Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.7/5 (9 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-১১-২০১৬

চিরচেনা পৃথিবীর অজানা যত কথা

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি


চিরচেনা পৃথিবীর অজানা যত কথা

পৃথিবীর উপরিভাগে মাটি, বালু, পাথর, লোহাসহ আরো কতকিছুই তো দেখতে পাই আমরা। বলতে গেলে পৃথিবীর উপরিভাগে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের পুরো জীবনকে ভাবিয়ে দেওয়ার মতন যথেষ্ট উপাদান। তবে এতেও থেমে থাকেনি মানুষ। জানতে চেয়ে সবসময় পৃথিবীর ভেতরের কথা। কি রয়েছে সেখানে? কি রয়েছে পৃথিবীর একেবারে মাঝখানটাতে? জানবার অদম্য ইচ্ছাকে সাথে করেই মাটিকে খুঁড়ে চলেছে তারা অনেকসময়। কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু লাভ হয়নি। ভেতরের দিকে পৃথিবীর একদম শেষ জায়গাটা হচ্ছে মাটির নীচ থেকে প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার দূরে। এর সবচাইতে বাইরের অংশটিও হচ্ছে ৩,০০০ কিলোমিটার দূরে। আর মানুষ যেতে পেরেছে মাত্র ১২.৩ কিলোমিটার অব্দি। তাও আবার রাশিয়ার কোলা সুপারডিপ বোরহোল তৈরির সময়েই। এমনকি পৃথিবীর বাইরে আমরা এর ভেতরের যে জিনিসগুলো পেয়ে থাকি যেমন- লাভা কিংবা হীরা, তাও কিন্তু ভূমি থেকে মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার গভীরেই জন্মেছে। সুতরাং একটু হলেও হয়তো আপনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাববেন এখন যে তাহলে আর কি করে জানা যাবে? কি করে বোঝা যাবে যে পৃথিবীর একেবারে মাঝখানটাতে ঠিক কি রয়েছে? তবে অনেকটা অবাস্তব হলেও সত্যি যে সেটা কেবল বোঝা যাবেই না, এরমধ্যে বুঝে ফেলেছেও মানুষ নানারকম হিসেব নিকেষ করে। কি করে? বলছি।

লন্ডনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইমন রেডফার্নের মতে পৃথিবীর অন্তঃস্থল সম্পর্কে জানতে হলে সবার আগে এর ভর সম্পর্কে জানা উচিত। আর ভূমির ওপরে থাকা নানারকমের জিনিসপত্রের ওপর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব দেখলেই আমরা খুব সহজে বুঝতে পারি এর ভরের হিসাবটা। এখান থেকেই জানা যায় যে পৃথিবীর ভর ৫.৯ সেক্সটিলিয়ন। যেটার পেছনে রয়েছে কিনা ২০ টি শূন্য! তবে এখান থেকে একটা ভাবনাতেই বারবার পড়তে হয়েছে মানুষকে যে এতভর এল কোথা থেকে? কি করে পেল পৃথিবী এই পরিমাণের ভর যেখানে এর ওপরিভাগে এমন কিছুই নেই যেটা দিয়ে করে ফেলা যাবে হিসেবটা। এতসব ভাবতে গিয়েই বিজ্ঞানীদের মাথায় খেলা করেছে পৃথিবীর উপরিভাগে নেই তো কি হয়েছে? নিশ্চয়ই এর ভেতরে এমন কিছু রয়েছে যেটা দিয়ে তৈরি হয়েছে এই অসম্ভব রকমের ভর। কিন্তু কি সেটা? কিসের এত ওজন?

প্রথমেই মাথায় এসেছে লোহার নাম। আসবে নাইবা কেন? মহাবিশ্বের সবটা জায়গাতেই লোহার ছড়াছড়ি। অন্য গ্রহগুলো তো অবশ্যই, মাঝে মাঝে পৃথিবীতে এসে পড়া উল্কাগুলোতেও পাওয়া যায় লোহা। যদিও ভুমিতে অত বেশি লোহা নেই পৃথিবীর। তাহলে নিশ্চয়ই রয়েছে এর নীচে? পৃথিবীর গভীর অংশটাতে? একটা সময় ধারনা করা হয়েছিল যে পৃথিবীর অন্তঃস্থলে ৮০ শতাংশই লোহা রয়েছে। যেগুলো ৪.৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী তৈরির সময় ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছিল পৃথিবীর ভেতরে। এমনিতেই লোহার ঘনত্ব অনেক বেশি। আর অতিরিক্ত চাপে সেটা আরো অনেক বেশি ঘনত্বের রুপ নেয়। ফলে এটাই একমাত্র সম্ভাব্য কারণ মনে হয়েছিল সবার পৃথিবীর এমন ভরের। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন এসে যায় যে, এত লোহা একটা জায়গায় হল কি করে? বিজ্ঞানীরা দিয়েছেন এই প্রশ্নেরও উত্তর।

পৃথিবীর বেশিরভাগটাই সিলিকেট নামের পাথর দ্বারা তৈরি। মনে করা হয় এই সিলিকেটের ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে পৃথিবীর ভেতরের দিকে চলে গিয়েছে লোহা। পানির মতন নয়, লোহা কোনদিকে না ছড়িয়ে একটা জায়গায় জমে থাকে। এখানেও সেটাই হয়েছে। সবটা লোহা গিয়ে জমেছে পৃথিবীর মাঝখানটাতে। কেমন অবস্থা হয় লোহার যখন সিলিকেটের প্রচন্ড চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয় তাকে? পরীক্ষা করে দেখতে পাওয়া গিয়েছে, এই সময়টায় একদম অন্যরকম একটা ফলাফল হয়। লোহা গলে যায়! সেই গলে যাওয়া লোহার মাধ্যমেই আরো একটা জিনিস জানা গিয়েছে যে পৃধিবীর মাঝে কেবল লোহা আছে তাই নয়, আছে গলিত লোহা। তখন থেকে এই ধারনাটা বদ্ধমূল হয় যে পৃথিবীর অন্তঃস্থলের সবটা জুড়েই রয়েছে গলিত লোহা। কিন্তু সেই ধারণাও বেশিদিন টেকেনি। আর টেকেনি ভূমিকম্পের ফলে।

ভূমিকম্পের সময় পৃথিবীর এক পাশ থেকে কোন ঢেউ এলে সেটা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর অন্যপাশ অব্দি। এটা অনেকটা টেলিফোনের মতন। একপাশ দিয়ে কথা বললে সেটা চলে যায় অন্যপাশে। কিন্তু হঠাৎ একবার ভূ-কম্পনবিদেরা আবিষ্কার করেন যে, এস-ওয়েভ বা ঢেউ নামের একটি ঢেউ আসছে না অপর পাশে। এখন কথা হচ্ছে এই ঢেউ কেবল কঠিন পদার্থের ভেতর দিয়েই চলতে পারে। তরল কিছুর ভেতর দিয়ে নয়। ফলে পৃথিবীর ভেতরকার তরল লোহার ব্যাপারটা আরো বেশি পাকাপোক্ত আকার নেয়। সেটা ছিল ১৯৩০ সাল। ডেনিশ ভূ-কম্পনবিদ ইনগে লেহম্যান দেখতে পান পি- ওয়েভ নামের একটা ঢেউ খুব সহজেই পৃথিবীর এপাশ থেকে ওপাশে চলে আসতে পারছে। আর তাও মূলের অনেকটা কাছ দিয়েই। শুরু হয় পরীক্ষা নিরীক্ষা। অনেক গবেষনা করে তিনি বের করেন যে পৃথিবীর একদম ভেতরটা তরল লৌহের হলেও তার খানিকটা আগে থেকে রয়েছে শক্ত লোহার একটা ধাপ। আর সেইখান থেকে আসা ঢেউগুলো খুব সহজেই পৃথিবীর একপাশ থেকে অন্যপাশে চলে যেতে পারে।

ধীরে ধীরে লেহম্যানের এই তত্ত্ব বেশ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। তবে কেবল পৃথিবীর গঠন জানবার জন্যেই নয়, বিশ্বযুদ্ধের সময় অন্যদেশের কাছে কতটা পারমাণবিক শক্তি রয়েছে সেটা জানতেও ব্যবহার করা শুরু হয় পৃথিবীর এই উপরিভাগ কিংবা কঠিন লোহার অংশটিকে। পারমানবিক বিস্ফোরনের সময় ভূমিকম্পনের মতনই একটা কম্পন চলে আসে পৃথিবীর ভেতরে। আর সেই কম্পনের মাত্রা অন্যপাশ থেকে শুনে বুঝে নিতে শুরু করে শত্রুরা যে তাদের শত্রুপক্ষ ঠিক কতটা শক্তির অস্ত্র তৈরি করেছে।

পৃথিবীর ভেতর সম্পর্কে অনেকটা জানার পরেও কিন্তু মানুষের মনে এসেছে আরো প্রশ্ন। জানতে ইচ্ছে করেছে পৃথিবীর একদম মাঝখানে ঠিক কতটা গরম? কিন্তু যেহেতু নীচে গিয়ে সেটা মাপার মতন কোন অবস্থা নেই বা এখনো তৈরি হয়নি, তাই উপরে বসেই বিশুদ্ধ লোহাকে পৃথিবীর অন্তঃস্থলের সমপরিমাণ চাপে ফেলে সেটার তাপমাত্রা বোঝার চেষ্টা করেছেন। আর সেটা দিয়েই জানা গিয়েছে যে পৃথিবীর একেবারে মাঝখানটায় তাপমাত্রার পরিমাপ হচ্ছে প্রায় ৬,২৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাঝেমাঝে অন্যান্য দ্রব্যের উপস্থিতি সেটাকে কমিয়ে ফেললেও গড় হিসেবে ৬,০০০ ই থাকে সেটা। এবং নানারকম প্রাকৃতিক মাধ্যমেই যদিও নিজের এই তাপমাত্রা তৈরি করে নিচ্ছে পৃথিবী নিজেই, প্রতি বিলিয়ন বছর পর সেটা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যাচ্ছে।

তবে একটা অদ্ভূত ব্যাপারের উত্তর এখনো অব্দি পায়নি মানুষ। আর সেটা হচ্ছে ভূ-কম্পনের মাত্রার তারতম্য। সাধারনত বিশুদ্ধ লোহার ভেতর দিয়ে ঢেউ যেভাবে ও যতটা তাড়াতাড়ি আসা উচিত তারচাইতেও আরো কম দ্রুত আসে পৃথিবীর ভেতর দিয়ে ঢেউগুলোর কম্পন। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন এসে যায় ঠিক কি কারণে এমনটা হচ্ছে। বিজ্ঞানী লিডুনকা ভকাডনো বলেন- “ এখনো কেউ জানেনি কেন এটা হচ্ছে। “ তবে এই প্রশ্নের একটাই সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে। আর সেটা হচ্ছে পৃথিবীর গবীরে লোহার সাথে আরো কোন পদার্থের মিশ্রণ। বিজ্ঞানীরা নিকেলকে লোহার সাথে মিশে থাকার সম্ভানার কথা তুললেও এখনো অব্দি প্রমাণ হয়নি কিছু। বিজ্ঞানীরা যদিও লোহা আর নিকেলের মিশ্রণ তৈরি করে বোঝার চেষ্টা করেছেন আসলে সেটার ফলাফল কি হয়, ঠিকঠাক জবাব এখনো আসেনি। ভকাডনো কেবল এক নিকেলকেই নয়, আরো অনেক উপাদানের উপস্থিতির সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেছেন। কে জানে! হতেই তো পারে যে পৃথিবীর ভেতরে লোহার সাথে নিকেল কিংবা সালফারও মিশে রয়েছে।

তবে শুধু এটাই নয়, কম্পনের কম দ্রুত আসবার কারণ হিসেবে গলিত লোহা আর শক্ত লোহার মাঝখানের জায়গাটিকেও কারণ হিসেবে মনে করছেন ভকানডো। চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি ক্রমাগত নিজের তৈরি কম্পনের গতির সাথে সত্যিকারের গতির মিল করার। হয়তো তিনি সফল হবেন, হয়তো হবেননা। কিন্তু ফলাফল যেটাই আসুক না কেন, এটা পরিষ্কারভাবে বলে দেওয়া যায় যে,  পৃথিবী আর পৃথিবীর গঠন সম্পর্কে মানুষের মনে জন্ম নেওয়া এসব রহস্যের সমাপ্তি কখনোই হবেনা। বরং দিনকে দিন নতুন নতুন সব উত্তরের সাথে সাথে মানুষের মনে জেগে উঠবে আরো হাজারটা প্রশ্ন!

আর/১৮:১০/১১ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে