Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-২০-২০১৬

তৃণমূলের নজিরবিহীন বিজয়ের পেছনে কারণ কী?

তৃণমূলের নজিরবিহীন বিজয়ের পেছনে কারণ কী?

কলকাতা, ২০ মে- পশ্চিমবঙ্গে ২০১৬র বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রবল উৎকণ্ঠা ছিল খোদ তৃণমূল শিবিরেই।

তার একটা কারণ যদি হয় ভোটের মুখে দলের নেতাদের বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ ফাঁস হওয়া বা গোপন ক্যামেরায় টাকা নিতে দেখা – আর একটা বড় কারণ ছিল রাজ্যের প্রধান দুই বিরোধী দল কংগ্রেস ও সিপিআইএম তৃণমূলকে রুখতে এককাট্টা হয়েছিল, জোট গড়ে ও আসন সমঝোতা করে তারা চ্যালেঞ্জ জুড়ে দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জিকে।

কিন্তু রাজ্যে ম্যারাথন ভোট পর্বের শেষে আজ ১৯ মে ভোট গণনা কয়েক ঘণ্টা গড়াতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছির, মমতা ব্যানার্জির দল শুধু জিতছেই না – বিপুল ব্যবধানে জিতছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত যা হিসেব, তাতে রাজ্যের মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে তৃণমূল অন্তত ২১৫টি আসনে হয় জিতে গেছে, কিংবা এগিয়ে আছে।

পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এই প্রথম রাজ্যে কোনও দল একক গরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়তে চলেছে (গতবার তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছিল কংগ্রসকে সঙ্গী করে) – এবং তারা দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে জিততে চলেছে।
ভোটের এই ফলাফল অনেকটাই হতচকিত করে দিয়েছে রাজ্যে রাজনৈতিক পণ্ডিতদের – তারা প্রায় সবাই পূর্বাভাস করেছিলেন রাজ্যে এবার তৃণমূল ও বিরোধী জোটের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিংবা মমতা ব্যানার্জি যদি ক্ষমতাতেও আসেন তাহলে তার গরিষ্ঠতা অনেক কমে যাবে।

এই সব অনুমানই যে ভুল প্রমাণিত হল তার পেছনে আসলে একাধিক কারণ আছে। প্রথমত, কংগ্রেস ও বামপন্থীদের বিরোধী জোট একেবারেই কাজ করেনি – নির্বাচনী অঙ্কে তিন আর দুইয়ের যোগফল পাঁচ হয়নি, বড়জোর তিনেই আটকে গেছে।
আসলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে দুটো দল চিরকাল একে অপরের বিরুদ্ধে লড়ে এসেছে – তারা ভোটের মাত্র কয়েকদিন আগে শুধু মমতাকে রোখার জন্য জোট গড়ছেন, এটা রাজ্যের মানুষ মেনে নিতে পারেননি। আর সে কারণেই ভোট ট্রান্সফার – যা এই ধরনের জোট সফল হওয়ার প্রধান শর্ত – তা মোটেই ঠিকঠাক কাজ করেনি।

অর্থাৎ কিনা যেখানে জোটের হয়ে সিপিআইএম প্রার্থী লড়েছেন, সেখানে কংগ্রেস সমর্থকরা তাকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভোট দেননি – এবং কংগ্রেস প্রার্থীর ক্ষেত্রেও তিনি সিপিএম ভোটের পুরোটা পাননি। জোটটা যে মসৃণভাবে দানাই বাঁধেনি, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম ফলপ্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভেতর অভিযোগের সুরে বলেন, ‘কংগ্রেসের লোকজন তো আমাদের ভোটই দেননি!’

মমতা ব্যানার্জির সাফল্যের আর একটা বড় কারণ রাজ্যের মুসলিমরা প্রবলভাবেই তৃণমূলের পাশে থেকেছেন – যে কারণে মুর্শিদাবাদ, মালদা বা উত্তর দিনাজপুরের মতো নতুন নতুন এলাকাতেও তৃণমূল পায়ের তলায় জমি খুঁজে পেয়েছে। ২০১১তে তৃণমূল যখন ক্ষমতায় এসেছিল, রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজের সমর্থন তার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করা হয়। তারপর মুসলিম সমাজের একেবারে আশাভঙ্গ হয়নি তা বলা যাবে না, কিন্তু মমতার ওপর তাদের আস্থা এখনও যে অটুট আছে সেটা ভোটের ফলেই প্রমাণ হয়ে গেছে।

বিশেষ করে এটা আরও বেশি বোঝা যাচ্ছে মুর্শিদাবাদ বা মালদার ফল থেকে – রাজ্যের মুসলিম-প্রধান যে দুটো জেলাতে এতদিন তৃণমূল বিশেষ দাঁত ফোটাতে পারেনি। কংগ্রেসের গড় বলে পরিচিত এই দুই জেলাতেও তৃণমূল বেশ ভাল ফল করেছে – তাদের আসনসংখ্যা খুব একটা না-বাড়লেও শতকরা ভোটের হার অনেকটাই বেড়েছে।

তৃতীয়ত, তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ মানুষ তেমন গুরুত্ব দেননি। গোপন ক্যামেরায় নেতাদের টাকার বান্ডিল নেওয়ার ছবি গ্রামবাংলায় তো নয়ই, শহরেও তেমন প্রভাব ফেলেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল – গ্রামে না-হোক, শহরের শিক্ষিত সমাজ তৃণমূল নেতাদের টাকা নেওয়ার দৃশ্য বিরূপ প্রভাব ফেলবে – কিন্তু দেখা গেল সেই নারদ স্টিং অপারেশনের কথা ভেবে মানুষ ভোট দেননি।

শুভেন্দু অধিকারীর মতো ডাকসাইটে তৃণমূল নেতা, যাকে সেই স্টিং অপারেশনে টাকা নিতে দেখা গেছে, তিনিও কিন্তু নিজের কেন্দ্র থেকে রেকর্ড ভোটে জিতেছেন।

আসলে ‘সব কেন্দ্রে আমাকেই প্রার্থী ভেবে ভোট দিন’ – গোটা রাজ্য জুড়ে মমতা ব্যানার্জির এই আবেদন ভীষণভাবে কাজে দিয়েছে। মানুষ শেষ পর্যন্ত তার নিজের কেন্দ্রের প্রার্থীর দোষগুণ দেখে নয়, মমতা ব্যানার্জিকে দেখেই ভোট দিয়েছেন, তার উন্নয়নের কর্মসূচীতে সিলমোহর দিয়েছেন। ‘তৃণমূলে আসলে একটাই পোস্ট, বাকি সব ল্যাম্পপোস্ট’ বলে বিরোধীরা তা নিয়ে বিস্তর হাসাহাসি করেছেন – কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে ব্যক্তি মমতা ব্যানার্জির সেই দুর্নীতিমুক্ত ভাবমূর্তি, কাজপাগল সাদামাটা জীবনযাপনের ইমেজটাই তৃণমূলকে ভোটে উতরে দিয়েছে।

গ্রামবাংলায় কন্যাশ্রী বা সবুজ সাথীর মতো প্রকল্প – যাতে গ্রামের অবিবাহিত মেয়েরা আর্থিক অনুদান পেয়েছেন, স্কুলের ছেলেমেয়েরা বিনা পয়সায় সাইকেল পেয়েছেন – কিংবা সরকারি হাসপাতালের ফেয়ার প্রাইস শপে অনেক কম দামে ওষুধ কিনতে পেরেছেন – এই সব প্রকল্পেরও সুফল পেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ১৯ মে তাদের বিপুল ভোটে জেতার পেছনে এগুলোই চার নম্বর কারণ।

পশ্চিমবঙ্গে এবারের ভোটে মূল প্রশ্ন ছিল ‘পরিবর্তন টু’ না কি প্রত্যাবর্তন ? অর্থাৎ পাঁচ বছরের মধ্যে রাজ্যে আরও একবার ক্ষমতার পালাবদল, না কি মসনদে ফের মমতাই? ভোটের ফলে স্পষ্ট, প্রত্যাবর্তনের পক্ষেই রায় দিয়েছ পশ্চিমবঙ্গ। বোঝা যাচ্ছে, সাড়ে তিন দশকের বামপন্থী শাসনের অবসান ঘটিয়ে যিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন তার ওপর এত তাড়াতাড়ি মানুষ ভরসা হারাতে রাজি নয়।

বৃহস্পতিবার কলকাতায় এক বৃষ্টি ভেজা সকালে রাজ্যের মানুষের সেই রায়টাই জেনে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। দ্বিতীয় দফায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে যিনি শপথ নিতে চলেছেন আগামী ২৭মে, শুক্রবার।

পশ্চিমবঙ্গ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে