Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (105 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-২১-২০১৬

দয়া করে তাকে হত্যা করতে দিবেন না!

ফাইয়াজ আহমেদ


দয়া করে তাকে হত্যা করতে দিবেন না!

ঢাকা, ২১ মার্চ- আমি আমার সন্তানকে ১০ মাস ১০ দিন পেটে ধরে জন্ম দিয়েছি। অনেক কষ্ট করে তাকে বড় করছি। আমার সন্তানকে বাঁচান। সে আর আগের মতো হাসে না, খেলে না, ছবি আঁকে না, একবারে চুপচাপ থাকে। দয়া করে তাকে হত্যা করতে দিবেন না।

সামনে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনি (পিইসি) পরীক্ষা। পড়াশোনার চাপে বাকরুদ্ধ হয়ে যাওয়া এক শিশুর মায়ের আকুতি এটি। একদিকে সন্তানের পড়াশোনার চাপ, অন্যদিকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ- সবমিলিয়ে অভিভাবকদের প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত। পিইসির নামে এই নির্যাতন যেন চাপিয়ে দিয়েছে সরকার। আর সেই সুযোগে টাকা কামানোর কারখানায় পরিণত হয়েছে নামিদামি স্কুলগুলো।

আগামী নভেম্বর থেকে শুরু হবে পিইসি পরীক্ষা। এরই মধ্যে রাজধানীর প্রায় প্রতিটি স্কুলে শুরু হয়েছে রমরমা কোচিং বাণিজ্য। শিক্ষকরাও বাড়িতে বাড়িতে খুলেছেন প্রাইভেট সেন্টার। স্কুলের ক্লাস, কোচিং, শিক্ষকের বাসায় প্রাইভেট পড়ানোর পরও বাসায় প্রাইভেট টিউটর রাখতেই হচ্ছে।
 
এই কসাইগিরির পরও সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে মুখ বুঁজে সব সহ্য করছেন অভিভাবকরা। কারণ কিছু বললেই স্কুল থেকে বের করে দেয়া, চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণে সমস্যা তৈরিসহ নানা ঝাক্কি-ঝামেলার অঘোষিত নীতি সবার জানা।

এসব নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা এখন চরমে। রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুলের এক অভিভাবক কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি আমার সন্তানকে ১০ মাস ১০ দিন পেটে ধরে জন্ম দিয়েছি। অনেক কষ্ট করে তাকে বড় করছি। আমার সন্তানকে বাঁচান। সে আর আগের মতো হাঁসে না, খেলে না, ছবি আঁকে না, একবারে চুপচাপ থাকে। দয়া করে তাকে হত্যা করতে দিবেন না।’ তার অভিযোগ, পিইসি পরীক্ষার দোহাই দিয়ে শিশুদের ওপর অমানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে শিশুদের স্বাভাবিক মেধা বিকাশ।

স্কুলের নিয়মিত ক্লাস, কোচিংয়ের পড়া, স্কুলের স্যারদের বাসায় প্রাইভেট- তাদের অ্যাসাইনমেন্ট সমাধানের জন্য আবার বাসায় রাখতে হয় শিক্ষক। এটাকে শিশুদের ওপর চরম নির্যাতন বলেই মনে করছেন অভিভাবকরা।

একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তারা জানান, রাতে ঘুমানোর সময় বাচ্চাদের স্কুলের ড্রেস পরিয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। কারণ তারা এতোটাই ক্লান্ত থাকে- রাতের এ কয়েক ঘণ্টা ঘুম কোনোভাবেই যথেষ্ট না। সকালে ঘুম থেকে উঠে যথাসময়ে স্কুলে উপস্থিত হওয়ার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখেতে হয়।

তারা বলেন, এতো পরমিাণ পড়ার চাপ থাকে- কোনো রকম শেষ করতেই রাত দেড়টা-দুইটা বেজে যায়। প্রায়শ শিশুরা পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়ে। এমনো ঘটনা ঘটেছে, ঘুমের কারণে পড়ার টেবিল থেকে পড়ে গেছে। আমাদের কাছে তো সন্তান আগে। পড়াশোনা বেঁচে থাকলে জরুরি। তাই বলে জীবন দিয়ে পড়াশোনা! জিবনের জন্য পড়াশোনা...জীবন দিয়ে নয়।

সম্প্রতি মাইলস্টোন স্কুলে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গেলে ২০/২৫ জন অভিভাবক এই প্রতিবেদককে ঘিরে ধরেন। তারা নানা অভিযোগ তুলে ধরে পত্রিকায় লেখার অনুরোধ করেন। পিইসি পরীক্ষাকে মূল্যহীন উল্লেখ করে অনেক অভিভাবক বলেন, ‘পিইসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট শুধু ক্লাস সিক্সে ভর্তি হতে লাগে। আর কোনো কাজেই আসে না। ভর্তি ছাড়া এ সার্টিফিকেট সম্পূর্ণ মূল্যহীন। শুধু ভর্তির জন্য তো এতো বড় একটা জাতীয় পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
 
বরং এ পিইসি পরীক্ষাকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যাচ্ছে। মাইলস্টোনের অভিভাবকরা বলেন, সকাল ৮টা থেকে ১টা পর্যন্ত ক্লাস। আধ ঘণ্টা বিরতি দিয়ে শুরু হয় কোচিং। শেষ হয় বিকেল ৩টায়। কোচিং বাধ্যতামূলক। কোচিং না করলে বাচ্চারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না। তাদের ইচ্ছে করে ফেল করানো হবে!
 
তারা জানান, যারা কোচিংয়ে আসবে না তাদের অভিভাবকদের ৩শ টাকার স্ট্যাম্পে এই মর্মে স্বাক্ষর করতে হয় যে, স্কুলের চূড়ান্ত পরীক্ষায় সন্তান অকৃতকার্য হলে বোর্ড পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ প্রদানে কোনো ধরনের সুপারিশ চাইবে না এবং তদবির করবে না। 

অভিভাবকরা বলেন, সবকিছু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মেনে নিই আমরা। কিন্তু এখন সন্তানেরই প্রাণ যায় যায়! শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি। কোনো কিছু বললে বাচ্চাকে বের করে দিবে। আমরা সবসময় ভয়ে, আতঙ্কে থাকি।
 
অভিভাবকরা জিম্মি স্কুলের শিক্ষকদের কাছেও। তারা বলেন, স্কুলের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে, পাস করতে হলে স্কুলের শিক্ষকদের বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়তে হবে। এটা অলিখিত নিয়ম। যারা প্রাইভেট পড়বে না তাদের পরীক্ষার খাতায় নম্বর কম দেয়া, ফেল করানোসহ নানারকম হয়রানির শিকার হতে হয়। 

অভিভাবকরা জানান, প্রত্যেক শিক্ষকের বাসায় একটা করে কোচিং সেন্টার আছে। ঐসব কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেন ওই শিক্ষকেরাই। বাইরে থেকেও শিক্ষক আনেন তারা, অথবা কোচিং ব্যবসায়ীদের তাদের বাসায় জায়গা দেন।
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাসিক বেতনের সমপরিমাণ টাকা কোচিং ফি হিসেবে দিতে হয়। শিক্ষকদের বাসায় প্রাইভেটের ফি ৩ হাজার টাকা। সঙ্গে আছে খাতা, কলম, স্কুল ড্রেস যার সবগুলোই স্কুলের স্টেশনারি থেকে প্রতিষ্ঠানের পছন্দ মতো কিনতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, বাইরের থেকে অনেক বেশি দামে খাতাসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনতে হয়। সব মিলিয়ে হিসাব করে দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থীর পেছনে অভিভাবকের প্রতি মাসে ৮/১০ হাজার টাকার বেশি গুণতে হয়। যাদের একাধিক সন্তান স্কুলে পড়ছে তাদের অবস্থা তো আরো গুরুতর! এ বিষয়ে মাইলস্টোন স্কুলের প্রাথমিক শাখার ইনচার্জ মমতাজ বেগমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।
 
তবে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা জারিন জামিল বলেন, সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়াশোনা পরিচালিত হওয়ার কারণে বাচ্চাদেরকে একটু বেশি সময় নিয়ে পড়াতে হচ্ছে। দেখা যায় বইতে একটি নমুনা দেয়া আছে, এটার সমাধান করে আরো কয়েকটি নমনা তৈরি করে তাদের অনুশীলনের জন্য দেয়া হচ্ছে। যেন শিক্ষার্থীরা ভালোভাবে বিষয়টি শিখতে পারে।

বাসায় প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য করার বিষয়টি অস্বীকার করে জারিন জামিল বলেন, ‘অভিভাবকরাই শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য লাইন ধরে থাকে। আমি বলেছি কোচিংয়ের বাইরে আমার অনুমতি ছাড়া কেউ প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। প্রাইভেট পড়ানো নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। তারা বলে ম্যাম অমুকের বাচ্চা প্রাইভেট পড়ছে আমার বাচ্চাকেও পড়ান না হলে সে পিছিয়ে যাবে।’ 

কোচিং না করালে ৩শ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করার বিষয়টিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেন তিনি। তবে স্কুল স্টেশনারি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার বাধ্যবাধকতাকে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বলে উল্লেখ করেন জারিন জামিল। আবার বেশি শিক্ষার্থী পেতে হলে ভালো ফলাফল দেখানোর যে চ্যালেঞ্জ আছে তা মোকাবেলায় অনেক কিছুই করতে হয় সে কথাও স্বীকার করলেন তিনি।

ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলোতে চলছে আরো ভয়াবহ পরিস্থিতি। পান থেকে চুন খসলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকের ওপর চাপয়ে দেয়া হয় ন্যক্কারজনক নিয়ম-কানুন। অর্থ ছাড়া যেন তারা কিছুই বোঝেন না! সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, আমার দু’সন্তান এবার পিইসি পরীক্ষার্থী। আমি কোনো মতেই এ খরচ বহন করতে পারছি না। ধার-দেনা করে পড়াচ্ছি। পিইসি পরীক্ষা না দিয়ে তো কোনো উপায় নেই।

তিনি আরো বলেন, ‘ক্লাসে গেলে বলে কোচিংয়ে এসো। কোচিংয়ে বলে প্রাইভেটে এসো। প্রাইভেটে গেলে একগাদা শিট ধরিয়ে দিয়ে বলে এগুলো বাসায় পড়ে এসো, কালকে পরীক্ষা। ক্লাসে, কোচিংয়ে, প্রাইভেটে কিছুই পড়ায়নি তারা। এগেুলো পরীক্ষার নামে সাধারণ মানুষকে জবাই করা হচ্ছে। প্রত্যকটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক একটা কসাইখানা। তারপর পড়া শেষ করানোর জন্য বাসায় প্রাইভেট টিউটর রাখতে হয়। প্রতি বিষয় তিন হাজার টাকা করে দিতে হয়। প্রতিমাসে আমার কম করে হলেও ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়।’
 
তবে স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষক সুলতান মাহমুদ এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা কখনোই প্রাইভেট বা কোচিংয়ের জন্য শিক্ষার্থীদের চাপ দেই না। অভিযোগুলো খুবই দুঃখজনক।’
 
পিইসি পরীক্ষার জন্য ক্লাস, কোচিং, প্রাইভেট, বাসায় শিক্ষক এতো কিছুর প্রয়োজন আছে কি না জানতে চাইলে সুলতান মাহমুদ দোষ চাপালেন অভিভাবকদের ওপর। তিনি বলেন, ‘বোর্ড পরীক্ষার কারণে অভিভাবকরা চায় তার সন্তানের জন্য সবটুকু চেষ্টাই করতে। এটা অভিভাবকদের আবেগের ব্যাপার। এক্ষেত্রে ভালো ফলাফলের প্রত্যাশা বিশেষভাবে কাজ করে তাদের মধ্যে।’
 
এদিকে এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মাইলস্টোন স্কুল, মণিপুর স্কুল, আইডিয়াল স্কুল, ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল, সেন্ট গ্রেগরী স্কুল, টঙ্গী সফিউদ্দিন সরকার একাডেমিসহ বিভিন্ন স্কুলের অভিভাকরা বিভিন্ন সময় মানববন্ধন করেছেন। গত মাসে (ফেব্রুয়ারি) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও দিয়েছেন। সবশেষ গত সোমবার হাইকোর্টে পিইসি পরীক্ষা বন্ধের আবেদন করে একটি রিট দায়ের করেন ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা।

এছাড়া সরকার ২০১৮ সাল থেকে পিইসি পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই বিষয়টি উল্লেখ করে অভিভাবকরা বলছেন, এতে প্রমাণ হয় পিইসি পরীক্ষা অপ্রয়োজনীয়। যেটা ২০১৮ সালে হবে সেটা এখন হতে দোষ কি? আমাদের দাবি, সরকার পিইসি পরীক্ষা বাতিল করবে। এবং সেটা এ বছর থেকেই।

এফ/০৮:০০/২১মার্চ

শিক্ষা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে