Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 4.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-০৭-২০১৬

‘হঠাৎ কোটিপতি’ দালালচক্র

এস এম রানা


‘হঠাৎ কোটিপতি’ দালালচক্র

চট্টগ্রাম, ০৭ এপ্রিল- চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নে বঙ্গোপসাগরের তীরে নির্মিতব্য কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমি কেনাবেচায় দালালি করে এক শ্রেণির মানুষ রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছে। আর এই হঠাৎ কোটিপতিদের দৌরাত্ম্যের কারণেই ফুঁসে উঠেছে গণ্ডামারার প্রান্তিক মানুষগুলো। প্রায় দুই বছর ধরে জমি কেনায় নানা ধরনের কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল দালালরা।

আর দালালদের পালিত ‘মোটরসাইকেল’ ও ‘অটোরিকশা’ বাহিনীর বেপরোয়া আচরণ উপকূলীয় চাষি-জেলে সম্প্রদায়ের আত্মসম্মানে আঘাত দিয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণ্ডামারায় বড় ধরনের আন্দোলনের সূচনা করা হয়েছে। এর নেপথ্যে জমির দাললচক্রের ভূমিকা বেশি বলে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে। আবার এই দালালচক্র স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে মিশে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়েছে। সেখানে সরকারি দল আওয়ামী লীগ, তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি-জামায়াতের স্থানীয় নেতারা একই পাত্র থেকে টাকা নিয়ে আখের ঘুছিয়েছেন।

বাঁশখালীর স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সামাজিক উদ্যোগও নিয়েছিল। কিন্তু দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে সেই উদ্যোগও ম্লান হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। গত সোমবার বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে-বিপক্ষে সমাবেশ বন্ধ করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিতে চারজন নিহত এবং পুলিশসহ বেশ কিছু লোক আহত হয়। এই ঘটনার পর থেকেই দালালচক্রসহ সুবিধাভোগীরা আত্মগোপনে চলে গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, গণ্ডামারা ইউনিয়নের সাগর উপকূলে কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে দুই বছর আগে থেকেই প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এস আলমের সঙ্গে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিকানায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে, যাতে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে।

প্রকল্পের জন্য জমি কেনা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই এলাকায় এক শ্রেণির চালালচক্র তৈরি হয়, যারা প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে কম দামে জমি কিনে বেশি দামে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রি করেছে। অতি মুনাফালোভী এই দালালচক্র প্রান্তিক মানুষগুলোকে কখনো আরএস-বিএস খতিয়ানের, কখনো ওয়ারিশ-সংক্রান্ত নানা জটিলতায় ফেলেছে। আবার বঙ্গোপসাগরের দিকে ‘মাথাখিলা’ জমির (মালিকানা জমির সামনে বঙ্গোপসাগরের দিকে যে জমি ভেসে ওঠে) মূল্য নিয়েও নানা ধরনের কূটচাল করেছে। এসব কূটকৌশলের মাধ্যমে জমির প্রকৃত মালিককে কম দাম দিয়ে বেশি মুনাফা করেছে দালালরা। জমির প্রকৃত মালিকরা প্রকৃত ক্রেতার নাগালও পায়নি। দালালচক্রের এই কারসাজির বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার পর বেশি ক্ষোভ জন্মেছে প্রান্তিক মানুষের মনে।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, এস আলম গ্রুপ জমি কেনার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাসহ এলাকার প্রভাবশালী শতাধিক মানুষ নানাভাবে দালালি প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে কিছু মানুষ পরে সরে যায় আর কিছু দালাল কোটিপতি হয়ে যায়। দালালদের কেউ কেউ প্রকল্পের শুরুর দিকে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল, পরে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করে দালালের খাতায় নাম লিখিয়ে কোটিপতি বনে যায়। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী এবং এলাকার জনপ্রতিনিধিরা রয়েছেন।

গ্রামবাসীর অভিযোগ, আকস্মিক কোটিপতি হওয়াদের একজন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের সমন্বয়কারী নাছির উদ্দিন। তিনি জমির প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার মধ্যে যে জমি নিজের নামে কেনেন, পরে তা প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রি করেন আট থেকে ১২ লাখ টাকায়।

আরেক হঠাৎ কোটিপতি হলেন গণ্ডামারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উপজেলা জামায়াতের নেতা মাওলানা আরিফ উল্লাহ। তিনি নাশকতা মামলার আসামি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, চেয়ারম্যান থাকার সুবাদে নাছির উদ্দিনের সঙ্গে তিনি সখ্য গড়ে তোলেন এবং জমি কেনাবেচায় প্রভাবশালী দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।

এভাবে কটিপতি হওয়াদের মধ্যে আরো আছেন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের সহকারী সমন্বয়কারী ও শীলকূপ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বাহাদুর আলম হিরণ, সাবেক মেম্বার নুরু, গণ্ডামারার আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল মোস্তফা সংগ্রাম, মানবপাচার মামলার আসামি ইউপি মেম্বার জাকের আহমদ, মেম্বার হাফেজ শহিদুল্লাহ, নাছিরের ভাগ্নে মোহাম্মদ নাছির (ওরফে ভাগিনা নাছির), শীলকূপের এনামুল হক এনাম, নাগু মেম্বারসহ অনেকে।

জমির দালালি করে কোটিপতি বনে যাওয়া এবং মোটরসাইকেল ও অটোরিকশায় নিজস্ব বাহিনী লালনের বিষয়ে জানতে নাছির উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। একইভাবে বাহাদুর আলম হিরণ, আরিফ উল্লাহ চেয়ারম্যানকেও ফোন করা হয়। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

জানতে চাইলে গণ্ডামারা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মাস্টার শামসুল আলম বলেন, ‘অনেকেই জমি বেচাকেনায় মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে কাজ করেছে। জমি বেচাকেনায় এ ধরনের মধ্যস্থতাকারী লাগে। তবে তারা প্রকৃত জমির কোনো মালিককে ঠকিয়েছে, এমন অভিযোগ আমি পাইনি।’ জমির দালালরা মোটরসাইকেল ও অটোরিকশায় নিজস্ব বাহিনী লালন করত এবং তারাই গ্রামবাসীকে বেশি বিরক্ত করেছে—এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘এমন কিছু তো আমরা দেখিনি।’

বাঁশখালীতে ঢিলেঢালা হরতাল, তদন্ত চলছে : গত সোমবার গুলিতে বিদ্যুৎকেন্দ্রবিরোধী চারজন গ্রামবাসীর মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে ডাকা হরতাল বাঁশখালীতে ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। হরতালের পক্ষে পিকেটারদেরও মাঠে দেখা যায়নি।

সাতকানিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার এ কে এম এমরান ভুঁইয়া জানান, হরতালের সময় বাঁশখালীর পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ছিল। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সোমবার হতাহতের ঘটনার পর দায়ের করা তিন মামলায় নতুনভাবে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, তবে অভিযান চলছে।

স্থানীয় সাংবাদিকরা জানান, গণ্ডামারায় পুলিশ-র‌্যাবের যৌথ অভিযান শুরু হচ্ছে—এমন গুজবে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অভিযান হয়নি। এ ছাড়া তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটি চট্টগ্রাম শাখার একটি প্রতিনিধিদল গতকাল গণ্ডামারায় গিয়ে নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তারা বলে, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে বাঁশখালীর গণ্ডামারার মানুষ জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছে, দেশ, পরিবেশ ও সমাজের স্বার্থে কোনো আপস চলে না। তারা ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে নিহত এবং আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি অবিলম্বে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবি জানায়।

এদিকে গতকাল দুপুরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পক্ষে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে একদল লোক।

সোমবারের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, কমিটি তদন্ত করছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মমিনুর রশিদ বলেন, তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরেজমিন গিয়ে তদন্ত হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে জেনেছি, গণ্ডামারা এলাকার পরিস্থিতি এখনো উত্তপ্ত। এ রকম থাকলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। তাই পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে