Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 4.5/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-২৬-২০১৬

ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলির বৈশাখী মেলা

শিব্বীর আহমেদ


ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলির বৈশাখী মেলা

ওয়াশিংটন, ২৬ এপ্রিল- বর্ণাঢ্য ও বর্ণিল আয়োজনে ওয়াশিংটনে উদ্‌যাপিত হয়েছে বাঙালির বৈশাখী মেলা ও বাংলা নববর্ষ উৎসব ১৪২৩। বৃহত্তর ওয়াশিংটনের বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলির আয়োজনে ২৩ এপ্রিল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের অদূরে পোটম্যাক নদীর তীরে ভার্জিনিয়ার আর্লিংটনের গেটওয়ে পার্কের উন্মুক্ত মাঠে এই বৈশাখী মেলা ও বাংলা নববর্ষ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে লালনের গানের মূর্ছনায় বৃহত্তর ওয়াশিংটনপ্রবাসী হাজারো দর্শককে মাতিয়ে নাচিয়ে রাখে ব্যান্ডদল লালন আর তার ক্ষ্যাপা বাউল সুমি।

মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা। বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও গর্বিত ঐতিহ্যের রূপময় ছটায় বৈশাখকে এভাবেই ধরাতলে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবির কিরণে হাসি ছড়িয়ে পুরোনো বছরের সব গ্লানি, অপ্রাপ্তি, বেদনা ভুলে গিয়ে নব আনন্দে জাগিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাল বৃহত্তর ওয়াশিংটনের বাঙালি সমাজ। শুভ সূচনা হলো একটি নতুন বছরের। শুভ নববর্ষ। স্বাগত ১৪২৩।

ওয়াশিংটন ডিসি, মেরিল্যান্ড ও ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালিরা ওই দিন নতুন বছরকে আবাহন জানান। হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় সবাই মেতে ওঠেন বাঁধভাঙা উল্লাসে। উৎসব, আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরে যায় গেটওয়ে পার্কের খোলা ময়দান। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো সব জরা গ্লানিকে মুছে ফেলে সকলে গেয়ে ওঠেন নতুন দিনের গান। বৈশাখী উৎসবের এই আয়োজনের মধ্যে দিয়ে বৃহত্তর ওয়াশিংটন প্রবাসী বাঙালিরা যেন খুঁজে পান তার শিকড়। আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার হিসাব চুকিয়ে নতুন করে পথচলা শুরু হয় বৃহত্তর ওয়াশিংটন প্রবাসী বাঙালিদের। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসবে নববর্ষ উদ্‌যাপনে সবাই একসঙ্গে গাইল এসো হে বৈশাখ এসো এসো।

এই গানের মধ্যে দিয়ে মেরিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া ও ওয়াশিংটনের সবখানেই দোল দিয়ে গেল বৈশাখী উন্মাদনা। মুড়ি মুড়কি, মণ্ডা মিঠাইয়ের সঙ্গে সঙ্গে নাচে-গানে, ঢাকে-ঢোলে, শোভাযাত্রায় পুরো বৃহত্তর ওয়াশিংটন প্রবাসী বাঙালিরা বরণ করে নিল নতুন বছরকে। কেউ কেউ সকালবেলা থেকেই মেতে উঠেছিলেন নগর সংস্কৃতির দান পান্তা-ইলিশ খাওয়ার উৎসবে। খোলা হলো বছরের নতুন হিসাব নিয়ে হালখাতা। চলেছে মিষ্টিমুখের আসর।

সকাল থেকেই অনুষ্ঠানস্থল জুড়েই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু দুপুর পার হতেই বৈরী আবহাওয়া তার লাগাম টেনে ধরে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালো হতে থাকে আবহাওয়া। সকালবেলা বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনুষ্ঠান শুরু করতে বিলম্ব হয় অনেকটাই। আবহাওয়া ভালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রংবেরঙের পোশাক পরে বৃহত্তর ওয়াশিংটনপ্রবাসী বাঙালিরা সপরিবারে আর্লিংটনের গেটওয়ে পার্কে হাজির হতে থাকেন। বেলা প্রায় আড়াইটার দিকে মূল মঞ্চে ব্যান্ডদল বিবাগির ব্যান্ড সংগীত দিয়ে শুরু হয় মূল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মেলায় যাইরে মেলায় যাইরে গানের মাধ্যমে ব্যান্ডদল বিবাগির ব্যান্ড সংগীতের তালে তালে নববর্ষ বরণের আনন্দে মেতে সবাই। ব্যান্ড সংগীতের পরিবেশনা শেষে মঞ্চে আসে দলীয় নৃত্য নিয়ে সিন্থিয়া, শ্রুতি, রিয়া, পিয়না, মুন, অড্রি, র‍্যাচেল, মাট্রি ও শ্রেয়া। নৃত্যের কোরিওগ্রাফিতে ছিলেন সিন্থিয়া। দলীয় নৃত্য শেষে একক সংগীত পরিবেশন করে কৌশিক বড়ুয়া, রবিউল আলম ও সামিয়া জুবায়ের।


একক সংগীত পরিবেশনা শেষে আবারও দলীয় নৃত্য নিয়ে মঞ্চে আসে মঞ্জুরি নৃত্যালয়। শিল্পী রোজারিওর কোরিওগ্রাফিতে দলীয় নৃত্যে অংশগ্রহণ করে পিটার, এলিজাবেথ, সামান্থা, আদ্রিয়া, এরিকা, অনন্ত, আরিয়ানা, সান্দ্রা, মনীষা, রিতি ও শরিল। এরপর মঞ্চে আসেন অনুষ্ঠানের গ্র্যান্ড স্পনসর ডাটা গ্রুপের সিইও জাকির হোসেইন। তিনি তার শুভেচ্ছা বক্তব্যের শুরুতে সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান ও পরে তিনি ডাটা গ্রুপের কার্যক্রমের ওপর বিশেষ আলোকপাত করেন। ডাটা গ্রুপের পরপরই শুভেচ্ছা বক্তব্য নিয়ে আসেন অনুষ্ঠানের গোল্ড স্পনসর রুক্সানা পারভিন।

ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলির পক্ষ বৃহত্তর ওয়াশিংটনের আটজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করার ঘোষণা প্রদান করেন আবু রুমি ও আকতার হোসেইন। অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তরা হলেন অর্থনীতিবিদ ড. ফায়জুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ ড. বদরুল হুদা খান, সাংবাদিক সুবীর কাস্মীর পেরেরা, মোহাম্মদ জাহিদ, রিয়েলটর আবু হক, ব্যান্ড শিল্পী শামশীষ সুহাষ, নাইম রহমান ও ইনাম হক।

এরপর মঞ্চে দলীয় সংগীত নিয়ে আসে ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলির শিল্পীরা। এসো হে বৈশাখ এসো, ধিতাং ধিতাং বলে ও বসন্ত বাতাসে সইগোসহ পরপর তিনটি সংগীত পরিবেশন করে তারা দর্শক-শ্রোতাদের মন জয় করে নেন। এই পর্বে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন শামসুন পারভিন, ফাহমিদা শম্পা, রচনা মাওলা, সাবরিনা রহমান, অ্যামেলিয়া শারমিন, বুলবুল আক্তার, শিমুল সরকার, রুক্সানা পারভিন ও শম্পা বণিক।

দলীয় সংগীত শেষে একক সংগীত পরিবেশন করে প্রীতি, টগর, কালাচাঁদ সরকার, শেখ মাওলা, উৎপল বড়ুয়া ও আফসানা সিরাজ। এরপর নৃত্যশিল্পী মিতু গনজালভেজের পরিচালনা ও কোরিওগ্রাফি নিয়ে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে সৃষ্টি নৃত্যাঙ্গন। নৃত্য শেষে আবু রুমির আমন্ত্রণে মঞ্চে এসে কবিতা আবৃতি করেন ওয়াশিংটন প্রবাসের বিশিষ্ট কবি হারুন চৌধুরী।

এরপর মঞ্চে আসে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ বাংলাদেশ থেকে আগত ব্যান্ডদল লালন। ব্যান্ডদলে ছিলেন নিগার সুলতানা সুমি (ভোকাল), থেই হান মং টিটি (ড্রামস), আশফাক আহমেদ তূর্য (বেজ গিটার), রাফি ইসলাম (গিটার) ও জুলকার নাইন (গিটার)। বৃহত্তর ওয়াশিংটনের প্রায় দুই হাজার বাঙালি মুগ্ধ হয়ে শোনেন লালন ব্যান্ডের ভোকাল সুমির কণ্ঠে বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক মরমি সাধক লালন ফকির শাহের গান। গানের মাঝখানে সুমি বাংলাদেশের মাটি-মানুষ ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি ওয়াশিংটন প্রবাসী বাঙালিদের কাছে তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশের সাঁইজি লালন ফকির সম্পর্কের উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের ধারণা দেন। সুমি তার দলের জনপ্রিয় গান জাত গেল জাত গেল বলে, সময় গেলে সাধন হবে না, ক্ষ্যাপা, মনের মানুষ, তাল তমালের বনেতে, পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না ইত্যাদি গানগুলো একের পর এক গেয়ে দর্শক-শ্রোতাদের নাচিয়ে গেলেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে একটি অন্যধারার ব্যান্ড লালন। লালনের গানে নাগরিক মাত্রা যোগ করে এই ব্যান্ডটি অল্প সময়েই সুপরিচিত হয়ে উঠেছে। তবে ব্যান্ডের নাম লালন হলেও সাঁইজির গানেই ব্যান্ডটি সীমিত থাকেনি। লালনের পাশাপাশি নিয়মিত গাইছে তারা বাউল শাহ আবদুল করিম, রাধারমণ, সিরাজ সাঁইসহ প্রচলিত লোকসংগীত।

অবশ্য লালন শাহকে সব সময়ই দিচ্ছে প্রাধান্য। একের পর এক স্টেজ শো আর নিয়মিত অ্যালবাম প্রকাশ করে ব্যান্ডদল লালন এরই মধ্যে পেয়েছে তরুণ প্রজন্মের শ্রোতাদের গ্রহণযোগ্যতা। খুব বেশি দিন হয়নি এই ব্যান্ডটি প্রতিষ্ঠার। অথচ এরই মধ্যে জনপ্রিয়তায় অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডকেও তারা ছাড়িয়ে গেছে। ২০০৭ সালে খুলনার এক কলেজের অডিটোরিয়ামে কনসার্টের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে লালন। লালন সাঁইয়ের গান ভালোবাসেন এ রকমই পাঁচ শিল্পী মিলে গঠন করেন ব্যান্ডটি। প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত তারা একসঙ্গেই আছেন। লাইন আপেও হয়নি কোনো পরিবর্তন। লালন ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবাম বিপ্রতীপ বাজারে আসে প্রতিষ্ঠার বছর ২০০৭ সালে। এ অ্যালবামের অপার হয়ে বসে আছি, এক চক্ষেতে হাছন কান্দে, আরেক চক্ষে লালন প্রভৃতি গান শ্রোতাদের প্রশংসা পায়। প্রথম অ্যালবামে সাফল্যেও ধারাবাহিকতায় লালন শুরু করে দ্বিতীয় অ্যালবামের কাজ। ব্যান্ডের দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ক্ষ্যাপা অডিও বাজারে আসে ২০০৯ সালে। এ অ্যালবামটির বেশ কিছু গান জনপ্রিয়তা পায়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—চাতক, ক্ষ্যাপা প্রভৃতি।


ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলি আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিল ওয়াশিংটন বাংলা ডটকম, এনটিভি ও আরটিভি। এ ছাড়া অনুষ্ঠানের স্পনসর হিসেবে ছিল গ্র্যান্ড স্পনসর ডাটা গ্রুপ, গোল্ড স্পনসর রুক্সানা পারভিন, গো ঢাকা ডটকম, আমেরিকান নেশনওয়াইডের আবু হক, ফেয়ারওয়ে, দিলাল হক, ইউকসেল রিয়েলটির মাসুদ আহসান, বিএনআই রিয়েলটির মুজিবুল হক, অল স্টেট ইনস্যুরেন্সের মোহাম্মদ আলী, পার্টনার রিয়েল স্টেটের রাজিব হক, ই আর সলিউশনের কাজী টি ইসলাম, কমনওয়েলথ মর্টগেজের তৌফিক মতিন, বার্কশায়ার হাথওয়ের সুমন রহমান, লং অ্যান্ড ফোস্টারের নাজির উল্লাহ ও ঘরের খাবারের রাজা ও রুম্পা।

অনুষ্ঠানে ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলি যাদের ধন্যবাদ জানায় তারা হলেন ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার, লেখক-সাংবাদিক শিব্বীর আহমেদ, মোহাম্মদ আলমগীর (বাগডিসি), ড. আনোয়ারুল করিম (বাই), মোহাম্মদ মওলা (আবেয়া), আরিফুর রহমান, সঞ্জয় বড়ুয়া (বিসিসিডিআই), নীতু গনজালভেজ (সৃষ্টি নৃত্যাঙ্গন), শিল্পী রোজারিও (বাকা), সিন্থিয়া, উৎপল সাহা, রুক্সানা পারভিন, মোহাম্মদ মকবুল, মোহাম্মদ আওরঙ্গজেব, ড. ফায়জুল ইসলাম, করিম সালাউদ্দীন, পরেশ হাওলাদার, তমাল ঠাকুর, প্রদীপ সাহা, শেখ মওলা, শামসুন রুমি, ফাহমিদা হোসেইন, নাইম রহমান, ইনাম হক, মোস্তফা হোসাইন ও এমদাদুল হক।

অনুষ্ঠানের ফটোগ্রাফি ও মিডিয়ার দায়িত্বে ছিলেন রাজিব বড়ুয়া, এ্যান্থনী পিউস গমেজ, সুবীর কাস্মীর পেরেরা, আবদুস সাত্তার, শরাফত হোসেইন, হারুন চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম, বিপ্লব দত্ত। অনুষ্ঠানকে সফল করার জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানানো হয় খবর ডটকম, নিউজ বাংলা ডটকম, সাউন্ড ও গিটার শিশির, অক্টোপ্যাড প্রান্তিক, কিবোর্ড সৌমি ও অনীক, ড্রাম কেনি ও তুর্ঘ, তবলা আশিস বড়ুয়া ও বাপ্পী, স্টল নুরুল আমিন ও মঞ্চসজ্জা উৎপল বড়ুয়া।


সবশেষে অনুষ্ঠানের স্পনসর আবু হক তার রিয়েল স্টেট কোম্পানির পক্ষ থেকে র‍্যাফেল ড্রর মাধ্যমে ৪০ ইঞ্চি রঙিন টিভি, প্রিন্টার ও ট্যাবলেট প্রদান করেন। সন্ধ্যা ৭টায় সংগঠনের দুই কর্ণধার আবু রুমি ও আকতার হোসেইন অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

আর/১০:০৪/২৬ এপ্রিল

যূক্তরাষ্ট্র

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে