Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৫-১০-২০১৬

সৈয়দ আশরাফের দায়িত্ব কমল, নাকি বাড়ল?

মাহবুব রেজা


সৈয়দ আশরাফের দায়িত্ব কমল, নাকি বাড়ল?

ঢাকা, ১০ মে- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে আবারও তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে এ খবরটি বেশ ফলাও করে ছাপা হয়েছে। স্বভাবতই এ খবরে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী এবং জাতীয় রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্নেরও। টেলিভিশন চ্যানেলের স্ক্রলে যখন সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সংবাদটি যাচ্ছিল তখন সাধারণ মানুষ তো বটেই দলের ভেতর ও বাইরে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল, সৈয়দ আশরাফ কি এবার নিজে থেকেই স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন! দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কারণে তিনি কি এবার নিজে থেকেই দল থেকে সরে দাঁড়াবেন নাকি সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে, অভিমান করে লন্ডন চলে যাবেন!

উল্লেখ্য, এর আগে গত বছর আকস্মিকভাবে আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ নিয়ে সে সময় আওয়ামী লীগসহ রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ সরগরম হয়ে উঠেছিল এবং নানা রকম গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে অবশ্য এ পরিস্থিতির সামাল দিতে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীকে। সৈয়দ আশরাফকে স্থানীয় সরকারের চেয়েও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়েছিল।

৩ মে সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে প্রতিরক্ষা কাজে নিয়োজিত দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পরিবর্তে অদ্য ৩ মে ২০১৬ খ্রি. তারিখ থেকে দায়িত্ব পালন করবেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক।’

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, ওয়ান ইলেভেনের আগে ও পরে জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং সেখান থেকে দলকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে তিনি দলীয়প্রধানের পূর্ণ বিশ্বাস এবং আস্থার জায়গা তৈরি করে নিয়েছিলেন, যা অনেক অভিজ্ঞ, বর্ষীয়ান ও ঝানু রাজনীতিকদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। মূলত সে সময় দলকে আশরাফ তার একক নির্দেশনা ও নৈপুণ্যে টিকিয়ে রেখে দলকে নিয়ে গিয়েছিলেন ক্ষমতায়। তখন দেশে এবং দেশের বাইরে আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের অপ্রতিরোধ্য নেতায় পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন। মূলত তখন থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সৈয়দ আশরাফের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, পরিমিতিবোধ ও দূরদর্শিতার কাছে পদ-পদবিসর্বস্ব নেতৃত্বের একটি অংশ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। সূত্রটি জানায়, দলের ভেতর নেতৃত্বের এ অংশটি দীর্ঘদিন ধরে দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব, গ্রুপিং, লেজুড়বৃত্তি ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান নিয়ে দলীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার সংকীর্ণ খেলায় ব্যস্ত ছিল। সৈয়দ আশরাফ দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর এসব নোংরা রাজনৈতিক কালচার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সবাইকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। সতর্ক করে দেওয়ার বিষয়টি আশরাফবিরোধীরা ভালোভাবে নেয়নি। এর পর থেকে দলের ভেতর ও বাইরে আশরাফুল ইসলামকে একটি প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হচ্ছে।

জানা যায়, আওয়ামী রাজনীতিতে অপ্রিয় সত্য কথা বলার জন্য ঠোঁটকাটা হিসেবে তার খ্যাতি রয়েছে। দলের অনেক শীর্ষ নেতা সাধারণ সম্পাদকের এ বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারেননি। তারা দলীয় সভানেত্রীর কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করলেও তিনি (প্রধানমন্ত্রী) বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি। বরং দলীয় সভানেত্রী সাধারণ সম্পাদকের পাশেই অবস্থান নিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা জানান, সৈয়দ আশরাফকে তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে আশরাফবিরোধী অংশটি যে রকম তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন এই ভেবে যে তাকে (সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম) তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে ‘সাইজ’ করা গেছে তাহলে তাদের জন্য বড় ধরনের ভুলই হবে। এই নেতা আগামী ১০-১১ জুলাই আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের বিষয়টি উল্লেখ করে জানান, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব দিক বিচার-বিশ্লেষণ ও সাম্প্রতিক রাজনীতির জটিল হিসাব-নিকাশকে সামনে রেখে দলকে প্রস্তুত করতে চাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি বিএনপি-জামায়াতসৃষ্ট নিকট ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটা সম্ভাব্য চিত্রও মাথায় রেখেছেন। সেই পরিস্থিতির সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে আর সবার চেয়ে আশরাফুল ইসলাম দলীয় সভানেত্রীর কাছে যে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও কাছের মানুষ সে কথা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করে, দেশে একের পর এক ব্লগার, মুক্তচিন্তা, ভিন্নধর্মাবলম্বী ও প্রগতিশীলদের হত্যার ঘটনায় সরকার কার্যত আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আছে। এই চাপের পরিসর অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে বলে জানিয়েছেন তারা। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না হওয়াকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করছে। নীতিনির্ধারকদের এ অংশটি মনে করে, দেশে যেকোনো হত্যাকা- ঘটলেই আমেরিকা বেশ ঘটা করে তা প্রচার করে। দেশে ব্লগার, মুক্তমনা হত্যাকা- ঘটলেই হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র প্রেস কনফারেন্স করে তা বিশ্বের কাছে তুলে ধরে। আমেরিকার এই প্রচার-প্রোপাগান্ডা এবং একই সঙ্গে এ দেশে তাদের ‘আইএস’-এর উপস্থিতিকে প্রমাণ করার চেষ্টাÑ এ বিষয়গুলোকে সুনজরে দেখছে না তারা। তারা মনে করছেন, আমেরিকা জোর করে প্রমাণ করতে চাইছে দেশে আইএস আছে এবং এই আইএসকে নির্মূল করতে তারা বদ্ধপরিকর।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি-জামায়াতসহ নামধারী ইসলামী সংগঠনগুলো দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি, একাত্তরের ঘাতকদের বিচারকাজকে বাধাগ্রস্ত করতে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে। এরা দেশে গুপ্তহত্যাসহ নানা ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে সরকারের ওপর একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে চাইছে, যাতে আন্তর্জাতিক শক্তি সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়ে ওঠে।

আওয়ামী রাজনীতি ঘনিষ্ঠরা বলছেন, কাউন্সিলকে সামনে রেখে দলের সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে দলের ভেতর দু-একজন নেতা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্য ঘোঁট পাকাচ্ছেন। তারা নানাভাবে সৈয়দ আশরাফের বিরদ্ধে নেমেছেন। লবিং-গ্রুপিং করছেন। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পর পর দুবার আশরাফের সফলতা তাদের জন্য গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা কোমর বেঁধে আশরাফুল ইসলামের বিরুদ্ধে নেমেছেন। কিন্তু তাদের এসব দৌড়ঝাঁপ আখেরে কোনো কাজে লাগবে না উল্লেখ করে তারা বলছেন, আশরাফুল ইসলামের নানা অভিযোগ, সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। দলের নেতা-কর্মীরা তাকে সব সময় তাকে তাদের পাশে পায় না। কিন্তু তারপরও দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে সততা, জনপ্রিয়তা কিংবা গ্রহণযোগ্যতায় এখনো তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার ধারেকাছে কেউ নেই।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করছেন, দলের সাধারণ সম্পাদক পদে এখন পর্যন্ত আশরাফুল ইসলামই অধিক গ্রহণযোগ্য। তার মধ্যে একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিরতা, বিবেচনা, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা রয়েছে, যেটা অন্যদের ভেতর নেই। দলের কর্মীদের সঙ্গে তার হয়ত সার্বক্ষণিক যোগাযোগ নেই কিন্তু তিনি জানেন কোন সময় সাধারণ কর্মীদের কী দিকনির্দেশনা দিতে হবে। কেন্দ্রীয় নেতাদের এই অংশটি মনে করছেন, দলের ভেতর সাধারণ সম্পাদক পদে এখনো তার পাল্লাই ভারী। আর নেত্রীর আস্থার জায়গাও তিনি অটুট রাখতে পেরেছেন। ২০১৩ সালের ঢাকায় হেফাজতের তা-বলীলা ও ৫ জানুয়ারি নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ছাপ সামলাতে শেখ হাসিনার পাশে থেকে আশরাফুল ইসলাম তার যথাযথ যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করে আওয়ামী নীতিনির্ধারকদের একজন প্রভাবশালী নেতা জানান, ক্লিন শেভে স্যুট কোট আর টি-শার্ট গায়ে দিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন, টিভি ক্যামেরার সামনে বুদ্ধিজীবীদের মতো জাতিকে নসিহত করার ভাবভঙ্গি আর প্রচারসর্বস্ব নেতাদের মনে রাখা জরুরি যে, তাদের জন্য আর যে পদই হোক না কেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ নয়। এই নেতা আরও জানান, দলীয়  সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৈয়দ আশরাফকে নিরবছিন্নভাবে দলের কর্মকা-ে আরও নিবিড়ভাবে দেখতে চান। আর সে কারণেও হয়ত তাকে এই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে পারেন। আমি মনে করি, এতে করে সৈয়দ আশরাফের দায়িত্ব আরও বেড়ে গেল। তবে তার এই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে কেউ যদি বগলদাবা করে উল্লাস করতে থাকেন, সেটা হবে তাদের না বোঝা ও মূর্খতার বিষয়।

আর/১৭:৩৪/১০ মে

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে