Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.5/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-১৪-২০১৬

অবস্থা ও ব্যবস্থা

সৈয়দ আবুল মকসুদ


অবস্থা ও ব্যবস্থা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১১১ বছর আগে উত্তাল রাজনীতির সময় ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ রচনা লিখেছিলেন। তিনি রাজনীতিবিদ ছিলেন না বলে তাঁর কথা বড় বড় রাজনীতিবিদের পছন্দ হতো না। তিনি ওই রচনায় লিখেছিলেন:

‘আজ বাংলাদেশে উত্তেজনার অভাব নাই, সুতরাং উত্তেজনার ভার কাহাকেও লইতে হইবে না। উপদেশেরও যে বিশেষ প্রয়োজন আছে তাহা আমি মনে করি না। বসন্তকালে ঝড়ে যখন রাশি রাশি আমের বোল ঝরিয়া পড়ে তখন সে বোলগুলি কেবলই মাটি হয়, তাহা হইতে গাছ বাহির হইবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। তেমনি দেখা গেছে, সংসারে উপদেশের বোল অজস্র বৃষ্টি হয় বটে, কিন্তু অনেক স্থলেই তাহা হইতে অঙ্কুর বাহির হয় না, সমস্ত মাটি হইতে থাকে।’ [আত্মশক্তি, ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা’]

কবিগুরুর সময় উপদেশ বিতরণকারীদের সংখ্যা যা-ই হোক, তা পরিবেশনের পাত্রের প্রতুলতা ছিল না। পত্রপত্রিকা ছিল অল্প, টেলিভিশন তো দূরের কথা, রেডিও বলে কোনো বস্তু আছে মানুষ তার নামটিও শোনেনি। এখন উপদেশ প্রচারের মাধ্যম বিচিত্র। টিভি টক শোর মনোনীত টকারদের মুখনিঃসৃত উপদেশ ও পরামর্শ যদি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে বাংলাদেশে এত দিনে সোনা ফলত। পত্রপত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় যেসব উপদেশ বর্ষিত হয় অথবা সরকারের যেসব শত্রুর দিকে সরকারকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়, তাদের আরেকটু বেশি সংখ্যায় পাকড়াও করলে দেশ সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হতে মাস ছয়েকের বেশি কোনোক্রমেই লাগার কথা নয়। তবে কবিগুরুর সময় যা ছিল নিছকই উপদেশ, এখন উপদেশের আবরণে তাল দেওয়া হয়। সরকারের মনের কথাগুলোই ধ্বনিত অথবা লিখিত হয়।

বাংলাদেশের প্রগতিশীল ব্যক্তিরা যদি আরেকটু রক্ষণশীল হতেন, প্রতিক্রিয়াশীল ও রক্ষণশীলেরা যদি আর সামান্য প্রগতিশীল হতেন, দেশের সেক্যুলারপন্থীরা যদি ধর্মপন্থীদের কিঞ্চিৎ সম্মান দিতেন এবং ধর্মীয় মৌলবাদীরা সেক্যুলারবাদীদের কিছু পরিমাণ গুরুত্ব দিতেন, তাহলে বাংলাদেশ পৃথিবীর পনেরো-বিশটি শ্রেষ্ঠ দেশের একটি হতে পারত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল, রক্ষণশীল, সেক্যুলারবাদী ও মৌলবাদী—সবার মধ্যেই উগ্রবাদী ভাব ষোলো আনা। তাদের কথা ও কাজে উপযুক্ত সংযমের পরিচয় পাওয়া কঠিন।

গুপ্তহত্যা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত খুনখারাবি এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার অনেক দেশেই আছে। কম-বেশি আমাদের সমাজেও সব সময় ছিল। তারপরও বলা যায়, আমাদের সমাজ মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ। শিক্ষাঙ্গন ও শিল্প এলাকায় সন্ত্রাসী তৎপরতা প্রায়ই হয়। প্রাণহানিও ঘটে। জঙ্গি তৎপরতা বলতে যা বোঝায়, সে রকম কিছু বাংলাদেশে না থাকলেও সরকারি নেতারা সভা-সমাবেশে জঙ্গিদের ‘কঠোর হাতে’ দমনের হুঁশিয়ারি দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। টিভি সংবাদের শ্রোতারা তা প্রতিদিন শুনে শুনে নেতাদের কথা গায়ে মাখেন না। বাংলাদেশের মানুষ জানে, দিনদুপুরে যখন-তখন অসত্য ও অর্থহীন কথা শোনাই তাদের নিয়তি।

‘টার্গেট কিলিং’ কথাটা বাংলার মানুষ আগে কখনো শুনে থাকবে কিন্তু কী জিনিস, তা বছর খানেক যাবৎ স্বচক্ষে দেখছে। কিছুদিন যাবৎ তো প্রতি হপ্তায় বা প্রতিদিনই। গত ১৭ মাসে সে রকম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৪৯টি। সর্বশেষ চার দিনে নিহত হয়েছেন পাঁচজন। তাঁদের একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই ৪৯ জনের মধ্যে হিন্দু ও খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী যেমন রয়েছেন, ইসলাম ধর্মাবলম্বীও আছেন। এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বেশি। যাঁরা অঙ্ক কষে সবকিছু দেখতে চান, তাঁরা বলবেন প্রতি ১০ জনের ৯ জন মুসলমান হওয়ার কথা। কিন্তু এই পৃথিবী শুধু আইনস্টাইন ও স্টিফেন হকিংয়ের বাসস্থান নয়। এই গ্রহে অঙ্কে অজ্ঞ মানুষের সংখ্যাই বেশি, সুতরাং অঙ্ক কষে সব হিসাব মিলবে না। কখনো কখনো এক বা দুটি সংখ্যা এক বা দুই কোটির সমান।

সতেরো মাসে একই ধরনের হত্যাকাণ্ড—টার্গেট কিলিং ঘটেছে ৪৯টি, যদিও এই সময় অন্যান্যভাবে খুনখারাবির শিকার হয়েছে শত শত মানুষ। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সময়ই খুন হয়েছেন ১১৬ জন। সুতরাং, সংখ্যাটা বড় নয়। ঘটনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বড়। এই ৪৯টি হত্যাকাণ্ডের পর একটি বেলাও অপেক্ষা না করে ক্ষমতাসীন জোটের চার-পাঁচজন নেতা-মন্ত্রী বলে দিয়েছেন এই খুনের পেছনে রয়েছে খালেদা জিয়া এবং বিএনপি-জামায়াতের হাত। তথ্য হিসেবে যদি তা সম্পূর্ণ সত্যও হয়ে থাকে, তবু দু-এক দিন পর বললে মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতো। ঘোরতর শত্রুকেও নিন্দা করার একটা ভাষা বা রীতি আছে। শত্রুকে যতভাবে সম্ভব দুর্বল করা বা ধ্বংস করা এক কথা আর শত্রু সম্পর্কে মিথ্যা বলা আরেক জিনিস।

সরকারি নেতারা প্রতিদিন টেলিভিশনে আর যে কথাটি বলছেন, তা হলো সরকারের পতন ঘটানোর জন্য এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। এই কথাটি কয়েকজন মন্ত্রী বলছেন স্নায়বিক দুর্বলতা থেকে, কারণ তাঁদের মাথায় রয়েছে সরকারের পতন ঘটলে তাঁদের মন্ত্রিত্ব ও উপদেষ্টাত্ব থাকবে না। হাজার হাজার মানুষকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারলেও সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব, তার নিশ্চয়তা কী? কিছু মানুষ খুন করলেই যদি সরকারের পতন ঘটানো যেত এবং পতন ঘটত, তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের প্রতি তিন মাসে পরিবর্তন ঘটত। আমাদের ১৭ মাসে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন, ফ্লোরিডায় গত পরশু সমকামীদের নাইট ক্লাবে ১৭ মিনিটে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন। ওবামা ও তাঁর মন্ত্রীরা বলছেন না ওই হত্যাকাণ্ড তাঁদের সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য ঘটানো হয়েছে। কারণ, তাঁরা জানেন, তাঁদের দেশে গণতন্ত্র আছে এবং যথাসময়ে নির্বাচনের মাধ্যমেই সরকারের বদল হবে।

উপমহাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নতুন কিছু নয়। সংখ্যালঘুদের নিয়ে রাজনীতিও নতুন নয়। উপমহাদেশ ও বাংলাদেশও আর আগের মতো নেই। আগের উপমহাদেশ ছিল রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরুদের। তাঁদের সময়ও সাম্প্রদায়িকতা ছিল এবং সংখ্যালঘুদের নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। তাঁরা সমাজের অপশক্তিকে প্রতিরোধ করেছেন তাঁদের যশস্বিতা দিয়ে প্রজ্ঞা প্রয়োগ করে। আজ শুকনো পাতা জড়ো করে আগুন লাগানোর লোক আছে, আগুন নেভানোর মানুষের অভাব।

ভারতের বর্তমান শাসকদের নির্বাচনী ওয়াদাও ছিল এবং এখন অব্যাহতভাবে নেতারা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা ভারতে গেলে তাদের আশ্রয় শুধু নয়, নাগরিকত্ব দেবেন। এমনিতেই দুই দেশে মানুষ অবৈধভাবে যাতায়াত ও বসবাস করে। কিন্তু এই নাগরিকত্ব পাওয়ার লোভে অনেক গরিব অথবা বিত্তবান হিন্দু যদি ভারতে যেতে প্রলুব্ধ হন, তাতে বাংলাদেশের মুসলমানদেরই কী লাভ আর ভারতের হিন্দুদেরই বা কী লাভ? সোজা কথাটা হলো এই, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকদেরও বোঝা উচিত সুখ-শান্তিতে থাকতে হলে সবাইকে নিয়েই থাকতে হবে, যেমন তারা আছে হাজার বছর ধরে। গান্ধীজির কথাই বলব, অহিংসার পথই সর্বোৎকৃষ্ট পথ। অহিংসা দিয়ে সবকিছু জয় করা সম্ভব। সরকারকে যারা ‘কঠোরতর’ হওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন, তাঁরা সমস্যার সমাধান ও শান্তি চান না।

বাংলাদেশের মানুষের একটি দীর্ঘ সামাজিক ঐতিহ্য আছে। এই সমাজে পাকিস্তানবাদী জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে প্রতিদিন কথা বলা শক্তির অপচয় মাত্র। জামায়াতের যখন অতি সুদিন ছিল চারদলীয় জোটের সরকারের সময়, ছিল তার প্রবল প্রতাপ, তখনই তার ভোটারের সংখ্যা ছিল ৪ শতাংশ। এখন তার ভোটার বা সমর্থক কত পারসেন্ট, তা তাদের নেতারা বলতে পারবেন। আওয়ামী লীগ ও বাম প্রগতিশীলরা সারাক্ষণ জামায়াত জামায়াত করায় মৌলবাদী সংগঠনটির ক্ষতির চেয়ে উপকারই হয়ে থাকবে।

জঙ্গি দমনের নামে ‘সাঁড়াশি আক্রমণ’ শুরু হয়েছে। তিন দিনে হাজার পাঁচেক আটক হয়েছেন। দাড়ি-টুপি থাকলেই তাঁরা জঙ্গি বা মৌলবাদী, সেটা ভুল ধারণা। ঈদের আগে আটক-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। সে অভিযোগ সত্য হোক বা না-হোক, বিনা পরোয়ানায় এত গ্রেপ্তার সংবিধান পরিপন্থী ও উচ্চতর আদালতের নির্দেশের বরখেলাপ। কিছু কিছু সমস্যা মালকোঁচা মেরে শক্তি প্রয়োগ করে সমাধান সম্ভব নয়। দরকার সংবেদনশীলতা ও প্রজ্ঞা। সব ব্যাপারেই বিকল্প উপায় থাকা ভালো। 

যাদের অর্থের অভাব, জ্ঞানবুদ্ধির অভাব, যারা কুসংস্কারের অন্ধকারে পড়ে থাকে, তারা কখনো খারাপ কাজে ঝুঁকতে পারে। তাদের অসম্মান ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা সুবুদ্ধির পরিচয় নয়। শিখা গোষ্ঠীর লেখকেরা বাড়াবাড়ি মুসলমান সমাজকে সংস্কার করে প্রগতিশীল বানাতে চেয়েছিলেন। তাতে লাভ হয়নি। সেই গোষ্ঠীরই একজন কবি আবদুল কাদির। শুরু করেছিলাম সর্বশ্রেষ্ঠ কবিকে দিয়ে, শেষ করতে চাই তাঁর চেয়ে ছোট এক কবিকে দিয়ে। জসীমউদ্দীন তাঁর বন্ধু আবদুল কাদিরকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন:

‘যে সব মোল্লা-মৌলবীর ধ্বংসের ফতোয়া দিয়ে তোমরা বেড়াচ্ছ তাদের বিষয় কি তোমরা কিছু স্টাডি করেছ? অজ্ঞান অশিক্ষিত সমাজের ভেতর যাদের সব সময় কাটাতে হয়, সেই সমাজের মন্দ যে তাদের জীবনে প্রভাব বিস্তার করবে, এ কথা কিছু বিচিত্র নয়। তাই বাহির হতে এদের জীবনের অন্যায়টাই আমাদের বেশি চোখে পড়ে, আমাদের সংস্কারের কথা তারা শোনেনি। আমরাই কি তাদের কথা শুনেছি? আজ শুধু সংস্কারক হয়েই নয়, বিনীত ভক্তের মত এই সমাজের অন্তরের অন্তঃস্থলে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। আমাদের সমাজ যে পঙ্গু হয়ে পড়ে আছে তার জন্য দায়ী অজ্ঞানতা। প্রচলিত ইসলামের বিধিবিধান নয়। এই যে অজ্ঞানতার আবর্জনা হতে তাদের তুলে ধরতে চাই এর জন্য কি আমরা তাদের ভালো করে কেউ অধ্যয়ন করে দেখেছি। আজ সংস্কারের কথা তো কতজন বলছেন কিন্তু এর কজন বর্তমান বাংলার মুসলমানকে স্টাডি করেছেন?’ এ কথা পল্লিকবি লিখেছিলেন ৭০ বছর আগে। তাঁর মতো সেক্যুলার মানুষ আমি আমার জীবনে বাকরুদ্ধ নজরুল ছাড়া আর কাউকে দেখিনি।

গত ৬০-৬৫ বছরের মধ্যে যাঁরা বাংলাদেশ শাসন করেছেন, তাঁদের মধ্যে আমার জানামতে, শেখ হাসিনা সবচেয়ে সংখ্যালঘুবান্ধব। তাঁর সরকারের সময়ই আজ বাংলাদেশ বিপন্ন, সেটা খুবই বেদনার বিষয়। মনে পড়ে সেই ইংরেজি প্রবচন—গিভ দ্য ডগ আ ব্যাড নেম অ্যান্ড কিল হিম। তবু আশা করব, যত দেরিতেই হোক মানুষের শুভবুদ্ধির জয় হবে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে