Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 1.3/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৩-১১-২০১৬

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে

সুজন ঘোষ


চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে

চট্টগ্রাম, ১১ মার্চ- বেসরকারি খাতে একটি বাস থেকে মাসে গড়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাভ করেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ‘সিটি ট্যুর সার্ভিস’ প্রকল্পের প্রতিটি বাসের জন্য মাসে লোকসান দিতে হচ্ছে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাসপ্রতি সিটি করপোরেশনের লোকসানের পরিমাণ অবিশ্বাস্য। তাঁদের মতে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকা, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি লাভজনক হয়নি। 
ক্রমাগত লোকসান, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং মানসম্মত যাত্রীসেবা দিতে না পারায় এই প্রকল্প বন্ধ করে বাসগুলো নিলামে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে নগর পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সেবা চালু রাখা দরকার। 

সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, অনেকগুলো বাস অকেজো। যেগুলো চালু আছে, সেগুলোর অবস্থাও লক্কড়ঝক্কড়। এসব বাস দিয়ে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। তাই এই সেবা বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের যান্ত্রিক শাখা সূত্রের তথ্যমতে, সিটি ট্যুর সার্ভিসে বর্তমানে ১৬টি বাস রয়েছে। ২০১১ সালের মার্চ থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পরিবহনচালক ও শ্রমিকদের বেতন, জ্বালানি ও মেরামত বাবদ খরচ হয়েছে ২ কোটি ১ লাখ ২৬ হাজার ৫২৫ টাকা। একই সময়ে আয় হয়েছে মাত্র ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ২২৪ টাকা। ওই ৩৮ মাসে এই প্রকল্পে সিটি করপোরেশন লোকসান দিয়েছে ১ কোটি ৮২ লাখ ২৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে বাসপ্রতি গড়ে লোকসান হয়েছে ২৯ হাজার ৯৭৯ টাকা। প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী জয়সেন বড়ুয়া বলেন, গাড়িগুলো থেকে যা আয় হয়, তার চেয়ে বেশি খরচ হয়।

তবে আয়-ব্যয়ের এই হিসাব মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী আফজালুর রহমান। তিনি বলেন, আয়-ব্যয়ের এই পার্থক্য অবিশ্বাস্য। করপোরেশনের উচিত কেন এত লোকসান হয়েছে, তা খুঁজে বের করা। 

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন গ্রুপের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম ও সিটি সার্ভিস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তরুণ দাশগুপ্ত বলেন, সিটি করপোরেশনের গাড়িগুলো পরিচালনায় সুষ্ঠু কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। গাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও যন্ত্রাংশ ক্রয়ে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম থাকতে পারে। ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ির ক্ষেত্রে এই সমস্যা নেই। ফলে গাড়ি মেরামত, চালক-সহকারীদের বেতনসহ যাবতীয় ব্যয় মেটানোর পরও বাস (৪২ আসন) থেকে মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় হয়। করপোরেশনের অধিকাংশ বাস ৪২ আসনের। কয়েকটি বাস ৫২ আসনের। 

সঠিক ব্যবস্থাপনা, কড়া নজরদারি ও আলাদা বিভাগের মাধ্যমে করপোরেশনের বাসগুলো পরিচালনা করা গেলে প্রকল্পটি লাভজনক হতো বলে মন্তব্য করেন এই দুই পরিবহন ব্যবসায়ী। 

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী নগরে নারী ও শিশুদের যাতায়াত দুর্ভোগ লাঘবে ২০০৬ সালের ১ এপ্রিল ১০টি বাস ভাড়া নিয়ে এই সেবা চালু করেন। পরে করপোরেশনের তহবিল থেকে ২০০৬ ও ২০০৯ সালে দুই দফায় ১৯টি বাস কেনা হয়। প্রথমে কেবল নারী ও শিশুদের জন্য চালু করা হলেও পরে এই সেবা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। 
সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘গাড়িগুলোর অবস্থা ভালো না। এভাবে আর রাখা হবে না। গাড়িগুলো নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হবে। ভবিষ্যতে পরিকল্পিত উপায়ে বাস সার্ভিস চালু করব।’ 

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের যান্ত্রিক শাখা সূত্রে জানা গেছে, ১৯টি গাড়ির মধ্যে ১৫টি গাড়ি নিলামে বিক্রি করার জন্য সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ১ কোটি ২০ লাখ ৫২ হাজার ১৮২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব গাড়ি কেনা হয়েছিল ৪ কোটি ৮৩ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। বাকি চারটি গাড়ির মধ্যে তিনটি সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাজে এবং রৌফাবাদ শিশুসদনের শিশুদের বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। দুটি বাস নষ্ট। আরেকটি বাস ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান (যাদের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল) ফেরত নিয়েছে। 

চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলাচল করে সিটি ট্যুর সার্ভিসের বাসগুলো। গত বুধবার দুপুর সোয়া ১২টায় সরেজমিন বহদ্দারহাটে গিয়ে সিটি ট্যুর সার্ভিসের কোনো বাস দেখা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী জয়সেন বড়ুয়া মুঠোফোনে বলেন, হরতালের সময় বাসগুলো চলে না। বুধবার জামায়াত হরতাল ডাকলে সকাল থেকেই নগরে অন্য পরিবহন সংস্থার বাস চলাচল স্বাভাবিক ছিল। 

ওই দিন বেলা সোয়া একটায় পূর্ব মাদারবাড়ি এলাকায় সিটি করপোরেশনের গাড়ি রাখার ডিপোতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ১৪টি বাস রয়েছে। চট্টমেট্রো ব ১১-০৩৭১ নম্বরের গাড়িটিতে ব্যাটারি লাগানো হচ্ছিল। এ ছাড়া আরেকটি গাড়ির যন্ত্রপাতি ঠিক করছিলেন চালক শাহ আলম। তিনি বলেন, একটি বাস থেকে দিনে ৩ হাজার টাকার মতো আয় হয়। গাড়িচালক ও সহকারীদের দিতে হয় মোট ৭৫০ টাকা। গ্যাস খরচও করপোরেশন বহন করে। 

ছাউনির তত্ত্বাবধায়ক মো. মুনির হাসান বলেন, যাত্রী পরিবহনে নিয়োজিত ১৩টি বাসের মধ্যে নিয়মিত চলে ৮-৯টি। অন্য বাসগুলো মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যাত্রী পরিবহন করতে পারে না। তবে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ সুভাষ বড়ুয়া বলেন, নগরে গণপরিবহন বলতে কিছু নেই। তাই এ ধরনের সেবা চালু রাখা দরকার। সিটি করপোরেশন চাইলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বাস সেবা চালু রাখা সম্ভব।

এস/১৮:৪০/১০ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে