Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.1/5 (7 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৪-২০-২০১৬

ট্রানজিট-করিডোর: কার লাভ কার ক্ষতি

তানজীমা এলহাম বৃষ্টি


ট্রানজিট-করিডোর: কার লাভ কার ক্ষতি

ঢাকা, ২০ এপ্রিল- জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ-ভারত সমঝোতায় পরস্পরের মধ্যে ট্রানজিট-করিডোর সুবিধা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কয়েকরকম মত আছে। কেউ কেউ এখানে বাংলাদেশের লাভই বেশি দেখলেও অন্যদের যেমন সংশয়-সন্দেহ আছে, তেমনি দর-কষাকষিতে অযোগ্যতার কারণে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত লাভবান হতে পারবে কিনা সেই প্রশ্নও আছে কারো কারো।

তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এ বিষয়ে তারা এখনো বিস্তারিত জানেন না কারণ ‘সরকার কখনো কোনো চুক্তির বিষয়ে সবকিছু জানায় না।’

‘তবে এতোটুকু জানি, ভারতের রিলায়েন্স-আদানিসহ বড় বড় ব্যবসা গ্রুপের বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দিকে আগ্রহ খুব বেশি। সরকারও বেশ উদারভাবে বিভিন্ন সময় তাদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে,’ বলে মন্তব্য করেন দেশের জ্বালানি খাত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা এ অর্থনীতিবিদ।

সঙ্গে তিনি একথাও বলেন: এ পর্যন্ত আমরা ভারতের সঙ্গে যে কয়টা চুক্তি দেখে এসেছি, সবগুলোই ভারতের জন্য খুব সুবিধাজনক হয়েছে। বাংলাদেশের বিবেচনায়, বাংলাদেশের পক্ষে দর কষাকষির ভিত্তিতে এখনো আমরা তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তি হতে দেখিনি।

এলপি গ্যাস পরিবহনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং ইন্ডিয়ান অয়েল করর্পোরেশন লিমিটেড এর মধ্যে সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়। চুক্তির অধীনে বাংলাদেশে এলপিজি প্ল্যান্ট বসিয়ে স্থানীয় বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি ভারতেও পাঠানো হবে।

এভাবে এলপি গ্যাস নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারত এক ধরনের ট্রানজিট সুবিধা পাবে। সঙ্গে ভবিষ্যতে ভারত থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য এলএনজি (লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস) রফতানির পাশাপাশি সেই গ্যাস অন্য পথে আবার নিজ দেশেও নিয়ে যেতে চায় ভারত। এজন্য তাদের এক ধরনের করিডোর সুবিধা প্রয়োজন হবে।

তবে, বিনে পয়সায় যেমন ভারত এ সুবিধা চায় না তেমনি ভারতও বাংলাদেশকে একই ধরনের ট্রানজিট এবং করিডোর সুবিধা দিচ্ছে। পাইপালাইনে ভারত থেকে ডিজেল আমদানির জন্য বাংলাদেশকে করিডোর সুবিধা দিচ্ছে ভারত। এছাড়াও বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ আমদানির সুবিধাও দিচ্ছে।

এসব কিছু মিলিয়ে নতুন সমঝোতা চুক্তি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ইতিবাচক দিকও দেখছেন কেউ কেউ। জ্বালানি খাতে দেশের একমাত্র ম্যাগাজিন পাক্ষিক এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার এডিটর মোল্লাহ আমজাদ হোসেন সমঝোতা স্মারকটিকে দু’ দেশের জন্যেই ‘উইন উইন’ বলে মনে করেন।

তিনি বলেন: এখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে খুলনা পর্যন্ত যে পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে, এর হুইলিং চার্জ শুধু আমরা যে গ্যাস ব্যবহার করবো তার ওপরই পড়তো। একেই যদি ব্যাস একটু বড় করে রংপুরের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের আরেকটি অংশে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে হুইলিং চার্জটা কমে আসবে। ফলে গ্যাসের দামও কম হবে। এতে আমাদেরই লাভ।

‘তাছাড়া আইপিআই (ইরান-পাকিস্তান-ইন্ডিয়া)সহ যে আন্তর্জাতিক গ্যাস পাইপলাইনগুলো নিয়ে আলোচনাগুলো চলছে, সেখান থেকে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে সংযোগ পেতে চাইলে ভারতের সঙ্গে সমঝোতাটা থাকলে তখন আমাদের জন্য সুবিধা হবে,’ বলে মনে করেন তিনি। তবে কিছু প্রশ্নও তুলেছেন মোল্লাহ আমজাদ হোসেন।

তিনি বলেন, দেশের ফ্যাক্টরিগুলোর এখন যে এলপিজি উৎপাদনের ক্ষমতা আছে, তার এক-তৃতীয়াংশেরও বাজার নেই দেশে। সরকার চাইলে দেশের বেসরকারি খাতের এই এলপিজি ভারতের বাজারে সহজেই নিতে পারে। ‘তারপরও কেনো বিপিসি ভারতীয় একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগ করতে গেলো বিষয়টি আমার কাছে পরিস্কার না। এটি না করলেও চলতো।’ তবে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সমঝোতায় এ ধরনের চুক্তি নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো ভয় থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সরকারের এলপি ব্যবসা নিয়ে প্রশ্ন
যৌথ বিনিয়োগ নিয়ে মোল্লাহ আমজাদ হোসেনের সুরেই কথা বলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পেট্রোলিয়াম প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সহকারি ম. তামিম।

ব্যবসা হিসেবে এই সমঝোতায় কোনো ক্ষতি না দেখলেও সরকার কেনো এলপিজি ব্যবসায় নিজে নামতে চাচ্ছে, এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

ম. তামিম বলেন, ‘যেখানে এলপিজি ব্যবসায় বেসরকারি খাতের অনেকেই আগ্রহী এবং তারাই দেশের এই চাহিদাটা মোটামুটি পূরণ করে আসছে, সেখানে সরকারের এই ব্যবসায় নামার কোনো যৌক্তিকতা আমি দেখছি না। কারণ আমরা সবসময় চাই সরকার যেনো কোনো ব্যবসায় সরাসরি না থাকে। তারা পর্যবেক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কাজ করতে পারে। কেননা সরকার ব্যবসায় নামলে সবসময়ই কিছু না কিছু সুবিধা নেয়।’

বুয়েটের এ অধ্যাপক বলেন: এটি সরকারের নৈতিকতার ওপর নির্ভর করে যে তারা ব্যবসা করবে কি করবে না। অবশ্য এমন একটি খাত সম্পূর্ণভাবে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দিলে সেটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না-ও হতে পারে, হয়তো এমনটা ভেবেই সরকার এই একটা অংশ নিজের হাতে রাখতে নিজেই মাঠে নামার পরিকল্পনা করেছে।

অধ্যাপক তামিম বলেন, পৃথিবীর কোথাও সরকার নিজে ব্যবসা করে মুনাফা আদায় করে না। সরকার সেবামূলক কাজ করে। যেসব সেবা, যেমন বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস অন্যরা দিতে পারে না সেগুলো সেবা হিসেবে স্বল্পমূল্যে সরকার দেয়।

‘তাছাড়া কবে নাগাদ এই পণ্য বাজারে আসবে ঠিক নেই। ততোদিনে হয়তো বেসরকারি খাতটি আরও অনেক বিশাল হয়ে উঠবে। তখন সরকার ব্যবসা হারাতে পারে। সরকারের টাকা সরকারের নিজের না, জনগণের টাকা। তাই এই টাকা ব্যবহারের আগে সরকারকে মার্কেট স্টাডি করে ভালোভাবে ভেবে নিতে হবে,’ বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ-ভারত সমঝোতা
এলপি গ্যাস খাতে সমঝোতা চুক্তির পর সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এলপিজি প্ল্যান্ট বাংলাদেশে তৈরি হবে, টার্মিনালও তৈরি হবে এবং পাইপলাইনে সেই এলপিজি ভবিষ্যতে ভারতের পূর্বাঞ্চলে সরবরাহ করা হবে।

কর্মকর্তারা জানান, সমঝোতা চুক্তি অনুসারে, ১ লাখ মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার একটি এলপিজি প্ল্যান্ট তৈরি করা হবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্সে এলপি গ্যাসের অনেক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু মূল ভূখণ্ড থেকে ওই এলাকায় এলপিজি সরবরাহ করা কষ্টসাধ্য। তাই যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্ল্যান্টটা করা হচ্ছে যেনো সেখান থেকে উৎপাদিত এলপিজি বাংলাদেশের বাজারে আনা যায়, আবার ভারতের বাজারেও পাঠানো সম্ভব হয়।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, প্রায় সব বিষয়েই তারা ভারতের সঙ্গে একমত হয়েছেন। এর মধ্যে সবার ওপরে ছিলো নোমালীগড় থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল নেয়ার বিষয়টি। বাংলাদেশের পার্বতীপুর থেকে ভারতের শিলিগুড়ি পর্যন্ত প্রস্তাবিত পাইপলাইনটি যেনো দ্রুত স্থাপন সম্ভব হয় এ নিয়েও আলোচনা হয় সমঝোতা স্মারক বিষয়ক আলোচনা।

অন্যদিকে যৌথ বিনিয়োগে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজি প্ল্যান্ট স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেন ভারতের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস প্রতিমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

খুলনায় ৮শ’ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট করার উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের একটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস পাইপলাইনে খুলনায় আনা হবে। ভারতীয় প্রতিমন্ত্রী প্রস্তাব করেছেন, পাইপলানটি বর্ধিত করে রংপুরের ওপর দিয়ে আবার পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায় কিনা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য ব্যবহারযোগ্য পাইপলাইন ট্রানজিটের ব্যবস্থা হয়ে যাবে, এমন আশায় প্রস্তাবটিতে নৈতিকভাবে মত দিয়েছে বাংলাদেশ।

এফ/০৯:৩৯/২০ এপ্রিল

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে