Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.5/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-২৭-২০১৬

ব্রাসেলস হামলা, নিরাপত্তাহীনতায় ইউরোপ

ইফতেখার হোসাইন


ব্রাসেলস হামলা, নিরাপত্তাহীনতায় ইউরোপ

ব্রাসেলস, ২৭ মার্চ- গত বছরের নভেম্বরে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে মরণঘাতী হামলার ঘটনায় ১৩০ ব্যক্তি নিহত, আহত হয়েছিলেন আরো ৩৬২ জন। প্যারিসের কনসার্ট হল, বার ও পানশালায় চালানো ওইসব হামলায় অংশ নিয়েছিলেন আট আইএস উগ্রমনা। ওই হামলার কিছু মাস পরে অবশেষে গত মঙ্গলবার ইউরোপের আরেক দেশ বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের ব্যস্ততম বিমান বন্দর ও রেল স্টেশনে সন্ত্রাসী জঙ্গিরা হামলা করে। দুটি ঘটনার ভয়াবহতা ও চরিত্র এক। প্যারিসে যে বা যে চক্র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে তাদেরই আরেকটি দক্ষ ও প্রশিক্ষিত দল ব্রাসেলসে আক্রমণ করে। এতে দেশটির প্রধান বিমানবন্দর ও রেল স্টেশন এক ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে। আর এতে অন্তত ৩১ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ২৭০-৩০০ বেসামরিক লোক আহত হন। হতাহত ব্যক্তিরা বেলজিয়ামসহ প্রায় ৪০টি দেশের নাগরিক ছিলেন। 

প্যারিসের ঘটনায় আইএস অনেকটা দায়িত্ব নিয়েই হামলায় অংশ নেয়া জিহাদিদের ছবি প্রকাশ করেছিল। তখন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা প্রশাসন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এদিকে ব্রাসেলসে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডেও শহরে এখন জরুরি অবস্থা চলছে। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী টহল দিচ্ছে বিমানবন্দর, পাতাল ট্রেন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে। আর ব্যস্ততম হাইওয়েগুলোতে বসানো হয়েছে তল্লাশি চকি। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সব সীমান্ত দ্বার। আতঙ্কিত বেলজিয়ামবাসীর নিত্যদিনের কাজে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। সাধারণ মানুষ খুব জরুরি না হলে ট্রেন ও বিমানবন্দর এলাকা ত্যাগ করছে। শহরের হাসপাতাল আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বিশেষ বাহিনীর পাশাপাশি অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই চলছে সবকিছু। 

এমন উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে প্রকৃত হামলায় অংশ নেয়া ব্যক্তির হদিস খুঁজছে দেশটির নিজস্ব বাহিনী ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকার যত গোয়েন্দা দল। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো গোষ্ঠী ওই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে ব্রাসেলসের কৌঁসুলি ফ্রেডরিক ভন লিউ গত বুধবার বলেন, জাভেনতেম বিমানবন্দরে আত্মঘাতী হামলায় অংশ নেন ইব্রাহিম আল বকরাউয়ি (২৯)। আর মেট্রো স্টেশনে হামলায় অংশ নেন তার ভাই খালিদ আল বকরাউয়ি (২৭)। অপর বিমানবন্দরে আত্মঘাতী হামলায় অংশ নেয়া আরেকজনের নাম নাজিম লাশরাউয়ি (২৫)। 

এদিকে পুলিশ বিমানবন্দরে হামলায় অংশ নেয়া তৃতীয় ব্যক্তির খোঁজে গতকাল অভিযানে নেমেছে। সিসিটিভির ফুটেজে ইব্রাহিম ও নাজিমের পাশে তাকে হ্যাট ও জ্যাকেট পরা অবস্থায় দেখা গিয়েছে। অন্য দুই আত্মঘাতী হামলাকারীর বিস্ফোরক-ভর্তি লাগেজ বিস্ফোরিত হলেও তার লাগেজটির বিস্ফোরক ফাটেনি। পাশাপাশি মেট্রো স্টেশনের হামলায় অংশ নেয়া সন্দেহভাজন আরেক ব্যক্তির অবস্থানও শনাক্ত করার চেষ্টা করছে গোয়েন্দারা। গোয়েন্দাদের ভাষ্য, বিমানবন্দরের সিসিটিভির ফুটেজে ধরা পড়া তিন জনেরই ফ্রান্সের প্যারিসে গত নভেম্বরের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। ওই হামলার দায় স্বীকার করে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এতে করে ব্রাসেলসে হামলা কারা করেছে সেটা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। 


উপরন্তু যে বিষয়টি সবার সামনে চলে আসে তা হলো ইউরোপীয়দের নিরাপত্তার শঙ্কা। এতে করে ইউরোপীয় দেশগুলো কতটা হুমকির মধ্যে রয়েছে, তাও সহজে অনুমেয়। আর তা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ইতিমধ্যে ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে বিবৃতিও দিয়েছেন এ নেতা।  

এদিকে প্যারিস হামলায় জড়িত বেলজিয়ামের নাগরিক সালেহ আবদেসালামকে গ্রেপ্তারের চারদিনের মাথায় ব্রাসেলসের ওই বিস্ফোরণের মাধ্যমে কী কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী প্রতিশোধ নিলো? এমন প্রশ্নও এখন বিশ্লেষকদের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে। সালাহ আবদেসালামকে গত সপ্তাহে ব্রাসেলসের মুসলিমপ্রধান মলেনবিক মহল্লা থেকে গ্রেপ্তারের পর থেকে এমন আশঙ্কাই জনমনে দানা বাঁধছিল। মরক্কোর বংশোদ্ভূত আবদেসালাম ফরাসি নাগরিক। তবে তিনি তার ভাই ইব্রাহিম আবদেসালামের সঙ্গে প্রতিবেশী বেলজিয়ামের মলেনবিকে থাকতেন। প্যারিস হামলার সময় নিজেকে বোমায় উড়িয়ে দিয়েছিলেন ইব্রাহিম। আর ওই হামলার মূল হোতা আবদুলহামিদ আবাউদ ছিলেন বেলজিয়ামেরই নাগরিক। হামলার পাঁচদিন পর তিনি পুলিশের গুলিতে মারা যান। 

ব্রাসেলসের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত মলেনবিক এলাকায় লাখ খানেক মানুষের বাস। বিভিন্ন কারণে সেখানে ইসলামি চরমপন্থার বিস্তার হয়েছে। এই এলাকাটি ইউরোপের এ দেশটির জন্য এখন বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী প্যারিস হামলার পর মলেনবিককে বিরাট সমস্যা বলে উল্লেখও করেছেন। মলেনবিকের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ বেকার। পুরো এলাকাটিই হতশ্রী দোকানপাটে ভরা। যেসব অভিবাসী এখানে বাস করতে আসে, তাদের বেশির ভাগই হয় শুধু আরবি কিংবা ফরাসি ভাষা জানে। কিন্তু ব্রাসেলসের অভিজাত এলাকায় কাজ পেতে ফরাসি, ফ্লেমিশ, ডাচ কিংবা ইংরেজি জানতে হয়। অর্ধশতাব্দী আগে এখানে প্রথমে তুরস্ক ও পরে মরক্কোর মুসলিম অভিবাসীরা বসতি গড়ে। ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের আফ্রিকা প্রতিনিধি জ্যাসন বার্ক ব্রাসেলসের হামলা নিয়ে একটি বিশ্লেষণী প্রতিবেদন করেছেন। সেখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এটা কি প্রতিশোধমূলক হামলা? নতুন সেল ও অযোগ্য নিরাপত্তা সার্ভিসের প্রমাণ? গত বছর প্যারিস হামলায় জড়িত সন্দেহে গত শুক্রবার আটক সালেহ আবদেসালামের নেটওয়ার্ক এখনো সচল? অথবা মঙ্গলবার সকালের এই হামলা সম্পর্কে আমাদের কাছে কোনো তথ্য ছিল নাকি ওপরের কোনোটিই নয়?

সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য হচ্ছে তারা সন্ত্রাস ও সহিংসতা ঘটাতে পারে তা দেখানো। এই হামলা ততটা প্রতিশোধমূলক নয়, তবে তাদের ধারাবাহিক সক্ষমতার প্রদর্শন। তাদেরকে ধ্বংস করা যাবে কিন্তু তারা যদিও বলছে, তা সম্ভব নয়। এসব ঘটনার পর ইউরোপের গোয়েন্দা সংস্থা ইউরোপোল গোটা ইউরোপের দেশগুলোর প্রতি সন্ত্রাসী হামলা হওয়ার সতর্কতা জারি করেছে। বিশেষ করে সিরিয়া থেকে আসা শরণার্থীদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইসলামিক স্টেট সংগঠনের সদস্যদের তরফ থেকে এই হামলার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছে তারা। এখন পর্যন্ত ইউরোপে প্রায় ৫ হাজার মানুষ চরমপন্থি জিহাদের আদর্শ গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে আইএসের এমন উত্থান ব্রাসেলসের পিছিয়ে থাকা মুসলিমদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দেয়। বেলজিয়ামের গোয়েন্দা তথ্যমতে, ছোট এ দেশটি থেকেই প্রায় ৫০০ মুসলিম আইএসের পক্ষে লড়াই করতে সিরিয়া ও ইরাকে গেছে। এমন পরিস্থিতি ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে করণীয় নির্ধারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিচারমন্ত্রীরা গত বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে জরুরি বৈঠকে বসেন। 


ব্রাসেলস হামলায় আতঙ্ক বাড়িয়েছে অভিবাসন ইস্যুতেও। সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ইয়েমেন থেকে প্রচুর অভিবাসী তুরস্ক হয়ে ইউরোপে ঢুকছে। জার্মানি, পোলান্ড, তুরস্কসহ ইউরোপের নানা দেশ তাদের আশ্রয় দিচ্ছে। কোন দেশ কত পরিমাণে অভিবাসী নিবে তার হিসাব-নিকেশ নিয়ে সম্মেলনও হয়ে থাকে। তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না অভিবাসীদের গতি। আন্তর্জাতিক গবেষকদের অনেকে মনে করছেন, বেশি সংখ্যক অভিবাসী বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের শান্তিপ্রিয় দেশগুলোতে অভিগমনের কারণে সেসব দেশ এখন আইএস হামলার টার্গেটে পরিণত হয়েছে। কিংবা ওই অভিবাসীরাই নিজ দেশে শরণার্থী হয়ে বিদেশে জঙ্গিপনা কাজের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছেন। তাই আর কোনো নতুন অভিবাসী গ্রহণ করবে না বলে পশ্চিমের দেশগুলো এখন সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। নিরাপত্তার শঙ্কায় তারা অনেক বেশি সচেতনতা অবলম্বন করছে। এই যেমন- হামলাকারীরা আইএস জঙ্গি এবং বহিরাগত বলেই পোল্যান্ড ইতিমধ্যে ৪০০ জন শরণার্থী নিবে না বলে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দিয়েছে। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বেয়াটা শিডলো বলেছেন, ‘ব্রাসেলসে যা ঘটে গেল তারপরও আমাদের পক্ষে বলা সম্ভব নয় যে, এখনো শরণার্থী গ্রহণে আমরা রাজি আছি৷’ তিনি মনে করেন, ঢালাওভাবে শরণার্থী গ্রহণ শুরু করার কারণেই ইউরোপে নিরাপত্তা সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

এফ/২৩:০২/২৭মার্চ

ইউরোপ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে