Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.6/5 (131 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-১৪-২০১৬

ঝরে পড়ার দল

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম


ঝরে পড়ার দল

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন এখন অনলাইনে এবং মুঠোফোনে করছে ভর্তিপ্রত্যাশীরা। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির জন্য ২৬ মে থেকে ৪ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত ১৩ লাখ ১০৯৯ জন আবেদন করেছে। পত্রপত্রিকার খবরে বলা হচ্ছে, দেড় লাখ শিক্ষার্থী কোনো আবেদন জমা দেয়নি। এদের কিছু অংশ পলিটেকনিকে ভর্তি হবে, কিন্তু বড় একটি অংশ ঝরে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব কমিটির কলেজ পরিদর্শক জানাচ্ছেন, প্রতিবছরই এক লাখের ওপর শিক্ষার্থী ‘এদিক-ওদিক চলে যায়।’

গত বছর চট্টগ্রামের একটি কাগজ জানিয়েছিল, ‘মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট’ দিয়ে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডে চাকরির আশায় দেশ ছেড়েছে অন্তত নয়জন এসএসসি পাস ছাত্র। এই মালয়েশিয়া এয়ারপোর্ট হচ্ছে কক্সবাজার জেলার উখিয়ার সোনাইছড়ির সমুদ্রপাড়ের একটি ঘাট, যেখান থেকে অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশী ট্রলারে করে দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে যায়। ওই নয়জন ছাত্র নিরাপদে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে কি না, তা জানা যায়নি। খবরটি পড়ে ছেলেগুলোর জন্য মনে একটা কষ্ট জমেছিল। একটা ক্ষোভও তৈরি হয়েছিল আমাদের সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে। ছেলেগুলোর তো এখন কলেজে পড়ার কথা, অথচ তারা হয়তো পিঠভাঙা কাজ করছে কোনো রাবার অথবা পাম–বাগানে, অথবা হৃদয়হীন কোনো কংক্রিটের জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে নির্মাণশ্রমিকের ভুলে যাওয়ার মতো জীবন বেছে নিয়ে।

এরা সেই ঝরে পড়াদের দলে, যাদের প্রকৃত সংখ্যা কোনো মানুষ পরিসংখ্যানবিদও নির্ধারণ করতে পারবেন না। তবে নির্মম সত্যটি হলো, এই ঝরে পড়া ছেলেমেয়েগুলোকে যখন পরিসংখ্যানের বিমূর্ত চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়, তখন তাদের আর রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দেখা হয় না, দেখা হয় সংখ্যার কিছু কায়াহীন অবতার হিসেবে। যে জন্য তাদের নিয়ে পরিসংখ্যানগত অসন্তুষ্টি থাকে, কিন্তু কোনো মানবিক উদ্বেগ বা সহানুভূতি থাকে না। এক কাগজে পড়লাম, ২০১৫ সালে আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। এ বছরের প্রথম পাঁচ মাসে গত বছরের ওই পাঁচ মাসের তুলনায় ৩২ শতাংশ বেশি মানুষ বজ্রপাতে মারা গেছে। হতাহতের সংখ্যার সঙ্গে কোনো কান্না-বেদনা বা দীর্ঘশ্বাসকে জড়িয়ে যেতে দেওয়া হয় না। ইরাকে একবার যুক্তরাষ্ট্রের বিমান থেকে বোমা ফেলে এক বিয়ের উৎসবে জড়ো হওয়া ২২ জন নারী–শিশুকে মেরে ফেলা হলো। ওয়াশিংটনে সংবাদ সম্মেলনে সরকারি মুখপাত্র নিরুত্তাপ গলায় বললেন, এরা ছিল ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’, অর্থাৎ যুদ্ধের বড় ক্ষতির সমান্তরাল সামান্য ক্ষতি। বটে, এতগুলো নারী-শিশু এক কর্তাব্যক্তির বয়ানে মানুষ থেকে সামান্য ক্ষতিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল, হারিয়ে গেল মানুষ হিসেবে তাদের সব পরিচয়?

আমাদের দেশেও ঝরে পড়াদের কথা বলা হয় একই রকম নিরুত্তাপ গলায়। তবে শুধু ঝরে পড়াদের কেন, পাবলিক পরীক্ষায় যারা অকৃতকার্য হয়, তাদের বেলায়ও আমাদের ভাবভঙ্গী তো তা–ই। এরাও তো আছে ঝরে পড়াদের দলে। এরা সেই সামান্য ক্ষতির ধারক; এদের নিয়ে মাথাব্যথা থাকতে নেই। গত দশ বছর (চর্চাটা অবশ্য আরও পুরোনো) থেকে দেখে আসছি, এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন দেশের সব টিভি চ্যানেল হাজির হয় কিছু বড় স্কুলে। যারা পাস করেছে, জিপিএ–৫ পেয়েছে, তাদের আনন্দ–উল্লাস, দুই আঙুলের ভি চিহ্নে তাদের পরিশ্রমের সফলতা প্রধান হয় চ্যানেলগুলোর সংবাদে। দৃশ্যটি আমাদের আনন্দ দেয়—যেকোনো সাফল্য উদ্‌যাপনের দৃশ্য দেখাটাই তো আনন্দের।

কিন্তু আনন্দের অপর পিঠে যে বেদনা, তা কোনো টিভি চ্যানেল বা পত্রপত্রিকাকে স্পর্শ করে না কেন? একটা টিভি চ্যানেলকেও কখনো দেখিনি, যারা পাস করতে পারেনি, তাদের বাড়িতে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেছে বা জানতে চেয়েছে কেন তাদের ফল খারাপ হয়েছে। টিভি চ্যানেলগুলো না হয় ঢাকার দিকে দৃষ্টি দিতেই পছন্দ করে, তাদের তাজা খবর শোনাতে-দেখাতে হয়। কিন্তু খবরের কাগজ? তাদের জেলা-উপজেলা প্রতিনিধিরা তো পারেন গ্রামের বিষণ্ন, নির্বাক হয়ে যাওয়া স্কুলে গিয়ে জানার চেষ্টা করতে, কেন শিক্ষার্থীদের ফল ভালো হয়নি, কেন ফেল করেছে কেউ কেউ অথবা অনেকে? অথচ কোনো কোনো খবরের কাগজেই তো দেখি, ফল বেরোনোর দু–তিন দিন পর অকৃতকার্য হওয়া কোনো শিক্ষার্থীর আত্মঘাতী হওয়ার খবর ছাপাতে, ৫ অথবা ৭ নম্বর পৃষ্ঠায়, অনেকটা যেন কুণ্ঠা নিয়ে।

ফেল করার পর যারা আত্মঘাতী হয়, তাদের পৃথিবীটা হঠাৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে যায়। কোথাও তারা কোনো আলো দেখতে পায় না। আমাদের ভাগ্য ভালো, পরিবারগুলো এখনো শিশু-কিশোরদের ভাগ্যাহত তরুণদের প্রধান আশ্রয়। তারা ফেল করা সন্তানদের বুকে টেনে নিয়ে প্রবোধ জানায়, আশার কথা শোনায়। প্রতি পাবলিক পরীক্ষার পর আমরা তাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, যেন পরিবারগুলো অকৃতকার্যদের আগলে রাখে, যেন আত্মঘাতী শিক্ষার্থীদের পরিসংখ্যানের শীতল ঘরে এদের পা না পড়ে। একটি অভিমানী সন্তান শেষ পর্যন্ত জীবনকে বেছে নিলে শুধু পরিবারটি যে বেঁচে যায়, তা নয়, সমাজ ও দেশও একটা সম্ভাবনাকে ফিরে পায়।

যারা ঝরে পড়ে, তাদেরও পরিবারগুলোই শেষ পর্যন্ত সমর্থন দিয়ে যায়। হয়তো চেষ্টা করে তাদের উৎসাহ জোগাতে, হয়তো ক্ষতিটা পুষিয়ে দিতে পরিশ্রম করে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, ঝরে পড়ার একটা বড় কারণ তো এই পরিবার, আরও নির্দিষ্ট করে বললে পরিবারের দারিদ্র্য। মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও একটা সমস্যা, পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসা, যেখানে আবারও সেই পরিবারের দাবিটা হয় প্রধান। এর বাইরে, যদি অকৃতকার্যদের তালিকাটা ঝরে পড়াদের দলে টেনে নিই, দেখা যাবে এর পেছনে আছে শিক্ষার্থীদের স্কুল ও কলেজজীবনে শিক্ষা স্রোতের সমান্তরালে চলতে পারার অক্ষমতা। একটি ক্লাসে ৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে হয়তো ৩৫ জন পাস করে, ৫ জন পারে না। ওই পাঁচজন নানা কারণে পিছিয়ে পড়ে। কৃতকার্য সহপাঠীদের দক্ষতা তারা অর্জন করতে পারে না। এটি প্রাতিষ্ঠানিক কারণে হতে পারে, অর্থাৎ স্কুল-কলেজের পাঠদান দুর্বল হতে পারে, অথবা যারা পাঠ গ্রহণে শতভাগ সক্ষম নয়, তাদের অন্তর্ভুক্ত করার কৌশল পাঠদাতাদের না থাকার কারণে হতে পারে। অকৃতকার্য হওয়ার অন্য কারণটি হতে পারে ব্যক্তিগত—অর্থাৎ শিক্ষার্থী প্রস্তুত নয় তার সহপাঠীদের সমান দক্ষতায় এগিয়ে যেতে।

পশ্চিমের শিক্ষাব্যবস্থায় এ রকম ব্যক্তিগত অক্ষমতা বা অমনোযোগিতা একটা বড় মাথাব্যথা হয়েই ছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু প্রচুর গবেষণা করে তাদের শিক্ষাতাত্ত্বিকেরা দেখেছেন, এরা ঠিক প্রচলিত ধারণায় বা সংজ্ঞায় যাকে দক্ষতা বা মেধা বা যোগ্যতা বলা হয়, তা ধারণ করতে না পারলেও তা অর্জনে বিশেষ কিছু ক্ষমতা তাদের আছে, যার বিকাশ করা যায় ভিন্ন পদ্ধতিতে। এসব ‘ভিন্নভাবে সক্ষম’ বা differently enabled শিক্ষার্থীদের জন্য ভিন্ন পাঠক্রম হয়েছে, শিক্ষণব্যবস্থা হয়েছে। দেখা গেছে, এদের প্রতি একটুখানি অভিনিবেশ দিলে এরা জ্বলে উঠতে পারে। আমাদের দেশে এই দিকটা এখনো চরমভাবে অবহেলিত। এই যে ভিন্ন ক্ষমতার শিক্ষার্থীরা আছে, তাদের আমরা মোটা দাগে ‘খারাপ ছাত্রছাত্রী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ঝরে পড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে ফেলি।

 বাংলাদেশে অটিজম নামক সমস্যাটি দীর্ঘদিন থেকেই অনেক শিশু-কিশোরকে অনেক ক্ষেত্রেই একটি সীমাবদ্ধ জীবনে ঢুকিয়ে রেখেছিল। এই কয়েক বছর ধরে এ বিষয়ে এ দেশে গবেষণা হচ্ছে, কার্যক্রম হাতে নেওয়া হচ্ছে, যাতে সমাজও অংশগ্রহণ করছে। অটিজম প্রভাবিত শিশু-কিশোরদের নিয়ে এখনো যা হচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হলেও কাজ তো শুরু হয়েছে, সমাজে সচেতনতা তো বাড়ছে। একসময় নিশ্চয় আমরা সাফল্যের গল্পগুলোই বেশি শুনব।

তবে আজকে যেহেতু এসএসসি পাস করার পর ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে কথা বলছি, সেদিকে আবার দৃষ্টি দেওয়া যাক। যারা ভর্তির আবেদন করেনি, তাদের ব্যাপারে একটু খোঁজ–খবর নিলে কেমন হয়? সরকার হয়তো বলতে পারে, এ জন্য টাকা লাগবে। একটি কাগজে পড়লাম, ‘শিক্ষার মানোন্নয়নের নামে কর্মকর্তাদের প্রমোদ ভ্রমণ’। কাগজটি লিখছে, দুই কোটি টাকা খরচ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে মানোন্নয়নের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ৫০ জন আমলা এবং শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তিরা থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে গিয়েছেন। আরও যাবেন। এ রকম প্রমোদ ভ্রমণে এত টাকা যে সরকার খরচ করতে পারে, সে কেন অতিশয় মানবিক একটি প্রয়োজনে টাকা জোগাতে পারবে না?

ঝরে পড়ার একটি কারণ সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। বাড়ির পাশে স্কুলে যাওয়া আমাদের গ্রাম বা ছোট শহরের মেয়েদের জন্য এক কথা, দূরের কলেজে পড়তে যাওয়া আরেক কথা। সামাজিক নিরাপত্তা সমাজ একা দিতে পারে না, এটি রাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তার সমান্তরাল চলে। অর্থাৎ যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জনগণের পক্ষে যায়, সে দেশের সমাজও ততটা ক্ষমতাবান হয়, নিজেদের সদস্যদের সুরক্ষা দেওয়ার শক্তিটা পায়। আমাদের দেশের শিক্ষাতাত্ত্বিকেরা ঝরে পড়ার অনেক কারণ খুঁজে পেয়েছেন। সেগুলোর সমাধান নিয়েও তাঁরা ভেবেছেন। তিন–চার বছর আগে একটি সংবাদপত্র একটি গোলটেবিলের আয়োজন করেছিল বিষয়টি নিয়ে। আলোচকেরা সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনাও দিয়েছিলেন কীভাবে সংখ্যাটা কমানো যায়, সে লক্ষ্যে। আমরা জানি, পরিসংখ্যান থেকে আমাদের নিষ্কৃতি নেই, কিন্তু পরিসংখ্যানের ডালপালাকে আমরা ছেঁটে দিতে পারি, যদি ঝরে পড়া তরুণদের দিকে আমরা দৃষ্টি দিই, তাদের বেদনা আর দীর্ঘশ্বাস নিজের বলে গ্রহণ করতে পারি এবং তাদের মুখে হাসি আনার উদ্যোগটা জোরেশোরে নিতে পারি।

তাহলে প্রতিবছর খবরের কাগজের অনেক জায়গাজুড়ে ভিন্ন পরিসংখ্যান ছাপা হতে পারে, যে পরিসংখ্যানের পেছনে আনন্দ আর স্বস্তির একটা হাসি দেখা যাবে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে