Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-২০-২০১৬

বিসমিল্লাহ গ্রুপের মালিকানা বদল

মির্জা মেহেদী তমাল


বিসমিল্লাহ গ্রুপের মালিকানা বদল

ঢাকা, ২০ মে- ব্যাংকের ১২০০ কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিসমিল্লাহ গ্রুপ গোপনে তাদের মালিকানা হাতবদল করেছে। মামলা দায়েরের আগে তদন্ত চলাকালেই গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠান সুকৌশলে মালিকানা হস্তান্তরের কাজটি সম্পন্ন করেছে। হাতবদল করেই গ্রুপের কর্ণধারসহ প্রত্যেকেই দেশ থেকে পালিয়ে যান। বিসমিল্লাহ গ্রুপের আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত করলেও নজিরবিহীনভাবে মালিকানা বদলের এই খবর জানে না তদন্তকারী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

ব্যাংকের ১২০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিরুদ্ধে রাজধানীর তিনটি থানায় মামলা হয় মোট ১২টি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই মামলাগুলো দায়ের করে ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর। তবে মামলার আগেই গ্রুপের মালিকানা হাতবদল করা হয়। তদন্ত শেষে মামলাগুলোর চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরী এবং তার স্ত্রী গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরিন হাসিব বর্তমানে দুবাইয়ে রয়েছেন বলে দুদকের কাছে খবর রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরী, তার স্ত্রী এবং গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরিন হাসিবসহ অন্য পরিচালকরা তড়িঘড়ি করে একযোগে এই মালিকানা পরিবর্তন করেন। আর যিনি নতুন মালিক হিসেবে গ্রুপের দেখভাল করছেন, তিনি হলেন এমডি খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরীর বোন ফেরদৌস আনোয়ার ভূঁইয়া। ফেরদৌস আনোয়ার ভূঁইয়ার স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগে. জেনা. (অব.) মো. আবদুল মজিদ ভূঁইয়া। সূত্র জানায়, জনতা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত শুরু করে। তদন্ত চলাকালেই বিসমিল্লাহ গ্রুপ তাদের মালিকানা হস্তান্তর করে। 

সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাত ১১টায় বিসমিল্লাহ গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদের এক জরুরি বৈঠকে গ্রুপের মালিকানা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গ্রুপের চেয়ারম্যান নওরিন হাসিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গ্রুপের এমডি খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরীসহ অন্য পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে ফেরদৌস আনোয়ার ভূঁইয়াকে গ্রুপের নতুন মালিক হিসেবে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়। নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে এই মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পন্ন হয়। তবে এখানে উল্লেখ রয়েছে— চেয়ারম্যান, এমডি ও অন্য পরিচালকদের অনুপস্থিতিতে গ্রুপের ১১টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক, নির্বাহী সিদ্ধান্ত, ব্যাংক লেনদেন, শৃঙ্খলা, বিপণন, আমদানি, রপ্তানি, জমি ক্রয়সহ সব ধরনের কার্যক্রম এককভাবে পরিচালনা করবেন ফেরদৌস আনোয়ার ভূঁইয়া। এরপরই ঋণ জালিয়াতির হোতা বিসমিল্লাহ গ্রুপের মালিক খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরীসহ অন্যরা গা-ঢাকা দেন। 

মামলা পরিচালনাকারী দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর চার্জশিট হয়ে গেছে। তবে মালিকানা বদলের বিষয়টি জানা নেই। যদি এমনটি হয়ে থাকে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মালিকানা হাতবদল হতে হলে তা অবশ্যই ব্যাংককেও জানাতে হবে। সেরকম কিছু জানিয়েছে বলে আমার জানা নেই।’ সূত্র জানায়, বিসমিল্লাহ গ্রুপের যাবতীয় কাজকর্ম ফেরদৌস আনোয়ার ভূঁইয়ার পাশাপাশি তার স্বামী আবদুল মজিদ ভুঁইয়াও করছেন। বিসমিল্লাহ গ্রুপের কাজ করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাড ব্যবহার করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক আবদুল মজিদ ভূঁইয়া। গ্রুপের গাড়ি নিজ নামে করে নেওয়ার ক্ষেত্রেও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পরিচালক। 

সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বছরের পর বছর প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক কেলেঙ্কারির হোতা বিসমিল্লাহ গ্রুপের হয়ে কাজ করা নজিরবিহীন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ অবস্থায় টাকা উদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে। সূত্র জানায়, বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ‘আল্পা কম্পোজিট টাওয়েলস লিঃ’-এর কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন নাজমুল আনোয়ার। তিনি ব্যবহার করতেন প্রাডো গাড়ি (ঢাকা মেট্রো ঘ-১৩-৪৫৬৩)। গ্রুপের সবাই যখন বিদেশ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন নাজমুল আনোয়ার গ্রুপের সেই প্রাডো গাড়িটি নিজ নামে রেজিস্ট্রেশন করার চেষ্টা চালান। বিআরটিএ থেকে বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য নোটিস আসে গ্রুপের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরদৌস আনোয়ার ভূঁইয়ার কাছে। তার স্বামী ব্রিগে. জেনা. (অব.) মো. আবদুল মজিদ ভূঁইয়া বিআরটিএর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাডে তিনি বিআরটিএর কাছে চিঠি দেন ২০১৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। তিনি সেখানে উল্লেখ করেন, ‘গাড়িটি আমার শ্যালকের (বিসমিল্লাহ গ্রুপের এমডি খাঁজা সোলেমান)। 

তিনি বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন।’ অন্য কারও নামে যেন গাড়ি ট্রান্সফার না করা হয় বলেও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন। বিসমিল্লাহ গ্রুপের এমন বহু কাজে এভাবে সহযোগিতা করে আসছেন তিনি হাসপাতালের প্যাড ব্যবহার করে। এ ছাড়া বিসমিল্লাহ গ্রুপের দুটি গাড়িও নিজ নামে করিয়ে নিয়েছেন। তবে দুই গাড়ির কাগজে তিনি ঠিকানা ব্যবহার করেছেন দুটি। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগে. জেনা. (অব.) মো. আবদুল মজিদ ভূঁইয়া কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মালিকানা বদলের এ খবরটি জানার পর হতবাক অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপের লুটে নেওয়া টাকা আত্মসাৎ করতেই মালিকানা বদল করা হতে পারে।

বিসমিল্লাহ গ্রুপের আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে রাজধানীর তিনটি থানায় মোট ১২টি মামলা হয়। বিসমিল্লাহ গ্রুপের কর্মকর্তাসহ পাঁচ ব্যাংকের ৫৪ কর্মকর্তাকে এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান দল ২০০৬ থেকে তাদের অনুসন্ধান চালায়। বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য নিয়ে অনুসন্ধানের পর ২০১৩ সালে মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহক বিসমিল্লাহ গ্রুপের স্বত্বাধিকারী খাজা সোলেমান আনোয়ার চৌধুরীসহ আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জাল দলিল দেখিয়ে ভুয়া রপ্তানি বিলের বিপরীতে এফডিবিপি ও ব্যাক টু ব্যাক এলসিতে ফান্ডেড প্রায় ১২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তদন্তে বিসমিল্লাহ গ্রুপের নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করলে আরও জালিয়াতির তথ্য প্রকাশ পায়। ব্যাংকগুলোর পরিচালক ও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে বিসমিল্লাহ গ্রুপকে ঋণ দেওয়া হয় বলে সূত্র জানায়।

তদন্ত ও মামলা  : দুদক সূত্র জানায়, রাজধানীর মতিঝিল থানায় নয়টি, রমনা থানায় দুটি এবং নিউমার্কেট থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। ১২টি মামলার সবগুলোতেই বিসমিল্লাহ গ্রুপের পরিচালক খাজা সোলেমান চৌধুরী আসামি। অন্য মামলাগুলোতে রয়েছেন খাজা সোলেমানের স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান নওরিন হাবিব, পরিচালক খাজা সোলেমানের বাবা সফিকুল আনোয়ার চৌধুরী ও মা সারোয়ার জাহান (পরিচালক)। গ্রুপের অন্য আসামিরা হলেন— আবুল হোসেন চৌধুরী, আবিদা হাসিব, নাহিদ আনোয়ার খান, খন্দকার মো. মইনুদ্দিন আশরাফ, বকর আজিজ মুতাক্কি, আবুল হোসাইন চৌধুরী, রিয়াজউদ্দিন আহম্মদ, আক্তার হোসেন, মঈন উদ্দিন এবং গোলাম মহিউদ্দিন আহম্মেদ। এদের মধ্যে খাজা সোলেমান ও তার স্ত্রী নওরিন হাবিব দুবাইয়ে, আবুল হোসেন মালয়েশিয়ায় ও মঈন উদ্দিন জার্মানিতে রয়েছেন। বাকি ৪১ জন আসামি বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা।

সূত্র জানায়, বিসমিল্লাহ গ্রুপ জনতা ব্যাংক ভবন করপোরেট শাখা থেকে ফান্ডেড ৩০৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ও ননফান্ডেড ২৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, মগবাজার শাখা থেকে ১৭৭ কোটি ১০ লাখ ফান্ডেড ও ননফান্ডেড এক কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং এলিফ্যান্ট রোড শাখা থেকে ফান্ডেড ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ফান্ডেড ২৬৫ কোটি ৪০ লাখ ও ননফান্ডেড টাকা ৬১ কোটি আট লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ফান্ডেড ২৩ কোটি ২২ লাখ ও ননফান্ডেড ৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যমুনা ব্যাংক লিমিটেডের দিলকুশা শাখা থেকে ফান্ডেড ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ ও ননফান্ডেড ৪৬ কোটি দুই লাখ টাকা এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের ইস্কাটন শাখা থেকে ৯৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা ফান্ডেড ও ১০ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ননফান্ডেড হিসেবে অর্থ আত্মসাৎ করে।

আর/১০:২৪/২০ মে

ব্যবসা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে