Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.4/5 (8 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৪-০২-২০১৬

তবুও অভিনন্দন নির্মলেন্দু গুণ

প্রভাষ আমিন


তবুও অভিনন্দন নির্মলেন্দু গুণ

আমি কবিতা প্রতিবন্ধী মানুষ। তবু যেটুকু বুঝি, তাতে আমার প্রিয় কবির সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন নির্মলেন্দু গুণ। আমি জানি তিনি শুধু আমার প্রিয় কবি নন, বাংলা সাহিত্যেরই অন্যতম সেরা কবি। শুধু কবি হিসেবেই নয়, তার গদ্যও অসম্ভব শক্তিশালী। ব্যক্তি নির্মলেন্দু গুণও আমার খুবই প্রিয়। তাঁর তীক্ষè রসবোধ, অসাধারণ ক্রীড়া প্রেম, বিশেষ করে ক্রিকেট প্রেম আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছে প্রায় দুই যুগ। আমার খুবই সৌভাগ্য বাংলাবাজার পত্রিকায় অল্প কিছুদিন তাঁর সহকর্মী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।

গুণদা আপাদমস্তক কবি চলনে, বলনে, জীবনাচরণে। নির্মলেন্দু গুণের মতো একজন খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় মানুষ পাঁচ দশক ধরে ঢাকায় আছেন। তার বেশিরভাগ সময় কেটেছে বস্তিতে, এটা ভাবা যায়! তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে বা তাঁর কবিতা অবলম্বনে সিনেমা বানিয়েই হয়ত অনেকে তাঁর চেয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করেছেন। চাইলে যে তিনি নিজে অর্থ উপার্জন করতে পারতেন না, তা নয়, করেছেনও। কিন্তু উপার্জিত অর্থ তিনি ভোগ বিলাসে ব্যয় করেননি। বারহাট্টায় একটি স্কুল বানিয়েছেন। শেষ জীবনে কামরাঙ্গিরচরে একটি ছোট্ট বাড়ি বানিয়েছেন। সেই বাড়ি নিয়ে তাঁর কত আহলাদ। তাঁর শিশুসুলভ সারল্য দেখে ভালো লাগে। নির্মলেন্দু গুণের ঢাকায় একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে, এটা জানার পর আমাদের অনেকের জীবনযাপনের গ্লানি কমে আসে।

গুণদা স্বাধীনতা পদক পাননি, এটা আমার জানা ছিল না। আমার ধারণা ছিল, সাহিত্য বিচারে অনেক আগেই তিনি এই পুরস্কারটি পেয়েছেন। ‘যেভাবে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলো’ এই কবিতার কবিরই সবার আগে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার অধিকার। নির্মলেন্দু গুণ ২০০০ সালে একুশে পদক পেলেও স্বাধীনতা পুরস্কার পেলেন এবার, তাও অনেক নাটকের পর। এমন নয় যে তিনি তরুণ কবি। ৭২ বছর বয়সে তাঁর সাহিত্যসংশ্লিষ্ট সব পুরস্কারই পেয়ে যাওয়া উচিত। মরণোত্তর পুরস্কারে আসলে পুরস্কারপ্রাপ্তদের কিছু যায় আসে না।

এ বছর ৭ মার্চ সরকার স্বাধীনতা পুরস্কারের জন্য ১৪ ব্যক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ঘোষণা করে। তার দুদিন পর নির্মলেন্দু গুণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘আমাকে স্বাধীনতা পদক দিন’ শিরোনামে একটি স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছিলেন ‘আমার একদা সহপাঠিনী, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার দৃষ্টে আমি প্রথম কিছুকাল অবাক হয়েছিলাম কিন্তু আজকাল খুবই বিরক্ত বোধ করছি। শেখ হাসিনা স্বাধীনতা পদকের মুলোটি আমার নাকের ডগায় ঝুলিয়ে রেখেছেন। কিন্তু কিছুতেই সেটি আমাকে দিচ্ছেন না। ওনার যোগ্য ব্যক্তির তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হতে হতে আকাশ ছুঁয়েছে। কিন্তু সেই তালিকায় আমার স্থান হচ্ছে না।’ তিনি আরো লিখেছিলেন, ‘আমাকে উপেক্ষা করার বা কবি হিসেবে সামান্য ভাবার সাহস যার হয়, তাকে উপেক্ষা করার শক্তি আমার ভিতরে অনেক আগে থেকেই ছিল, এখনও রয়েছে। পারলে ভুল সংশোধন করুন। অথবা পরে এক সময় আমাকে এই পদকটি দেওয়া যাবে, এই ধারণা চিরতরে পরিত্যাগ করুন।’

নির্মলেন্দু গুণের এই স্ট্যাটাস নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয় সামাজিক মাধ্যমে তো বটেই, গণমাধ্যমেও। অনেকেই তার এই স্ট্যাটাসকে ‘হ্যাংলামো’ বলে অভিহিত করেন। অনেকে তাঁকে ‘লোভী’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। কিন্তু যারা নির্মলেন্দু গুণকে চেনেন, তারা জানেন, তিনি এমনই সরল, সহজ, অকপট। নিজেকে নিয়ে প্রকাশ্যে এমন স্যাটায়ার করার ক্ষমতা সবার থাকে না। আমরা তো জানি, পদক-পুরস্কার পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকরা কত রকমের তদ্বির করেন। নির্মলেন্দু গুণ তার ধার ধারেননি। তিনি প্রকাশ্যে তাঁর দাবি তুলে ধরেছেন। আর এমন দাবি করতেও যোগ্যতা লাগে। যে কেউ এমন দাবি করলেই তো আর তিনি পুরস্কার পেয়ে যাবেন না। আমরা জানি, পুরস্কার বা পদকে নাম মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য একটি প্রধান বিবেচনা। বাংলাদেশে নির্মলেন্দু গুণের চেয়ে বড় বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক আর কে আছে? শেখ হাসিনা যার সহপাঠিনী, তিনি ঢাকায় বস্তিতে থাকেন, এটা নির্মলেন্দু গুণ বলেই সম্ভব।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, স্ট্যাটাসের দুদিনের মাথায় সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এখানেও তিনি অকপট। সরকারের সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করে নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, ‘ফেসবুক যে অনেক শক্তিশালী সেটা আবার প্রমাণিত হয়েছে। আমার এই স্ট্যাটাসটি প্রধানমন্ত্রীর চোখে পড়েছে। তিনি মনে করেছেন আমার এই দাবি ন্যায্য। তাকে ধন্যবাদ।’ স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার দাবি প্রকাশ্যে তোলার যুক্তি হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘আমি স্বাধীনতা পদক চেয়েছি এই জন্যই যে, আমি চাই এই পদকটি সসম্মানে সচল থাকুক।’ তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘ভালোবাসা আদায় করতে হয়, পুরস্কারও আদায় করতে হয়, অর্থও আদায় করতে হয়।’

আমি বিশ্বাস করি, স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে নির্মলেন্দু গুণকে সম্মানিত করা হয়নি। তিনি এই পুরস্কারের জন্য একটু বেশিই যোগ্য। বরং নির্মলেন্দু গুণকে দেওয়ার মাধ্যমে এই পুরস্কারের সম্মানই আরো বাড়ল। তবে বিলম্বে নাম ঘোষণার প্রতিবাদে পুরস্কারটি তিনি গ্রহণ না করলে ভালো করতেন। উপেক্ষা করার যে শক্তি তাঁর মধ্যে আছে বলে তিনি দাবি করেছেন, তা দেখাতে পারলে ভালো লাগত। দেরিতে হলেও যোগ্য লোককে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ। অভিনন্দন নির্মলেন্দু গুণকেও।

এফ/০৯:৩১/০২ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে