Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.3/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৫-০৩-২০১৬

সত্যজিৎ ও বাঙালির জীবনে মূল্যবোধের ওঠানামা

সত্যজিৎ ও বাঙালির জীবনে মূল্যবোধের ওঠানামা

কলকাতা, ০৩ মে- বাঙালিজীবনে মূল্যবোধের সংজ্ঞাটাও বোধহয় ইদানীং পাল্টে যাচ্ছে৷সম্প্রতি  বাঙালির একাংশের আলোচনার বিষয় দেখে মনে হচ্ছে  ঘুষ দেওয়া-নেওয়া জীবনের অঙ্গ, এই লেনদেনের মধ্যেকোনও অপরাধবোধ নেই৷ আখের গোছাতে গিয়ে নিজের প্রতিবাদী সত্তাটা হারিয়ে যাচ্ছে ৷এই পরিস্থিততে  সত্যজিৎ রায়ের কিছু ছবির কথা মনে পড়ছে। যা আজও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হচ্ছে৷

সত্যজিতের প্রথম দিকের ছবিগুলির মধ্য অন্যতম ছিল মহানগর৷  গত শতাব্দীর ষাটের দশকে নরেন্দ্রনাথ মিত্রের গল্প নিয়ে তাঁর পরিচালিত এই ছবিটিতে মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়েই প্রতিবাদ উঠে আসতে দেখা যায়৷ স্বামী সুব্রতর (অনিল চট্টোপাধ্যায়) পাশাপাশি স্ত্রী আরতি (মাধবী মুখোপাধ্যায়)সংসারের দায় ঘাড়ে তুলে নিয়ে সেলস গার্লের চাকরি নেয় ৷ কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে তা নিয়ে চাপা অশান্তি, নানা জনের নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় এই দম্পতিকে৷  পরিস্থিতির চাপে সেই চাকরি ছাড়বার কথা যখন ভাবা হয় তখনই সুব্রতর ব্যাংকে তালা পড়ে৷ সময়টা ব্যাংক জাতীয়তাকরণের আগের যুগ, ফলে সেই গৃহবধূর পক্ষে  আর চাকরি ছাড়া শেষ অব্দি সম্ভব হয়নি৷ ওই মুহূর্তে অর্থনৈতিক চাপের কাছে  সামাজিক চাপ মাথা নোয়ায়৷ কিন্তু এর কিছুদিন পরে চাকরি করতে করতেই মহিলার নজরে আসে তারই এক সহকর্মীকে অন্যায় ভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হচ্ছে৷ তখনই সে প্রতিবাদ করে৷ সংসারে একমাত্র উপার্জনকারী হয়েও সেই নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়ির গৃহবধূটিনিজের ভবিষ্যত অনিশ্চিত জেনেও চাকরি ছাড়ার সাহস দেখিয়েছিল৷ ছবিতে প্রতিফলিত হয়েছিল ৫০-৬০ দশকে বাঙালির মূল্যবোধঅর্থনৈতিক চাপকে প্রতিহত করে শিরদাঁড়া সোজা রাখতে সক্ষম৷

মহানগরের এক যুগ বাদে  সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তি পেয়েছিল শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের ছবি জনঅরণ্য৷ সত্তরের প্রথমদিক–  রাজ্যজুড়ে চরম অস্থিরতা, পরীক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে৷সেই সময়ের মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে সোমনাথ (প্রদীপ মুখোপাধ্যায়) পরীক্ষার ফল আশানিরুপ হয়নি৷ চাকরির চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ ৷বেঁচে থাকতে ব্যবসা করার কথা ভাবে৷ আর ব্যবসায় বরাত পেতে গিয়ে ঘুষের কার্যকারিতা বুঝতে পারে৷ ফলেদ্বিধা থাকলেও সেই মূল্যবোধ নৈতিকতার সঙ্গে আপোস করেও ঘুষ দিতে বাধ্য হয় ওই যুবকটি৷  বড় একটা কন্ট্রাক পাওয়ার জন্য কোনও ব্যক্তিকে খুশি করতে তার ঘরে মহিলা পাঠাতেও সে শেষমেশ রাজি হয়৷ অর্থনৈতিক চাপ বাঙালির মূল্যবোধ নৈতিকতাকে প্রতিহত করে চলে যায়৷

সত্যজিত রায়ের একেবারে শেষ পর্বের ছবি হল শাখাপ্রশাখা৷

জনঅরণ্যের আরও বছর ১৫ পরে মুক্তি পেয়েছিল৷যাতে বাঙালি জীবনের অবক্ষয় নিয়ে এই বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালকের উদ্বেগই ফুটে উঠেছিল৷ছবিতে আনন্দ মজুমদার (অজিতবন্দ্যোপাধ্যায়) একজন সৎ প্রতিষ্ঠিত শিল্পকর্তা৷তাঁর চার ছেলে প্রবোধ (হারাধনবন্দ্যোপাধ্যায়), প্রশান্ত ( সৌমিত্রচট্টোপাধ্যায় ), প্রবীর(দীপঙ্করদে) ওপ্রতাপ(রঞ্জিতমল্লিক) ৷প্রশান্ত অসুস্থ কোনও কাজ করেনা বাবার কাছেই থাকেন৷প্রবোধ চাকরিজীবি এবং প্রবীর ব্যবসা করেন৷এদের বাবা একজন পুরোদস্তুর সৎ মানুষ হলেও এই দুই ভাই কেউ সৎ নন৷উভয়েরই আয়ের উৎস নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে, রয়েছে দুর্নীতি৷ সৎ বৃদ্ধটি ছেলেদের এই অধঃপতনের কথা জানতে পেরে মানসিকভাবে আঘাত পান৷তবেএটাওঠিক, গত শতাব্দীর ৯০ দশকের শুরুতে নির্মিত ওই ছবিতে আশার আলো ছিল আনন্দবাবুর ছোট ছেলে প্রতাপ চরিত্রটি, যিনি তার কাজের পরিবেশের দুর্নীতির সঙ্গে আপোস না করেই লোভনীয় চাকরিটা ছেড়ে দিতে পারেন৷

২৪ বছর আগে ১৯৯২ সালে মারা যান সত্যজিৎ রায়৷জানিনা যদি তিনি বেঁচে থাকতেন তবে বর্তমান রাজ্যের মানুষের আচরণ দেখে কোনও ছবি করার কথা ভাবতেন কিনা৷রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে নানাভাবেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে৷সারদা কেলেঙ্কারি মাধ্যমে সাধারণ মানুষের টাকা নয়ছয় করা যেমন রয়েছে তেমনই অভিযোগ উঠেছে নারদা স্টিংকাণ্ডে শাসকদলের বেশ কিছু নেতা ঘুষ নিচ্ছেন৷কোনও কিছু নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তো মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাজানো ঘটনা, ছোট্ট ছেলেদের দুষ্টু ছেলেদের কান্ড বলে অসামাজিক অনৈতিক কাজগুলিকে প্রশয় দিয়েছেন৷ক্ষমতায় থাকার জন্য কোনও রাজনৈতিকদলের এহেন আচরণ মেনে নিলেও অবাক করে রাজ্যের বহু মানুষের কথাবার্তায়৷বিশেষত ইদানীং বেশ কিছু মানুষের কথাবার্তা আলোচনা দেখে মনে হয়েছে বাঙালি জীবনে ঘুষ দেওয়া নেওয়াটা আদৌ কোনও অপরাধ নয়৷এগুলি যেন একেবারে বাঙালির জীবনযাত্রা অংশবিশেষ অর্থাৎ এনিয়ে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করার কোনও মানে হয়না৷যদিও এর বিরুদ্ধমতও আছে৷তবে জানা নেই কারা সংখ্যাগরিষ্ঠ৷

মহানগর ছবির শেষে আরতির প্রতিবাদে খুশি না হলেও নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন ওর স্বামী সুব্রত৷জন অরণ্য ছবির শেষে বাঁকা পথে কাজের বরাত পেলেও যেন অপরাধবোধে ক্লান্ত এক সোমনাথকে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল৷আর শাখাপ্রশাখা ছবিতে দুইভাই প্রবোধএবং প্রবীর অসৎ হলেও ছোটভাই প্রতাপের প্রতিবাদী আচরণকে তারিফ না করে পারা যায় না৷যা দেখে মনে হয় যারা নিজেরা জীবনে আপোস করছেন তারাও অপরাধবোধে ভোগেনএবং মূল্যবোধকে নৈতিক সমর্থন করেন ৷

শাখাপ্রশাখা ছবিমুক্তির পরে সিকিশতাব্দী সময় পেরিয়ে গিয়েছে৷প্রশ্ন, বাঙালির মূল্যবোধ ওঠানামা করে এখন কোন অবস্থায়? সত্যিই কি বড্ড অবক্ষয় হয়ে গিয়েছে নাকি চাটুকার স্তাবকদের আচরণ যাই হোক না কেন সুপ্তভাবে মূল্যবোধ নৈতিকতা বঙ্গজীবনে এখনও রয়ে গিয়েছে!

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে