Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.0/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৫-১৭-২০১৬

বাজেটের আকার বাড়ছে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে

আবুল কাশেম ও আরিফুর রহমান


বাজেটের আকার বাড়ছে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে

ঢাকা, ১৭ মে- তিন লাখ ৪০ হাজার ছয় কোটি টাকার মধ্যে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। উন্নয়ন ভাবনা বাস্তবায়নে অনেক টাকার দরকার হলেও রাজস্ব আয়ে বড় উল্লম্ফন না থাকায় এ অঙ্ক ঠিক করেছিলেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। কিন্তু বিপত্তি বাধে খাতওয়ারি বরাদ্দের হিসাব করতে গিয়ে। হিসাব মেলাতে পারছিলেন না তাঁরা। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শনিবারের বৈঠকে কোনো কোনো খাতে আরো বেশি চাহিদার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাড়তি চাহিদা মেটাতে শেষ পর্যন্ত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকায় নিয়ে যাচ্ছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা।

আগামী ২ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে বাজেট পেশ করবেন। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অর্থমন্ত্রী তিন লাখ ৪০ হাজার ছয় কোটি টাকার বাজেট পরিকল্পনা ও খাতওয়ারি বরাদ্দ তুলে ধরেন। তখন বিভিন্ন খাতে আরো বরাদ্দ বাড়ানোর পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয় খাতওয়ারি বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শনিবারের ওই বাজেট সভায় উপস্থিত থাকা সরকারের একজন নীতিনির্ধারক গতকাল সোমবার বলেন, ‘বৈঠকে বাজেটের আকার বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় ও ঘাটতি এবং খাতওয়ারি বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বাজেটের আকার প্রয়োজনে আরো বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

চলতি অর্থবছর প্রথমবারের মতো মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭.০৫ শতাংশ অর্জন হবে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সে পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছর জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭.২ শতাংশ। সরকার আশা করছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্প নির্মাণ শেষে আগামী বছর চালু হবে। বছর শেষে তা জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকায়নের কাজ হবে আগামী অর্থবছর। তাতে শিল্প খাতের উৎপাদন বাড়বে। তার প্রভাবও প্রবৃদ্ধিতে পড়বে বলে মনে করছে সরকার।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দরপতন ও দেশে উৎপাদন ভালো হওয়ার আশায় আগামী অর্থবছর মূল্যস্ফীতি ৫.৮ শতাংশে সীমিত রাখার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের (এপ্রিল পর্যন্ত) তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের কম।

আগামী অর্থবছর থেকে সব পণ্য ও সেবার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করে নতুন আইন কার্যকর করতে যাচ্ছে সরকার। শনিবারের বৈঠকে নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা দীর্ঘ আলোচনা করেন। সব পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে তা স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। সাধারণ মানুষের ওপর যাতে এই ভ্যাট আইনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, তা মাথায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শুরুতে দুই লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরে বাজেট প্রণয়নের কাজ চলছিল। তবে বাজেটের মূল আকার বাড়ানোর তাগিদে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও বাড়িয়ে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে বাজেটে সার্বিক ঘাটতি দাঁড়াবে ৯৯ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার বিদেশি উৎস থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রাক্কলন করছে। আর দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৫৯ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। তবে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নেওয়া ঋণ যাতে ভবিষ্যতে বাজেটের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি না করে সে জন্য বাজেট ঘোষণার পরপরই সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমাবে অর্থ মন্ত্রণালয়। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমায় সরকার এ উদ্যোগ নিচ্ছে।

তবে আকার বাড়লেও বাজেট উচ্চাভিলাষী বলে মানতে নারাজ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সম্প্রতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, তাঁর দেওয়া আগের বাজেটগুলো দেখে যাঁরা উচ্চাভিলাষী বলে সমালোচনা করতেন, তাঁরাও এখন চুপ হয়ে গেছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিলে বাজেটের আকার আরো বড় হওয়া দরকার। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির অনুপাতে সর্বনিম্ন। সে কারণেই চাহিদা সত্ত্বেও বাজেটের আকার বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণ হওয়ায় এখাতে বরাদ্দ আরো বাড়াতে হচ্ছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই সরকারি চাকুরেরা দ্বিগুণ বেতনের সঙ্গে প্রথমবারের মতো দ্বিগুণ ভাতাও পাবেন। বাকি এক লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের (এডিপি) ব্যয় মেটাতে, যা ইতিমধ্যে অনুমোদন পেয়েছে। এডিপিতে বড় প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে হাত খুলে। অর্থাৎ ছোট ও মাঝারি প্রকল্প বাস্তবায়নের চেয়ে সরকার বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে ছয় হাজার ২৬ কোটি, ঢাকা মেট্রো রেল প্রকল্পে দুই হাজার ২২৬ কোটি, কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণে দুই হাজার কোটি ও পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পে চার হাজার ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড জনগণের চোখে সহজেই ধরা পড়বে বলে ধারণা নীতিনির্ধারকদের। আর এডিপি বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে প্রকল্প পরিচালক পুল বা পিডি পুল গঠনের বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা হলেও তা গঠন হয়নি। আগামী বাজেটে পিডি পুল গঠনের ঘোষণা থাকছে।

বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯৫ লাখ শ্রমিক বিদেশে কাজ করে প্রতিবছর দেড় হাজার কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। সেখানে মাত্র ৯০ হাজার দক্ষ বিদেশি বাংলাদেশে চাকরি করে প্রতিবছর রেমিট্যান্স হিসেবে নিয়ে যাচ্ছে ৫০০ কোটি ডলার। এ চিত্র সরকারকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। এ অবস্থায় জনসংখ্যার বোনাসকাল কাজে লাগাতে বেকার ও স্বল্প শিক্ষিত তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা এবং মধ্যম সারির ব্যবস্থাপকদের (মিডলেবেল ম্যানেজমেন্ট) আরো দক্ষ ও যোগ্য করে গড়ে তুলতে আগামী বাজেটে বিশেষ নজর দেবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ কয়েক গুণ বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির ভিত্তিতে ‘মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল’ নামে পৃথক একটি তহবিল গঠনের ঘোষণা থাকছে বাজেটে।

অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ জানান, মানবসম্পদ উন্নয়নে আগামী বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে সরকার। অদক্ষ শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, বেকারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ থাকবে। এ ছাড়া ব্যবস্থাপকদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে নানা ধরনের কর্মসূচি থাকবে। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে হলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিকল্প নেই। এ অবস্থায় সরকার বিদ্যমান সম্পদ ও বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

কয়েক বছর ধরেই বাজেটে সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখতে হয় সরকারের দেশি ও বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতে। এবারও তেমনটা হচ্ছে। ঋণের সুদ মেটাতে এবার সর্বোচ্চ ৪০ হাজার ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এরপর একক খাত হিসেবে শিক্ষায় সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। এর মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় পাচ্ছে ১৬ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ২০ হাজার ৪৬৮ কোটি এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নামে ১৮ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগে থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনের কারণে এ খাতে কোনো ভর্তুকি রাখা হয়নি এবার। নতুন অর্থবছরেও এ খাতে ভর্তুকির দরকার হবে না, উল্টো সরকার মুনাফা করবে বেশ। নতুন অর্থবছর ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাবদ ২৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছে সরকার। সরকার চলতি অর্থবছর গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম দিকেই তা আরেক দফা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ কমানো হচ্ছে। এ ছাড়া তৈরি পোশাক, পাট, পাটজাত পণ্যসহ বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যের প্রণোদনা কাটছাঁট করায় নতুন বছরে এ খাতে ব্যয় কম হবে বলে আশা অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের।

এফ/০৯:১৫/১৭মে

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে