Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.1/5 (9 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৪-১৬-২০১৬

বাঘের জন্য ‘ভ্রাম্যমাণ বোমা’!

ইফতেখার মাহমুদ ও সুমেল সারাফাত


বাঘের জন্য ‘ভ্রাম্যমাণ বোমা’!

বাগেরহাট, ১৬ এপ্রিল- সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচলকারী কয়লা, ছাই, সার ও তেলবাহী একেকটি জাহাজ বাঘের জন্য ‘ভ্রাম্যমাণ বোমা’ (মোবাইল বম্ব)! এগুলো চলাচলের কারণে বাঘের নদী পারাপার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে বাঘের প্রকরণ (জিনগত বৈশিষ্ট্য) কমে গিয়ে অস্তিত্বের লড়াইয়ে বাঘ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাণী বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্ব পরোক্ষভাবে হুমকির মুখে পড়ছে।

বাগেরহাটের রামপালে প্রস্তাবিত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়বে। সেটাও একইভাবে বাঘের জিনগত বৈশিষ্ট্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

এসব কথা বলা হয়েছে ভারতের বন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনে বাঘের অবস্থা’ শীর্ষক এক জরিপ প্রতিবেদনে। বাংলাদেশের বন বিভাগ ওই জরিপে সহায়তা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরিতে উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছে ভারতের বন্য প্রাণীবিষয়ক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াইল্ড লাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’। প্রতিবেদনটি গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নির্ণয়ে তিন বছর ধরে জরিপ শেষে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা ১০৬টি ও ভারত অংশে ৭৬টি।

প্রতিবেদনে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকে কেন ‘ভ্রাম্যমাণ বোমা’ বলা হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সুন্দরবনের ভেতরে সাড়ে তিন লাখ লিটার ফার্নেস তেলবাহী একটি জাহাজডুবির ঘটনা ঘটে। এতে সুন্দরবনের ক্ষতি হয়েছে। তা ছাড়া এরপর বনের ভেতরে ছাই ও কয়লাবাহী জাহাজডুবির ফলেও বনের ক্ষতি হয়েছে, যা বাঘের জন্য ক্ষতিকর।

গতকাল শুক্রবার ভারতের নয়াদিল্লিতে আন্তর্জাতিক বাঘ সম্মেলন উপলক্ষে ওই জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশের পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন, প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলীসহ তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এতে যোগ দেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দিল্লি থেকে মুঠোফোনে মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র যেহেতু নির্মাণ শুরু হয়ে গেছে, তাই এর কাজ আর বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সুন্দরবন ও বাঘের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য প্রধানমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, এতে সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে ওই এলাকায় যাতে আর কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা না হয়, সে জন্য সম্মেলনে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। আমরা ওই পরামর্শ আমলে নিয়ে এগোচ্ছি।’

তবে সুন্দরবনের দুই অংশের বাঘের সংখ্যা নিয়ে করা জরিপের প্রধান সমন্বয়কারী এবং ওয়াইল্ড লাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার অধ্যাপক রাজভেন্দর ঝালা এ ব্যাপারে বলেন, এমনিতেই সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌ চলাচলের কারণে বাঘের আচরণ ও চলাচলের ওপরে প্রভাব পড়বে। কেননা বাঘ নদী পার হয়ে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যায়। এতে অন্য এলাকার বাঘের সঙ্গে সংযোগের কারণে বাঘের জিনগত প্রকরণ বাড়ে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে যেসব জাহাজ চলাচল করছে, তাতে বাঘের এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে কয়লাবাহী জাহাজ চলাচল বাড়বে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কার পাশাপাশি বাঘের চলাচল আরও বাধা সৃষ্টি করবে।

জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতীয় সুন্দরবনে বাঘের বসতি থাকা সম্ভব, এমন এলাকায় প্রতি ১০০ কিলোমিটারে চারটি করে বাঘ আছে। আর বাংলাদেশে সমপরিমাণ এলাকায় বাঘের সংখ্যা তিনটিরও কম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে যত বাঘ আছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ বাঘ এখানে বসতি করতে পারে। চোরা শিকারিদের উৎপাত, বাঘের খাবার কমে যাওয়াসহ নানা কারণে বাংলাদেশ অংশে বাঘের ঘনত্ব কম।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশের সুন্দরবনের অংশে বাঘ জরিপের সমন্বয়কারী এবং বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির বলেন, ‘সুন্দরবনে আরও বাঘ বসবাসের উপযোগী পরিবেশ রয়েছে। আমরা যদি বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য সঠিক পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করা যাবে।’
জরিপে প্রতিবেদনে সুন্দরবনের বাঘের আচরণের পর্যবেক্ষণভিত্তিক তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের বাঘ নদীপথে ৬০০ মিটার পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারে। ভোর ৫টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত বাঘগুলো নদীপথে চলাচল করে। আর সুন্দরবনের ভেতরের খাল দিয়ে জাহাজগুলো ওই সময়েই বেশি চলাচল করে। সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে জরিপ চলাকালীন শ্যালা নদী দিয়ে দিনে ২০০টি জাহাজ চলাচল করছিল।

তবে বন বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, গত ২০ মার্চ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে একটি কয়লাবাহী জাহাজডুবির পর শ্যালা নদী দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে এর পরেও গত সপ্তাহে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২২টি জাহাজ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে চলাচল করে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায়ই রাতের বেলা সুন্দরবনের ওই পথ দিয়ে এখনো জাহাজ চলাচল করতে দেখা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। ওই নদীগুলোতে শিল্পকারখানা এবং নানা কারণে যে দূষিত পদার্থগুলো মিশছে, তা সুন্দরবনেও প্রভাব ফেলছে।

এ ব্যাপারে বাঘ বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান বলেন, যত উন্নত প্রযুক্তিই ব্যবহার করা হোক না কেন, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হলে সুন্দরবন ও বাঘের ক্ষতি হবে। এখন এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে সুন্দরবনের আশপাশে আরও শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে। এতে সুন্দরবনের আশপাশে মানুষের অভিবাসন বেড়ে যাবে। ফলে সুন্দরবনের ওপরে মানুষের নির্ভরশীলতা এবং ক্ষতি করার ক্ষমতাও বাড়বে। ফলে আমাদের এমন উন্নয়ন দরকার, যা সুন্দরবন ও বাঘ—দুটিকে রক্ষা করে তারপর হবে।

এস/১৯:৩৫/১৬ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে