Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.5/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৬-০৫-২০১৬

বলতে হবে সরকারকে

আসিফ নজরুল


বলতে হবে সরকারকে

বিরাট ঘটনাই এটি। ইউরোপের দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে আমাদের জন্য, বাদবাকি বিশ্বের জন্য। তবে তা ব্যবসা-বাণিজ্য বা কালোটাকা জমা রাখার বিষয়ে নয়, এটি দেশের স্বার্থ রক্ষার বিষয়ে। ইউরোপের দ্বার খুলেছে দেশের নদীসম্পদের ওপর অধিকার বজায় রাখার ক্ষেত্রে। এই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেকে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে। ইউরোপের দেশগুলো সুযোগটি করে দেওয়ার উদ্যোগ নেয় ২০০৩ সালে, এটি কার্যকর হয়েছে ২০১৩ সাল থেকে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর ইউরোপের প্রায় সব দেশ ইকোনমিক কমিশন ফর ইউরোপের (ইসিই) সদস্য হয়েছে। ইসিই ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক নদী ও হ্রদ-সংক্রান্ত একটি কনভেনশন (চুক্তি) করেছিল। আন্তর্জাতিক নদীর ন্যায়সংগত, পরিবেশবান্ধব ও অববাহিকাভিত্তিক টেকসই ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ কনভেনশনটি সারা বিশ্বে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এই কনভেনশনের সদস্য বর্তমানে ৪১টি ইউরোপীয় রাষ্ট্র। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই কনভেনশনের সদস্য বা পক্ষরাষ্ট্র হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে ইউরোপের বাইরের যেকোনো দেশের জন্য।

১৯৯২ সালের কনভেনশন অনুসারে এককভাবে আন্তর্জাতিক নদীর (যেমন: ভারতের প্রস্তাবিত আন্তনদী সংযোগ বা টিপাইমুখ) ওপর প্রকল্প গ্রহণ করে অন্য দেশের বা নদীর ওপর নির্ভরশীল পরিবেশ, জলবায়ু ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি করার কোনো সুযোগ নেই। পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে জরিপ সম্পাদন, অববাহিকার সব দেশের মধ্যে অবাধ তথ্যবিনিময় ও আলোচনা এবং নদীর পানির মান ও পরিবেশ রক্ষা না করে অভিন্ন নদীতে কোনো প্রকল্প গ্রহণেরই সুযোগ নেই। নদীর ব্যবহার, ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন ও সুরক্ষার জন্য অববাহিকাভিত্তিক যৌথ কমিশন গঠন করে সব রাষ্ট্রের সমঝোতার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনার ওপর এতে জোর দেওয়া হয়েছে।
২.
আন্তর্জাতিক নদীর পানিসম্পদ ব্যবহার ও রক্ষার জন্য ইউরোপের (এবং উত্তর আমেরিকার) দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার নীতির ইতিহাস শতাধিক বছরের। সেই তুলনায়, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে সহযোগিতার নীতি এখনো বহুলাংশে অনুপস্থিত। এসব অঞ্চলে অধিকাংশ আন্তর্জাতিক নদীর উচ্চ অববাহিকার দেশ ইচ্ছেমতো বড় প্রকল্প গ্রহণ করে নিম্ন অববাহিকার দেশের পানি নিজের দেশের ভেতরে টেনে নেয় বা তা দূষিত করে ফেলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশ অভিমুখী গঙ্গা নদীর শুষ্ক মৌসুমের পানি ফারাক্কা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে ভাগীরথী নদীতে নিয়ে ভারত ঠিক এ কাজটিই করেছিল।

আন্তর্জাতিক নদী নিয়ে বিরোধ দূর করার জন্য এশিয়া আর আফ্রিকার দেশগুলো আঞ্চলিক চুক্তির উদ্যোগ নেয় ইউরোপের বহু পরে। নদী বিষয়ে এশিয়ান-আফ্রিকান লিগ্যাল কনসালটেটিভ কমিটি ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নের চেষ্টা করেছিল। মূলত ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধের কারণে এই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। অনেক পরে আফ্রিকার (যেমন, ২০০০ সালের সাউথ আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল প্রটোকল) কিছু দেশ ইউরোপের আইনের আদলে আঞ্চলিক চুক্তি করে নদীর পানির ন্যায়সংগত ও পরিবেশবান্ধব ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোও (যেমন, ২০০৪ সালের পানতানাল ও প্যারাগুয়ে নদী চুক্তি) অনেক ক্ষেত্রে তা করতে সক্ষম হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো মেকং নদীসংক্রান্ত চুক্তি করেছে। তারপরও সমস্যা রয়ে গেছে বাদবাকি বিশ্বের বহু অঞ্চলে, এমনকি বহুপক্ষীয় চুক্তি হয়েছে এমন দেশগুলোতেও।

বৈশ্বিকভাবে ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনের মাধ্যমে নদীসংক্রান্ত বিরোধ মেটানোর চেষ্টা হয়েছে। বহু বছর প্রতীক্ষার পর ২০১৪ সালে এ কনভেনশনটি কার্যকরও হয়েছে। কিন্তু এই কনভেনশনের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সংখ্যা এখনো খুব কম, ইউরোপের ১৯৯২ সালের কনভেনশনের তুলনায় এটি কিছু ক্ষেত্রে অস্পষ্ট ও দুর্বল। ইউরোপের কনভেনশনটি বাদবাকি বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রস্তাব এ আলোকেই সুইজারল্যান্ড করেছিল ২০০৩ সালে, এখন তার সদস্য হওয়ার সুযোগ আছে বাংলাদেশেরও। সুযোগ রয়েছে এর বিধানগুলো প্রয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ভারত বা চীনের মতো উচ্চ অববাহিকার দেশের যেকোনো একতরফা পদক্ষেপ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করার দাবি আরও জোরালো করার। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা আদৌ এ বিষয়ে সচেতন আছেন কি? বিশেষ করে ভারতের আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণার পর তাঁরা এটি ভেবে দেখবেন কি?

৩.
অতিসম্প্রতি ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন তাঁদের প্রধান অগ্রাধিকার। এই প্রকল্পে শুধু গঙ্গার অবশিষ্ট পানি নয়, ব্রহ্মপুত্রের পানিও বাংলাদেশ অভিমুখ থেকে সরিয়ে ভারতের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের ওপর এর মারাত্মক প্রভাবের বিষয়ে হায়দার আকবর খান রনো ইতিমধ্যে প্রথম আলোয় লিখেছেন। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রতিবাদ দূরের কথা, কোনো প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত জানায়নি বাংলাদেশ সরকারের কেউ।

প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপের কনভেনশনের সঙ্গে ভারতের প্রকল্পের সম্পর্ক কী? বাংলাদেশ সরকার চাইলে সম্পর্কটি খুব সরাসরি করা যেতে পারে। বাংলাদেশ চাইলে প্রথমেই ১৯৯২ সালের ইউরোপীয় কনভেনশনটির সদস্য (পক্ষরাষ্ট্র) হতে পারে। তখন আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ১৯৯২ সালের কনভেনশনের বিধানের লঙ্ঘন হচ্ছে—এই অভিযোগ বাংলাদেশ জোরেশোরে করতে পারবে। ভারত এই কনভেনশনের পক্ষরাষ্ট্র নয়, কোনোদিন তার হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু একতরফা প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে তারা ১৯৯২ সালের কনভেনশনটির পরিপন্থী কাজ করছে—এ বিষয়টি অন্তত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তুলে ধরা যাবে।
চাইলে নিজের দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইতিমধ্যে বলবৎযোগ্য আইনেও বহু কিছু করা সম্ভব বাংলাদেশের পক্ষে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে যে গঙ্গা নদী চুক্তি হয়েছে, তা দুই দেশের সরকারপ্রধান কর্তৃক স্বাক্ষরিত এবং ১৯৬৯ ভিয়েনা কনভেনশন অন দ্য ল অব ট্রিটিজ্ অনুসারে এটি দুই দেশের জন্য অবশ্য পালনীয় একটি আন্তর্জাতিক আইন। এই চুক্তিতে শুধু গঙ্গা নদীর পানি ভাগাভাগির কথা বলা হয়নি। এর ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘ন্যায়পরায়ণতা (ইকুইটি), ন্যায্যতা (ফেয়ারনেস) এবং কারও ক্ষতি নয় (নো হার্ম)’—এসব নীতির ভিত্তিতে দুই দেশের সরকার অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির জন্য চুক্তি সম্পাদন করতে একমত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে, বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা এবং চুক্তি না করে ভারত কর্তৃক অভিন্ন নদীর ওপর এককভাবে প্রকল্প গ্রহণের কোনো বৈধতা নেই।

বাংলাদেশের পক্ষে এমনকি ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক কনভেনশনটির প্রাসঙ্গিকতাও তুলে ধরা সম্ভব। এ কনভেনশনটি ১৯৯২ সালের ইউরোপীয় কনভেনশনের তুলনায় দুর্বল হলেও এতে বাংলাদেশের স্বার্থানুগ কিছু বিধান রয়েছে, আমরা অনেকে একাধিকবার এ নিয়ে লিখেছি। দানিয়ুব নদী নিয়ে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ার মধ্যে বিরোধে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) যে রায় দেন, তাতে ১৯৯৭ সালের কনভেনশনটির খসড়াকে আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইনের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এটি তাই ভারত ও বাংলাদেশের জন্য বাধ্যতামূলক না হতে পারে, কিন্তু প্রাসঙ্গিক অবশ্যই। এই কনভেনশন অনুসারে নদী সংযোগের মতো মারাত্মক পরিবেশবিধ্বংসী কোনো প্রকল্প এককভাবে, এমনকি যৌথভাবে বাস্তবায়নেরও সুযোগ নেই।

আশ্চর্য ঘটনা হচ্ছে, এমন একটি অনুকূল কনভেনশন বাংলাদেশ এখনো অনুসমর্থন বা অনুমোদন করেনি। ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক কনভেনশনটি অনুসমর্থন করা হলে বাংলাদেশ জোরের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলে তার স্বার্থবিরোধী কোনো প্রকল্পের বিরোধিতা করতে পারবে। একই সঙ্গে ১৯৯২ সালের ইউরোপীয় কনভেনশনটির সদস্য হলে বাংলাদেশের পক্ষে আরও কার্যকরভাবে তার স্বার্থবিনাশী কোনো প্রকল্প রুখে দেওয়ার চেষ্টা করা সম্ভব।

আমাদের পক্ষে আইন আছে। কিন্তু তা জোরের সঙ্গে বলতে হবে, তা ব্যবহার করার সুচিন্তিত কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। এ দায়িত্ব মূলত সরকারের। এ গুরুদায়িত্ব এড়িয়ে গেলে তা দেশের জন্য শোচনীয় পরিণতি বয়ে আনবে অদূর ভবিষ্যতে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে