Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.6/5 (42 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-২৯-২০১৬

অপচয়, অপব্যয় ও অপরিচ্ছন্নতা

সৈয়দ আবুল মকসুদ


অপচয়, অপব্যয় ও অপরিচ্ছন্নতা

দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক অপব্যবস্থা। পৃথিবীর অল্প কিছু দেশ ছাড়া এই অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত নয় জাতিসংঘের কোনো সদস্যরাষ্ট্রই। দুর্নীতি দেশের ক্ষতি করে। কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে বাধা দেয়। জনগণ সামগ্রিকভাবে এবং নাগরিকদের অনেকে ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে দুর্নীতি একটি অপরাধ, যা শাস্তিযোগ্য। কিন্তু অপরাধের যে সংজ্ঞা, তাতে অপচয় ও অপব্যয় অপরাধের মধ্যে পড়ে না। আমাদের দেশেও দুর্নীতি দমনের ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষ রয়েছে। আরও আছেন প্রবল সাহসী সেই সংস্থার কর্তারা। কেউ দুর্নীতি করলে এবং তা প্রমাণিত হলে অথবা তা প্রমাণ করার ইচ্ছা থাকলে তার শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদের যদি অপচয় ও অপব্যবহার হয় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদের যদি কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবেও অপব্যয় করে, তাকে শাস্তির জন্য আদালতের কাঠগড়ায় খাড়া করা সম্ভব হয় না। দুর্নীতিতে ক্ষতির পরিমাণ অঙ্ক কষে পরিমাপ করা সম্ভব, কিন্তু অপচয় ও অপব্যয় জাতির যে ক্ষতি করে, তা পরিমাপের কোনো মাপকাঠি বা ব্যবস্থা নেই। অপচয় ও অপব্যয় একটি দেশকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে দেয়, বাঁশে বা কাঠে ঘুণ বা উইপোকা লাগলে যা হয়; ওপর থেকে সহজে চোখে পড়ে না।

চীনের কমিউনিস্ট বিপ্লবের নেতা মাও সেতুং প্রথমেই অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়কারীদের বিরুদ্ধে নির্মম শাস্তির ব্যবস্থা করেন। আজ চীন উন্নত এবং সেখানে দুর্নীতির মাত্রা যা-ই হোক, শুরুতে যদি অপচয় ও দুর্নীতি কঠোরভাবে দমন করা না হতো, আজ চীনের অবস্থা হতো আমাদের চেয়ে শোচনীয়।

রাজনীতি আর দেশপ্রেমে ভরে গেছে বাংলার মাটি আর পত্রিকার পাতা। দেশের প্রকাণ্ড সব ব্যাপারে ভাববার মতো মানুষের সংখ্যা অগণিত। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ভাববার মতো মানুষ কোথায় এবং ভাববার অবকাশই বা কার আছে? হাজার হাজার কোটি টাকা বস্তাভর্তি করে কোথায় পাঠানো হচ্ছে—সুইজারল্যান্ড না মালয়েশিয়ায়—তা নিয়ে অফিস-আদালতের কামরায় এবং বিভিন্ন বৈঠকখানায় চায়ের কাপ উত্তাল হয়ে ওঠে। কিন্তু সরকারি, আধা সরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত ঘরবাড়ি স্থাপনায় প্রতি মুহূর্তে যে অপচয় ও অপব্যয় হচ্ছে, তার মূল্য যোগ দিলে প্রতিদিন দাঁড়াবে শত শত কোটি টাকা।

গত দুই-আড়াই বছরে আমি কৌতূহলবশত ব্যক্তিগতভাবে ছেলেমেয়েদের দিয়ে কিছু সমীক্ষা করিয়েছিলাম। এই গুরুতর সমাজে তা খুবই সামান্য বিষয়। ওই সব ক্ষুদ্র ব্যাপারে দৃষ্টি না দিলে জাতি যে রসাতলে যাবে তা নয়, তবে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিষয়গুলো আমাকে ব্যথিত করেছে। সে সম্পর্কে কিছু কথা নিবেদন করছি।

খাম ও চিঠিপত্রবৃত্তান্ত

সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সরকারে এবং স্বাধীনতার পরে ১৯৭২-৭৩ সাল পর্যন্ত যাঁরা সরকারি চাকরি করেছেন, তাঁরা জানেন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত খাম আকারে ছোট হতো এবং শুধু তা-ই নয়, একেকটি খাম ওপরে আলগা কাগজ সেঁটে পাঁচ-সাতবার পর্যন্ত ব্যবহৃত হতো। যেমন, কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি পাঠাল তথ্য মন্ত্রণালয়ে। তথ্য মন্ত্রণালয় ওই খামের ওপর ঠিকানা লেখা আলাদা স্লিপ সেঁটে চিঠি পাঠাল ঢাকা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক বরাবর। তিনি তাঁর চিঠিটি বের করে ফাইলে রেখে ওই খামেই আলাদা কাগজ সেঁটে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠালেন কবি জসীমউদ্দীন বা শামসুর রাহমানকে। তাঁরা খামটি হয়তো ফেলে দিলেন। এভাবে সেকালে নিয়ম ছিল একই খাম অনেকবার ব্যবহার করার।

আমরা কাগজে স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। আমদানিনির্ভর দেশ। কাগজ ব্যবহারে আমাদের মিতব্যয়ী হওয়া প্রয়োজন। প্রতিদিন আমি গড়ে সাত-আটটির মতো চিঠি পাই। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রই বেশি। মস্ত বড় খাম। কোনো খামের চাররঙা প্রচ্ছদ। শুধু তা-ই নয়। কার্ড তো বটেই, খাম পর্যন্ত লেমিনেশন করা। বিনা পয়সায় চার বা দুইরঙা প্রচ্ছদ কেউ ছেপে দেবে না। লেমিনেশনে আদৌ পয়সা খরচ হয় কি না, আমার জানা নেই। এ রকম অপচয় নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ তো দূরের কথা, সর্বোচ্চ আয়ের দেশেও হয় বলে শুনিনি।

গত ৪৫ বছরে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদের যত অপচয় হয়েছে, তা দিয়ে বাংলাদেশের সমান আরও দুটি দেশ গড়ে তোলা সম্ভব কি না, অর্থনীতিবিদেরা হিসাব কষে দেখতে পারেন।

একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। যে সামান্য পুঁথিপত্র ৩০-৩৫ খানা লিখেছি, তার পাণ্ডুলিপি হাতে লিখে তৈরি করতে হয়েছে। মুসাবিদা করতে কাগজের প্রয়োজন। গত ৪০-৪২ বছরে আমি কোনো কাগজ কিনিনি। চিঠিপত্র, প্রেস রিলিজ, রিপোর্ট প্রভৃতির পেছনের সাদা পৃষ্ঠায় আমি লিখে আরাম পাই এবং পয়সাও বাঁচে।

সবাইকেই ওয়েস্ট পেপার বাক্সের কাগজ ব্যবহার করতে বলছি না। কিন্তু আজকাল কম্পিউটারের যুগে যে হারে কাগজ নষ্ট হয়, তাতে যেকোনো কাগজের সাদা পিঠ ব্যবহার করলে সম্পদের অপচয় কমবে।

বাঙালির চেয়ার ও তোয়ালে

মাদুর, শতরঞ্জি, টুল, বেঞ্চির চেয়ে চেয়ারে বসার আকাঙ্ক্ষা বাঙালির প্রবল। তবে ছোট চেয়ার তাদের অপছন্দ। চাই বিরাট চেয়ার। অনেকটা সিংহাসনের মতো। মোগল সম্রাটরা যে ধরনের চেয়ারে বসতেন, সেই রকম চেয়ারে বসা চাই। শারীরিক দিক থেকে বাঙালি হালকা-পাতলা হলেও তাদের বসার চেয়ারখানি চাই মস্ত বড়।

আনসার-ভিডিপিসহ ২৮টি সরকারি ও আধা সরকারি অফিসের পদস্থ কর্মকর্তাদের কক্ষে গিয়ে দেখা গেছে, যে চেয়ারে তাঁরা বসেন, তা আকারে বিরাট। এক বসের ঘরের ও রকম একখানা চেয়ার দেখিয়ে একজন কাঠমিস্ত্রিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওতে কতটা কাঠ লেগেছে। তিনি বললেন, দুটো চেয়ার বানানো সম্ভব। তা যদি না-ও হয়, ও রকম পাঁচটি চেয়ারের কাঠে আটটি মানসম্মত চেয়ার হয়। কাঠের কেন এই অপচয়? যেখানে আমাদের বনজ সম্পদের অভাব।

বাঙালি শুধু বেশি বেশি পেতে চায়। অল্পে সে তুষ্ট নয়। সরকারি অফিসে ঢুকে আপনি দেখবেন কর্তার চেয়ারের ওপর বিছানো একটি দীর্ঘতম তোয়ালে। চেয়ারে তোয়ালে ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় না জাপান, জার্মানি, ইরান, স্পেন বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কোনো দেশের অফিসারদের। চেয়ারে দামি তোয়ালে থাকলে দক্ষতা বাড়ে, তেমন প্রমাণ নেই। তোয়ালের একটাই উপযোগিতা, তা হলো, ওর নিচে কাগজে মোড়া ছোটখাটো বান্ডিল রাখা যায়। প্রতিবছর সরকারি ও আধা সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ারে ও টয়লেটে ব্যবহারের জন্য তোয়ালে কিনতে কত টাকা ব্যয় হয়, তার উল্লেখ মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় দেখিনি। তবে অনুমান করি, তোয়ালে কেনার টাকায় প্রতিবছর একটি করে ছোটখাটো হাসপাতাল বানানো সম্ভব।

কাঠের চেয়ারে বসে অনেকের নরম শরীর আরাম পায় না। নরম গদি আঁটা রিভলভিং চেয়ারই বেশি পছন্দ। উপবেশনকারী এদিক থেকে ওদিকে ঘুরে কারও সঙ্গে কথা বলবেন, কষ্ট করে তাকে নড়াচড়া করতে হবে না। চেয়ার নিজেই ঘুরবে। কর্মকর্তা শুধু একটা মৃদু মোচড় দেবেন।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ ছিল কোন পদমর্যাদার কর্মকর্তা কত বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিল, চেয়ার ব্যবহার করবেন। কোন অফিসারের টেবিল হবে গ্লাসটপ। কোন ব্যাংকের অফিসারের টেবিলে থাকবে কাগজের বোর্ড। কে কী কলম ব্যবহার করবেন। এখন স্বাধীন দেশ। তার মধ্যে রাষ্ট্রের মূলনীতি সমাজতন্ত্র। যেকোনো অফিসারই অধিকার রাখেন মস্ত চেয়ার, তোয়ালে, গ্লাসটপ সেক্রেটারিয়েট টেবিল, কোট ঝোলানোর স্ট্যান্ড, কাজ করতে করতে মাঝেমধ্যে চুল পরিপাটি করার জন্য দেয়ালে আয়না প্রভৃতি ব্যবহারের। অনেক অফিসারের ঘরে প্লেট, জগ, গ্লাস, কাপ-পিরিচ কোনো বস্তুরই অভাব নেই।

এই ঢাকা নগরীতেই জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংকসহ বহু সংস্থা ও দূতাবাস রয়েছে। তাদের মস্ত বড় সেক্রেটারিয়েট টেবিল, মণ খানেক ওজনের কাঠের সিংহাসনসুলভ নকশাকাটা চেয়ার বা রিভলভিং চেয়ার ছাড়াই কাজ চলে। আমাদের এত মালসামানের প্রয়োজন হয় কেন?

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সন্ধ্যার পর থেকে সারা রাত কোনো কোনো অফিসে অনাবশ্যক বাতি জ্বলে। যে দেশে বিদ্যুতের অভাবে লোডশেডিং করতে হয়, সেখানে সরকারি অফিসেই বিদ্যুতের অপচয় সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৮০ শতাংশ সরকারি অফিসের টয়লেট নোংরা এবং কল নষ্ট। কল থেকে অনবরত পানি ঝরছে। এভাবে লাখ লাখ গ্যালন পানির অপচয় হয় প্রতিদিন। অথচ নগরীর কোনো কোনো এলাকার মানুষ এক কলস পানির জন্য সারা দিন হাপিত্যেশ করে বসে থাকে।


টয়লেটের ছিটকিনি ও পানির কল

জাপানি ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর কোরিয়ার প্রথম কাজ ছিল পরিচ্ছন্নতা অভিযান। অর্থনৈতিক উন্নতির চেষ্টা করেছে তারা একটু পরে। তার মধ্যে একটা বড় যুদ্ধ করতে হয়েছে স্বজাতি ও স্বদেশিদের সঙ্গে। তারপরও তারা এগিয়ে গেছে। পরিচ্ছন্নতা শব্দটি আমাদের অভিধানে আছে, জীবনে নেই। আমার ব্যক্তিগত সমীক্ষা থেকে সবচেয়ে বেদনাদায়ক যে জিনিসটি দেখতে পেয়েছি তা হলো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের টয়লেটের দুরবস্থা। কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্কুল-কলেজের বহু টয়লেটে ছিটকিনি নেই। প্রয়োজনীয় পানি পর্যন্ত নেই। আট-দশটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে আমি বলেছি, প্রতিষ্ঠানের ফান্ডের প্রয়োজন কী, শিক্ষকেরাই ৫-১০ টাকা করে দিলে ছিটকিনি কেনা সম্ভব। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেয়েরা বলেছে, তারা ছিটকিনি ছাড়া টয়লেট ব্যবহার করতে গেলে সহপাঠিনী কাউকে দরজায় পাহারায় রেখে যায়। কত বড় বেদনার কথা!

বহু টয়লেটেই পানি থাকে না। অন্যদিকে ৫০ শতাংশ টয়লেটের পানির কল নষ্ট। সারা দিনরাত পানি পড়ছে তো পড়ছেই। মেঝেতে নোংরা পানি জমে থাকে। দু-একটি পানির কলের কতই-বা দাম! সব সমস্যার দায় সরকারের ঘাড়ে চাপানো যায় না। নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। সে দায়িত্ব এড়ানো আত্মপ্রতারণা।

পানির অপচয়, বিদ্যুতের অপচয়, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয়ে অফিসের আসবাব ও তৈজস কেনা—এসবের ফলে ভেতর থেকে জাতি দুর্বল হয়ে পড়ছে। গত ৪৫ বছরে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদের যত অপচয় হয়েছে, তা দিয়ে বাংলাদেশের সমান আরও দুটি দেশ গড়ে তোলা সম্ভব কি না, অর্থনীতিবিদেরা হিসাব কষে দেখতে পারেন। দুর্নীতি দমনের সঙ্গে অপচয় ও অপব্যয় রোধ করতে হবে যদি আমরা বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই।

এ আর/০৫:১৫/২৯জুন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে