Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৪-২৭-২০১৬

নিহত ৩৫ : ১৪ মাসে ৩৪ হামলা

টিপু সুলতান


নিহত ৩৫ : ১৪ মাসে ৩৪ হামলা

ঢাকা, ২৭ এপ্রিল- ধর্মীয়, গোষ্ঠীগত সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিশানা করে একের পর এক আক্রমণ ও গুপ্তহত্যার মাধ্যমে দেশে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে তৎপর উগ্র গোষ্ঠীগুলো।

বিশ্লেষকদের ধারণা, অপেক্ষাকৃত সহজ নিশানায় একের পর এক হামলা ও গুপ্তহত্যার মধ্য দিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেওয়ার পাশাপাশি দেশে বড় ধরনের নাশকতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চাইছে জঙ্গিরা।

আন্তর্জাতিক দুই জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস (ইসলামিক স্টেট) ও আল-কায়েদার মতাদর্শ অনুসরণকারী দেশীয় এসব জঙ্গি গত ১৪ মাসে অন্তত ৩৪টি হামলা করেছে বলে সন্দেহ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব হামলায় নিহত হয়েছেন ৩৫ জন। আহত ব্যক্তির সংখ্যা ১২৯।

এসব ঘটনার মধ্যে ১৫টির ‘দায় স্বীকার’ করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস। আর আটটি ঘটনার ‘দায় স্বীকার’ করেছে আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের (একিউআইএস) কথিত বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলাম।

পুলিশ বলছে, আইএসের নামে দেশীয় সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি অংশ এসব হামলা ও গুপ্তহত্যা চালাচ্ছে। আর আল-কায়েদা বা একিউআইএসের নামে ঘটনাগুলোতে জড়িত আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।

আনসারুল্লাহ বাংলা টিমই এখন আনসার আল ইসলাম নাম ধারণ করেছে। এই সংগঠনই এখন আল-কায়েদার বাংলাদেশ শাখা বলে দাবি করে ব্লগার ও প্রকাশক হত্যার দায় স্বীকার করছে। সর্বশেষ গত সোমবার বিকেলে রাজধানীতে জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় হত্যারও দায় স্বীকার করেছে আনসার আল ইসলাম। তাঁরা সমকামীদের অধিকার নিয়ে কাজ করতেন। এ কারণে তাঁদের হত্যা করা হয়েছে বলে গতকাল মঙ্গলবার টুইটার বার্তায় আনসার আল ইসলাম দাবি করেছে।

দেশে আইএস বা আল-কায়েদার অস্তিত্ব নেই বলে মাস সাতেক ধরে সরকারের পক্ষ থেকে জোরের সঙ্গে বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এ দুই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর অনুসারী দুটি উগ্র গোষ্ঠী গত বছরের শুরুর দিকে নতুন করে সক্রিয় হয়। অনেকটা পাল্লা দিয়ে দুই পক্ষই গুপ্তহত্যা বা নাশকতায় নামে।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যার পর নতুন করে আলোচনায় আসে আনসারুল্লাহ বা আনসার আল ইসলাম। এরপর একে একে সাতটি গুপ্তহত্যার ঘটনার দায় স্বীকার করে সংগঠনটি। সেগুলো হলো ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায়, প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিম উদ্দিন এবং সর্বশেষ জুলহাজ ও মাহবুব তনয় হত্যা।

এসব ঘটনা পর্যালোচনায় দেখা যায়, আনসারুল্লাহর ধরন হলো, ঘাড়ে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা। তবে সর্বশেষ তিনটি ঘটনায় আঁততায়ীদের কাছে পিস্তলও ছিল। এই গোষ্ঠী ঘরে ঢুকে দিনদুপুরে হত্যা করে এমন ধারণা সৃষ্টি করতে চাইছে যে তারা চাইলে ঘরে-বাইরে যেকোনো স্থানে মানুষ হত্যা করতে পারে। ব্লগার ওয়াশিকুরকে সকালবেলা রাস্তার ওপর, নীলাদ্রিকে দুপুরবেলা ঘরে ঢুকে স্ত্রীর সামনে আর জুলহাজ ও তনয়কে বিকেলে নিজ বাড়িতে খুন করা হয়েছে। এর আগে গত বছরের ৩১ অক্টোবর দিনদুপুরে জঙ্গিরা জোড়া হামলা করেছে। ওই দিন আজিজ মার্কেটে নিজ কার্যালয়ে জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিনকে খুন করে বাইরে দরজা বন্ধ করে চলে যায় তারা। প্রায় একই সময়ে লালমাটিয়ায় আরেক প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে ঢুকে প্রকাশক আহমেদুর রশিদ চৌধুরীসহ তিনজনকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। আর নাজিমকে হত্যা করা হয় পুরান ঢাকার জনবহুল রাস্তায় ৬ এপ্রিল সন্ধ্যায়। এসব ঘটনার মধ্যে শুধু ওয়াশিকুর হত্যা মামলার তদন্ত শেষে আনসারুল্লাহর পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। বাকি ঘটনাগুলোর এখনো কোনো কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। আনসারুল্লাহ মূলত রাজধানী বা নগরকেন্দ্রিক সংগঠন। এই গোষ্ঠী ঢাকার বাইরে শুধু সিলেটে ব্লগার অনন্ত হত্যায় সন্দেহভাজন।

জঙ্গিবাদবিষয়ক বিশ্লেষক, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. নুর খানের মতে, ‘শেষ কয়েকটি ঘটনায় ঘরে বা কার্যালয়ে ঢুকে গেরিলা কায়দায় আক্রমণ হয়েছে। ধরন দেখে মনে হচ্ছে, এই জঙ্গিগোষ্ঠীর নেতৃত্বে সামরিক বিদ্যায় পারদর্শী লোকজন আছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত ও পলাতক মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক আনসারুল্লাহ বা আনসার আল ইসলামের সামরিক শাখার নেতৃত্বে এসেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার তিনটি স্থানে আনসারুল্লাহর আস্তানা থেকে উদ্ধার করা কাগজপত্র পর্যালোচনা ও গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এটা জানা গেছে।

অপর দিকে আনসারুল্লাহর আট বছর আগে জন্ম নেওয়া জঙ্গি সংগঠন জেএমবির একটি অংশ গত বছরের এপ্রিল থেকে নতুন করে, নতুন মাত্রায় মাঠে নামে। এই সংগঠন গত বছরে ২৬টি হামলায় প্রধান সন্দেহভাজন। এসব ঘটনায় ২৭ জন নিহত এবং ১২৩ জন আহত হন। এগুলোর মধ্যে ১৫টি হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস।

জেএমবি নতুন করে সক্রিয় হওয়ার পর গত বছরের ২১ এপ্রিল রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ায় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের কাঠগড়া শাখায় ডাকাতি করে। এ ঘটনায় আটজন নিহত হন। পুলিশ তদন্ত শেষ করে গত ডিসেম্বরে জেএমবির ১১ জঙ্গির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের কথিত ল্যাংটা ফকির রহমতউল্লাহ ও তাঁদের খাদেমকে জবাই করে হত্যার ঘটনায়ও জেএমবির জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। হত্যাকারী ধরাও পড়েছে।

জেএমবির নতুন মাত্রার তৎপরতার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে আইএস। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার গুলশানে ইতালির নাগরিক তাবেলা সিজার এবং এর পাঁচ দিনের মাথায় রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে হত্যার পরপর দায় স্বীকার করে আইএস। সাইট ইন্টেলিজেন্ট গ্রুপ নামে ইন্টারনেটে জঙ্গি তৎপরতা নজরদারি মার্কিন একটি ওয়েবসাইট এই দাবির খবর প্রথম প্রকাশ করে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সঙ্গে সঙ্গে আইএসের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলা হয়, এ দেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের আইএসের ‘সমন্বয়ক’ বা সদস্য বলে উল্লেখ করেছিল পুলিশ।

পুলিশের জঙ্গি দমন-সংক্রান্ত সেলের প্রধান উপমহাপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম বলেন, জেএমবিই ঘটনা ঘটিয়ে আইএস বলে দাবি করছে। তদন্তে এ দেশে আইএসের সাংগঠনিক কোনো অস্তিত্ব তাঁরা খুঁজে পাননি। আল-কায়েদার কোনো শাখা আছে এমন তথ্য-প্রমাণও তাঁরা এখনো পাননি।

এ যাত্রায় জেএমবির লক্ষ্যবস্তুতে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে শিয়া সম্প্রদায়, খ্রিষ্টান ধর্মযাজক, হিন্দু মন্দির ও পুরোহিত এবং আহমদিয়া মসজিদসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামে যেভাবে বেছে বেছে গুপ্তহত্যা করা হয়েছে, তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত এসব হামলায় আইএসের নামে দায় স্বীকারের বার্তা এসেছে। ইরাক ও সিরিয়ায় শিয়ারা আইএসের হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় এ দেশেও শিয়াদের জেএমবি টার্গেট করেছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া জেএমবির পুরোনো টার্গেট মাজার-খানকায়ও কয়েকটি হামলা হয়েছে, সেগুলোতে আইএস দায় স্বীকার করেনি।

আইএস দায় স্বীকার করেছে এমন ১৫টি ঘটনার মধ্যে ১৪টিতে জেএমবি জড়িত বলে পরে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। যদিও বেশির ভাগ ঘটনায় তদন্ত শেষ হয়নি। ঢাকায় ইতালির নাগরিক হত্যায় বিএনপির কয়েকজন নেতা জড়িত বলে পুলিশ দাবি করেছে। কিন্তু গত সাত মাসেও পুলিশ অভিযোগপত্র দিতে পারেনি।

জেএমবির বেশির ভাগ ঘটনায় দেখা যায়, মোটরসাইকেলে করে তিনজন আঁততায়ী ঘটনাস্থলে গেছে। তারা গুলি করে হত্যা বা বোমা নিক্ষেপ করে পালিয়েছে। একাধিক ঘটনায় এভাবে পালানোর সময় জনতার হাতে কয়েকজন ধরাও পড়েছে। আর জেএমবির আক্রমণ ও তৎপরতার বেশির ভাগই দেশের উত্তরাঞ্চলকেন্দ্রিক।

এ দেশে জঙ্গি তৎপরতার শুরু থেকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক নুর খান। তিনি বলেন, ‘জেএমবি ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারা দেশে একযোগে বোমা হামলার আগের কয়েক বছর বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু নাশকতা ও হামলা করেছিল। গত এক বছরের তৎপরতায় মনে হচ্ছে, আবার বড় কিছু ঘটাতে জঙ্গিরা প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে