Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.0/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-২৭-২০১৬

উন্নয়নের আড়ালে থাকা সমস্যার সমাধান করুক নতুন সরকার

কুমারেশ হালদার


উন্নয়নের আড়ালে থাকা সমস্যার সমাধান করুক নতুন সরকার

কলকাতা, ২৭ মে- রাজ্য ভোটের উৎসবে ‘একাই’ ২৯৪টি আসনে লড়াই করে পেয়েছেন বিপুল জনসমর্থন৷ বাংলার মানুষের আশীর্বাদে কুড়িয়ে নিজের ঝুলিতে ভরেছেন ২১১টি আসনের জয়ের একরাশ প্রত্যাশা৷ জোট ‘ঘোঁট’-কে উড়িয়ে, পদ্ম মাড়িয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য গঙ্গা পেরিয়ে নবান্নে প্রত্যাবর্তন৷ রাজ্য বিধানসভার ৪ হাজার ৩০০ বর্গফুটের গোলাকৃত কক্ষ আলো করে আগামী পাঁচ বছরের জন্য রাজ্যের শাসনপাট চালাবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ অবাধ ভোটের সুযোগ মেলায় ধাপে ধাপে ২০১১ সালে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামকে হাতিয়ার করে ‘পরিবর্তনে’র ঝড় তুলেছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ বাংলার মানুষের আশীর্বাদে ১৮৪টি আসন পেয়ে ১৩ এপ্রিল মমতা প্রথম পা রেখেছিলেন লালবাড়িতে, মহাকরণে৷ মুহূর্তেই বিশ্বমিডিয়ার ক্যামেরায় ঝলসে উঠেছিল মমতার মহাকরণ দখল৷ সেই শুরু৷ গত পাঁচ বছরের তৃণমূল সরকারের অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছে রাজ্য৷ ঘটেছে অনেক বিপর্যয়৷ সারদা-নারদা, রেশন-উড়ালপুল৷ বিরোধীদের সমস্ত ‘কুৎসা’, ‘অপপ্রচার’, ‘চক্রান্তে’র পরও ২০১৬-র বিপুল জয়৷ ১৪৮-এর ম্যাজিক ফিগার ছাপিয়ে ২১১৷ ফের নবান্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ আবারও রাজ্যে ‘মা মাটি মানুষে’র সরকার৷

২০১৬ নির্বাচনে টানা একমাসের জেলাজুড়ে দেড়শটিরও বেশি সভা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ বিশেষত বিরোধী গড়ে দাঁড়িয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘‘তৃণমূলকে ভোট দিন, যা চাইবেন করে দেব!’’ জেলায় জেলায় সপার্ষদ প্রশাসনিক সভা করে একাধিকবার তিনি দাবি করেছেন, ‘‘১০০ শতাংশ কাজ হয়ে গিয়েছে৷’’

mamta2কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ১০০ শতাংশের গ্যারান্টি দিলেও, এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে গোটা বাংলায়৷ উত্তরবঙ্গের সাত জেলায় রয়েছে এখনও অনেক সমস্যা৷ আগামী পাঁচ বছরে সেই সমস্যা মুক্তি পেতে উত্তরের কোটি মানুষের একমাত্র ভরসা সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ গোটা উত্তরবঙ্গে কোথাও প্রকট হয়ে উঠছে জলের চাহিদা, কোথাও জেলাগুলির মধ্যে পরিবহণের উপর গুরুত্ব দেওয়ার দাবি, সড়ক যোগাযোগ-স্বাস্থ্য-পরিকাঠামো-নদী সংস্কার-কৃষি-চা-তামাক শিল্প-নিকাশি ব্যবস্থা উন্নয়ন নিয়েও রয়েছে অসংখ্য দাবি৷ একইসঙ্গে উত্তরের জেলাগুলিতে ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি৷ সীমান্ত-লাগোয়া এলাকায় এখনও নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন৷

জেলা কোচবিহার৷ এই জেলার আছে নিজস্ব ইতিহাস৷ পাঁচটি মহকুমা ও ছয়টি পুরসভা নিয়ে প্রায়  ৩০ লক্ষ মানুষের বসবাস৷ এই জেলার প্রধান শিল্পকেন্দ্র চকচকা শিল্পকেন্দ্র৷ কিন্তু এখন তা মৃতপ্রায়৷ কৃষিনির্ভর এই জেলায় বৃষ্টির অভাবে ধানের উৎপাদনও কমে হয়েছে৷ ফি বছর প্রতি মরশুমে জেলায় ধান উৎপাদন হয় গড়ে প্রায় ৪ লক্ষ মেট্রিক টন। কিন্তু চলতি বছরে তা দাঁড়িয়ে প্রায় ২ লক্ষ ১০ হাজার মেট্রিক টনে৷ এই জেলার তামাক চাষ সংকটে৷ কৃষি দফতর সূত্রে খবর, জেলার দিনহাটা, সীতাই, মাথাভাঙা, মেখলিগঞ্জ, শীতলখুচির বিস্তীর্ণ এলাকায় মোতিহারি ও জাতি তামাকের চাষ হয়। জেলায় গড়ে ২০ হাজার হেক্টর এলাকায় ফি বছর তামাকের চাষ হয়। এ বছর আবহাওয়া অনুকূল থাকায় পাতার আকারও ভালো হয়েছে। কিন্তু দাম নিয়ে চলছে নানা টালবাহানা৷ গত বছর জেলায় গুণগত মানের নিরিখে জাতি তামাকের দাম ছিল কুইন্ট্যাল প্রতি ৬৫০০-৭০০০ টাকা। এবার ওই তামাকের দাম দাঁড়িয়েছে কুইন্ট্যাল প্রতি ৪৫০০-৫০০০ টাকায়। গত বছর মোতিহারি তামাকের দাম  ছিল প্রতি কুইন্ট্যাল ৪,০০০-৬০০০ টাকা। এবার তা হয়েছে ২,৫০০-৪,০০০ টাকা প্রতি কুইন্ট্যাল। দ্রুত দাম না বাড়লে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে চাষিদের৷ দিনহাটার এক তামাক চাষি কমল জানার বক্তব্য, ‘‘ফসলের দাম নিয়ে ফোড়েদের রাজ চলছে৷ সরকার বিষয়টি একটু দেখুক৷’’ কৃষির পাশাপাশি এই জেলায় ফের উঠেছে পৃথক রাজ্যের দাবি৷ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলির রমরমা৷ এখানেই দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলিত কোচবিহার বিমানবন্দর৷ কোচবিহার থেকে বাকি উত্তরের জেলার সঙ্গে যোগাযোগের মূল রাস্তাও বেহাল৷ তাছাড়া, রয়েছে সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দাদের ন্যূনতম শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের দাবি৷

আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি৷ চাশিল্পের উপর ভিত্তি করেই এখানকার অর্থনীতি৷ কম করেও ১০টিরও বেশি চা বাগান এখানে বন্ধ৷ ডানকানসের বাগান নিয়ে চলছে কেন্দ্র-রাজ্যের দোলাচল৷ বন্ধ বাগানের শ্রমিক মহল্লায় অনাহার-অপুষ্টিতে মৃত্যু হয়েছে কমপক্ষে ১৩০ জন শ্রমিকের৷ রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বন্ধ চা বাগান শ্রমিকদের ৩৫ পয়সা কেজে দরে চাল দেওয়া হলেও, শ্রমিক সমস্যার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা এখনও সম্ভব হয়নি৷ এখনও উত্তরের বাগানে চলছে মৃত্যু মিছিল৷ চা বাগানের পাশাপাশি এই জেলায় ব্যাবসার অন্যতম উৎস হতে পারে পাহাড়ি নদীতে বেড়ে ওঠা বোরোলি মাছ৷ এই মাছকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার দাবি রয়েছে এখানে৷ প্যাকেজিংয়ের দাবি তুলে এক ব্যবসায়ীর দাবি, ‘‘এই মাছ বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে আমরা উপকৃত হব৷’’

দার্জিলিং৷ পর্যটন ও চা শিল্পের উপরই ভরসা স্থানীয়দের৷ পৃথক রাজ্যের দাবি এখানকার রাজনৈতিক নেতাদের রক্ত মিসেছে৷ বর্তমানে পাহাড়ে এখন জলের সমস্যা মূল সমস্যা৷ শিলিগুড়ি শহর-ফাঁসিদেওয়া বিধানসভা কেন্দ্রে জলের তীব্র সংকট রয়েছে৷ মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি-পানিঘাটা এলাকাতেও দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ চা-বাগান৷ অভাব এখানে নিত্যসঙ্গী শ্রমিকদের৷ এছাড়া গোটা শিলিগুড়ি শহর অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠায় মশার উপদ্রব বেড়েই চলেছে৷ নিকাশির সমস্যায় জর্জরিত গোটা শহর৷ যানজট সমস্যা লেগেই আছে৷ স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও পরিকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন৷ শিলিগুড়ি শহরের বাসিন্দা দেবেশ বিশ্বাসের মন্তব্য, ‘‘ধীরে ধীরে এই শহর ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে৷ বাড়ছে দূষণ৷ দূষণ নিয়ন্ত্রণে পুরসভাকে উদ্যোগী হওয়ার প্রয়োজন৷

উত্তর দিনাজপুর৷ একাধিক সমস্যা রয়েছে এই জেলায়৷ এইমস না-হওয়া নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ রয়েছে৷ অভিযোগ, উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে এমসের জন্য জমি নির্ধারিত হলেও পরে রাজনীতির গেরোয় আটকে এইমসের ভবিষ্যত৷ এই জেলার অন্যতম প্রধান দাবি কুলিক নদীর সংস্কার৷ ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী রায়গঞ্জের প্রাণ৷ দীর্ঘ দিন সংস্কারের অভাবে ধুঁকছে কুলিক৷ বাংলাদেশ থেকে উৎপত্তি হওয়া কুলিক হেমতাবাদ হয়ে নাগরে মিশেছে৷ এক সময়ে এই নদীর উপর নির্ভর করে জীবন কাটাতেন কয়েক হাজার মৎস্যজীবী৷ কিন্তু, এখন নাব্যতা হারিয়েছে কুলিক৷ নিকাশি জল বহনেই তা ব্যর্থ৷ স্থানীয়দের দাবি, এই নদী সংস্কার করে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা হোক৷ কৃষিকাজে ব্যবহার হোক নদীর জল৷ নদীর পড় বাঁধিয়ে করা হোক সৌন্দর্য্যায়ন৷ মূলত এই কুলিক নদীকে কেন্দ্র করে পর্যটনও এই জেলার আয়ের অন্যতম উপায়৷ নদী শুকিয়ে যাওয়ার জেরে পরিযায়ী পাখিদের আর সেভাবে এখানে আসতে দেখা যায় না৷ ফলে, প্রাকৃতিক দিক থেকে এই জেলার কুলিকের গুরুত্ব আছেই৷ এই জেলার আরও একটি মূল সমস্যা সড়ক যোগাযোগ ও রেলপথের দাবি৷ এই জেলার লাগোয়া বিহারের বারসই৷ বিহারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য রেলপথ ও সড়কপথের দাবি এখানে দীর্ঘদিনের৷ রায়গঞ্জ স্টেশন থেকে রাধিকাপুর-কালকা-শিলিগুড়ি রুটে ট্রেন চলাচল করে৷ অথচ, বারসই যাওয়ার কোনও রেলপথ নেই৷ সড়কপথ থাকলেও তার বেহাল দশা৷ ফলে, এই রুটে সড়ক ও রেলপথ চালু হলে বিহারসহ বাকি পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সুগম হবে বলে মনে করেন এখানকার মানুষজন৷ এই জেলার তুলাইপঞ্জি চাল বিখ্যাত৷ কিন্তু, এই চাল দেশের বাজারে এখনও তেমন কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি৷ এখানকার অধিকাংশ চাল ব্যবসায়ীদের দাবি, রাজ্য সরকার এই চালকে বিশ্ববঙ্গ প্রকল্পের মাধ্যমে তুলে ধরুক৷

দক্ষিণ দিনাজপুর৷ এই জেলার এখন মূল সমস্যা জলের সংকট৷ তপন-বংশিহারি এলাকায় তীব্র জলকষ্টে ভুগছেন বহু মানুষ৷ জলের দাবিতে এ বছর ভোট বয়কট করেছেন কুমারগঞ্জ, কুশমণ্ডি, নারায়ণপুর, গঙ্গারামপুরের ভোটাররা৷ জলের সংকট মেটাতে এখানে বিএসএফ তাদের নিজস্ব উদ্যোগে জল সরবরাহ করে থাকে৷ এই জেলায়া জলের সংকটের সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবারও সেই অর্থে কোনও উন্নতি হয়নি৷ ভোটের আগে ঘটা করে মাল্টি সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল উদ্বোধন হলেও শুধু বহির্বিভাগ চালু হয়েছে৷বাকি সব বিভাগ এখনও চালু হয়নি৷ বালুরঘাটে হেলিকপ্টার পরিষেবা চালু হলেও এখন তা বেহাল৷ এই জেলায় কৃষিভিত্তিক শিল্পের কথা বলা বলেও তার কোনও চিহ্ন এখনও দেখতে পাননি জেলার সাধারণ মানুষ৷ ভোটের আগে পেয়েছেন শুধুই প্রতিশ্রুতি৷

মালদহ৷ ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি হওয়ার দুই মাস আগেই সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসে কালিয়াচকের নাম৷ এই জেলার অন্যতম সমস্যা মাফিয়ারাজ৷ আফিম চাষের রমরমা চলছেই৷ মানিকচক-রতুয়া-কালিয়াচকের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তার অভাবের অভিযোগ উঠছে৷  মানিকচক থেকে মথুরাপুর পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের কাজ ধীরগতিতে চলছে৷ গাজলের ৮১ নম্বর জাতীয় সড়কের অবস্থা তথৈবচ৷ মানিকচকের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও আর্সেনিক কবলিত৷ সীমান্ত এলাকায় জাল নোট-বোমা কারখানায় অতিষ্ঠ জনজীবন৷

তবে, সমস্যা থাকলেও গত বেশ কয়েক বছরে উন্নয়ন যে থেমে ছিল না, সে কথাও একবাক্যে স্বীকার করেছেন উত্তরবঙ্গের বাসিন্দারা৷ তবু উত্তরের জেলাগুলিতে উন্নয়নের প্রদীপের নীচে এখনও রয়েছে একাধিক সমস্যা৷ নতুন সরকারের কাছে তাঁদের একটাই প্রতাশা, ‘অনুন্নয়নকে মুছে এগিয়ে যাক উন্নয়নের চাকা৷’

আর/১০:৩৪/২৭ মে

পশ্চিমবঙ্গ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে