Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.1/5 (29 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৪-১৫-২০১৬

৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নিমাইচাঁদের মেলা

রতন বালো


৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নিমাইচাঁদের মেলা

মানিকগঞ্জ, ১৫ এপ্রিল- ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা আর কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ৭০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নিমাইচাঁদের পুণ্যস্নান সম্পন্ন হয়েছে শুক্রবার ( ১৫ এপ্রিল)। 

প্রতিবছরের মতো এবারও মানিকগঞ্জ, শিবালয়, নবাবগঞ্জ, হরিরামপুর, শিবালয়সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার পুণ্যার্থী নিমাইচাঁদের স্নানে অংশ নেন।

সকাল ৮টা থেকে এ স্নান শুরু হয়ে টানা চলে সকাল সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। তীর্থ যাত্রীরা পুণ্য লাভের আশায় স্নান করার জন্য শক্রবার ভোর থেকে সমবেত হতে থাকেন বালিরটেক বাজার সংলগ্ন কালিগঙ্গা নদীর তীরে। 

এ উপলক্ষে মানিকগঞ্জের সদর থানার ভাড়ারিয়া ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামে বসেছে ১৫ দিন ব্যাপী ‘নিমাইচাঁদের মেলা’। আজ ২ বৈশাখ কালিগঙ্গা নদীতে নিমাই চাঁদের স্নানের মধ্য দিয়ে মেলা শুরু হয়েছে।

এখানে প্রতিবছর এ পূর্ণস্নানে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ হিন্দু-মুসলমান উপস্থিত হয় এবং ১৫ দিন আগে থেকেই এ এলাকায় বাড়ি বাড়ি শুরু হয় বিভিন্ন প্রস্তুতির পালা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়-অনাত্মীয়তে বাড়ি ভরে যায়।

মেলায় তৈলজপত্র দেখছেন ক্রেতারা

এ অঞ্চলে এটি সবচেয়ে বড় উৎসব। আর সব ধর্মাবলম্বীও এ উৎসবে উপস্থিত হয়। মেলায় বিভিন্ন রকমের দোকান, পুতুলনাচ, দোলনচাঁপা, সার্কাস বসে। প্রতি বছরের মতো এ বছরেও পুণ্যস্নানের দিন থেকে ১৫ দিনব্যাপী মেলা বসেছে। 

পুণ্যার্থীরা বালিরটেক নদীর ঘাটে কালিগঙ্গা নদীতে ঘুরে ঘুরে পুণ্যস্নানে অংশ নেন। বিশেষ করে সবারই লক্ষ্য ছিল নিমাইচাঁদের নিচ দিয়ে পুণ্যস্নানে অংশ নেয়া। ফলে এখানেই সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা যায়।

পুণ্যস্নানে অংশগ্রহণকারীদের জন্য বালিরটেক বাজার হরিসভা বাজার কমিটি আয়োজিত ভক্তসেবার আয়োজন করা হয়। ভোর রাত থেকে বালিরটেক কালী মন্দির প্রাঙ্গণে এ ভক্তসেবার জন্য রান্না করা হয়। বিরতিহীন বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে খিচুড়িপ্রসাদ বিতরণ।

বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ভোলানাথ রায় মেলা ও স্নানের শুরুর কথা বলতে গিয়ে তাদের দুঃখের কথা বলেন। আগে তাদের মুরুব্বিরা মেলার কার্য পরিচালনা করতেন, কারো অনুমতি নিতে হতো না। শুধু স্থানীয় চেয়ারম্যানের সম্মতিতেই চলতো। পরে এসডিও অনুমতি দেন।

তিনি বলেন, “এখন অনুমতি নিতে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত দৌড়াতে হয়। শুধু মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গেলেই চলে না, এর জন্যে ঘাটে-ঘাটে বাধা সৃষ্টি হয়। এই বাধা অতিক্রম করতে ‘তৈল’ প্রয়োগ করতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নিমাইচাঁদের মেলা ও পুণ্যস্নান উৎসব বন্ধ হয়ে যাবে।”

তিনি আরও বলেন, ‘আজ থেকে প্রায় ৭’শ বছর আগে পদ্মা নদীর ওপারে ফরিদপুর নামক স্থানে জনৈক কাঠমিস্ত্রি তার বাড়িতে একটি নিমগাছ লাগিয়েছিলেন। প্রতিদিন তিনি নিমগাছের তলা পরিষ্কার করে রাখতেন। গাছ যখন বড় হয়, তখন একদিন ওই গাছের ভেতর থেকে দৈববাণী শুনতে পান মিস্ত্রী। গাছের কাণ্ডের অংশ দিয়ে মূর্তির মতো করে নিমাইচাঁদ নামক কাঠের দেবতা তৈরি করার আদেশ পান তিনি।’

মেলায় পুতুল নাচের প্যান্ডেল

তখন মিস্ত্রী দৈববাণী মোতাবেক কাঠের দেবতা তৈরি করেন। নিয়মিত পূজা অর্চনা করতে থাকেন। একদিন মিস্ত্রির বাড়িতে আগুন লাগে। তখন মিস্ত্রি রাগান্বিত হয়ে বলেন, ‘আমি তোর পূজা করি। আমার বাড়িতে আগুন লাগলো কী করে।’ তখনই কাঠের দেবতাকে তিনি আড়াইল বিলে ফেলে দেন।

সে সময় বিলের তীরে বাস করতের জনৈক নারী। তিনি দেখতে যেমন সুন্দরী তেমনী ধর্মপ্রাণও ছিলেন। তিনি বিল থেকে নিয়মিত জল আনতেন। একদিন সেই দৈববাণীর মতো শব্দ শুনতে পেলেন। প্রথমে তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। পরের দিন আবার দৈববাণী হলো, ‘তুই আমাকে জল থেকে তুলে নে।’ তখন তিনি বিল থেকে কাঠের দেবতাকে তুলে নিয়ে গেলেন বাড়িতে। দেবতার নিয়মিত পূজা অর্চনার কথাও স্বপ্নে জানতে পারলেন। সেই থেকে ওই নারী বাংলা সনের চৈত্র মাসের ১০ দিন থাকতে স্নান শুরু করেন। এই স্নান করানো হতো রাতে। সেই সময় এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি রাতের স্নানের সময় তাকে অশ্লীল ভাষায় কথা বলতো।

ব্রিটিশ আমলের জমিদাররা ওই দেবতার নামে জমি দান করেন। ওই জমির ওপর মন্দির ও মেলার স্থান নির্ধারণ হয়। মন্দিরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট (বর্তমান চেয়ারম্যাকে প্রেসিডেন্ট বলা হতো) প্রেমচরণ মহাত্মা, লোকনাথ বালো ও কাঙাল গোসাঁই নিয়ম করেন, বৈশাখের ২ তারিখে নিমাইচাঁদের স্নান হবে। সেই থেকে পর্যায়ক্রমে তুলশি বালো, আদ্যনাথ বালো, পদ্মচরণ বালো, কৃষ্ণকুমার বালো, মাখন চন্দ্র রায়, ভজন বালো, রসিক লাল বালো, ভোলানাথ রায় একইভাবে কাজ করে আসছেন।

সেই থেকে পর্যায়ক্রমে শুরু হয়ে আসছে নিমাইচাঁদের মেলা এবং কালিগঙ্গা নদীতে ২ বৈশাখ শুরু হয় নিমাইচাঁদের স্নান। এ স্নান সনাতন ধর্মালম্বীদের কাছে পবিত্র স্নান হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে সেই থেকে।

এস/১৯:/১৫ এপ্রিল

মানিকগঞ্জ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে