Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.5/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৫-২৮-২০১৬

রিজার্ভ চুরির নেপথ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা

রিজার্ভ চুরির নেপথ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা

ঢাকা, ২৮ মে- রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় সুইফট সার্ভারের পাসওয়ার্ড নকল করতে অপরাধীদের ‘সহায়তা’ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকেরই দুই কর্মকর্তা। তাঁদের একজন চুরির ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা দায়েরকারী অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা।

আরেকজন একই বিভাগের উপপরিচালক জি এম আব্দুল্লাহ ছালেহীন। গত বছরের নভেম্বরে সুইফটের (সোসাইটি ফর ইন্টারব্যাংক ফিন্যানশিয়াল টেলিকমিউনিকেশন) ভুয়া প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে আসা নিলাভান্নান এ দুজনের পাসওয়ার্ড নকল করে নেন। এই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে সার্ভারের গোপন নোটবুকে থাকা ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুমের সব কর্মকর্তার আইডি ও পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। তবে হ্যাকাররা রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করতে একই বিভাগের আরেক কর্মকর্তা শেখ রিয়াজউদ্দিনের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে। হ্যাক হওয়ার আগে সর্বশেষ সার্ভারটি ব্যবহার করেছিলেন রিয়াজউদ্দিন, তাই হ্যাকাররা ‘রেকনিসেন্স’ ও ‘ভেরিফিকেশন’ করে রিয়াজউদ্দিনের আইডি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ২০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ঘটনার বিবরণ, আনুষঙ্গিক ঘটনাবলি, রিজার্ভ চুরির ঘটনা সরকারকে না জানানোর বিষয়, বিতর্ক ও দায়-দায়িত্ব এবং বেশকিছু সুপারিশমালা রয়েছে। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাঁদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার মাধ্যমে হ্যাকিংয়ের ঘটনা সম্পন্ন হতে সহায়তা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের (অর্থ মন্ত্রণালয়) কাছে গোপন রাখার বিষয়টিকে ‘গর্হিত অপরাধ’ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদানীন্তন গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের ‘অসদাচরণ’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক, সুইফট ও ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকেরও দায় রয়েছে। চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কূটনৈতিক কৌশলী তৎপরতার সাহায্যে অত্যন্ত যোগ্য আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের অনুলিপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. ফজলে কবিরকেও দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

গত বছর নভেম্বরে সুইফটের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে আসেন নিলাভান্নান। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাগজে-কলমে তাঁকে সুইফটের ‘প্রকৃত’ প্রতিনিধি হিসেবে দেখানো হলেও ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিলাভান্নান সুইফটের ভুয়া প্রতিনিধি। তিনি এসে সুইফট সার্ভার ব্যবহারকারীদের আইডি ও পাসওয়ার্ড নকল করে নেন। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় নিলাভান্নানকে প্রধানতম অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ ম্যানেজমেন্টের বড় ধরনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সুইফটের বার্তা পাঠানোর প্রক্রিয়াকে বিবি-আরটিজিএস (বাংলাদেশ ব্যাংক-রিয়েল টাইম গ্রস সেটলমেন্ট) নেটওয়ার্কে জড়িয়ে ফেলা হয়, উড়িয়ে ফেলা হয় ব্যাক অফিসের এন্টি-ভাইরাস রক্ষাকবচ। নভেম্বরে মিশনের সময় জুবায়ের বিন হুদা ও ছালেহীনের ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড নকল করে নেন সুইফটের ভুয়া প্রতিনিধি নিলাভান্নান। আর যেহেতু সার্ভারের গোপন নোটবুকে সবারই আইডি পাসওয়ার্ড রেকর্ড করা থাকে, সে জন্য সাইবার অপরাধীরা রেকনিসেন্স ও ভেরিফিকেশন করে রিয়াজউদ্দিনের আইডি পাসওয়ার্ড ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ, রিয়াজউদ্দিন ছিলেন সর্বশেষ ব্যবহারকারী। অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা অযত্ন, অবহেলায়, অসাবধানে নিজেদের গোপন তথ্য সাইবার অপরাধীদের হাতে তুলে দেন।’

দোষী কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় নিয়ে শাস্তি দেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। তাদের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, “রিজার্ভ চুরির ঘটনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা, উপপরিচালক মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, জি এম আব্দুল্লাহ ছালেহীন, শেখ রিয়াজউদ্দিন ও রফিক আহমেদ মজুমদার তাঁদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে হ্যাকিংয়ের ঘটনাটি সম্পন্ন হতে সহায়তা করেছেন। এ ছাড়া গভর্নর সচিবালয় বিভাগে কর্মরত মইনুল ইসলাম এবং অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের শেখ রিয়াজউদ্দিন তাঁদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ‘কমপ্রোমাইজড’ হতে দিয়ে মহাবিপত্তির সৃষ্টি করেছিলেন।’’

গত ১৫ মে বাংলাদেশ ব্যাংকে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় মূল দায় সুইফটের বলে উল্লেখ করেন ফরাসউদ্দিন। ওই দিন তিনি জানান, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত নন। তবে কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অসতর্কতা, অসাবধানতা, অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতা ছিল। তাঁদের প্রযুক্তিগত অদক্ষতা ও ঘাটতির কারণে হ্যাকাররা ঘটনাটি সহজেই ঘটাতে পেরেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে উঠে আসা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে তদন্ত কমিটির সদস্যদের। কমিটির একজন সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারের উচিত ছিল তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এক মাসের বেশি সময় পার হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না।

রিজার্ভ চুরির ঘটনা মাসখানেকেরও বেশি সময় সরকার বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে গোপন রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ঘটনায় তখনকার গভর্নর ড. আতিউর রহমানের ওপর ক্ষিপ্ত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতসহ সরকারের অনেক নীতিনির্ধারক। যার পরিপ্রেক্ষিতে আতিউর রহমানকে গভর্নরের পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়েছে। তবে চুরির ঘটনা সরকারের কাছে গোপন রাখার কোনো যুক্তি খুঁজে পায়নি ড. ফরাসউদ্দিনের তদন্ত কমিটি। এ প্রসঙ্গে কমিটি বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি গোপন করার কোনো যৌক্তিকতা তদন্ত কমিটি খুঁজে পায়নি। গোপন করার বিষয়টিকে গর্হিত অপরাধ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের তদানীন্তন গভর্নর, ডেপুটি গভর্নরগণ অসদাচরণ করেছেন।’

হ্যাক হওয়ার পর চুরি হওয়া অর্থ পরিশোধ ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়নি উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অবৈধ পরিশোধ ঠেকানোর পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ মোটেও পর্যাপ্ত ছিল না। ডিলিং রুমের ব্যাক অফিসে কোনো ব্যাকআপ সার্ভার ছিল না। ৫ ফেব্রুয়ারি অফিসে এসেও কর্মকর্তারা মেসেজ পড়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে অফিস ত্যাগ করেন। ব্যাক অফিসের ডিলিং রুমের অফিস ব্যবস্থাপনা ভীষণভাবে ত্রুটিযুক্ত ছিল এবং উক্ত অফিসটি যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্তৃক পরিদর্শন করা হতো না।’

ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে সে জন্য কিছু সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। তার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে কার্যকর, সমন্বিত, দক্ষ, ক্ষীপ্র প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলা, রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন, সার্ভেইলেন্স ম্যাকানিজম সৃষ্টি, বাস্তবায়নমুখী প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করা এবং দক্ষ মানবসম্পদবিশিষ্ট জনবল তৈরির সুপারিশ রয়েছে।

গত ৪ ফেব্রুয়ারি রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর ১৫ মার্চ ড. ফরাসউদ্দিনকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে সরকার। তদন্ত শুরুর ৩০ দিনের মাথায় গত ২০ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর কাছে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে আগামী মাসে। তদন্ত কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন প্রণয়নে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ঘটনাকালীন কর্মরত সব ডেপুটি গভর্নরসহ ৩২ জন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

দোষী কর্মকর্তাদের শাস্তির সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা  বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন আমি দেখি নাই। সেখানে কী আছে, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি হচ্ছে না, সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’

চুরির ঘটনায় মতিঝিল থানায় দায়ের করা মামলা তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মির্জা আব্দুল্লাহেল বাকী গতকাল বলেন, ‘হ্যাকিংয়ের পুরো ঘটনা ঘটেছে অপারেশনাল দুর্বলতার কারণে। এটা আমাদের তদন্তে পরিষ্কার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কমিটির তদন্তে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কর্মকর্তার গাফিলতিতে পাসওয়ার্ড নকল বা আইডি নকলের বিষয় আছে কি না, তা আমাদের জানা নেই। যদিও কিভাবে হ্যাক করা হয়েছে সেটা আমরা জেনেছি। নেপথ্যের কারিগরদের খোঁজার কাজ চলছে।’

-খবর-কালের কন্ঠ।

এফ/১৫:৩০/২৮মে

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে