Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-২৭-২০১৬

কানাডায় বাঙালি সংস্কৃতির এক অদম্য প্রেরণা

দেওয়ান মাহমুদ


কানাডায় বাঙালি সংস্কৃতির এক অদম্য প্রেরণা
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশনা

অটোয়া, ২৭ এপ্রিল- বাংলা নববর্ষ ১৪২৩ বরণ উপলক্ষে কানাডার রাজধানী অটোয়ায় আয়োজন করা হয়েছিল ব্যতিক্রমী এক সাংস্কৃতিকসন্ধ্যার। অটোয়ার সুপরিচিত বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক সংগঠন সঞ্চারী ১৬ এপ্রিল শুক্রবার এর আয়োজন করে। সংস্কৃতিসেবীদের উদ্যম ও পরিশ্রমের ফসল ছিল মনোমুগ্ধকর আয়োজন সঞ্চারী সন্ধ্যা ২০১৬। এবারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল যেতে হবে যোজন দূর। উল্লেখ্য, সঞ্চারীর এটি ছিল ষষ্ঠ আয়োজন। প্রতি বছরই সংগঠনটি বাংলা নববর্ষ বরণ উপলক্ষে অটোয়াবাসীর জন্য নিয়ে আসে ভিন্ন স্বাদের আয়োজন। অটোয়ার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৈলাস মিতাল থিয়েটারে সঞ্চারী সন্ধ্যার সহআয়োজক ছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সুকারা। সঞ্চারীর এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রির অর্থ সুকারার মাধ্যমে কানাডার সুপরিচিত শিশু হাসপাতাল চিলড্রেন হসপিটাল অব ইস্টার্ন অন্টারিওর (CHEO) শিশু কল্যাণ তহবিলে প্রদান করা হবে।

অনুষ্ঠানে অটোয়াসহ পার্শ্ববর্তী শহরগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক দর্শক যোগদান করেন। সপরিবার উপস্থিত থেকে প্রায় পুরো অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেন কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার কামরুল আহসান। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অটোয়া ওয়েস্ট-নেপিয়েন থেকে নির্বাচিত কানাডার ফেডারেল এমপি মিস অনিতা ভ্যানডেনবেল্ড। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে কামরুল আহসান এ ধরনের ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য সঞ্চারীকে ও এর আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রবাসে বাঙালির সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেওয়া ও বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ার ক্ষেত্রে এমন সাংস্কৃতিক আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এ অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম।

অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে সঞ্চারী ও এর ষষ্ঠ আয়োজন সম্পর্কে দর্শকদের সামনে সূচনা বক্তব্য দেন সংগঠনের পক্ষে রিজওয়ানা আলমগীর। সমবেত কণ্ঠে সারগামের মাধ্যমে মঞ্চের পর্দা উন্মোচিত হয়। তারপর এসো হে বৈশাখ এসো এসো গানটির মধ্য দিয়ে নতুন বর্ষকে স্বাগত জানানো হয়। সমবেত কণ্ঠে গানটি পরিবেশন করেন অপূর্ব দাস, ফারজানা মাওলা, মাসুদুর রহমান, শারমিন সিদ্দিক, শিশির শাহনেওয়াজ, শম্পা মারিয়া, সাদী রোজারিও, আরেফিন কবির, রিজওয়ানা আলমগীর, ফয়সাল আরিফ, নন্দিতা ঘোষ, তপু ঘোষ, আবির, মেসবাহ আলম ও দেওয়ান মাহমুদ। নীল অঞ্জন ঘন পূঞ্জ ছায়ায় সম্বৃত অম্বর গানটির সমবেত উচ্চারণের সঙ্গে চমৎকার নৃত্য পরিবেশন করে শিশু নৃত্যশিল্পীদের দল। তারপর সমবেত কণ্ঠে বর্ষার পদধ্বনির সংগীত প্রচণ্ড গর্জনে, আসিল একি দুর্দিন, দারুণ ঘনঘটা ও দারুণ অগ্নি বাণে রে, হৃদয় তৃষায় হানে রে গান দুটির সঙ্গে পরিবেশিত হয় নৃত্য। ঈশিতা নাসরিন খানের পরিচালনায় এ পর্বের নাচগুলো পরিবেশন করে অহর্ণা, অ্যালিসিয়া, আরিয়ানা, আরিশা, বাশিরা, এলসা, কাঞ্চি, লরিন, মুবিনা, নিউশা, নবনীপা, পৃথা, পৃথিকা, রোদসী, তানিশা, সাভিকা ও ইউসরা। এরপর বৃন্দকণ্ঠে শিল্পীরা পরিবেশন করেন প্রাণ চায় চক্ষু না চায় গানটি। এ গানের পরপরই শিশুশিল্পীদের দল পরিবেশন করে হারে রে রে রে রে রে আমায় ছেড়ে দেরে দেরে গানটি। বৈশাখী রঙের পোশাক আর হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে গানটি গেয়ে তারা মুগ্ধ করে শ্রোতাদের। খুদে শিল্পীদের এ দলে ছিল আলিয়া, আরিশা, অদ্রিব, রায়া, রুহান, বর্ষণ, সহীহ্ ও সামী।

এ পর্যায়ে কবি আবিদ আজাদের খিড়কি কবিতাটি আবৃত্তি করেন তাপসী দাস। বিদ্রোহী কবি নজরুলের প্রবর্তকের ঘুর চাকায় কবিতাটির বৃন্দ আবৃত্তির ছন্দে দর্শকদের মুগ্ধ করেন আবৃত্তিশিল্পী মাসুদুর রহমান, তাপসী দাস, শম্পা মারিয়া ও দেওয়ান মাহমুদ। একাদিক্রমে তাঁরা বৃন্দ আবৃত্তিতে আরও পরিবেশন করেন কবি ইস্তেকবাল হোসেনের প্রতিবাদী কবিতা আজ মিছিলে বন্যা হবে।

এরপর সঞ্চারীর শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন আবার জমবে মেলা বটতলা হাটখোলা গানটি। বাংলার কথা আর গানে বিশ্বের সম্মান ছিনিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত হয় এ গানে। এরপর শামা, অজন্তা, শম্পা, রিজওয়ানা ও নন্দিতা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন বাংলার লোকজীবনের চিরায়ত গান আজি বাহাহাল করিয়া বাজানরে দোতরা, সুন্দরী কমলা নাচে। আবেদনময়ী এ গানের তালে তালে শিশু নৃত্যশিল্পীরা পরিবেশন করে চমৎকার নাচ। এই গানটির পরে কিবোর্ডের সুরের ঝংকার ও মৃদুমন্দ লয়ে পরিবেশিত হয় তিনটি ডুয়েট। সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে গেয়ে দর্শকদের কিছুক্ষণের জন্য ভালোবাসার সংজ্ঞা কী সে বিষয়ে ভাবিয়ে তোলেন শিশির-রিজওয়ানা। এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে নাতো মন গানটির আবেশে দর্শকদের বৃষ্টিস্নাত দিনের পরশ পাইয়ে দেন সাদী রোজারিও ও অজন্তা। আর রোমান্টিক গান যেথা রামধনু ওঠে হেসে, আর ফুল ফোটে ভালোবেসের মিষ্টি সুরে দর্শকদের এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যান দেওয়ান মাহমুদ ও শম্পা মারিয়া। সমগ্র অনুষ্ঠান জুড়ে তবলায় সংগত করেন সাদী রোজারিও; কিবোর্ড ও গিটার ও বেইসে আরেফিন কবির এবং অক্টোপ্যাড ও তবলায় মেসবাহ আলম ৷ সুরের ঝংকারে তাঁরা মাতিয়ে রাখেন দর্শক-শ্রোতাদের ৷ পিয়ানোয় শিশির শাহনেওয়াজ, কিবোর্ডে রিজওয়ানা আলমগীর ও হারমোনিয়ামে ছিলেন ফারজানা মাওলা ও নন্দিতা ঘোষ।


নৃত্য পরিবেশনা

এরপর সকল শিল্পী সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন নজরুলের সেই বিখ্যাত গান, দুর্গম গিরি কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার হে...কান্ডারি হুঁশিয়ার। এ গানের তালে নৃত্য পরিবেশন করে শিশু নৃত্যশিল্পীরা। এ গানটির পর যুগলকণ্ঠে তাপসী দাস ও মাসুদুর রহমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পথের বাঁধন আবৃত্তি করেন। এর পরপরই পরিবেশিত হয় সৈয়দ শামসুল হকের নূরলদীনের সারা জীবন। কবিতার পর সমবেত কণ্ঠে নোঙর তোল তোল সময় যে হলো হলো ও দৃষ্টি আমার দিগন্তে...যেতে হবে যোজন দূর, সীমানা ছাড়িয়ে পরিবেশন করে প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে।

সঞ্চারী সন্ধ্যার এ পর্যায়ে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয় হাইকমিশনার কামরুল আহসানকে। শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর তাঁকে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করেন ঈশিতা নাসরীন খান। এরপর অনুষ্ঠানের সহআয়োজক সুকারা'র কার্যক্রম সম্পর্কে উপস্থাপন করেন মুজিব খান। এরপরই বিশ মিনিটের বিরতিতে চলে যায় সঞ্চারী সন্ধ্যা। বিরতির সময়ে দেশীয় নানান খাবারের আয়োজন করেছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সুকারা। এই খাবার বিক্রির অর্থও অনুদান করা হবে শিশু হাসপাতালকে (CHEO)।

বিরতির পর অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে শিশির শাহনেওয়াজের সম্পাদনায় ঢাকার এফডিসি তথা ঢালিউডের বাংলা সিনেমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ওপর একটি গবেষণামূলক ও তথ্যনির্ভর প্রামাণ্যচিত্র উপস্থাপন কর হয়। প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছেন কাজী সিরাজুল মাওলা।

এরপর অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ, সঞ্চারী পরিবেশিত নাটক জীবনের সন্ধানে। ঢাকাই চলচ্চিত্রের চিরাচরিত কাহিনিনির্ভর এ নাটকের সূত্রধর, এককালের আইন-আদালত খ্যাত উপস্থাপক ব্যারিস্টার রেজাউর রহমান তুলে ধরেন নাটকের কাহিনি সংক্ষেপ। তার উপক্রমণিকার পরপরই জীবনের সন্ধানে নাটকে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সালমান ও তার সহপাঠী মৌসুমির প্রণয় এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের কারণে তাদের মাঝে যোজন দূর ব্যবধান। মৌসুমির শিল্পপতি বাবা, চৌধুরী সাহেব কিছুতেই মেনে নিতে চান না এ সম্পর্ক। ওদিকে তাদেরই এক সহপাঠী, সুচতুর ও শিকদার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় সালমান-মৌসুমির মাঝে।

নায়ক সালমান চরিত্রে অভিনয় করেন আবির। মৌসুমি চরিত্রে শামা। ওদিকে খলনায়ক শিকদার চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ে আলোচিত হন ফয়সাল আরিফ। বিভিন্ন চরিত্রে ছিলেন জুলফি সাদিক (চৌধুরী সাহেব), সুরমা রহমান (সোমার মা), রোজেল (পুলিশ অফিসার পুলক) ও মৌমিতা (সোমা)। নাটকের ডায়ালগ প্রম্পট করেন শামস সাদিক (খুকি)। রচনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন শিশির শাহনেওয়াজ। নাটকের বিভিন্ন পর্যায়ে দৃশ্যের সঙ্গে সংগতি রেখে সঞ্চারী শিল্পীরা পরিবেশন করেন বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় বিভিন্ন গান।

সুরেলা কণ্ঠে নন্দিতা ঘোষ শোনান, এই মন তোমাকে দিলাম, এই প্রেম তোমাকে দিলাম; তুমি চোখের আড়াল হও, কাছে কিবা দূরে রও...। অপূর্ব দাস পরিবেশন করেন, চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা, ভালোবাসো যদি, কাছে এসো না...। ফারজানা মাওলা সুমিষ্ট কণ্ঠে গেয়ে শোনান অশ্রু দিয়ে লেখা এ গান, যেন ভুলে যেও না গানটি। সাদী রোজারিও পরিবেশন করেন দিন যায়, কথা থাকে। আরেফিক কবির পরিবেশন করেন হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস দম ফুরাইলে ঠুস। রিজওয়ানা আলমগীরের চমৎকার ও সুললিত পরিবেশনায় আমি রজনীগন্ধা ফুলের মতো গন্ধ বিলিয়ে যাই। শিশির শাহনেওয়াজের ভরাট কণ্ঠের আমি চক্ষু দিয়া দেখতে ছিলাম জগৎ রঙ্গিলা গানের মাঝে আনে ভিন্ন আমেজ। সমবেত কণ্ঠে শিশির শাহনেওয়াজ, দেওয়ান মাহমুদ, সাদী রোজারিও, অপূর্ব কুমার দাস, আরেফিন কবির ও তপু ঘোষ পরিবেশন করেন জনপ্রিয় গান আছেন আমার মুক্তার, আছেন আমার ব্যারিস্টার গানটি। যুগল কণ্ঠে শিশির শাহনেওয়াজ ও রিজওয়ানা আলমগীরের আমি একদিন তোমায় না দেখিলে, তোমার মুখের কথা না শুনিলে দর্শকদের দারুণ মাতিয়ে রাখে। সবশেষে নাটকের যবনিকা পাতের ঠিক শেষ মুহূর্তে সকল শিল্পী, কলাকুশলী ও সূত্রধর সমস্বরে পরিবেশন করেন জীবনের গল্প, আছে বাকি অল্প, যা কিছু দেখার নাও দেখে নাও, যা কিছু বলার যাও বলে যাও, পাবে না সময় আর হয়তো...। এরপর সূত্রধরের উপসংহারের মাধ্যমে সমাপ্ত হয় সমগ্র অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের যোগাযোগ, গণমাধ্যম ও কারিগরি ব্যবস্থাপনায় ছিলেন কাজী সিরাজুল মাওলা; হিসাব ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় মাহমুদুল আলম। শব্দ নিয়ন্ত্রণে জামিল খন্দকার। বিশেষ সহযোগিতায় তপন পাল। অনুষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষকতা করেন শাহ বাহাউদ্দিন, ড. মনজুর চৌধুরী, জিপসি ঘোষ, ব্যারিস্টার মো. শামীম হাসান, এ কে এম ইকবাল হোসেন, সিন মং, কাজী মাওলা বাদল, সুবীর পাল, কুমার সরকার ও দেওয়ান শাহিন (পালকি কুইজিন)। চিত্রগ্রহণে গোলাম রব্বানী, জামাল চৌধুরী ও মোতাহের হোসেন।

তথ্য ও বিনোদনের সমাহারে, ভিন্ন আমেজে, ব্যতিক্রমী একটি সন্ধ্যা উপহার দেওয়ার জন্য সঞ্চারী অবশ্যই ধন্যবাদ পাবে অটোয়াবাসীর কাছে। আর এভাবে বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়বে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে, বিশ্বব্যাপী। এ প্রত্যাশা সকলের মতো লেখকেরও।

এফ/০৭:৫৭/২৭ এপ্রিল

কানাডা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে