Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-২৯-২০১৬

হই চই হয়, তদন্ত হয়, শাস্তি হয় না

মাহবুবুর রহমান মুন্না


হই চই হয়, তদন্ত হয়, শাস্তি হয় না

খুলনা, ২৯ এপ্রিল- সুন্দরবনে দুর্ঘটনা ঘটে, বন ও বন্যপ্রাণীর অনেক ক্ষতি হয়। তা নিয়ে প্রচারমাধ্যম এবং সরকারসহ বিভিন্ন মহলে হইচই হয়৷ মামলা হয়। তদন্ত কমিটি গঠনের পর তারা প্রতিবেদনও দেয়। কিন্তু এর বেশিরভাগই আলোর মুখ দেখে না। যে প্রস্তাবগুলো সামনে আসে তাও ঠিকমতো বাস্তবায়ন হয় না। এটাই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে পৃথিবীর একমাত্র এবং সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের।

অভিযোগ রয়েছে, গত ১৪ বছরে বনে ২৫টি অগ্নিকাণ্ড এবং ফার্নেস অয়েল, সার, সিমেন্ট ও কয়লাবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেছে বহুবার। ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু, মাস বছর পেরিয়ে গেলেও  অনেক কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয় না। যেসব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি দোষীদের বিরুদ্ধে। প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করে ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হয় না বলেই বার বার অপরাধীরা পার পেয়ে  যায়। ফলে একের পর এক দূর্ঘটনা ঘটতে থাকে বনে।

সর্বশেষ বুধবার (২৭ এপ্রিল) এক মাসের মধ্যে সুন্দরবনে চতুর্থ বারের মতো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের পাশে ২৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টের তুলাতলা এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

চতুর্থবার আগুন লাগার ঘটনায় বন বিভাগ চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. বেলায়েত হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মো. জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।


বার বার সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, এর আগে আগুন লাগার ঘটনায় স্থানীয় ১১ চোরাকারবারির বিরুদ্ধে দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। এজন্য তারা পরিকল্পিতভাবে আবারও বনে অগ্নিসংযোগ করেছেন। সুন্দরবনকে ধ্বংস করতে চক্রটি একের পর এক নাশকতা চালাচ্ছে।

এর আগে গত ২৭ মার্চ সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের নাংলি টহল ফাঁড়ির কাছে প্রথম আগুন লাগে। এর পর ১৩ এপ্রিল নাংলি ফাঁড়ি এলাকার আব্দুল্লাহর ছিলা ও ১৮ এপ্রিল একই এলাকায় আবারও আগুন লাগে।

শরণখোলা উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ রাজাপুর গ্রাম সংলগ্ন ভোলা নদী তীরবর্তী সুন্দরবনে সর্বশেষ লাগা তিন অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ১০ একর বনভূমি পুড়ে গেছে।
তৃতীয় ও চতুর্থ দফায় গত ১৩ এবং ১৮ এপ্রিল নাংলি ক্যাম্পের আব্দুল্লাহর ছিলা, পঁচাকোড়ালিয়া ও নাপিতখালি বন এলাকায় আগুনের জন্য বন বিভাগ স্থানীয় কয়েক দুর্বৃত্তকে দায়ী করে। এ ঘটনায় বন আইনে পৃথক দু’টি মামলা করে বন বিভাগ।

সুন্দরবনের অভ্যন্তরে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা ও দোষীরা শাস্তি না পাওয়ায় পূর্ব সুন্দরবনের অরণ্যে ১৪ বছরে সরকারি-বেসরকারি হিসাবে ২৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ৪টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাদে ১৩ বছরে ২১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ ও বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালের ২২ মার্চ সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জে কটকা অভায়ারণ্য প্রথম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। পুড়ে যায় ১ একর বন। এরপর ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলি ক্যাম্পের মাদ্রাসার ছিলা এলাকার ৩ একর বন পুড়ে যায়। ২৭ মার্চ আড়িয়ার খাল এলাকায় বনের ভেতরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর আড়ুয়াবেড় এলাকায় আগুনে পুড়ে যায় প্রায় ৯ শতক  বন।

২০০৫ সালের ৮ এপ্রিল ধানসাগর স্টেশনের অধীন কদলতেজি এলাকায় পুড়ে যায় আড়াই একর বন। এর ৫ দিন পর ১৩ এপ্রিল একই রেঞ্জের তুলাতলা এলাকায় পুড়ে যায় সাড়ে ৪ একর বন।

এর পরের বছরের ৩ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের ২৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টের আড়াই একর বন পুড়ে যায়। ১৯ মার্চ শরণখোলা রেঞ্জের তেরাবেকা এলাকায় পুড়ে যায় প্রায় একর বনভূমি। ২০০৬ সালের ১১ এপ্রিল চাঁদপাই রেঞ্জের  আমুরবুনিয়া টহল ফাড়ি এলাকায় পুড়ে যায় প্রায় ৫০ শতক বন। এর একদিন পর কলমতেজির টহলফাড়ির খুটাবাড়িয়া এলাকার দেড় একর, পহেলা মে নাংলির পচাকুড়ালিয়া এলাকার ৫০ শতক, এর ৩ দিন পর ৪ মে ধানসাগর স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় অগ্নিকাণ্ডে আড়াই একর বনভূমি পুড়ে যায়।

২০০৭ সালে সুন্দরবনে ৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ১৫ জানুয়ারি শরণখোলার ডুমুরিয়া ক্যাম্প এলাকায় ৫ একর, ১৯ মার্চ চাদপাই রেঞ্জের নাংলি এলাকার ২ একর ও ২৮ মার্চ একই এলাকার ৮ একর বনভূমি পুড়ে যায়।

২০১০ সালের ২০ মার্চ ধানসাগর স্টেশনের গুলিশাখালি এলাকায় প্রায় ৫ একর বন পুড়ে যায়। এর পরের বছর ২০১১ সালে মার্চ মাসে তিন দফা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ১ মার্চ নাংলি এলাকার ২ একর ও ৮ মার্চ একই এলাকার ২৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টে টানা ৩ দিনের অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সাড়ে ৩ একর বন পুড়ে যায়। এ আগুন নেভাতে না নেভাতেই ৯ মার্চ ভোলা নদী থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে গহীন বনে হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে।

২০১৪ সালের ২৫ মার্চ টানা ৩ দিনের অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় প্রায় ১০ একর বনভূমি। ২১ মে চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের ৬৫ ছিলায় আগুনে সাড়ে ৩ একর বন পুড়ে যায়।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, একের পর এক দুর্ঘটনায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়লেও সংশ্লিষ্টদের কাছে বিষয়টি যতোটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, ততোটা পাচ্ছে না।

তারা আশঙ্কা করছেন, সুন্দরবনে এভাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে তা জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। এ বন একের পর এক বিপর্যয়ের মুখে পড়লে শিগগিরই ইউনেস্কোর ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ থেকে ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যে’র তালিকায় নাম লেখাবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জেলে ও বনজীবীরা জড়িত থাকলেও অনেক সময় সুন্দরবনের অসাধু কর্মকর্তারাও জড়িত থাকেন। এসব অসাধু কর্মকর্তারা কাঠ, হরিণ ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বন্যপ্রাণী পাচারকারীসহ দেশি ও আর্ন্তজাতিক চোরাকারবারিদের পণ্য নিরাপদ রুট ব্যবহারের জন্য অন্যত্র দৃষ্টি ফেরাতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগিয়ে দেন বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসভূমি এ সুন্দরবনে।

সুন্দরবন একাডেমির পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বৃহস্পতিবার (২৮ এপ্রিল) সকালে বলেন, সুন্দরবনে একটি সংঘবদ্ধ দল বার বার আগুন লাগাচ্ছে। তা নাহলে এক মাসে চার বার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতো না। আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে শত শত একর বনভূমি। তা নিয়ে প্রচার মাধ্যম এবং সরকারসহ বিভিন্ন মহলে হই চই হচ্ছে৷ তদন্ত কমিটি গঠনের পর তারা প্রতিবেদনও দিচ্ছে। কিন্তু এর বেশিরভাগই আলোর মুখ দেখে না। যার কারণে বার বার অগ্নিকাণ্ডে পুড়ছে সুন্দরবন। তিনি সুন্দরবন সুরক্ষায় সরকারকে আরও বেশি কঠোর হওয়ার আহবান জানান।

সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনের খুলনার আহবায়ক প্রফেসর আব্দুল মান্নান বলেন, সুন্দরবন আমাদের জন্য শুধু গর্বেরই নয়, ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় জনপদের কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এই বন বর্মের মতো কাজ করে। কিন্তু রাষ্ট্রের উদাসীনতা ও নীতিমালাহীনতা, রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সীমাহীন লুটেরা মনোবৃত্তি, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অবাধে বনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ লুন্ঠন, অভ্যন্তরের নদ-নদী দিয়ে বিশালাকৃতির নৌ-যানের যাতায়াত- সুন্দরবনের প্রতিবেশ-পরিবেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এফ/১০:২৫/২৯এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে