Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৩-২৫-২০১৬

পাঁচ তারকা হাসপাতালে বাণিজ্য

পাঁচ তারকা হাসপাতালে বাণিজ্য

ঢাকা, ২৫ মার্চ- রগচটা ফেরিওয়ালা যেমন কর্কশ সুরে হাঁক ছাড়ে—‘ফেলো কড়ি গান শোনো/ মাখো তেল নাচ দেখো’, তেমন সুরেই বেখাপ্পা বাণিজ্য ফেঁদে বসেছে দেশের অভিজাত হাসপাতালগুলো। আভিজাত্য আর চাকচিক্যে পাঁচ তারকা হোটেলের আদলে গড়ে তোলা একেকটি হাসপাতাল যেন রক্তচোষা বাদুড় হয়ে উঠেছে। সেখানে চিকিৎসাসেবা বলতে কোনো কিছু নেই। পুরোটাই পরিণত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রে। মৃত্যুপথযাত্রী রোগীকে মেঝেতে ফেলে রেখেও তারা অবলীলায় কড়ায়-গণ্ডায় হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। চাহিদামাফিক টাকা আদায় করতে রোগীর লাশ আটকে রাখতেও দ্বিধা করছে না তারা। রাজধানীর অধিকাংশ অভিজাত হাসপাতাল-ক্লিনিকের বিরুদ্ধেই অবহেলা, ভুল চিকিৎসা আর পদে পদে রোগী হয়রানির সবচেয়ে বেশি অভিযোগ। নিজেদের আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান দাবি করে একশ্রেণির বেসরকারি হাসপাতাল রোগীদের পকেট খালি করার ধান্ধাতেই ব্যস্ত থাকছে। সেসব স্থানে রোগীদের রীতিমতো জিম্মি করে ‘মুক্তিপণ’ স্টাইলে আদায় করা হচ্ছে টাকা। আন্তর্জাতিক মানের দাবিদার অন্তত ১০টি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে রোগী ঠকানো, হয়রানি ও মাত্রাতিরিক্ত টাকা হাতানোর অভিযোগ রয়েছে।

চিকিৎসাসেবার নামে উচ্চমাত্রার বাণিজ্য করেই ক্ষান্ত নয় তারা, উপরন্তু রোগীদের আটকে রেখে, লাশ জিম্মি করে, স্বজনদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার মতো ‘বর্বরতা’ চালানোর অসংখ্য নজির রয়েছে। অবহেলা, ভুল চিকিৎসা ও লাশ আটকে পৈশাচিক কায়দায় টাকা আদায়ের অভিযোগ মাথায় নিয়ে অতিসম্প্রতি তিনটি অভিজাত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। শিশুর মৃত্যু ঘটিয়ে লাশ লুকিয়ে টাকা আদায়ের ঘটনায় হাইকোর্টের নির্দেশে একটি হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স, কর্মচারীসহ ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের গ্রেফতারও করা হয়। এত কিছুর পরও রাজধানীর অভিজাত হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাব্যবস্থায় চরম নৈরাজ্য থামছেই না। এসব হাসপাতালে একের পর এক ভুল চিকিৎসা, রোগী হত্যা, অঙ্গহানি, চিকিৎসা খরচের নামে সর্বস্ব হাতিয়ে নেওয়া, লাশ আটকে রেখে টাকা আদায়সহ নানা হয়রানির অসংখ্য অভিযোগ উঠলেও তা ধামাচাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে। এ দেশে ভুল চিকিৎসায় এত এত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন অথচ দোষী চিকিৎসকের কিছু হয় না। ভুল চিকিৎসার শিকার বেশির ভাগ মানুষ ক্ষতিপূরণের কোনো অভিযোগ ছাড়াই চুপচাপ বাড়ি ফিরে যান। এ ছাড়া ভুল চিকিৎসার বিরুদ্ধে এ দেশে কোনো অনুসন্ধান হয় না, অভিযোগ হয় না, ক্ষতিপূরণের নজির নেই বললেই চলে। হাসপাতালগুলো মৃত মানুষকে লাইফ সাপোর্টে রেখে তার পরিবারকে কত বড় বিল ধরিয়ে দিতে পারে, তা-ই যেন প্রাধান্য পায়। অভিজাত নামধারী হাতে গোনা কয়েকটি পাঁচ তারকা হাসপাতাল বারবার নানা অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও তাদের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় টুঁ শব্দটি করার সাহস পায় না।

কমিশনখোর চিকিৎসকদের মহা বাণিজ্য : ঢাকার পাঁচ তারকা খ্যাত অভিজাত হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের কোনো বেতন নেই, আছে শুধু কমিশন। এই কমিশনকেই মাসিক বেতন হিসেবে ধরা হয়। কমিশনকেই ধরা হয় বাণিজ্য হিসেবে। চিকিৎসায় কমিশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কমিশন, ওষুধপথ্যে কমিশন, বিদেশে রোগী পাঠানোর ব্যবস্থা করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে মোটা অঙ্কের কমিশন। হাসপাতালে পাঠানো থেকে রোগীর লাশ হয়ে বের হওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই চলে বেপরোয়া কমিশন-বাণিজ্যের ধকল। আর এত সব কমিশন হাতানোর ধান্দাবাজি সার্থক করতেই রোগীদের মৃত্যুর পরও রেহাই মিলছে না। অভিজাত হাসপাতালগুলোতে ‘যত বিল তত কমিশন’ ভিত্তিতে চিকিৎসকদের ভিড় জমে ওঠে। শতকরা ২০ থেকে ৪০ ভাগ কমিশন হাতানো চিকিৎসকরা পাঁচ তারকা হাসপাতালগুলো ঘিরে মহা বাণিজ্য ফেঁদে বসেছেন। এ বাণিজ্যের প্রতারণা থেকে রোগী-স্বজন কারও নিস্তার নেই। চিকিৎসকরা এখানে সামান্য জ্বর, ঠান্ডা, কাশির জন্যও ডজন ডজন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা লিখে দিচ্ছেন। প্রয়োজন থাকুক না থাকুক, একগাদা শারীরিক পরীক্ষা, হাসপাতালে ভর্তি, ছোট-বড় অপারেশনের মুখোমুখি করিয়ে লাইফ সাপোর্টের পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে রোগীকে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের জন্য রয়েছে লোভনীয় কমিশন। সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী বাগিয়ে নিয়ে অভিজাত হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারলেই শতকরা ৪০ ভাগ ‘ভর্তি ফি’ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পকেটে ঢোকে। ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক পান শতকরা ৩০ থেকে ৬০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন। অন্যদিকে অত্যধিক ভাড়ার বেড-কেবিনে রোগী রাখার ক্ষেত্রেও চিকিৎসককে শতকরা ২০ থেকে ৪০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন দেওয়ার নজির রয়েছে।

লাইফ সাপোর্টের ধান্ধাবাজি : সাধারণ রোগ নিয়ে ভর্তি হলেও একের পর এক জটিল রোগ আবিষ্কার, অপারেশন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, কারণ ছাড়াই আইসিইউ, লাইফ সাপোর্টসহ নানা ধরনের স্পেশাল কেয়ারে রাখার ক্যারিশমা চলতে থাকে। বেসরকারি ফার্মের একজন চাকুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে উন্নত চিকিৎসা নিয়ে বাঁচার আশায় শেষ সম্বল বিক্রি করে ভর্তি হন ঢাকার বারিধারার একটি পাঁচ তারকা হাসপাতালে। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক তাকে আনুমানিক তিন লাখ টাকা খরচের আগাম ধারণা দেন। অথচ ২৮ দিনের মাথায় রোগীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ১৩ লাখ টাকার বিল। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, প্রয়োজন ছিল না, তবু তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। লাইফ সাপোর্ট ব্যবহারের বিশেষ বাণিজ্যিক কৌশলটি সাম্প্রতিক সময়ে খুবই পরিচিত করে তোলা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, লাইফ সাপোর্টে রাখা অবস্থায় একজন রোগীর প্রতিদিনের বিল করা হয় ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। আইসিইউতে ভাড়া প্রতিদিন সাড়ে সাত থেকে আট হাজার টাকা। এর সঙ্গে বিল করা হয় ভেনটিলেটর সাড়ে তিন হাজার, মনিটর ১১ হাজার, আলফা বেড চেইঞ্জ, চিকিৎসকের ভিজিট, টেস্ট, রেডিওলজি—সবকিছু মিলিয়ে আর ৫০ হাজার টাকা।

নিয়ন্ত্রণহীন সেবা ফি : বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে রোগীদের কাছ থেকে মাত্রাতিরিক্ত ‘সেবা (!) ফি’ আদায়ের পাগলা ঘোড়া কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। দিনে দিনে, এমনকি ঘণ্টার ব্যবধানে পাল্টে যাচ্ছে চিকিৎসার খরচ। খেয়ালখুশিমতো বাড়ানো হচ্ছে সেবা ফি। বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোতে নিয়ন্ত্রণহীন ‘সেবা মূল্য’ আদায়ে রোগীদের জিম্মিসহ নানা মাত্রার হয়রানি-অত্যাচার ইংরেজ নীলকরদেরও হার মানাচ্ছে। একই রোগী সাধারণ ওয়ার্ডে থাকাবস্থায় চিকিৎসকের ভিজিট প্রতিবারের জন্য ৮০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত হলেও ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বা হাইলি ডিপেনডেন্স ইউনিটে স্থানান্তরের পর একই চিকিৎসকের ভিজিট বেড়ে দাঁড়ায় দুই হাজার টাকা। ছুটির দিনে একজন জুনিয়র চিকিৎসকের ভিজিটও দুই থেকে আড়াই হাজার পর্যন্ত ওঠে বলে ভুক্তভোগী রোগীরা ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন।

বিল আদায়ের জঘন্য প্রক্রিয়া : অভিজাত হাসপাতালগুলোর মালিক কর্তৃপক্ষ যেমন প্রভাবশালী হয়ে থাকেন, তেমনি স্থানীয় প্রশাসন ও থানা পুলিশের সঙ্গেও তাদের থাকে দহরম-মহরম সম্পর্ক। রোগী বা তার স্বজনরা অনিয়ম-অভিযোগ নিয়ে টুঁ শব্দটি করলেই হাসপাতালের পক্ষ হয়ে পুলিশ গিয়ে হাজির হয়। কখনো কখনো রোগীর স্বজনদের বিরুদ্ধেই উল্টো চুরি, ভাঙচুর, হামলা, চাঁদাবাজি সংক্রান্ত মামলা করে রীতিমতো তাড়িয়ে বেড়ানোর ঘটনা ঘটে। এ্যাপোলো, ইউনাইটেড, পপুলার কিংবা কমফোর্টে চিকিৎসা খরচ পৃথিবীর যে কোনো উন্নত দেশের চেয়ে মোটেও কম নয়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের আদলে সেবা আর আচরণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। এসব হাসপাতালে রোগী ভর্তি ফি ও বেড ভাড়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। অভিজাত এই হাসপাতালগুলো আইনের কোনো তোয়াক্কা করে না। এ হাসপাতালগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এফ/১০:১৮/২৫মার্চ

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে