Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 2.0/5 (11 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-১৪-২০১৬

কবি রফিক আজাদের প্রয়াণে কবিদের প্রতিক্রিয়া

অলাত এহ্সান


কবি রফিক আজাদের প্রয়াণে কবিদের প্রতিক্রিয়া

স্বাধীনতার সময়ে বাংলা কবিতা তার ভিত পেয়েছিল যে কয়জন কবির হাতে, রফিক আজাদ তার উজ্জ্বলতম প্রতিনিধি। তিনি সেই বিরল কবিদের একজন যিনি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর সময়েও তিনি বাংলা কবিতার প্রধানতম স্বর। কবিতা দিয়ে কিছুই হবে না–এই কথার বিরুদ্ধে তিনি একসময় বলেছিলেন ‘কবিতা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাবে’। ‘পদ্য-প্রবন্ধ’, তার সেই বিখ্যাত কবিতা চর্চার ধরন আজো নিরীক্ষার বিষয়। ষাটের দশকের ভাবলুকতাকে তিনি উপেক্ষা করেছিলেন সদম্ভে। তাঁর কবিতায় সমাজ-সময়-রাষ্ট্রের চরিত্র যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে মাটি ও গণমানুষের সংগ্রামের প্রাণশক্তি। শান্তির জন্য যুদ্ধ কিংবা সৌন্দর্য্যকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি তার কবিতায় নানানভাবেই এসেছে।

গত ১২ মার্চ, ৭৪ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন এই কবি। তাঁর প্রস্থান যেমন ব্যক্তিগত শোকের, তেমনি সাহিত্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতিও। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন তিনি। তার প্রয়াণ নিয়ে কথা বলেছেন তার অগ্রজ, সমসাময়িক এবং অনুজ কবিগণ। তাদের কথা এখানে গ্রন্থণা করেছেন তরুণ লেখক অলাত এহ্সান।


আহমদ রফিক
ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জাড়িয়ে আছে কবি আহমদ রফিকের নাম। পরবর্তী দশকের অন্যতম কবি রফিক আজাদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও তার কবিতার সঙ্গে ঘনিষ্টতা ছিল বলে তিনি জানান। একজন প্রসিদ্ধ কবির প্রয়াণ তাকেও আহত করেছে। ব্যক্তিগত অনুভূতির বাইরে তিনি এই প্রয়াণকে দেখেন বৃহৎ প্রেক্ষাপটে: ‘এটা সাহিত্যের জন্য, বিশেষ করে কবিতার জন্য বড় ক্ষতি। রফিক আজাদ একজন ভাল কবি, প্রসিদ্ধ কবি, একজন উঁচুমানের কবি। আমি মনে করি এমন একজন কবির চলে যাওয়া তো দুঃখজনক এবং কবিতার জন্য ক্ষতি কর’ ।


মনজুরে মওলা
বাংলা একাডেমিতে কাজ করার সুবাদে কবি রফিক আজাদের সহকর্মী ছিলেন কবি মনজুরে মওলা। রফিক আজাদ তার অনুজ। তবে কাব্যচর্চার কারণে দু’জনের সখ্যতাও ছিল বেশ। বরাবরই তিনি রফিক আজাদের কবিতার মুগ্ধ পাঠক। তার প্রয়াণকে মেনে নেয়া তার জন্য ‘অত্যন্ত কষ্টের’। তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম না রফিক আজাদ মারা গেছে। আজ সকালে খবরের কাগজ দেখে খুবই বেদনাহত হয়েছি। আমি অনেকদিন ধরে পত্রিকায় রফিকের কোনো খবর পাচ্ছিলাম না। আমার ধারণা ছিল রফিক ভাল হয়ে গেছে এবং বাড়ি ফিরে গেছে।’ শারীরিক অসুস্থতার কারণে রফিক আজাদকে দেখতে যেতে না পারা বর্ষিয়ান এই লেখকের কাছে বেদনার। ‘কবি হিসেবে রফিককে অত্যন্ত পছন্দ করতাম। করতাম না, করি এবং করবো’ বলেন তিনি। ‘আমি মনে করি আমরা এমন একজন কবির সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হলাম, যিনি কবিতায় আশ্চর্য চিত্রকল্প তৈরি করতে পারতেন।’ রফিক আজাদের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি টেনে বলেন, ‘রফিক যখন বাংলা একাডেমি ছেড়ে চলে যায়, সেটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখের ছিল। আমি চেয়ে ছিলাম, রফিক যেন না যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রফিক একাডেমি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলেই যায়। এখন তো সে শরীরিভাবে অসীম দূরে চলে গেল। এখন তো আর কিছু বলার নেই।’ রফিক আজাদের সঙ্গে তার শেষ দেখা হয়েছিল একটি কবিতা পাঠের আসরে। ‘আমি তার প্রয়াণে মুহ্যমান’ বলেন মনজুরে মওলা।


সৈয়দ শামসুল হক
সাহিত্যের দশক বিচারের ধারায় সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্য চর্চা রফিক আজাদের একদশক আগে, পঞ্চাশের দশকে। ষাটের দশকে বাংলা কবিতার বাঁক বদলকে আমলে নিলে তার উজ্জ্বল কারিগরদের একজন রফিক আজাদ। দশক বিভাজনের সেই রেখা তুলে নিলে দুইজনেই কাব্যের অভিন্ন ঘরের বাসিন্দা। যদিও রফিক আজাদ কবিতাকে এক ও অদ্বিতীয় করে রাখলেও সৈয়দ হকের সাহিত্য চর্চা বিকশিত হয়েছে অন্যান্য দিকেও। তথাপি সাহিত্যের মঞ্চে তাদের বহুবারই একত্রিত হতে হয়েছে। আশির জাতীয় কবিতা পরিষদের দু’জনই যুক্ত হয়েছেন নানা ভাবে। বর্ষীয়ান কবি সৈয়দ হকের কাছে তাই রফিক আজাদের মৃত্যু শোকের ও অনুজ বিয়োগের। তিনি বলেন, ‘তার মৃত্যুর অনুভূতি বলার মতো মনে অবস্থা এখন নেই। কাল ওর দাফন-টাফন হয়ে যাক। এখন আমার বলার অবস্থা নেই।’


নির্মলেন্দু গুণ
‘বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজে তার হিম শীতল দেহ স্পর্শ করলাম। মাঝখানে ’৬৪ থেকে ২০১৬, ৫২ বছরের সম্পর্ক তাঁর সঙ্গে। চাকরি উপলক্ষ্যে তিনি অনেক সময় ঢাকার বাইরে থেকেছেন। সেই সময়গুলোতে আমরা একত্রিত হতে পারি নাই। কিন্তু তিনি যখন ঢাকায় ফিরেছেন, আমাদের মধ্যে সাক্ষাৎ আলাপা হয়েছে’ বলেন নির্মলেন্দু গুণ। কবি গুণ স্মরণ করেন, ‘তিনি যখন ইত্তেফাক গ্রুপের সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘রবিবার’-এ কাজ করার জন্য বাংলা একাডেমির চাকুরি ছেড়ে দিলেন, তখন আমি প্রথম তার পত্রিকায় ক্রিকেটের ওপর ধারাবাহিক লিখতে শুরু করি। এটা ’৭৯ সালের দিকে। তিনি সম্পাদক হিসেবে অনেক তরুণ লেখককে দিয়ে লিখিয়েছেন। এই স্পৃহা তার ভেতরে ছিল। …আমি যেহেতু দুইবছরের ছোট তার চেয়ে, আমি তাঁকে ভাই-ই বলতাম, তিনি আমাকে নির্মল বলতেন।’
ষাটের দশকের বিখ্যাত ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকার মধ্যদিয়ে সংগঠিত হয়েছেন ও উঠে এসেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অনেক কবি। নির্মলেন্দু গুণও সেখানে যুক্ত হয়েছিলেন দশকের প্রথমার্ধে। কবিতায় নিজস্ব স্বর তৈরিতে সক্ষম নির্মলেন্দু গুণ তখন থেকেই আন্তরিকতার বন্ধনে জড়িয়ে যান কাব্য সারথী রফিক আজাদের সঙ্গে। অর্ধশত বছরের সখ্য-বন্ধুত্ব তাদের। তাই রফিক আজাদের মৃত্যু তার কাছে এক গভীর বেদনা। ‘তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল, এখন যেটা শহিদুল্লাহ হল পাকিস্তান আমলে সেটা ঢাকা হল ছিল, সেখানে’–স্মৃতিচারণ করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ–‘তখন রফিক আজাদের রুমে, তাঁকে মধ্যমণি করে উঠতি কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডা হতো। তারা প্রথাবিরোধী সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তুলছিলেন।’ উচ্চ মাধ্যমিক পেরুনো নির্মলেন্দু গুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসে সেই রুমেই উঠেছিলেন। তখন থেকেই তাদের সখ্য। তারপর ‘শরিফ মিয়ার ক্যান্টিনে, নওয়াবপুর রোডের আর্জু হোটেল, নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকান, বিউটি বোর্ডিংয়ে আমরা আড্ডা দিয়েছি।’
‘রফিক আজাদ তো অনেক দিন ধরে সাহিত্যে ইন-এ্যাক্টিভ ছিলেন। গতকিছু দিন ধরে তার কবিতার বই বের হচ্ছিল না, তিনি লিখছিলেন না। ফলে কবি হিসেবে মৃতই ছিলেন বলা যায়, অবসর প্রাপ্ত। অবসরের মধ্যই তিনি ছিলেন। সংসার জীবন নিয়ে তিনি বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত ছিলেন। বিব্রত থেকেছেন সব সময়। …শামসুর রাহমান যেমন ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’ লিখেছেন, এই বিধ্বস্ত নীলিমা হলেন রফিক আজাদ। তো তিনি তার সময়ে কম লিখতেন তার সময়ের তুলনায়। আন্তর্জাতিক সাহিত্য পরিমণ্ডলকে বিবেচনায় রেখে লিখতেন। …তার শোক আমাকে মুহ্যমান করে।’


মুহম্মদ নূরুল হুদা
ষাটের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশে কবিতায় আবির্ভূতদের মধ্যে অবশ্য স্মরণীয় কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা। সময়টা কবি রফিক আজাদেরও উর্বর কাল। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে উভয়ের কাব্য-সিদ্ধি কবিতার ইতিহাসেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। নুরুল হুদা খ্যাত হয়েছেন ‘জাতিসত্তার কবি’ হিসেবে। রফিক আজাদ চিহ্নিত হয়েছেন ‘ভাত দে হারামজাদা’ কবিতার মধ্যদিয়ে। প্রায় সমসাময়িক দু’জনের কাব্যযাত্রা ও সখ্য ছিল গভীর। তাই ‘রফিক আজাদ শারীরিকভাবে চলে যাচ্ছে, সেটা প্রায় আরো ৫৮ দিন আগে থেকে, যখন তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলেন, তখন থেকেই আঁচ করেছি। কিন্তু এটা আমার বিশেষভাবে ধারণা ছিল যে, রফিক আজাদ এইবার বেঁচেই যাবেন। এটা বন্ধুত্ব বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপার নয়, সাধারণত দেখেছি লাইফ সাপর্টে থাকা রোগি ৬-৭ দিনের মধ্যে চলে যায়। দীর্ঘদিন যারা থাকে তারা রেসপন্স করে যায়, ডাক্তারদের এমন একটা আশা ছিল। ব্যক্তিগতভাবে এই আশাবাদ আমার ভেতর এমনভাবেই ছিল যে, আমি ভাবতেই পারি নাই, হঠাৎ তার প্রয়াণের খবর শুনতে হবে। ভেবেছি, রফিক ভাই সারাজীবন কবি হিসেবে, মানুষ হিসেবে অনেক আশ্চর্য ঘটনা ঘটিয়েছেন, আরেকটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটবে। এই আশ্চর্যটা প্রাকৃতিকও ছিল। তাই শুনেছি যখন, বিশ্বাসই করতে পারিনি। এবং এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না। ধাক্কাটা এত প্রবল। আমি এর জন্য মোটেই তৈরি ছিলাম না। ফলে তার সম্পর্কে লেখা, ভাবা কোনোটাই আর সেভাবে হচ্ছে না। তার কবিতা সমগ্র কেবল হাতে নিয়ে নিয়ে ঘুরছি।’ রফিক আজাদের অনেক খ্যাতনামা কবিতা ও লেখার মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে আছেন মুহাম্মদ নূরুল হুদা। পঞ্চাশ দশকের কবিদের সঙ্গে কবিতার নান্দনিক বৈপরীত্যে ও বিদ্রোহে লিপ্ত হওয়া ষাটের দশকের প্রথম দিকের কবিদের মধ্যে রফিক আজাদ নিজস্বতায় ভাস্বর ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এককভাবে শুধু কবিতা চর্চা করে, উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হয়েছেন রফিক আজাদ। …বিশ্ব সাহিত্যে অনেকেই করছেন, কিন্তু এখানে একই সঙ্গে কবিতার ভেতর জ্ঞানের বিষয় ঢুকিয়ে দেয়া রফিক আজাদ সব থেকে বেশি করেছেন। …জীবনের শুরু থেকেই কবিতা নিয়ে বিচিত্র নিরীক্ষা তিনি করেছেন। আবার বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের আর্থসামাজিক অবস্থাকে ধারণ করে তীব্রতম ভাষায় কবিতা লিখেছেন ‘ভাত দে হারামজাদা’ নামে। তারপর কবিতাকে স্লোগান থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে নিয়ে স্লোগানকেই কবিতার নান্দনিকতায় ভাস্বর করেছেন। আর কবিতা কিছুই করতে পারে না বলে যে কথা বাজারে প্রচলিত আছে, তাকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি বলেছিলেন, কবিতা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামাবে, সেই ষাটের দশকেই।’ কলেজ শিক্ষকতার মধ্যদিয়ে কবিতা থেকে সাময়িক দূরে যাওয়া প্রকৃত প্রস্তাবে চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকের কবি ও সম্পাদকরা রফিক আজাদকে সনাক্ত করতে না পারাকেই দায়ি করেন এই কবি। ‘কবিতা যে কত ঐশ্বর্যময়, বিশ্ব শাসন করতে পারে–রফিক আজাদ তা ঘোষণা করেছিলেন। … রফিক আজাদ আমাদের সেই বিরল কবি যেই কবি অস্ত্র হাতে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।’ তাঁর প্রস্থানকে সারা জীবন কোনো কিছুর সঙ্গে সন্ধি, আপোস না করার মতোই মনে করেন মুহাম্মদ নূরুল হুদা।


মহাদেব সাহা
রফিক আজাদের মৃত্যু, ‘এটা আমার কাছে এতো বেদনাদায়ক যে, আমি মনে করি আমার অনুভূতিটা এইরকম–কোনো বন্ধুজনের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে প্রকৃতপক্ষে নিজেরই একধরনের মৃত্যু হয়ে যায়। এমন করে আমরা জীবনে বহু বন্ধুজনের মৃত্যুর মধ্যদিয়ে এগিয়ে আসি। ফলে নিজেরই বহু মৃত্যু যেন অতিক্রম করতে হয়।’ বলেন কবি মহাদেব সাহা। কাব্যানুরাগী এক বন্ধুর মাধ্যমে প্রথমে রফিক আজাদের মৃত্যুর সংবাদ শোনেন তিনি। ষাটের দশ থেকে শুরু করে প্রয়াণ-পূর্ব রফিক আজাদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ ও সখ্য অটুটই ছিল তার। ‘কণ্ঠস্বর’-এর মধ্যদিয়ে একত্রিত কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে তাদের বন্ধুত্বের সাহিত্যিক উদযাপনও বিদিত। তাই বন্ধুর প্রয়াণে ‘এই বেদনা প্রকাশযোগ্য নয়।’ মৃণালীনী দেবীর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিক্রিয়া টেনে তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, আমার কাছে সব থেকে বেদনার যে, সব আছে কিন্তু সেই মানুষটি নেই। …ব্যাপারটা এমন, যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, …তখন কাটবে গো দিন আজও যেমন দিন কাটে। সবই চলতে থাকবে। এই হচ্ছে অবস্থা।’
কিন্তু প্রতিটি মৃত্যু একটা শূন্যতা সৃষ্টি করে বলে তার বিশ্বাস। কিন্তু সেই শূন্যতার ভেতর দিয়ে শোক ও দুঃখকে ধারণ করে মানুষ এগিয়ে যায়। ‘কবি যেহেতু মানুষের অন্তর জীবনের চিত্রকর। অন্তর জীবনকে বুনে তোলেন, মানুষের অন্তর জীবনকে দেখার চেষ্টা করেন এবং তা অন্তর দৃষ্টির সাহায্যেই করেন। ফলে তার মৃত্যু অবশ্যই বেদনা সৃষ্টি করে, শূন্যতার সৃষ্টি করে। বিশেষত সেই কবি যদি স্বকীয় ধারা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ধারক হন। সেই দিক থেকে রফিক আজাদ বাংলা কবিতায়, বাংলাদেশের কবিতায় নিজস্ব অবস্থান তিনি তৈরি করেছিলেন। তার কবিতার নিজস্ব শৈলী ও আঙ্গিক তৈরি হয়েছিল। বাংলা কবিতা যেখানে একটু এ্যালানো, একটু আবেগ ছড়ানো, সেইখানে রফিক আজাদ সুসংহত ও দৃঢ়বদ্ধ কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলেন। এই কারণে তিনি তাকে ‘পদ্য-প্রবন্ধ’ বলেছিলেন।’ মহাদেব সাহা মনে করেন ‘পদ্য-প্রবন্ধ’ বলে কিছু নেই, এটা অবশ্যই কবিতা। রফিক আজাদ বরং এই শব্দ যুগল দিয়ে বিনয়ই প্রকাশ করেছিলেন। ‘তাঁর কবিতা সুগ্রথিত। শুধু এ্যালানো ভাবাবেগের প্রকাশ নয়, তার কবিতা সুসংগত, সুগঠিত বলে আমি মনে করি। কবিতাই তাঁর কৃতি, কবিতার জন্যই তিনি জীবন ব্যায় করেছেন, জীবন ক্ষয় করেছেন। আমি তার আত্মার শাক্তি কামনা করি।’ রফিক আজাদ বাংলা কবিতায় আরো বহু বহু বছর বেঁচে থাকবেন বলে তিনি মনে করেন


মোহাম্মদ রফিক
ষাটের দশকের কবিতার অন্যতম স্বর কবি মোহাম্মদ রফিক। রফিক আজাদ বয়সে তার এক বছরের অগ্রজ হলেও তারা একই সময়ে কাব্যচর্চা শুরু করেছিলেন। রফিক আজাদের মতো তিনিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাছাড়া সাহিত্যিক সামাজিক বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামেও তারা পাশাপাশি ছিলেন। রফিক আজাদের প্রয়াণ তার জন্য অত্যন্ত বেদনার। ‘তার মৃত্যু আমার জন্য ব্যক্তিগত শোকের’, বলেন সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিক। রফিক আজাদ নিয়ে শিগগিরই লেখার আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি বলা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। কারণ আমরা এক সাথে লিখতে শুরু করেছি। দীর্ঘদিন যুক্তি ছিলাম। এই শোক আগে কাটিয়ে উঠি। আমি তাকে নিয়ে লিখবো। তাকে নিয়ে আমার লিখতেই হবে।’

 


 

 

আসাদ চৌধুরী
ষাটের দশকেই কলকাতায় শুরু হওয়া ‘হাংরি জেনারেশন মুভমেন্ট’-এর অনুকরণে আসাদ চৌধুরীরা যখন ‘স্যাড জেনারেশন মুভমেন্ট’ শুরু করেন, রফিক আজাদের খেয়াল ছিল সেদিকে। তার চেয়ে তিনি বরং কবিতায় গণমানুষ ক্ষোভকে ধারণ করার চেষ্টা করেছেন। সমসাময়িক কবিদের মধ্যে আসাদ চৌধুরীর সঙ্গে তার সখ্য গভীর ছিল। এমন কি ‘আসাদ চৌধুরী’ নামটাও রফিক আজাদেরই ঠিক করে দেয়া। তার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে ‘বাংলা সাহিত্যের একটা বড় রকমের ক্ষতি হয়ে গেল।’ রফিক আজাদ বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ কবি বলে উল্লেখ করেন তিনি। ‘একজন বড় মাপের দেশপ্রেমিক ছিলেন। বাংলাদেশের প্রকৃতিকে তিনি ভীষণ ভালবাসতেন। বৃষ্টির জন্য নদীগুলোর যে আর্তনাদ আছে, বনভূমির উজার হয়ে যাওয়ার জন্য তার যে আর্তি রফিক আজাদের কবিতা না পড়লে তা বুঝবে না। মুখে বললে হবে না, পড়লে বোঝা যাবে, কত গভীর তার মমতা ছিল।’ এই গভীর মমতা থেকেই তিনি অস্ত্র হাতে হানাদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, লাড়াই করেছেন–বলেন কবি ও জনপ্রিয় উপস্থাপক আসাদ চৌধুরী। ‘বিখ্যাত কবিদের মধ্যে যে কয়জন অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন, তিনি তাদের একজন। …কাজেই এইটুকু বলা যেতে পারে, বাংলাদেশের নিসর্গ, বাংলাদেশের মানুষ, মানুষের বৈষম্য প্রতারণা সহ্য করতে পারতেন না বলেই তিনি লিখেছেন। যেগুলো এখন বেদবাক্যের মতো মনে হয়।’
ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আমার ক্ষতি হচ্ছে, এক অর্থে তিনি আমার গার্জিয়ান। তিনি আমার নাম বদলে রাখলেন। আমার কবিতা পত্রিকায় ছাপতেন। কাজেই আমার ক্ষতিটা আর নাইবা বললাম। …তার মৃত্যু সংবাদ আমার কাছে পারিবারিক শোক।’


কাজী রোজী
‘ও আমার অকৃত্রিম বন্ধু। খুব ভাল বন্ধু ছিল’, বলেন কবি কাজী রোজী। সমসাময়িক না হলেও সারাজীবনই রফিক আজাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল তার। ‘এই বন্ধুতা থেকেই বলতে পারি, তার কয়েকটা জীবনের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল। একটা জীবন তার বাংলা একাডেমির জীবন, সেখান থেকে সাপ্তাহিক রোববার-এর জীবন, বিড়িসিঁড়ি’র জীবন, তারপর জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের জীবন। এই চাকরির সুবাদে তার বিভিন্ন জায়গায় থাকা, তার অবস্থান। তার প্রত্যেক জায়গায় আমি গিয়েছি। আমি দেখেছি। আমার সঙ্গে তার দারুণ গভীরতা সম্পর্ক ছিল’ –বলেন কাজী রোজী। ‘বাংলা একাডেমিতে যখন কাজ করতেন, তখন তিনি আমার লেখা চেয়ে নিতেন, ‘রোজী তুমি কবে লিখাটা দিবা, তাড়াতাড়ি দাও’–এর রকম করতেন। কিংবা কবিতা পাঠের আসরে হবে, তখন তিনি বলতেন, ‘রোজী তুমি তো আসবেই’। এটা ওর মধ্যে ছিল। আমি মনে করি এইভাবে তিনি আমাকে বলতেন, আমাকে সমৃদ্ধ করতেন।’
অন্তরঙ্গ বন্ধু রফিক আজাদের প্রয়াণ কবি ও সাংসদ কাজী রোজীর কাছে মহাশূন্যতার। ‘আমি একটা কথা বলতে পারি, যেকোনো মানুষের চলে যাওয়া বুকের ভেতর থেকে একরাশ নিঃশ্বাস বেরিয়ে যায়, আমরা জানতেও পারি না। রফিক আজাদের বিদায়টাও তাই। একমাস তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। শেষ বার হাসপাতালে দূর থেকে তাকে দেখলাম, মনে হলো ও আমাদের সেই রফিক আজাদ। তার প্রয়াণ, তার চলে যাওয়া, তার না-থাকা এ যেন সমস্ত জায়গা শূন্য হয়ে যাওয়া।


রবিউল হুসাইন
কবিতা চর্চায় অনেকটা পরে এলেও প্রায় সমবয়সীই কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন। দুই বছরের অনুজ রবিউল হুসাইন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন, রফিক আজাদের সাহচর্য, অনুপ্রেরণা তাকে সমৃদ্ধ ও শানিত করেছে। ‘তিনি যে কেবল কবি ছিলেন তা-ই নয়, প্রথম জীবনে শিক্ষক ছিলেন, সেটাও ঠিক। কিন্তু তিনি কবিতা যেমন সৃষ্টি করেছেন, আবার কবিদেরও তিনি সৃষ্টি করেছেন। উঁনার সান্নিধ্য যারা যারা এসেছেন, জুনিয়র বা সিনিয়র কবি, প্রত্যেকের অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস কিন্তু উঁনি।’ ম্যাগাজিন ও পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে তার ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘সম্পাদক হিসেবে উনি অতুলনীয়। মানে হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ–এরা তো লেখক তৈরি করেছেন। ম্যাগাজিন বা পত্রিকার সম্পাদকের কাজ হলো নতুন যে রত্ন, যে প্রতিভা তাকে খুঁজে বের করা; সব সময় তাদের প্রতিপালন করা। এটা আমাদের রফিক আজাদের মধ্যে ছিল। এমনকি তিনি নাম পর্যন্ত বলে দিতেন–এই নামটা তোমার হবে না, এই নামটা তোমার কর।’ মইনুদ্দীন নামে কবিতা-লেখক পরবর্তীতে নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন হয়ে ওঠার কারণও এই। ‘তিনি বললেন, তুমি তৃতীয় শ্রেণির কবি না হয়ে প্রথম শ্রেণির নাট্যকার হও। এবং সেলিম আল দীন তাঁকে পিতার মতো মনে করতেন। তিনি বলতেনও, আমি যে নাট্যকার হয়েছি তা আমার বাবা রফিক আজাদের গুণে।’ তিনি আরো উদাহরণ টেনে বলেন, ‘এই আমাদের ইমদাদুল হক মিলন। উনি যখন প্রথম দিকে রোববার-এর সম্পাদক ছিলেন, মিলনকে দিয়ে লেখানো, কত কিছু করতেন তিনি, উনি যখন বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকার-এর সম্পাদক ছিলেন। আমি মনে করি, সেই সময় উত্তরাধিকার বাংলাদেশের সেরা সাহিত্য পত্রিকা ছিল। এমনকি সংগঠক হিসেবে জাতীয় কবিতা পরিষদেও প্রথম দিকে ছিলেন তিনি। সব কিছু মিলে তিনি একটা পরিপূর্ণ মানুষ ছিলেন। কবিতার জগতে এরকম সৃষ্টিশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ বা কবি আমাদের জীবনে আর পাইনি।’ তাঁর মৃত্যু বাংলা কবিতায় অপূরণীয় ক্ষতি বলে মনে করেন এই কবি।


হেলাল হাফিজ
ষাটের দশকের প্রথম দিকে কাব্যচর্চা শুরু করেন রফিক আজাদ, আর শেষ দিকে কবি হেলাল হাফিজ। তবু সময়ের উজ্জ্বল যাত্রী হিসেবে রফিক আজাদের প্রতুল স্নেহ-সাহচার্য পেয়েছেন তিনি। উভয়েই কবিতা অন্তপ্রাণ। সময়ের তুলনায় রফিক আজাদ কম লিখেছেন বলা হলে হেলাল হাফিজ সবার চেয়েই অনেক কম লিখেছেন, তা বলতে হবে। তাদের মধ্যে আন্তরিকতার মুক্ত বাতাস সব সময় প্রবাহমান ছিল। কবিতার দীর্ঘ যাপনের পর রফিক আজাদকে হারানো তার জন্য বেদনা ও শোকের। পারতপক্ষে স্মৃতিচারণের মধ্যদিয়ে তা পুনরায় মনে করে তিনি এই শোক যাপনের অনুভূতির মুখোমুখি হতে চান না। ‘এটা আমি কী বলবো, বলো। তিনি আমার অনেক বড়। তবে ষাট দশকের শুরুতে উনারা আর শেষদিকে আমি। মাঝখানে তো অনেকেই আছেন। তার সাহচার্য পেয়েছি।’ বলেন কবি হেলাল হাফিজ, ‘তাঁর প্রয়াণ আমার জন্য শোকে।’

 

 


অসীম সাহা
সমসাময়িক না হলেও কাছাকাছি সময়ের কবি অসীম সাহা। ব্যক্তিগত সাহচর্যের মধ্যদিয়ে কাব্যভাবেরও সঞ্চার ঘটেছে তার মধ্যে। অসীম সাহা বলেন ‘আমার জন্য সব চেয়ে দুঃখের কথা হচ্ছে, যখন দ্বিতীয় বিয়ে করলেন তখন সমস্ত বন্ধুদের থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁকে কেউ আশ্রয় দেয় নি। তখন আমার যে ইত্যাদি প্রিন্টার্স আছে, সেখানে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। সকালে এবং বিকেলে তিনি সেখানে কাটাতেন। একটানা বিশটি বছর তিনি আমার এখানে কাটিয়েছেন। সেটা আমার জন্য খুব যন্ত্রণার জায়গা।’ শুধু কবিতা নয়, ব্যক্তিগতভাবেও অন্তরঙ্গ ছিলেন দুইজন। ’৭২ ঢাকায় ফিরে আসার পর থেকেই তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঘনিষ্ট হয়। তাতে পারস্পারিক জল সিঞ্চন করেছেন দুইজনেই। ‘আমাদের সম্পর্ক ছিল মধুর। কোনো দিন আমাদের মধ্যে কোনো রকম মনমালিন্য হয় নি। …এটা ধরে রাখা সহজ ব্যাপার ছিল না। অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে। কিন্তু আমার সঙ্গে তা হয়নি।’
তবে রফিক আজাদের মৃত্যু শোকের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে তার মধ্যে। তিনি বলেন, ‘মৃত্যু মানুষের হবেই, তা ঠিক আছে। কিন্তু অত্যন্ত বেদনার কথা হচ্ছে, গত দুই মাস ধরে তিনি হাসপাতালে ছিলেন। না আমাদের বন্ধু লেখক-সাহিত্যিক, না আমাদের মিডিয়া, রফিক আজাদের মতো একজন কবি, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং ভাষা বিষয়ে সচেতন একজন কবি, সেই কবিকে যথাযথ সম্মান দেখায়নি। দেশের রাজনীতিক ও বিভিন্ন ব্যক্তির সংবাদ মিডিয়ায় যে গুরুত্বের সঙ্গে যায়, গত দুই মাসে তেমনটি আমরা দেখিনি। তিনি নিরবে নিভৃতে মারা গেলেন। এটা খুব বেদনাদায়ক।’ তাঁর মতো বড় মাপের কবি বাংলা কবিতায় হাতে গোনা, বলেন অসীম সাহা। রফিক আজাদের ‘পদ্য-প্রবন্ধ’ সম্পর্কে বলেন, ‘নতুন একটা ধারার উদগাতা রফিক আজাদ। তিনি পদ্য-প্রবন্ধ বলতে যা বোঝাতেন, তা তিনি লিখে প্রমাণ করেছেন। তার কবিতা সত্যিকার অর্থের পদ্য-প্রবন্ধ ছিল। আমাদের তথাকথিত রোমান্টিক কবিতার মুখে থু থু মেরে তিনি কবিতার নতুন একটা কাঠামো ও আলাদা ম্যাসেজ দিতে চেষ্টা করেছেন। এবং সফল হয়েছেন সেটাই সব চেয়ে বড় কথা।’


হাবীবুল্লাহ সিরাজী
রফিক আজাদের উত্তর প্রজন্মের কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে রফিক আজাদ যেমন তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করেছেন, ব্যক্তিগত সাহচর্যে বন্ধুপ্রতীম অনুজ কবিদের তিনি সমৃদ্ধ করেছন। দীর্ঘ সময় তাঁর সাহচর্য পাওয়া কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘মৃত্যুতে কারো হাত নেই। তবে অনেক মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা চেয়েছিলাম তিনি আমাদের মাঝে আরো কিছুদিন থাকবেন। কিন্তু সেটা হয়নি, এই দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আমরা এই মুহূর্তে কিছু করতে পারছি না।’ ব্যক্তিগত ছাড়াও নানা সংগঠনে, অনুষ্ঠানে রফিক আজাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। ‘কবি হিসেবে তাঁকে বড় জানতাম অনেক, ভাই হিসেবেও।’ ‘ব্যক্তি রফিক আজাদ না থাকলেও তার রচনাবলী আছে’ মনে করিয়ে দিয়ে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘আমরা চাই, আমরা শুধু নয়, পরবর্তী প্রজন্মও তাকে পাঠ করুক। আপাতত তার দেহাবসানকে বাদ দিয়ে তার যে মানসিক যে অবস্থান তার সঙ্গে যুক্ত থাকি। বাংলা সাহিত্যে রফিক আজাদ যেভাবে ছিলেন, আমরা তাকে পাঠ করে যুক্ত থাকি। সেটাই হবে যথার্থভাবে রফিক আজাদকে স্মরণ করা।’


সোহরাব পাশা
কবিতা ভাষায় স্বাতন্ত্র্য ছিল কবি রফিক আজাদের। সত্তুরের দশকের কবি সোহরাব পাশার কবিতা ভাবনাও স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। সে হিসেবে উভয়ের মধ্যে দূরত্ব অনেক। তথাপি দু’জনের ব্যক্তিগত নৈকট্য কখনো ব্যাহত হয় নি। দুইজনেরই কবিতার ভেতরে গড়ে তুলেছেন আপন আপন সৌধ। ‘যদি বলি বাংলা কবিতায় একটা বৃক্ষের পতন হয়েছে, একটা নক্ষত্রের পতন হয়েছে, যদি বলি একটা মহীরুর পতন হয়েছে–তবু আসলে তাঁর প্রয়াণ সম্পর্কে শেষ কথাটি বলা হবে না, কতটা ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করেন কবি সোহরাব পাশা। রফিক আজাদের প্রথম কর্মজীবনের মতো কলেজ শিক্ষকতায় নিয়োজিত এই কবি বলেন, ‘আরেকজন রফিক আজাদের জন্য আমাদের কত সময় অপেক্ষা করতে হবে, তা কেবল মহাকালই জানে।’ আশির দশকের জাতীয় কবিতা পরিষদের আন্দোলনে যুক্ত থাকার সুবাদে তাদের ভেতরে গড়ে ওঠে আন্তরিক সম্পর্ক, শেষাবধিও ছিল। ‘তিনি শুধু আমার অবস্থানগত প্রতিবেশি ছিলেন,আসলে হৃদয়ের প্রতিবেশিও ছিলেন। এত ঘনিষ্টতা ছিল যে, সে সব মনে করতে গেলে বাকরুদ্ধ হয়ে যেতে হয়। চোখ ভিজে যায়, মনও ভিজে যায়। এটা আসলে ব্যাখ্যা করা যায় না।’


গোলাম কিবরিয়া পিনু
রফিক আজাদের পরের দশকের কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু। সত্তুর দশকে তার কাব্য যাত্রা শুরু। কাব্য ভাষা আলাদা হলেও কবিতা ও কবি আন্দোলনে রফিক আজাদের সাহচর্য তাকেও সমৃদ্ধ করেছে। অগ্রজপ্রতিম এই কবির প্রয়াণের বেদনা তাকেও ছুঁয়েছে। ‘বহুদিন তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি, কবিতা বিষয়ক সাংগঠনিক কাজের পরিধিতেও তাঁর সাথে মিশেছি অনেকদিন, এভাবে একটা সর্ম্পক ছিল কিন্তু পাঠক হিসেবে তাঁর কণ্ঠলগ্ন ছিলামও বহুদিন ধারাবাহিকভাবে, এখনো আছি।’ এসব কারণে ‘এই মৃত্যু আমাকে বিষাদ-আক্রান্ত করেছে স্বাভাবিকভাবেই’ বলেন কবি গোলাম কিবরিয়া পিনু। রফিক আজাদকে বাংলা কবিতার মূলধারা, বিশেষত বাংলাদেশের কবিতার একজন বিশিষ্ট কবি উল্লেখ করেন তিনি। ‘যে বোধের উন্মীলন ঘটিয়েছেন, তাঁর কবিতায় তিনি, তা একজন আধুনিক কবিরই পরিচয় মেলে ধরে। তাঁর কবিতা জীবনের রসে তাজা, গন্ধময় দৃশ্যময়, শব্দময় ও বর্ণময় । কবি তাঁর কবিতার মাধ্যমে যে বোধ সঞ্চারিত করেছেন, তা আর কবির থাকেনি, পাঠকের হয়ে তা পাঠককে অনুপ্রাণিত করেছে। এইখানে তাঁর যাদুকরী কারুকাজ।’ এই সময়ের কবি হিসেবে তাঁর কবিতার কাছে বারবার যেতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

আর/১১:২৫/১৪ মার্চ

 

 

সাহিত্য

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে