Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-১৫-২০১৬

লন্ডনি দৌলত বেগমের কান্না

লন্ডনি দৌলত বেগমের কান্না

সিলেট, ১৫ মার্চ- ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ দৌলত বেগম। স্বামী এখলাছ মিয়া ছিলেন লন্ডন প্রবাসী। সেই সুবাদে ১৯৮৬ সাল থেকে লন্ডনের স্থায়ী বাসিন্দা দৌলত বেগমও। একমাত্র মেয়ে ফাতিমা বেগমকে নিয়ে লন্ডনের ‘সিলেটি পাড়া’ হিসেবে পরিচিত ইস্ট লন্ডনে বসবাস করছেন দৌলত বেগম। পৈতৃক সূত্রে সিলেট নগরীর ২৭ নং ওয়ার্ডের গোটাটিকরে বিপুল ভূ-সম্পত্তি রয়েছে দৌলত বেগমের। বাড়ি, দোকান, ফসলি জমি সব মিলিয়ে সেই সম্পদের মোট দাম ৫ কোটি টাকার কম নয়। বৃদ্ধ দৌলত বেগমের সেই সম্পদে লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে এক ভয়ঙ্কর জালিয়াত চক্রের। সেই অশুভ চক্রের কবলে পড়ে এখন সব হারানোর উপক্রম হয়েছে দৌলত বেগমের। জাল একটি ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ বা আমমোক্তারনামার মাধ্যমে এই চক্র হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে দৌলত বেগমের সব সম্পত্তি।

এই ঘটনার নায়ক মাহছুমুল হক রুহেল (৩৫) নামের এক যুবক। দৌলত বেগমের দেশে অনুপস্থিতির সুযোগে সে দৌলত ও তার মেয়ের স্বাক্ষর জাল করে সম্পাদন করে নিয়েছে একটি আমমোক্তারনামা। ২০০৯ সালে এই অপকর্ম হলেও জানতেন না দৌলত বেগম বা তার পরিবার। ২০১৪ সালে হঠাৎ করেই তিনি জানতে পারেন তার মালিকানাধীন কোটি টাকা মূল্যের ৭৫ শতক ভূমি নিজের নামে নামজারি করিয়ে নিয়েছে রুহেল। এরপর কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে আসে সাপ। জানাজানি হয়, কৌশলে জাল আমমোক্তারনামা করে দৌলত বেগমের সমুদয় সম্পদ আত্মসাতের পাঁয়তারা চালাচ্ছে মাহছুমুল হক রুহেলের নেতৃত্বে অংশটি।

দৌলত বেগম জানান, প্রায় দু’বছর আগে আকস্মিকভাবে দৌলত বেগমের সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক আকসার মিয়া জানতে পারেন গোটাটিকর গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুস শহীদ মাহমুদের পুত্র মাহছুমুল হক রুহেল একটি সাফ কবলা দলিল করে দৌলত বেগমের সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়েছে। দৌলত বেগম সে সময় লন্ডনে। তত্ত্বাবধায়ক আকসার মিয়া খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ২০০৯ সালে সম্পাদিত একটি জাল আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) বলে মাহছুমুল হক রুহেল নিজেকে দৌলত বেগমের আমমোক্তার দাবি করে জালিয়াতির মাধ্যমে জমি বিক্রি করেছে। আকসার মিয়া খোঁজ নিয়ে আরও জানতে পারেন, ওই আমমোক্তারনামার বলে মাহছুমুল হক রুহেল দৌলত বেগমের মালিকানাধীন কোটি টাকা মূল্যের ৭৫ শতক ভূমি নিজের নামে নামজারিও করিয়ে নিয়েছে। পরবর্তীতে আকসার মিয়া ওই দলিল নং-৩৫৩৭/২০১৪ এর নকল সংগ্রহ করে দেখতে পান রুহেল নিজেকে দৌলত বেগমের আমমোক্তার দাবি করে ওই ৭৫ শতক জমি বিক্রি করেছে তার (রুহেলের) ভাইদের কাছে। এরপর সেই জমি আবার দানপত্রের মাধ্যমে নিজের নামে করিয়ে নিয়েছে রুহেল।

বিষয়টি জানতে পেরে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত দৌলত বেগমের পক্ষে তার মেয়ে ফাতিমা বেগম  লন্ডনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে লিখিতভাবে জালিয়াতির বিষয়টি অবহিত করেন। এর প্রেক্ষিতে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সেকেন্ড সেক্রেটারি ২০১৫ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি এক পত্রের মাধ্যমে এ বিষয়ে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে সিলেটের ডিআইজি অফিসের প্রবাসী অভিযোগ সেলে চিঠি পাঠান। লন্ডনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের ওই চিঠির প্রেক্ষিতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাব-ইন্সপেক্টর মো. মাহবুবুর রহমান বিষয়টি তদন্ত করে ২০১৫ সালের ২৫শে আগস্ট একটি প্রতিবেদন প্রদান করেন। প্রতিবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রমাণ পান যে, উক্ত মাহছুমুল হক জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া আমমোক্তার সৃজন করে দৌলত বেগমের মালিকানাধীন ভূমি তার ভাইদের কাছে বিক্রি করেছেন। এর মাত্র ৬ মাস পর সেই জমি আবার দানপত্রের মাধ্যমে নিজের নামে স্থানান্তর করে নিজে ওই জমির মালিক সেজেছেন। শুধু তাই নয়, জাল আমমোক্তারনামার বলে কৌশলে নিজের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করে জমি তার নিজের নামে নামজারিও করিয়ে নিয়েছেন।

কোটি টাকা মূল্যের ওই সম্পত্তি জালিয়াতির ঘটনায় নিয়মিত মামলা দায়েরের সুপারিশও করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। অভিযোগে প্রকাশ, জালিয়াত রুহেল চক্র ৩৫৩৭/২০১৪ নং যে দলিলটি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে প্রদর্শন করে সেখানে জমির মূল্য বাবদ পরিশোধকৃত টাকার পরিমাণ দেখিয়েছে ৭৫ লাখ টাকা। পরবর্তীতে সে দলিলটি সংশোধন করে সরকারের কর ফাঁকি দেয়ার উদ্দেশ্যে দলিলে পরিশোধকৃত টাকার পরিমাণ উল্লেখ করেছে ১০ লাখ টাকা। এছাড়া, ৭৫ লাখ টাকার দলিলে সে সব জায়গার শ্রেণী রেকর্ড মোতাবেক উল্লেখ করে। কিন্তু পরবর্তীতে ১০ লাখ টাকার দলিলে সব জমি বোরো শ্রেণীর উল্লেখ করে। এই ভয়ঙ্কর জালিয়াতির ঘটনা জানাজানি হলে তোলপাড় শুরু হয় পুরো এলাকায়। দৌলত বেগমের পক্ষ থেকে বিষয়টি গ্রামবাসীকে অবহিত করা হলে এলাকার সর্বস্তরের মুরব্বিয়ানরা সামাজিক সালিশ  বৈঠকের আয়োজন করেন। গোটাটিকর পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি হাজী মখলিছ মিয়া, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুল জলিল, নজরুলের বড় ভাই রফিক মিয়াসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে মাহছুমুল হক রুহেলকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জালিয়াতির কথা অকপটে স্বীকার করে এবং নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে জালিয়াতি করেছে স্বীকার করে এলাকাবাসীকে জানায় দৌলত বেগম দেশে আসলে সে তার সম্পত্তি ফিরিয়ে দেবে। এর প্রেক্ষিতে দৌলত বেগম দেশে আসলে পুনরায় এলাকাবাসী মাহছুমুল হক রুহেলকে সালিশ বৈঠকে ডাকেন। বৈঠকে উপস্থিত হয়ে রুহেল বলেন, জায়গা নিয়ে মামলা মোকদ্দমা হওয়ায় সে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দৌলত বেগম আর্থিক ক্ষতিপূরণ না দিলে সে জায়গা ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। ফলে, বৈঠকে এলাকাবাসী রুহেলকে তিরস্কার করেন এবং দৌলত বেগমের জায়গা কেউ খরিদ না করার জন্য এলাকাবাসীকে জানিয়ে দেন।

দৌলত বেগম জানান, জালিয়াতির ঘটনায় রুহেলের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে একটি মামলা, আমমোক্তারনামা জালিয়াতির অভিযোগে একটি মামলা (নং-২২৭/২০১৫) এবং জমির স্বত্ব নিষ্কণ্টক ও নির্মল করার স্বার্থে একটি মামলা (নং-৭৮/২০১৬) দায়ের করেছে, যা বিচারাধীন আছে। আদালত দৌলত বেগমের দায়ের করা জালিয়াতির মামলাটি আমলে নিয়ে এ বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে প্রতিবেদন প্রদানের জন্য মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু, এ নির্দেশের ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত  মোগলাবাজার থানা কর্তৃপক্ষ নানা আইনি জটিলতার দোহাই দিয়ে এখন পর্যন্ত ঐ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রদান করছেন না। তিনি অভিযোগ করেন, জালিয়াত রুহেল তার জমি জবরদখলে পাঁয়তারা চালাচ্ছে ও তার জমি থেকে গাছ গাছালি কেটে বিক্রি করছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত মাহছুমুল হক রুহেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, দৌলত বেগম ১৯৯৮ সালে আমার বাবা আব্দুস শহীদ মাহমুদের কাছে মৌখিকভাবে জমি বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে দৌলত বেগমের স্বামী এখলাছ মিয়া মারা যাবার পর ২০০৯ সালে তিনি দেশে এসে আমাকে পাওয়ার অব এটর্নি দিয়ে যান। এর প্রায় ৬ বছর পর তিনি এসে পাওয়ার অব এটর্নি সম্পাদনের বিষয় অস্বীকার করছেন। মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খায়রুল ফজল জানান, রুহেল কর্তৃক পাওয়ার অব অ্যাটর্নি জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হতে হলে বিশেষজ্ঞের মতামত প্রয়োজন। আদালত এ বিষয়ে নির্দেশ দিলে আমরা ওই পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কপি ঢাকায় বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাবো।

এফ/০৮:০৭/১৫মার্চ

সিলেট

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে