Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.1/5 (7 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-০৮-২০১৬

যেভাবে করস্বর্গ হয়ে উঠল পানামা

আফসার বিপুল


যেভাবে করস্বর্গ হয়ে উঠল পানামা

পানামা, ০৮ এপ্রিল- পানামার ল’ ফার্ম মোস্যাক ফনসেকার বিপুল পরিমাণ নথি ফাঁস হওয়ার ফলে বিশ্বের ধনী ও ক্ষমতাবানের লুকিয়ে রাখা সম্পদেও আলো পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম ‘করস্বর্গ’ হিসেবে পরিচিত পানামার দিকেও নতুন করে চোখ পড়েছে সবার।

কর আইন বা ব্যবস্থাপনার দিক দিয়ে পানামা কেন অন্য দেশ থেকে আলাদা এবং এ দেশটি কীভাবে এরকম একটি করস্বর্গ হয়ে উঠল, তারই আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে।

যেভাবে শুরু?
নরওয়েজীয় সেন্টার ফর ট্যাক্সেশন এর প্রকাশিত ২০১৩ সালের এক গবেষণায় জানা যায়, করস্বর্গ হিসেবে পানামার ইতিহাস শুরু হয় ১৯১৯ সালে। ওই সময় মার্কিন তেল কোম্পানি স্ট্যান্ডার্ড অয়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের কর ও আইনকানুন থেকে বাঁচিয়ে দিতে পানামা বিদেশি জাহাজের রেজিস্ট্রেশন করা শুরু করে।

স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের দেখানো পথ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য জাহাজ মালিকরাও অনুসরণ করতে শুরু করেন। এদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বেঁধে দেওয়া উচ্চ মজুরি ও কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নিয়ে কড়াকড়ি এড়াতে পানামাকে বেছে নেন।

ওই সময় পানামায় রেজিস্ট্রেশন করার অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের যাত্রীবাহী জাহাজগুলোয় ক্রেতাদের মদ সরবরাহ করতে পারা।

কারণ ১৯১৯ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মদ জাতীয় পানীয় উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহ নিষিদ্ধ ছিল। পানামায় রেজিস্ট্রি করা জাহাজ এই বাধ্যবাধকতা এড়াতে পারতো।

কিছুদিনের মধ্যেই পানামা দেখল, জাহাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ন্যূনতম কর, আইন ও পক্ষগুলোর মধ্যে তথ্য শেয়ার করার নীতিগুলো অফশোর অর্থের ক্ষেত্রেও বিস্তৃত করার সুযোগ আছে।


পানামার ল’ ফার্ম মোস্যাক ফনসেকার লোগো।

নরওয়েজীয় গবেষণা অনুসারে, “ওয়াল স্ট্রিটের আগ্রহ পানামাকে শিথিল কোম্পানি ইনকর্পোরেশন আইনের সঙ্গে পরিচিত হতে সহায়তা করে। এতে ন্যূনতম জবাবদিহিতার মাধ্যমে যে কারো নামে করবিহীন, বেনামি কর্পোরেশন খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়।”

কয়েক দশক ধরে পানামায় বিদেশি অর্থের প্রবাহ তেমন একটা নজর কাড়েনি। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে তেলের উচ্চমূল্য পরিস্থিতি আমূল বদলে দেয়।

কী হলো তখন?
কর্পোরেট ও ব্যক্তিগত অর্থের গোপনীয়তা দৃঢ় করে আইন পাস করলো পানামা। কঠোর গোপনীয়তা আইন ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হল। এসব আইন অমান্যের জন্য কঠিন দেওয়ানি ও ফৌজদারি দণ্ডের বিধান করা হল। রেজিস্ট্রেশনের জন্য কর্পোরেট শেয়ারহোল্ডারদের নামের প্রয়োজনীয়তা আর থাকলো না।

দেশটিতে কঠোর ব্যাংকিং গোপনীয়তা আইনও বিদ্যমান ছিল। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও অ্যাকাউন্ট মালিকদের সম্পর্কে তথ্য না দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।

এ বিষয়ে একমাত্র যে ব্যতিক্রম জানা যায় তা হল, পানামার এক আদালতের আদেশে সন্ত্রাস, মাদক-পাচার এবং অন্যান্য পরস্পর সম্পর্কিত গুরুতর অপরাধের (এরমধ্যে কর ফাঁকির বিষয়টি ধরা হয়নি) তদন্তের ক্ষেত্রে আইনটির প্রযোজ্য না হওয়া।

তার উপর পানামার সঙ্গে অন্য কোনো দেশের কর বিষয়ক কোনো চুক্তি নেই। এতে অর্থ গচ্ছিত রাখা বিদেশিদের জন্য সুরক্ষার একটি অতিরিক্ত আবরণ যুক্ত হয়েছে। দেশটিতে মুদ্রা বদলের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে দেশটি থেকে কি পরিমাণ অর্থ বাইরে গেল বা ভিতরে ঢুকলো তা নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া কোনো বালাই নেই এবং অর্থের পরিমাণের বিষয়েও কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।

১৯৮২ সালের মধ্যে পানামা খাল ও এর মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের কারণে সৃষ্ট ব্যবসা সুযোগে আকৃষ্ট হয়ে আন্তর্জাতিক ১০০টিরও বেশি ব্যাংক দেশটির রাজধানী পানামা সিটিতে তাদের দপ্তর খোলে।

এসবের ফলাফল    
২০১৪ সালে সাংবাদিক কেন লিভারস্টেইন ভাইস সাময়িকীতে মোস্যাক ফনসেকা নিয়ে এক অনুসন্ধানী নিবন্ধে বলেন, “এসব আইন ‘ডার্টিব্যাগ’-ধারী এবং একনায়কদের লম্বা একটি লাইন তৈরি করে, যারা পানামাকে তাদের চুরি করা সম্পদ লুকিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করেন। এদের মধ্যে ফিলিপাইনের সাবেক শাসক ফার্দিনান্দ মার্কোস, হাইতির ‘বেবি ডক’ দ্যুভালিয়ার এবং আগুস্তো পিনোশে অন্যতম।


পানামার সাবেক শাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগা।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “যখন ১৯৮৩ সালে পানামার প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার ম্যানুয়েল নরিয়েগা ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেশটির মানি-লন্ডারিং ব্যবসাটি জাতীয়করণ করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি মেডেলিন মাদকচক্রকে অংশীদার করে একে দেশব্যাপী বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করার অবাধ অধিকার দেন।”

এর কয়েকবছরের মধ্যেই বৈধ অফশোর ব্যাংকিং কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পানামার উদ্যোগ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। বৈশ্বিক আর্থিক সমস্যা বিশেষভাবে লাতিন আমেরিকাকে কঠিনভাবে আঘাত করে। আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর ঋণ বেড়ে যায়।

একই সময় পানামায় মাদকপাচার-ব্যবসার ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

শেষে ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাঠে নেমে পানামা দখল করে নিয়ে নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। ক্ষমতায় বসায় বেসামরিক আইনজীবী গুয়িলেরমো এনদারাকে। এতে মাদক পাচারকারীদের প্রভাব কমে পানামার আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কিছুটা ফিরে আসে।

কিন্তু দেশটির অর্থনৈতিক পদ্ধতি মানি-লন্ডারিংয় অনুমোদন করে এমন অভিযোগ থাকা সত্বেও, ধোঁকাবাজি ও আন্তর্জাতিক কর ফাঁকি দেওয়া চলতেই থাকে।

পানামা অন্যান্য করস্বর্গ থেকে আলাদা কেন?
“ভালো করস্বর্গ বলে কোনো কিছু নেই,” বিবিসি ফাইভকে বলেন কর বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জোলিয়ন মগহ্যাম।

“বিশ্ব অর্থনীতিতে তাদের কোনো ভূমিকা নেই, এসব সাধারণভাবে সর্বতোভাবে পানামার জন্য সত্য,” বলেন তিনি।

“এই গল্পে সত্যিকার বিশিষ্ট খারাপ চরিত্র হল পানামা। আপনার সম্পদ লুকিয়ে রাখার জন্য এটি একমাত্র কুৎসিত জায়গা। চরম ও বিরক্তিকর গোপনীয়তার জন্য এটি কুখ্যাত যা এর যোগ্যতা।”

আর/০৯:৫৫/০৮ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে