Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

Login
ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-০৮-২০১৬

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পেছনের গল্প  

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের পেছনের গল্প

 

৮ মার্চ সারা বিশ্ব জুড়ে নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। নারীকে নিয়ে এইদিন হয় কত কত আলোচনা সভা, অনুষ্ঠান, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় শুভেচ্ছাবার্তা, আয়োজন হয় টক শো। এমনকি নারী দিবসের বিশেষ ছাড় চলে ব্রান্ডশপগুলোতে। অনেক দেশে ৮ মার্চ নারীর সম্মানে সরকারি ছুটিও থাকে। এই যে এত গুরুত্ব, এত সুবিধা পাই বিশেষ একটি দিনে, কেন পাই? কি হয়েছিল এই দিনে?

মানুষ হিসেবে একজন নারীর পরিপূর্ণ অধিকারের দাবিতে সুদীর্ঘকালের আন্দোলনের সম্মানস্বরূপ আজ পালিত হচ্ছে নারী দিবস। অন্তত একটা দিন গোটা বিশ্ব আলাদা করে মনে করে নারীরাই এই জগতের শক্তির উত্‍স আর প্রেরণা। যদিও আলাদা করে বছরের একটা বিশেষ দিনে নারী দিবস পালন করা নিয়ে নানা কথা হয়। নিন্দুকরা নাক সিঁটকে বলেন, সবটাই বাড়াবাড়ি। কিন্তু যারা এ কথাটা বলেন তারা নিশ্চয় ইতিহাসের পাতাটা ভাল করে উল্টে দেখেননি। আসুন ইতিহাসটা জেনে নিই সংক্ষেপে।

১৯০৮
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস কোন একজন বিশেষ নারীবাদি বা কোন সংগঠন শুরু করেনি। বরং এটি ছিল একটি সমষ্টিগত সংগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রে নারী শ্রমিকদের অবস্থা ছিল খুবই করুণ। সমমর্যাদা তো দূরের কথা পুরুষদের সমান কাজ করেও মজুরী দেওয়া হত খুবই কম। নারী শ্রমিকদের মধ্যে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। অবদমন আর অসমতাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দি্তে জোড়ালো আওয়াজ তোলার পরিকল্পনা করতে থাকেন তারা। ১৯০৮ সালে ১৫০০০ নারী নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা, ভাল বেতন এবং ভোটার অধিকারের দাবিতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন।

১৯০৯
আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক পার্টি ১৯০৯ সালে প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয়ভাবে নারী দিবস পালন করে। তবে দিনটি ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত নারীরা দিনটিকে উৎযাপন করেন বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবারে।

১৯১০
১৯১০ সালে কর্মজীবি নারীদের ২য় আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিন এখানে নারী দিবস আন্তর্জাতিকভাবে উৎযাপনের দাবি উত্থাপন করেন। তিনি মনে করতেন, সকল দেশেই দিবসটি পালন করা প্রয়োজন, যাতে সেই দিনে একযোগে সারা বিশ্বে নারীরা তাদের অধিকারের কথা বলতে পারে। ১৭ টি দেশের ১০০ জনেরও অধিক নারী প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন এই সভায়। তারা সবাই গেটকিনের প্রস্তাবটিকে সমর্থন করেন।

১৯১১
১৯১১ সালে কোপেনহেগেনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে আন্তর্জাতিক নারী দিবস প্রথমবারের মত পালিত হয় ১৯ মার্চ তারিখে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জার্মানি এবং সুইজারল্যান্ডে। ১ মিলিয়নেরও বেশি নারী-পুরুষ দিবসের র‍্যালিতে অংশগ্রহণ করেন এবং নারীর কাজ করা, ভোট প্রদান করা, প্রশিক্ষণ নেওয়ার অধিকার এবং সমতার দাবিতে ক্যাম্পেইন করেন। এর ১ সপ্তাহ পর ২৫ মার্চে নিউইয়র্কে দুঃখজনক 'Triangle Fire' এর ঘটনা ঘটে। এতে ১৪০ জনেরও বেশি নারী প্রাণ হারায়, এদের অধিকাংশই ছিলেন ইতালিয়ান এবং ইহুদী অভিবাসী। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে কর্ম পরিবেশ এবং শ্রমের অবস্থা উন্মোচিত করে সবার কাছে। ১৯১১ সালে নারীরা Bread and Roses ক্যাম্পেইনও করে।

১৯১৩-১৯১৪
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শান্তির বার্তা প্রচারণার অংশ হিসেবে রাশিয়ান নারীরা প্রথম নারী দিবস উৎযাপন করেন ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবারে। ১৯১৩ সালেই আলোচনার মাধ্যমে আনতর্জাতিক নারী দিবসকে ৮ মার্চ করা হয় এবং বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ ব্যাপ্তির সাথে পালিত হয়। ১৯১৪ সালে সমগ্র ইউরোপে নারীরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং নারীদের সংহতি প্রকাশ করতে র‍্যালি বের করে। ৮ মার্চ, ১৯১৪। যুক্তরাষ্ট্রের লন্ডনে ট্রাফালগার স্কয়ারের সামনে একটি মিছিল বের হয় এইদিন। এখানে চ্যারিং ক্রস স্টেশনের সামনে বক্তব্য দানকালে নারী নেত্রী সিল্ভিয়া পানখারস্ট গ্রেফতার হন।

১৯১৭
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ২ মিলিয়ন রাশিয়ান সৈন্যের নিহত হওয়ার প্রতিবাদে ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবারে রাশিয়ার নারীরা ধর্মঘট শুরু করেন 'রুটি এবং শান্তি' এর জন্য। রাজনৈতিক নেতাদের নিষেধ স্বত্তেও তারা ধর্মঘট অব্যাহত রাখেন। অবশেষে ৪ দিন ঘর্মঘটের পর সরকার নারীর ভোটাধিকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে। তারিখটি ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৩ ফেব্রুয়ারি, গ্রেগরিয়া্ন ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৮ মার্চ।

১৯৭৫
১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে।

১৯৭৭
এরপর ১৯৭৭ সালে্র ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস আরও বড় পরিসরে উৎযাপিত হয় বিশ্বব্যাপী, যখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ তার সকল সদস্য দেশকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে দিবসটি উৎযাপনের আহবান জানায়।

বিশ্বের অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারী ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। তন্মধ্যে - আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, গিনি-বিসাউ, ইরিত্রিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজিস্তান, লাওস, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনিগ্রো, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম এবং জাম্বিয়া। এছাড়া চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার, নেপালে শুধুমাত্র নারীরাই সরকারী ছুটির দিন উপভোগ করেন।
 
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০১৬ এর প্রতিপাদ্য হল, “Planet 50-50 by 2030: Step It Up for Gender Equality”. এবছর ৮ মার্চ জাতিসংঘ বিষয়টি উত্থাপন করবে এবং কিভাবে উন্নয়নের ধাপগুলোকে আরও গতিশীল করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা এবং উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

কর্মক্ষেত্রে, গৃহে কোথাও আজও নারী সমঅধিকার পায় না। আজও অনেক পরিবারে মেয়ে সন্তানকে বোঝা মনে করা হয়। বাল্য বিবাহ প্রচলিত আছে শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের আরও অনেক দেশে। নারীশিক্ষা এখনও সর্বোজন স্বীকৃত ব্যবস্থা নয়। উচ্চ শিক্ষিতা নারীর বিয়ে, ক্যারিয়ার নিয়ে চলে নানান কটু কথা। চাকরিক্ষেত্রে নানান বৈষম্যের সাথে যোগ হয় যৌনহয়রানি। অভিযোগের সুরাহা হয় না, বরং নারীকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

নারী দিবসের ইতিহাস আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়। নারীর অবস্থার উন্নয়ন করতে হবে নারীকেই। বিজ্ঞাপনের রুপালী আলো বলবে, 'নারী, তোমার বাড়ছে বয়স! তুমি ফুরিয়ে যাচ্ছ!' বলবে, 'নারী, গায়ের রংটাই সব। এমনকি ভাল ক্যারিয়ার গড়তেও হতে হবে ডানা কাটা পরী।' নারীকেই বেছে নিতে হবে, কি চায় সে! সৌন্দর্য, লাবণ্য দিয়ে হতে চায় কবিতার অংশ নাকি পেতে চায় আত্মমর্যাদায় সমুন্নত জীবন?

লিখেছেন- আফসানা সুমী

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে