Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.3/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-০৯-২০১৬

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির উচ্চ হার

উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির উচ্চ হার

ঢাকা, ০৯ মে- ফের খবরের শিরোনাম শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আহছান উল্লাহ। রাজীব মীর থেকে মাহফুজুর রশিদ। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিমল তো এখন দৃষ্টান্ত! এর আগে ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এসেছে। ঘটনা একই। ছাত্রীকে যৌন হয়রানি। কুপ্রস্তাব, হুমকি-ধমকি। অব্যাহত যৌন হয়রানির জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেই দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগের মুখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোশারেফ হোসেনকে (রাজীব মীর) সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে গঠিত হয়েছে তদন্ত কমিটি।

বেসরকারি আহছান উল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহফুজুর রশিদ ফেরদৌস তো আর এক ধাপ এগিয়ে। শিক্ষার্থীদের ব্ল্যাকমেইল করে যৌন নিপীড়নের জন্য রীতিমতো আস্তানা গড়েছিলেন। পান্থপথের একটি ফ্ল্যাট তার শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের ঠিকানা। গত বুধবার তাকে গ্রেপ্তারের পর আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডেও নেয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের রায় হয়েছে ২০০৯ সালে। কমিটি গঠিত আছে প্রায় সর্বত্র। দু’চারটি বিচারের ঘটনাও ঘটেছে। নারীদের নিরাপত্তার জন্য একাধিক আইনও রয়েছে। কিন্তু, কমছে না হয়রানির ঘটনা। ইউএনউইমেন-এর এক জরিপের তথ্যমতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৮৭% ছাত্রী কোনো না কোনো ভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অশ্লীল কথাবার্তা বা কটূক্তির মুখোমুখি হন তারা। কেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন আছে। কিন্তু, প্রয়োগ নেই। সচেতনতারও অভাব রয়েছে। রয়েছে অবক্ষয়। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী মানবজমিনকে জানান, আইন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।

সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন আইন পাসের আগ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশও আইনের সমান। তাছাড়া, এসব বিষয়ের বিচারের জন্য নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনসহ অন্য অনেক আইনের সহায়তা নেয়া যায়। কিন্তু, সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাপক ক্যাম্পেইন জরুরি। সেখানে সরকারকেও মনোযোগ দেয়া দরকার। তিনি মহিলা আইনজীবী সমিতির সাম্প্রতিক জরিপের বরাত দিয়ে বলেন, অনেক স্কুল-কলেজ জানেই না যে যৌন হয়রানির তদন্তের জন্য কমিটি করা বাধ্যতামূলক। অন্তত ৫৫% শিক্ষার্থী এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশ সম্পর্কে অবগত নয়।

তাছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন না। তাদেরকেও সচেতনভাবে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। শুধু তাই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসিসহ সংশ্লিষ্ট ১৯টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত তদন্ত সেলের রিপোর্ট সরবরাহ করার বিষয়ে নির্দেশপ্রাপ্ত। কিন্তু, তা করা হচ্ছে না। সকল স্তরে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও সততা নেই। অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে করা হচ্ছে না বিচার। বরং, নানা পক্ষের তদবিরের মাধ্যমে দায়মুক্তি কিংবা বিচার এড়ানোর ব্যবস্থা পেয়ে যাচ্ছে অপরাধী। এ বিষয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেন এই আইনজীবী।

কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আরবি বিভাগের শিক্ষক এসএম রফিকুল আলমের চাকরি গেছে একই ধরনের অভিযোগে। পরিসংখ্যান বিভাগের চন্দন কুমার পোদ্দার জেল খেটেছিলেন গৃহকর্মীকে যৌন হয়রানি করার মামলায়।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তরুণ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল এক কলেজছাত্রীকে সিএনজি অটোরিকশায় যৌন হয়রানির। ওই শিক্ষার্থী ফেসবুকে এ ঘটনা প্রকাশ করার পর বিভিন্ন মহল থেকে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হয়। কিন্তু, যৌন নিপীড়ন বিরোধী তদন্ত সেলে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দাখিল না হওয়ায় তদন্তের মুখোমুখি হওয়া থেকে রেহাই পেয়ে যান ওই শিক্ষক। চবি’র অন্তত তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে গত তিন বছরে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শাস্তি ভোগ করেছেন নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুই শিক্ষক।

একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের এক শিক্ষককে করা হয়েছে বরখাস্ত। বহিষ্কৃত হয়েছে বেশকিছু শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি কামরুল হাসান মজুমদারকে শাস্তিস্বরূপ বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় ২০১৫ সালে। গত চার বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্ধশতাধিক যৌন হয়রানির অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

২০১২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক শাওন উদ্দিনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এর আগে মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষক জুলফিকারুল আমীনের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে আট বছর মেয়াদে তিন ধরনের শাস্তির সুপারিশ করে তদন্ত সেল।

সে অনুসারে, ওই শিক্ষককে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর পরীক্ষা সংক্রান্ত কোনো কাজে কখনোই যুক্ত হওয়া, তিন বছরের জন্য বিভাগের কোনো শিক্ষার্থীর পরীক্ষা ও গবেষণা তত্ত্বাবধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এ ছাড়া, ছাত্রীকে গানের প্রশিক্ষণ দেয়ার সময় যৌন হয়রানির দায়ে টিএসসির প্রশিক্ষক সানোয়ার হোসেন বরখাস্ত হন।

সমাজবিজ্ঞানের এক শিক্ষককেও শাস্তির সুপারিশ করে কমিটি। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছরে অন্তত দশটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি অভিযোগের তদন্ত শেষে শাস্তির সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু, সেই অভিযুক্তকে শাস্তি দেয়া হয়নি। বরং, তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের আগেই বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এভাবে, যৌন নিপীড়নের যেকোনো ঘটনার বিচার এড়াতে নানা মহলের সক্রিয় ভূমিকা দেখা যায়।

উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৯ সালে যৌন হয়রানির ঘটনায় সৃষ্ট তুমুল আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল শিক্ষাঙ্গনে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে একটি নীতিমালা প্রণয়ন। সেই দাবির প্রেক্ষিতে হাইকোর্টে এক রিট আবেদনের বিপরীতে আদালতের রায়ে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির রিরুদ্ধে একটি তদন্ত সেল গঠনের আদেশ দেয়া হয়। ২০১০ সালে ওই রায়ের পর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তদন্ত সেল গঠন করা হয়। এসময় ১৬ ধরনের কর্মকাণ্ডকে যৌন হয়রানি হিসেবে চিহ্নিত করে হাইকোর্ট। এর মধ্যে রয়েছে, সরাসরি কিংবা ইঙ্গিতে অশালীন আচরণ, হয়রানি বা নিপীড়নমূলক উক্তি, মন্তব্য বা ভঙ্গি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা। এছাড়া চিঠি, মোবাইল, খুদে বার্তাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে যৌন ইঙ্গিতমূলক অপমানজনক কথা লেখা, চরিত্র হননের জন্য স্থির বা ভিডিও চিত্র ধারণ করা, প্রেমের প্রস্তাব করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি দেয়া প্রভৃতি। সামপ্রতিক সময়ে সামনে আসা প্রতিটি ঘটনাই ছাত্রীদের প্রতি এইসব আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত ১৯৭৩ অধ্যাদেশ অনুসারে, নৈতিক অধঃপতন (মোরাল টারপিচিউড) ঘটলে কোনো ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের যোগ্যতা হারান। এতসব আইন ও নিয়ম থাকা সত্ত্বেও একের পর এক যৌন হওয়ানির ঘটনা ঘটছেই। এখানে সকলের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সার্বিক বিষয়ে মতামত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী বলেন, শিক্ষাঙ্গনগুলোতে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনাগুলো মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। নৈতিক অধঃপতনের বিষয়ে তিনি বিশেষভাবে নজর দিতে বলেন। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোড অব কন্ডাক্টের মধ্যেই এ বিষয়ে সবাইকে অবগত করা দরকার। স্কুল পর্যায় থেকেই নৈতিক শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। আমাদের দেশে আইন হয়েছে সত্য, তার প্রয়োগের বিষয়ে এখন বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে