চাইতে পারবেন না।

ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।শিক্ষক, আইন বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে