Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.4/5 (16 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-০৭-২০১৬

যে দীপ জ্বেলেছিলেন সুচিত্রা সেন

শান্তা মারিয়া


যে দীপ জ্বেলেছিলেন সুচিত্রা সেন

কলকাতা, ০৭ এপ্রিল- মহানায়িকা সুচিত্রা সেন অভিনীত সিনেমাগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা হলো ‘দীপ জ্বেলে যাই’। কাহিনি, অভিনয়, সংগীত, দৃশ্যায়ন সব মিলিয়ে ১৯৫৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা ছবিটি ধ্রুপদী হিসেবে গণ্য।

ন্যাশনাল সাইকোঅ্যানালিটিকাল ক্লিনিক একটি মানসিক হাসপাতাল।প্র খ্যাত মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. কর্নেল পি মিত্র এবং তার সঙ্গে একদল চিকিৎসক একটি জটিল গবেষণা করছেন। কর্নেলের তত্ত্ব অনুযায় যে রোগী মানসিক আঘাত পেয়েছে তাকে যদি যথেষ্ট পরিমাণে মানসিক প্রশান্তি ও নির্ভরতা দেওয়া হয় তাহলে সে শক ট্রিটমেন্ট ছাড়াও আরোগ্য লাভ করতে পারে। এই ওয়ার্ডে দেবাশীষ নামে এক তরুণ ভর্তি হয়। প্রেমিকার কাছ থেকে মানসিক আঘাত পেয়েছে সে। তার চিকিৎসার জন্য ডাক্তার নিয়োজিত করেন নার্স রাধা মিত্রকে। রাধাকে তিনি নির্দেশ দেন দেবাশীষের সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করতে। রাধার ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব দেবাশীষকে আরোগ্য করবে বলে মনে করেন ডাক্তার।দিনের পর দিন দেবাশীষকে সঙ্গ দেয় রাধা। ভালোবাসায় ভরিয়ে তোলে তার জীবন। ধীরে ধীরে নিজের উপর আস্থা ফিরে পায় দেবাশীষ। সে সুস্থ হয়। ডাক্তারের কাছ থেকে শোনে রাধার অভিনয় তাকে সারিয়ে তুলেছে। বাড়ি ফিরে যায় সে। দেবাশীষের বাড়ি চলে যাওয়ার দৃশ্যের মধ্য দিয়েই শুরু হয় সিনেমাটি। রাধা হাসপাতালের বারান্দা থেকে তাকিয়ে দেখছে দেবাশীষ চলে যাচ্ছে। টুকরো টুকরো ফ্ল্যাশব্যাকে দেখা যায় দেবাশীষের সঙ্গে তার সম্পর্ক।

রাধা তাকে বলে, "আমি তো নার্স। একেকজনের নিভে আসা জীবনে নতুন করে  দীপ জ্বালানো আমার কাজ।"

এরপর হাসপাতালে আসে নতুন রোগী তাপস চৌধুরি। তরুণ লেখক তাপসকে প্রতারণা করেছে সুলেখা নামে এক নারী। এরপর থেকে নারীদের ঘৃণা করে তাপস। সব নারীর মধ্যে সে দেখে সুলেখাকে। সে মনে করে সুলেখা তাকে হত্যা করতে চায়।। তাপসের চিকিৎসার ভার নিতে চায় না রাধা। কারণ সে আর ভালোবাসায় জড়াতে চায় না কারো সঙ্গে। বীণা নামে অন্য এক নার্স তার ভার নেয়। কিন্তু বীণাকে বিশ্বাস করে না তাপস। অন্যদিকে দেবাশীষের বিয়ে হয়ে যায় তার পুরনো প্রেমিকার সঙ্গেই যাকে না পেয়ে এক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল সে।।

ঘটনাচক্রে আবার তাপসের ভার এসে পড়ে রাধার উপর। এবারও তাপসের সঙ্গে ভালোবাসার অভিনয় করার জন্য নিয়োজিত হয় রাধা। রাধা আগের মতোই তাকে সঙ্গ দেয়। ভালোবাসার কথা বলে।তাপসকে তার পুরনো কথা মনে করিয়ে দিয়ে, তার সৃষ্টিশীলতার দিকে আবার অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা করে। তাকে স্নেহ ও ভালোবাসার স্পর্শ দেয়। কিন্তু ভেতরে ভেতরে রাধা ভুগতে থাকে চরম মানসিক সংকটে। কারণ দেবাশীষকে সে  সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিল। এখন তাপসকেও সে ভালোবাসে। তার মনোজগতে দেখা দেয় দ্বন্দ্ব। সে নিজে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। সে বুঝতে পারে না, দেবাশীষ, তাপস আলাদা ব্যক্তি নাকি অভিন্ন। সে তার নিজের ভালোবাসার বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়। রাধার অক্লান্ত শ্রমে তাপস সুস্থ হয়। সে চায় রাধাকে বিযে করতে। কিন্তু চিকিৎসক তাকে জানান, রাধা তার সঙ্গে অভিনয় করেছিল চিকিৎসার স্বার্থে।

এদিকে রাধা নিজেই তখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। সে বারে বারে বলতে থাকে "আমি অভিনয় করিনি, আমি অভিনয় করতে পারি না।" অন্যের জীবনের দীপ জ্বালিয়ে নিজের জীবনকে অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে রাধা। সে নিজেই হয়ে পড়ে মানসিক ওয়ার্ডের রোগী।

রাধা মিত্র চরিত্রে অসামান্য অভিনয় করেন সুচিত্রা সেন। বলতে গেলে তিনি একাই সিনেমার সিংহভাগ জুড়ে আছেন। দেবাশীষ ও তাপস চরিত্রে ছিলেন বসন্ত চৌধুরি। মানসিক রোগীর চরিত্রে বসন্ত চৌধুরি চমৎকার অভিনয় করেন।  বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের চরিত্রে অভিনয় করেন পাহাড়ী স্যান্যাল। একজন মানসিক রোগীর চরিত্রে অভিনয় করেন অনিল চ্যাটার্জি। অন্যান্য ভূমিকায় ছিলেন তুলসী চক্রবর্তি, নমিতা সিংহ, চন্দ্রাবতী প্রমুখ।

বিশিষ্ট লেখক আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছোট গল্প নার্স মিত্র অবলম্বনে গড়ে ওঠে সিনোমার কাহিনি। চিত্রনাট্য রচয়িতা ও পরিচালক ছিলেন অসিত সেন। ‘দীপ জ্বেলে যাই’ অসিত সেনের জীবনের সেরা পরিচালনা।

সংগীত পরিচালনা করেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। গীতিকার ছিলেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার। এ ছবির ‘এই রাত তোমার আমার’ গানটি বাংলা গানের জগতে অমর হয়ে আছে। ছবিতে গানে কণ্ঠ দেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে ও লতা মঙ্গেশকার। ছবিটির আবহ সংগীত ছিল অনবদ্য। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে হামিং  রোমান্টিক দৃশ্যগুলোতে অপূর্ব দ্যোতনা সৃষ্টি করে।

ছবিটিতে ক্যামেরার কাজ অসাধারণ। সুচিত্রা সেনের ক্লোজ ও লং শট তার সৌন্দর্য, অভিনয়, অভিব্যক্তি ধারণ করে সার্থকভাবে।দেবাশীষকে কখনো ছবিতে পুরোপুরি দেখা যায় না। তাকে ছায়া হিসেবে রাখা হয় রূপক হিসেবে। কারণ দেবাশীষের ভালোবাসা ছিল রাধার জীবনে ছায়ার মতো। আলো আঁধারির খেলা দেখা যায় বিভিন্ন দৃশ্যে। রাধার মনে ভালোবাসার রূপ, সংকট, দ্বন্দ্ব ফুটে ওঠে আলো আঁধারির খেলায়। কাহিনি ও সংলাপ রচয়িতা ছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। সংলাপ ছিল অত্যন্ত সাবলীল সেই সঙ্গে ইঙ্গিতবাহী। শেষ দৃশ্যে উন্মাদ রাধার কণ্ঠে ‘আমি অভিনয় করতে পারি না’ সংলাপ দর্শককে আবেগতাড়িত করে ভীষণভাবে। সুচিত্রা সেন তার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয় উপহার দেন এ ছবিতে।

পরবর্তীতে পরিচালক অসিত সেন ‘খামোশি’ নামে ছবিটি হিন্দিতে রিমেইক করেন। হিন্দি রিমেইকে অভিনয় করেন ওয়াহিদা রেহমান এবং রাজেশ খান্না। অতিথি চরিত্রে ছিলেন ধর্মেন্দ্র।

এর আগে সুচিত্রা সেন উত্তম কুমারের সঙ্গে জুটি বেঁধে ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও সাফল্য পেয়েছিলেন। কিন্তু সুচিত্রা চেয়েছিলেন উত্তম ছাড়াও তিনি সফল হতে পারেন কি না তা পরীক্ষা করতে।'দীপ জ্বেলে যাই' তাকে সে বিশ্বাস অর্জনে সাহায্য করে। এ ছবির বিপুল বাণিজ্যিক সাফল্য রয়েছে। সমালোচকদের প্রশংসায়ও ছবিটি ধন্য। ‘দীপ জ্বেলে যাই’-এর সাফল্য সুচিত্রার একার। মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের এ সাফল্যে তাকে প্রথম অভিনন্দন জানান বন্ধু ও মহানায়ক উত্তম কুমার।

আর/১১:২৪/০৭ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে